16/09/2026
জগত সংসার
পর্ব ০৩
লেখক The Story Haven (শাহেদ খান)
নিজের ঘরের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে আমি বিছানায় বসে রইলাম। বুকের ভেতরের কষ্টটা যেন দ্বিগুণ হয়ে চেপে বসল। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না—রুহির মতো মেয়ে, এত শিক্ষিত একটা মেয়ে, এই ধরনের নিচ আর অকৃতজ্ঞের মতো কথা কীভাবে মুখে আনতে পারলো? যে রুহিকে আমি আটটা বছর ধরে চোখের মণি করে আগলে রাখলাম, নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যাকে বিসিএস ক্যাডার বানালাম, সেই মেয়ে আজ ক্ষমতার আর স্ট্যাটাসের গরমে অন্ধ হয়ে আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা ভাবছে!
বিছানায় বসে যখন ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি, তখন কিছুক্ষণ পর রুহি রুমে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে একটু বিরক্তির সুরে বলল, "তুমি মায়ের সামনে ওভাবে এমন ব্যবহার করলে কেন? আমি এত কষ্ট করে দিন-রাত এক করে পড়ালেখা করে বিসিএস ক্যাডার হলাম, অথচ আমার এই ক্যারিয়ারের কোনো গুরুত্বই নাই তোমাদের কাছে! আমি ভেবেছিলাম বিসিএস-এর রেজাল্টটা হওয়ার পর অন্তত কয়েকটা দিন একটু মানসিক শান্তিতে ভালো কাটাব, তা-ও তোমার জন্য পারলাম না।"
আমি চুপচাপ বসে রুহির মুখের দিকে তাকালাম। আজ আমার চোখের সামনে যে রুহি দাঁড়িয়ে আছে, তার সাথে গত আট বছর ধরে আমি যে রুহিকে চিনি, তার আকাশ-পাতাল পার্থক্য! এ যেন অন্য এক অচেনা, হৃদয়হীন নারী।
আমি রুহির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম, "তোমার ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হলে আমার বাবা-মায়ের জীবন কি গুরুত্বপূর্ণ না, রুহি?"
রুহি আমার এই হুট করে ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। একটু থমকে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আমি রুহির দিকে তাকিয়ে আবার বলতে লাগলাম, "তুমি যখন বিসিএস-এর জন্য কঠিন পড়াশোনা করতে, তখনকার কথা কি তোমার মনে আছে? তোমার সেই পরীক্ষার দিনগুলোর কথা কি তুমি ভুলে গেছ?"
রুহি কোনো কথা না বলে অপরা*ধীর মতো আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
আমি বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রেখে বলতে লাগলাম, "তুমি যখন রাত জেগে মনোযোগ দিয়ে পড়তে, তখন আমার দুটি অবুঝ বাচ্চা যেন তোমাকে একটুও বিরক্ত না করে, সেজন্য আমি নিজে ওদের সামলে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছি। তুমি যখন পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিতে যেতে, আমি অফিসে যাওয়ার আগে নিজের কাজ ফেলে রেখে তোমাকে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছি। তুমি যখন ক্লান্ত হয়ে হতাশায় পড়তে, আমি তোমার হাত দুটো ধরে বলেছি—সংসারের কোনো চিন্তা তোমার করার দরকার নেই, তুমি শুধু পড়াশোনা করো। তখন আমি নিজে হাতে রান্না করে, বাচ্চাদের খাইয়ে তারপর অফিসে গিয়েছি। ক্যারিয়ার তো আমারও ছিল রুহি! আমি তো কোনো এনজিও ব্যাংকের মামুলি কর্মী হওয়ার কথা ছিলো না, আমারও স্বপ্ন ছিল আরও ওপরে ওঠার। কিন্তু তোমায় আর আমাদের সংসারটাকে ভালো রাখতে গিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করেছি।"
রুহি এবার আর আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না। মাথাটা নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আবার বললাম, "আজ তুমি সফল হয়েছ। তুমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছ, এতে আমি ভীষণ গর্বিত। কিন্তু তোমার এই সাফল্যের অজুহাতে যদি আমার জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রতি তোমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়, তবে সেই সাফল্য আর এই বিসিএস ক্যাডার পরিচয় আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারব না।"
রুহি এবার একটু আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিচু গলায় বলল, "তুমি সবসময় সবকিছুকে এভাবে দায়িত্বের আর ত্যাগের হিসাব দিয়ে দেখছ কেন? আমি কি তোমার বাবা-মাকে ভালোবাসি না?"
