11/07/2026
ফেসবুক আতঙ্ক ও অন্তঃকোন্দলে ব্যাহত পুলিশ
এক সহকর্মীর প্রতি অন্য সহকর্মীর অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা—পুলিশ বাহিনীতে এমন চিত্র এখন স্বাভাবিক ঘটনার মতো। বদলি বা পদোন্নতির ফাইল নড়াচড়া শুরু হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি চক্র, যারা ফেসবুককে ব্যবহার করছে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের অপরাধ দমন থেকে শুরু করে বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন পরিস্থিতি নিয়ে গত এক মাসে সাবেক ও কর্মরত অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি,,, আলাপে পেশাগত নানা সমস্যার কথা সামনে এসেছে। তবে কেউ নিজের পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।
আইনি জটিলতার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক একজন পুলিশপ্রধান বলেন, ‘কেউ কি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে চান? যাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তারা কি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্ষম? পুলিশ কি আজও এককভাবে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী বাহিনী হিসেবে কাজ করছে, নাকি ভেতরেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে?’
সাবেক ওই পুলিশপ্রধান বলেন, ‘৫ আগস্টের (জুলাই অভ্যুত্থান) পর পুলিশে বিভক্তির একটি স্পষ্ট বাস্তবতা রয়েছে। একাংশকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। অন্য অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত। ফলে কার্যকর নেতৃত্ব ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক পুলিশ সপ্তাহেও এমন কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়নি, যা পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য কারাগারে গেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব পালন করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিণতির শিকার হতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা না থাকায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। নির্বাচিত সরকার এসেছে, এখনও পুলিশ সদস্যরা যদি নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।’
সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, মাঠপর্যায়ে মূল দায়িত্ব পালন করেন ওসি, এসআই ও কনস্টেবলরা। তাদের নির্দেশনা দেন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার (এসপি কর্মকর্তারা।
বদলি-পদোন্নতিতে ফেসবুক-আতঙ্ক:
পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বদলি বা পদোন্নতির ফাইল নড়াচড়া শুরু হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি চক্র। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বানোয়াট ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে তথাকথিত ডসিয়ার (গোপন নথিপত্র বা প্রোফাইল) তৈরি করে তারা। এরপর তা পাঠানো হয় দেশের বাইরে থাকা কিছু অ্যাক্টিভিস্টের কাছে। তাদের ফেসবুক পেজের সুবাদে দ্রুত ভাইরাল হয় বিষয়টি। মূল উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলে তার পদায়ন বা পদোন্নতি আটকে দেওয়া।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বদলি ও পদায়নের আগেই তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছে বাহিনীর ভেতরের একটি অংশ। কোনো কর্মকর্তা কোথায় বদলি হচ্ছেন, কার ফাইলের অগ্রগতি কত দূর কিংবা অতীতে কার বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক তদন্ত ছিল; সব সংবেদনশীল তথ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসবের নেপথ্যে রয়েছে পুলিশের ভেতরের একটি চক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন ‘আগে ভয় পেতাম প্রশাসনিক ফাইল বা জবাবদিহিকে। আর এখন ভয় পাই ফেসবুককে। কে কখন কার বিরুদ্ধে কী পোস্ট করিয়ে দেবে, কোন তথ্য কোথায় চলে যাবে? এই ভয়ে অনেকে এখন রুটিন কাজ করতেও ভয় পান। কোনো কঠোর বা সৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলছেন কর্মকর্তারা।’
তিনি বলেন, ‘এই অপপ্রচারের নেপথ্যে কারা রয়েছেন, তা অনেকেই অনুমান করতে পারলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চান না। কারণ, যিনি নাম প্রকাশ করবেন, পরদিনই তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি বা মিথ্যা গল্প ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় রয়েছে। এই ‘ডিজিটাল কাউন্টার-অ্যাটাক’-এর ভয়ে এক ধরনের জিম্মিদশার মধ্যে কাজ করছেন বাহিনীর কর্মকর্তারা।’
বাহিনীর শৃঙ্খলায় ধস:
পুলিশ বাহিনীতে যখন বাহ্যিক ক্ষতগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই ভেতর থেকে একে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এই অদৃশ্য আতঙ্কের নাম ফেসবুক।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ কর্তারাও এখন এক ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-ভীতিতে দিন কাটাচ্ছেন। কেননা, বাহিনীর ভেতরের একটি অংশই সহকর্মীদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে, পদায়ন আটকাতে কিংবা ব্যক্তিগত ইমেজ ক্ষুণ্ন করতে ফেসবুককে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সাবেক একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘একটি শৃঙ্খলা বাহিনী টিকে থাকে পারস্পরিক আস্থা ও চেইন অব কমান্ডের ওপর। যখন বাহিনীর সদস্যরা একে অপরকে ঘায়েল করতে ফেসবুক প্রোপাগান্ডা এবং ব্ল্যাকমেইলের পথ বেছে নেয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা ভেঙে পড়ে।’
তার মতে, পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব আইটি ও সাইবার সেলকে কাজে লাগিয়ে তথ্য পাচারকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।