17/01/2026
Bijoy keyboard কিভাবে আমাদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।
পার্ট - ২
ভাইরে ভাই, এসএসসির বা এইচএসসির রেজাল্টের দিন যে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটগুলো ‘ক্র্যাশ’ করে বা সার্ভার হ্যাং হয়ে বসে থাকে, এর পেছনের আসল কালপ্রিট কে জানেন? আমরা ভাবি শুধু ট্রাফিক বেশি তাই সার্ভার ডাউন, কিন্তু আসল ঘটনা অন্য জায়গায়। এই যে মান্ধাতার আমলের আনসি (ANSI) বা বিজয় ফন্টের ডাটাবেস, এটাই হলো সার্ভারের গলার কাঁটা। বিষয়টা খুইলা বলি।
যখন লাখ লাখ স্টুডেন্ট একসাথে রেজাল্ট সার্চ দেয়, তখন সার্ভারের ডাটাবেসে একটা বিশাল ঝড় বয়ে যায়। এখন সমস্যা হলো, ডাটাবেসে তো আপনার নাম বাংলায় লেখা নাই, লেখা আছে কিছু উদ্ভট ইংরেজি ক্যারেক্টারে। ধরেন আপনার নাম ‘আকাশ’, কিন্তু ডাটাবেসে সেটা সেভ করা আছে ‘AvKvk’ বা এই টাইপের কিছু হিজিবিজি কোড হিসেবে। যখন সার্ভারকে বলা হয় ‘আকাশ’ খুঁজে বের করো, তখন সে আর বাংলা খুঁজে পায় না, তাকে ব্যাকএন্ডে হাজার হাজার লাইনের কোড কনভার্ট করে ওই হিজিবিজি কোড ম্যাচ করতে হয়। এই যে এক্সট্রা প্রসেসিং পাওয়ার নষ্ট হচ্ছে, এতেই সার্ভারের প্রসেসর হিট হয়ে যায় আর ওয়েবসাইট ‘502 Bad Gateway’ এরর মারে। যদি ডাটা ইউনিকোডে থাকতো, তাইলে সার্চ হতো মিলি-সেকেন্ডে, সার্ভারও হ্যাং করতো না।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপারটা ঘটে আমাদের সার্টিফিকেট আর ন্যাশনাল আইডির ডাটাবেসে। দেখবেন অনেকের সার্টিফিকেটে নামের বানান ভুল, বা অনলাইনে এক রকম আর হার্ডকপিতে আরেক রকম। এর কারণ হলো ওই ‘ফন্ট মিসম্যাচ’। আনসি ফন্টে লেখা ডাটা এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে নিলে বা এক সার্ভার থেকে আরেক সার্ভারে মাইগ্রেট করলে ডাটা ‘করাপ্ট’ হয়ে যায়। দেখা গেল বাবার নাম ‘রহিম’ হয়ে গেল ‘র #&ম’। এই ভুল ঠিক করতে মানুষকে যে কি পরিমাণ জুতার তলা ক্ষয় করতে হয়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। আমরা আসলে একটা ‘ডিজিটাল জঞ্জাল’ বা ডাটার আবর্জনা তৈরি করে রাখছি, যা ফিউচারে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলে দিবে।
অনেকে আবার পন্ডিতি করে বলে, "আরে সমস্যা নাই, ওসিআর (OCR) দিয়ে সব ঠিক করে ফেলব।" ওসিআর মানে হলো ছবি থেকে লেখা বের করা। কিন্তু ভাই, আনসি বা বিজয়ের লেখা ওসিআর দিয়ে উদ্ধার করা আর ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা একই কথা। বিজয়ের যুক্তবর্ণগুলো (যেমন: ক্ষ, ষ্ণ) এমনভাবে টাইপ করা হয় যে ওসিআর সফটওয়্যার ওগুলোকে আলাদা অক্ষর হিসেবে চিনতে পারে না। সে ‘ক্ষ’-কে ভেঙে ‘ক’ আর ‘ষ’ আলাদা করে ফেলে, বা অনেক সময় ভুলভাল শব্দ আউটপুট দেয়। ফলে আপনি যদি ভাবেন পুরনো সরকারি নথি স্ক্যান করে ওসিআর দিয়ে ডিজিটালাইজ করবেন, তাইলে বোকার স্বর্গে আছেন। ওটার অ্যাকুরেসি লেভেল এত জঘন্য হবে যে, ওই ডাটা দিয়ে কোনো কাজই হবে না। ম্যানুয়ালি টাইপ করা ছাড়া ওটা উদ্ধারের আর কোনো উপায় নাই।
সার্চ রেজাল্টেও একই কাহিনী। আপনি সরকারি কোনো ওয়েবসাইটের সার্চ বারে গিয়ে বাংলায় কিছু খুঁজলে রেজাল্ট আসে না কেন জানেন? কারণ সার্চ ইঞ্জিন আপনার বাংলা ইনপুট বুঝে, কিন্তু ডাটাবেসে থাকা ওই আনসি ফন্টের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বুঝে না। ফলে চোখের সামনে ডকুমেন্ট থাকলেও সার্চ রেজাল্ট দেখায় ‘No Data Found’। মানে প্রযুক্তির ভুলের কারণে তথ্য থেকেও আমরা তথ্য পাচ্ছি না।
সোজা কথায় , এই আনসি ফন্টের চক্করে পড়ে আমরা কোটি কোটি টাকার সার্ভার বানাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু পারফরম্যান্স পাচ্ছি নোকিয়া ১১০০-এর মতো। ডাটাবেস স্লো, সার্চ কাজ করে না, রেজাল্ট শিট ভুল আসে—সবকিছুর মূলে এই গোঁয়ার্তুমি। এখন সময় আসছে এই জোড়াতালি সিস্টেম বাদ দিয়ে ইউনিকোডে শিফট করার, নাইলে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ শুধু স্লোগানেই থাকবে, সার্ভারে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।