আমি একটা তিক্ত হাসির ছোঁয়া ঠোঁটে এনে বললাম, "ভালোবাসা শুধু মুখের ফাঁকা কথায় বোঝা যায় না রুহি, মানুষের বাস্তব আচরণে বোঝা যায়।"
রুহি আমার কথার আর কোনো জবাব দিতে পারল না। মুখটা থমথমে করে নিঃশব্দে রুম থেকে বের হয়ে চলে গেল।
আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সোজা মায়ের নম্বরে ডায়াল করলাম।
ফোন ধরতেই আমি বললাম, "কেমন আছো মা?"
ওপাশ থেকে মা একটা দুর্বল আর চিন্তিত গলায় বললেন, "আমি তো ভালোই আছি রে বাবা। তবে তুই কবে আসবি বল তো? তোর বাবার শরীরটা আবার একদম ভালো না। আজ দুপুর থেকে বুকটায় আবার তীব্র ব্যথা উঠেছে, সারাদিন বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে।"
মায়ের কথাটা শোনামাত্রই আমার বুকটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, "আম্মা, তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি কাল সকালেই গ্রামে আসছি। তোমায় আর আব্বাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসব। শহরে ভালো ডাক্তার দেখাব।"
সেদিন রাতে রুহি আমার পাশে এসে শুলেও আমরা দুজন দুজনের দিকে পিছন ফিরে রইলাম। সারারাত ও আর একটা শব্দও আমার সাথে বলল না। এক দমচাপা নীরবতায় রাতটা কেটে গেল।
পরদিন সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে গ্রাম যাওয়ার উদ্দেশ্যে দরজা খুলতে যাব, ঠিক তখনই রুহি পেছন থেকে এসে বলল, "এত সকালে কই যাও?"
আমি পেছনে তাকিয়ে বললাম, "বাবার বুকের ব্যথা আবার বেড়েছে। তাই আব্বা-আম্মাকে আনতে গ্রামে যাচ্ছি। শহরে এনে কোনো বড় ডাক্তারকে দেখাতে হবে।"
রুহি মুখখানা ভার করে দাঁড়িয়ে রইল, আর কোনো কথা বলল না। আমি আর দেরি না করে সোজা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম।
কয়েক ঘণ্টার জার্নি শেষে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেই আব্বা আর আম্মাকে বললাম, "তোমরা আর দেরি করো না, জামাকাপড় গুছিয়ে নাও। শহরের বাসায় যাব।"
আব্বা-আম্মা যখন জামাকাপড় রেডি করছিলেন, তখন আমি স্মৃতিঘেরা পুরোনো টিনের বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। আব্বা-আম্মাকে আনন্দের সাথে বললাম, "জান আম্মা, রুহি কিন্তু বিসিএস ক্যাডার হয়েছে! অনেক বড় চাকরি পেয়েছে ও।"
আমার কথা শুনে বৃদ্ধ আব্বা-আম্মার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ছেলে আর বউমার উন্নতিতে তারা গ্রামের মানুষদের ডেকে যেন বলতে চাইলেন। তাদের সেই সরল হাসিমুখ দেখে আমার বুকের ভেতর কষ্টটা আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল।
বিকেলের বাসে চেপে আব্বা-আম্মাকে সাথে নিয়ে যখন আমাদের শহরের ভাড়া বাসায় পৌঁছালাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।
কলিংবেলের শব্দ পেয়ে রুহি এসে দরজা খুলে দিল। আব্বা-আম্মাকে দরজায় দেখেই ও মাথার শাড়ির আঁচলটা টেনে একটু মাথায় কাপড় দিয়ে নিচু হয়ে সালাম দিল।
আম্মা পরম মমতায় বললেন, "কেমন আছো বউমা?"
রুহি ভেতরে ঢোকার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে কৃত্রিম একটা হাসি মুখে এনে বলল, "আমি ভালো আছি আম্মা। আপনারা কেমন আছেন? আসতে কোনো কষ্ট হয়নি তো?"
আব্বা একটু কাশতে কাশতে বললেন, "আমরা ভালো আছি মা। তোমার নাকি অনেক বড় সরকারি চাকরি হয়েছে? শাহেদ বলছিল। শুনে আমাদের যে কী আনন্দ হয়েছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। অনেক বড় হও মা।"
রুহি বিনয়ের ভান করে বলল, "জি বাবা, দোয়া করবেন। তা আপনার নাকি অসুস্থতা আবার বেড়েছে?"
