08/07/2026
রাতের তালবাগান সাদা কাপড়ের সেই আতঙ্ক
গ্রামের নাম ছিল ভবানীপুর। গ্রামের উত্তর সীমানা ঘেঁষে ছিল এক বিশাল বিল, আর সেই বিলের পাড় ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল শত বছরের পুরনো কিছু বিশাল তালগাছ। ভাদ্র মাসের গুমোট রাতে যখন ঝড়-বাতাস হতো, তখন সেই গাছ থেকে টুপটাপ পাকা তাল মাটিতে পড়ার শব্দ হতো—ধপাস! ধপাস!
সেই আমলে পাকা তালের অনেক কদর ছিল। গ্রামের গরিব মানুষেরা শেষ রাতে লণ্ঠন আর চটের বস্তা হাতে মেঠো পথ বেয়ে বিলের ধারে ছুটে যেত তাল কুড়াতে। কিন্তু সেই তালবাগানের সবচেয়ে বড় আর প্রাচীন গাছটার একটা ঘোরতর বদনাম ছিল। গ্রামের বুড়ো মানুষেরা হুঁকো টানতে টানতে সাবধান করে বলতেন:
"ওরে বাবা, ভাদ্রের নিশুত রাতে একা ওই বুড়ো তালগাছের নিচে যাস না। ওখানে এক অপদেবতার বাস। মাঝরাতের পর সেখানে অলৌকিক মায়া খেলা করে।"
গ্রামের লোকেদের মুখে শোনা যেত, গভীর রাতে যারা সেখানে তাল কুড়াতে গেছে, তারা দূর থেকে দেখেছে—সেই বিশাল তালগাছের গোড়ায়, ভিজে মাটির ওপর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ধবধবে সাদা কাফনের কাপড় মুড়ি দিয়ে কে যেন সোজা হয়ে শুয়ে আছে। নিথর, নিস্পন্দ এক জ্যান্ত লাশ!
সেবারের এক অমাবস্যার রাত। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বাতাস যেন থমকে গেছে। গ্রামের এক প্রবীণ ও সাহসী কৃষক, নাম তার রহমত আলী। সংসারে চরম অভাব, তাই তালের পিঠা বানিয়ে হাটে বিক্রি করার আশায় সে সে রাতে কারো বারণ শুনল না। রাত যখন আনুমানিক আড়াইটা, রহমত আলী তার হাতের পুরনো পিতলের হ্যারিকেনটা জ্বালিয়ে, অন্য হাতে একটা বাঁশের লাঠি নিয়ে একাই রওনা দিল বিলের ধারের সেই তালবাগানের দিকে।
বাগানে পৌঁছাতেই চারপাশটা কেমন যেন থমথমে আর অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা মনে হলো। বাতাসে তালপাতাগুলোর খড়খড় শব্দ হচ্ছিল, যেন কেউ ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। রহমত আলী হ্যারিকেনের আলোটা উঁচিয়ে ধরে মাটিতে তালের খোঁজ করতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ গেল সেই অভিশপ্ত বুড়ো তালগাছটার গোড়ায়। হ্যারিকেনের আবছা হলদে আলোয় রহমত আলীর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল! সে দেখল, গাছের ঠিক গোড়ায় একটা বড় পাকা তাল পড়ে আছে, আর তার গা ঘেঁষেই শুয়ে আছে সেই জিনিসটা! ধবধবে সাদা এক টুকরো কাপড়ে ঢাকা এক দীর্ঘ অবয়ব, যেন কোনো মৃত মানুষকে কফিন থেকে বের করে এনে গাছের নিচে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
রহমত আলী প্রথমে ভাবল তার চোখের ভুল। সে সাহস করে লণ্ঠনটা আর একটু উঁচিয়ে ধরে দুই কদম সামনে এগোল। আর ঠিক তখনই ঘটল সেই গা শিউরে ওঠা ঘটনা!
মাটিতে শুয়ে থাকা সেই সাদা কাপড় পরা অবয়বটা কোনো হাত বা পায়ের ভর ছাড়াই, কোনো কাঠের তক্তার মতো সোজা শূন্যে ভেসে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেল! রহমত আলী আতঙ্কে চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু ভয়ের চোটে তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। সে দেখল, কাপড়টার দৈর্ঘ্য আস্তে আস্তে বাড়ছে। দেখতে দেখতে ওটা প্রায় ১০-১২ ফিট লম্বা হয়ে গেল এবং তার নিচের অংশটা মাটির স্পর্শ ছেড়ে শূন্যে দুলতে লাগল।
সাদা কাপড়ের ওপরের অংশটা যখন বাতাসের ঝাপটায় একটু সরল, রহমত আলী দেখল—কাপড়ের ভেতরে কোনো মানুষের মুখ নেই, চামড়া নেই, মাংস নেই! শুধু দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল চোখ অন্ধকারের ভেতর থেকে অশুভ আলো ছড়াচ্ছে। সেই অশরীরী মূর্তিটি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আর সাথে সাথে হ্যারিকেনের ভেতরের আগুনটা দপ করে নিভে গেল।
চারপাশ তখন নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে এক হাড়কাঁপানো, ভাঙা ও গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো:
"রহমত... বড্ড লোভ তোর! আমার ঘুমের ব্যাঘাত করলি কেন? আজ তোকে এই মাটির নিচে আমার পাশেই শুইয়ে রাখব...!"
রহমত আলী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হাতের লণ্ঠন আর চটের বস্তা ওখানেই ফেলে সে অন্ধকারের মধ্যে "আল্লাহ গো" বলে এক চিৎকার দিয়ে গ্রামের দিকে দৌড় দিল। পেছনে তখন শোনা যাচ্ছিল সেই কাপড়ের বাতাসে ওড়ার বিকট শব্দ—খড়খড়, শোঁশোঁ। যেন সেই কাফনের কাপড়টা তাকে ধরার জন্য পেছন পেছন উড়ে আসছে!
রহমত আলী কীভাবে বাড়ি ফিরেছিল, তা সে নিজেও জানত না। পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ তাকে তার বাড়ির উঠোনে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। তিন দিন ওঝার ঝাড়ফুঁক আর নিমপাতার সেঁক দেওয়ার পর তার জ্ঞান ফেরে।