20/05/2026
বাঙালি মুসলমানের নেপাল বিজয়
শেখ নজরুল
আজ বাঙালি মুসলমানের নেপাল বিজয়ের ৬৭৪তম বছর। ১৩৫০ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নেপালের তরাই অঞ্চলে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। ইতঃপূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেনি।
তিনি রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসেন। নেপাল রাজ বংশাবলিতে পূর্ব দেশীয় সুলতান শামসুদ্দিনের নেপাল আক্রমণের উল্লেখ আছে। কাঠমান্ডুর নিকটস্থ স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরে প্রাপ্ত শিলালিপিতে এই আক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং এই লিপিতে আক্রমণের তারিখ ৪৭০ নেওয়ারী সম্বৎ (১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ) বলে উল্লিখিত আছে। মধ্যযুগের বাংলার সুলতানদের মধ্যে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তিনি শুধুমাত্র ইলিয়াস শাহী বংশেরই প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদেরও জনক। তিনিই প্রথম বাঙালি জাতিকে বাঙালি হিসেবে পরিচিত করেন। তিনি উড়িষ্যা ও নেপাল এলাকার ত্রিহুত পর্যন্ত বাংলার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর প্রভাব কাশী-বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনিই প্রথম 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' উপাধি ধারণ করেন।
তিনিই প্রথম শাসক যিনি বাংলা নামক বর্তমান যে অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হয় সেসব অঞ্চলকে সর্বপ্রথম ভৌগোলিকভাবে একীভূত করার কৃতিত্বের দাবিদার। এর আগে বাংলার বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, যেমন গৌড়, রাঢ়, পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ইত্যাদি। তাদের শাসন ব্যবস্থাও ছিল আলাদা আলাদা। তিনি ১৩৪২ সাল থেকে ১৩৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্বকালে উড়িষ্যা, নেপাল এবং কামরূপ বাংলার সাম্রাজ্যভুক্ত করে এতদঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সম্মিলিত রাজ্যের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং এর অধিবাসীদের বাঙালি নামে অভিহিত করেন।
ইলিয়াস শাহ পূর্ব পারস্যের সিজিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতার নাম ছিল সুলতান। প্রাথমিক জীবনে তিনি দিল্লির মালিক ফিরোজের অধীনে চাকরি করতেন। কিন্তু সেখানে কোনো এক অপরাধ করে তিনি বাংলায় পালিয়ে আসেন এবং সাতগাঁও এর শাসক ইজ্জুদ্দীন ইয়াহইয়ার অধীনে চাকরি নেন। নিজ যোগ্যতাবলে তিনি মালিক পদে উন্নীত হন। পরবর্তীকালে ইজ্জুদ্দীনের মৃত্যুর পরে তিনি ১৩৩৮ সালে সাতগাঁওয়ের অধীশ্বর হন। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সনে বাংলায় ক্ষমতায় আরোহণ করেন।
বাংলার রাজধানী তিনি লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) থেকে পাণ্ডুয়ায় সরিয়ে নেন। পাণ্ডুয়ার অবস্থান ছিল গৌড়ের ৩২ কিলোমিটার উত্তরে। তারপর থেকে পাণ্ডুয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে ওঠে। পাণ্ডুয়ার বর্তমান অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়। তিনি যখন সিংহাসনে বসেন তখন দিল্লিতে তুঘলক বংশের ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন চলতেছিল। গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে
তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন যেমন (ক) লক্ষ্মণাবতী; (খ) সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম; (গ) সোনারগাঁও। এই তিন প্রদেশের রাজধানীও ছিল আলাদা এবং শাসনকর্তা ছিলেন তিনজন। এরা ছিলেন দিল্লির অধীনস্থ এবং এই তিনজন শাসনকর্তার মধ্যে বিরোধ অব্যাহত ছিল। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই সুযোগটি গ্রহণ করলেন। তিনি ১৩৫২ সালে ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহকে পরাজিত করে সোনারগাঁও দখল করেন। এইরূপে তিনি সমগ্র বাংলা অঞ্চলের অধিপতি হন। বাংলার তিনটি প্রদেশ জয় করে বাংলাকে একীভূত করে ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি গ্রহণ করলেন। বাংলার ইতিহাসে বাংলা এই প্রথম 'বাঙ্গালা' নামে পরিচিত হল। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা সন্দেহ নেই।
কেননা, এর আগে বাংলা প্রাচীন কাল থেকে গৌড়, পুণ্ড্র, বঙ্গ এসব জনপদে বিভক্ত ছিল। এর পূর্বে ১৩৪৪ সালে ত্রিহুত ও ১৩৫০ সালে নেপাল অভিযান করেন। বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে তিনি জাজনগর (উড়িষ্যা) আক্রমণ করেন। অতঃপর ইলিয়াস শাহ ১৩৫৩ সালে বিহার আক্রমণ করেন। বিহারের পরেও তিনি তাঁর কর্তৃত্ব চম্পারণ, গোরখপুর, ও বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। রাজত্বের শেষদিকে ১৩৫৭ সালে তিনি কামরূপ দখল করেন।
ইলিয়াস শাহ তাঁর সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করতে গিয়ে দিল্লির শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন, ফিরোজ শাহ তাকে দমন করার জন্য বাংলা অভিযান করলে অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে তাঁর দিল্লির আক্রমণ মোকাবিলা করেছেন। সাহসী যোদ্ধা ইলিয়াস শাহ সফল সামরিক গুণের অধিকারী ছিলেন।
তিনি বাংলা ও বাংলার বাইরে তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেন। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ শুধুমাত্র বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এতদঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন এবং বাংলার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে জনসমর্থন লাভে প্রয়াসী হন। স্থানীয় জনগণকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে গণশাসনে রূপ দেন। তিনিই সর্বপ্রথম স্থানীয় জনগণকে অধিক সংখ্যায় সামরিক বাহিনীতে চাকরির সুযোগ দেন। বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম লক্ষ্মণাবতী, সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম এবং সোনারগাঁও এই তিন অঞ্চলে বিভক্ত বাংলাকে একত্রিত করে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত করেন।
জিয়াউদ্দিন বরনীই হলেন প্রথম মুসলিম ঐতিহাসিক যিনি ইক্লিম-ই-বাঙ্গালাহ অথবা দিয়ায়-ই-বাঙ্গালাহ (যার দ্বারা তিনি বাংলাকে বুঝিয়েছেন) শব্দগুলো ব্যবহার করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক লখনৌতি, সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও একত্রিত হওয়ার পর শামস-ই-সিরাজ ইলিয়াস শাহকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ', 'সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ' এবং ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান' হিসেবে উল্লেখ করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সালতানাত প্রায় দুশ' বছর টিকে ছিল এবং এ সময় বাঙ্গালাহ নামের বহুল পরিচিতি ঘটে।
এ অঞ্চলে মুঘলদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুঘলগণ বাঙ্গালাহকে মুঘল সাম্রাজ্যে একটি সুবাহ (প্রদেশ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এ প্রদেশ সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। এ নামই পর্তুগিজ বিবরণে বেঙ্গালা রূপে দেখা যায়। ইংরেজরা বেঙ্গালাকে বেঙ্গল বলে অভিহিত করেন। এভাবে দেখা যায় যে, চৌদ্দ শতক থেকেই বাঙ্গালাহ নামের পরিচিতি ঘটে এবং এ অঞ্চল বলতে বর্তমানের বাংলাদেশ ও ভারতীয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত প্রায় সব ভূভাগকেই বোঝায়।
✍️ ডাকটিকিট সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ সংখ্যা থেকে।