আব্বা একটু ধীর গলায় বললেন, "হ্যাঁ মা, একটু বেড়েছে। বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝেই বড্ড চাপ দিয়ে ব্যথা করে। বয়স তো কম হলো না, শরীরের কলকব্জা ঢিলে হয়ে গেছে।"
আব্বা কথাটি শেষ করার আগেই পাশের রুম থেকে আমার শাশুড়ি বেশ আড়ম্বর করে হেলেদুলে বের হয়ে এলেন। তিনি আব্বার কথার ওপর ফোঁড়ন কেটে খোঁচা দিয়ে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ, একদম ঠিকই বলেছেন বেয়াই সাহেব! বয়স হলে তো শরীরে এমন একটু-আধটু ব্যথা-বেদনা হতেই পারে। এটা তো স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু এখনকার ছেলেরা তো আর এসব বোঝে না! কথায় কথায় হুটহাট ডাক্তার আর হাসপাতালের দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়।"
কথাটি সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন রুহির মা।
আব্বা শাশুড়ির কথার পেছনের বিষাক্ত ইঙ্গিত বুঝতে না পেরে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললেন, "তা ঠিকই বলেছেন বিয়ানী। তা আপনি কেমন আছেন?"
রুহির মা কপালে একটা বিরক্তির ভাঁজ ফেলে, অবহেলার সুর এনে বললেন, "ভালোই আছি, আর ভালো না থেকে উপায় কী বলুন? আমার মেয়েটা এতদিন র**ক্ত পানি করে এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে বিসিএস ক্যাডার হলো শুধুই আমার দোয়ায়! আমার মোনাজাতে তো সবসময় রুহির নামটাই সবার আগে থাকত। আমার তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমি তো এই রুহিটাকেই সবথেকে বেশি ভালোবাসি।"
শাশুড়ির মুখের এই চরম মিথ্যা আর ঢং দেখে আমি হাঁ করে রুহির দিকে তাকালাম। আমার দৃষ্টি টের পেয়ে রুহি নিজের মুখটা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমার মনের ভেতর তখন ক্ষো*ভ আর ঘৃ*ণার ঝড় বইছে। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম—এই মহিলা এত বড় বহুরূপী আর পল্টিবাজ কীভাবে হতে পারে! যে মহিলা বিগত আটটা বছরের মধ্যে ফোন করে রুহির পড়াশোনা বা সংসারের খোঁজ নেয়নি! আমার দুটো সন্তান হওয়ার সময় যখন রুহি যন্ত্র*ণায় ছটফট করত, তখন এই শাশুড়ি একদিনের জন্যও এসে মেয়ের পাশে দাঁড়াননি বা বাচ্চাদের একটু কোলে নেননি।
অথচ আমার এই বৃদ্ধা মা—রুহির সন্তান হওয়ার পর থেকে টানা ছয়টা মাস নিজের শারীরিক অসুস্থতা ভুলে আমাদের বাসায় পড়ে থেকেছেন। বাচ্চার কাঁথা-কাপড় ধোয়া, তেল মালিশ করা থেকে শুরু করে রুহির পথ্য রান্না—সব আমার মা নিজের হাতে পরিষ্কার আর তৈরি করেছেন। আর আজ রুহি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর এই মহিলার যেন দরদ উথলে পড়ছে! সাফল্যের ভাগের সিংহভাগ এখন ওনার মোনাজাতের ফসল!
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে আমার ছেলে মেয়েরা দৌড়ে বের হয়ে এসে তাদের দাদা দাদিকে জড়িয়ে ধরল। আব্বা বুক ভরা তৃপ্তি নিয়ে দুই নাতি-নাতনিকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন।
কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, এই আনন্দের মুহূর্তটির মধ্যেও ড্রয়িংরুমের এক অদৃশ্য বি*ষাক্ত হিং*সা আর অশান্তির বা*রুদ জমা হচ্ছে। রুহির মায়ের এমন শীতল দৃষ্টিভঙ্গি জানান দিচ্ছিল, আমার জন্মদাতা বাবা-মায়ের এই বাসায় আগমনকে তারা কিছুতেই সহজভাবে মেনে নেয়নি
(চলবে...)
কেমন লাগলো এই পর্ব?