29/11/2025
🌷🌷মঠ মন্দির,দেবতা বা গুরুবৈষ্ণবের অর্থ সম্পদ ভোগ করলে কি হতে পারে। 🌷🌷
মঠ মন্দির, দেবতা বা গুরু-বৈষ্ণবের অর্থ সম্পদ ভোগ করা বা অপহরণ করাকে "মহাপাপ" বলে গণ্য করা হয়। শাস্ত্রে একে 'দেবস্ব' (দেবতার ধন) বা 'ব্রহ্মস্ব' (ব্রাহ্মণ বা গুরুর ধন) হরণ বলা হয়েছে।
এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ—এর ফলে শুধু সেই ব্যক্তির অধঃপতন হয় না, বরং তার পূর্বপুরুষ এবং ভবিষ্যৎ বংশধররাও বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
শাস্ত্রীয় শ্লোক ও সিদ্ধান্ত
স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাগবতে তাঁর নিজ বংশধরদের (যদু বংশ) সতর্ক করতে গিয়ে এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর বাণী প্রদান করেছেন।
শ্লোক ১: (শ্রীমদ্ভাগবত ১০.৬৪.৩১)
নাহং হলাহলং মন্যে বিষং যস্য প্রতিক্রিয়া।
ব্রহ্মস্বং হি বিষং প্রোক্তং নাস্য প্রতিবিধির্ভুবি।।
বঙ্গানুবাদ: আমি হলাহল বা কালকূট বিষকে প্রকৃত বিষ বলে মনে করি না, কারণ ওষধি বা মন্ত্রের দ্বারা তার চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু ব্রাহ্মণ, গুরু বা দেবতার সম্পত্তি হরণ রূপ যে বিষ, পৃথিবীতে তার কোনো প্রতিষেধক নেই।
শ্লোক ২: (শ্রীমদ্ভাগবত ১০.৬৪.৩২)
হিনস্তি বিষমত্তারং বহ্নিঃ শময়তি চ।
কুলং সমূলং দহতি ব্রহ্মস্বারণিপাবকঃ।।
বঙ্গানুবাদ: সাধারণ বিষ কেবল তাকেই মেরে ফেলে যে তা পান করে। আগুন জল দিয়ে নেভানো যায়। কিন্তু দেবস্ব বা ব্রহ্মস্ব হরণ করলে যে অগ্নির সৃষ্টি হয়, তা অপরাধীর সমগ্র বংশকে সমূলে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
শ্লোক ৩: (স্মৃতিশাস্ত্র)
স্বদত্তাং পরদত্তাং বা যো হরেত বসুন্ধরাম্।
ষষ্টিবর্ষ সহস্রাণি বিষ্ঠায়াং জায়তে কৃমিঃ।।
বঙ্গানুবাদ: যে ব্যক্তি নিজের দেওয়া বা অন্যের দেওয়া দেবতার ভূমি বা সম্পদ হরণ করে, সে ষাট হাজার বছর পর্যন্ত বিষ্ঠার (মল) পোকা হয়ে নরক যন্ত্রণা ভোগ করে।
রাজা নৃগের গিরগিটি হওয়া
সত্য যুগে ইক্ষ্বাকু বংশে নৃগ নামে এক অত্যন্ত প্রতাপশালী, ধার্মিক ও দানবীর রাজা ছিলেন। তিনি এতোই দয়ালু ছিলেন যে, প্রতিদিন হাজার হাজার সুসজ্জিত গাভী ব্রাহ্মণদের দান করতেন। কিন্তু তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া একটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে তাঁকে এক অদ্ভুত ও কষ্টদায়ক শাস্তি পেতে হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত
একদিন রাজা নৃগ যথারীতি দানকার্য করছিলেন। তাঁর বিশাল গোশালা থেকে হাজার হাজার গাভী ব্রাহ্মণদের দান করা হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, এক ব্রাহ্মণের দান করা একটি গাভী পথ ভুলে পুনরায় রাজার গোশালায় ফিরে আসে এবং অন্য গরুদের সাথে মিশে যায়। রাজা তা জানতেন না। তিনি না জেনেই সেই গাভীটি অন্য এক ব্রাহ্মণকে দান করে দেন।
দুই ব্রাহ্মণের বিরোধ
যিনি গাভীটি প্রথমে পেয়েছিলেন, তিনি পথিমধ্যে দেখলেন তাঁর গাভীটি অন্য এক ব্রাহ্মণ নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, "এই গাভী আমার! রাজা আমাকে এটি দান করেছেন।"
দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ বললেন, "না, রাজা এটি এখন আমাকে দান করেছেন, তাই এটি আমার।"
উভয়েই তর্কে লিপ্ত হলেন এবং বিচারের জন্য রাজার কাছে ফিরে এলেন। তাঁরা রাজাকে বললেন, "হে রাজন, আপনি একজনের ধন কেড়ে নিয়ে অন্যকে দিচ্ছেন, এটি কেমন ধর্ম?"
রাজার অনুশোচনা ও প্রস্তাব
রাজা নৃগ নিজের ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। তিনি মহাবিপদ আঁচ করতে পারলেন যে তিনি অজান্তে 'ব্রহ্মস্ব' (ব্রাহ্মণের ধন) হরণের দায়ে ফেঁসে গেছেন।
তিনি উভয় ব্রাহ্মণকে শান্ত করার জন্য জোড়হাতে বললেন, "হে দ্বিজবরগণ, আমার অজান্তে এই অপরাধ হয়েছে। আপনারা দয়া করে শান্ত হোন। এই একটি গাভীর বদলে আমি আপনাদের এক লক্ষ উৎকৃষ্ট গাভী দেব। তবুও আপনারা এই গাভীটি নিয়ে বিবাদ করবেন না এবং আমাকে এই পাপ থেকে উদ্ধার করুন।"
কিন্তু ব্রাহ্মণরা কোনো প্রলোভনেই রাজি হলেন না। তাঁরা বললেন, "মহারাজ, আমরা ভিক্ষুক নই যে একটার বদলে লক্ষ গাভী নেব। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই।" এই বলে তাঁরা ক্রুদ্ধ হয়ে গাভীটি সেখানে রেখেই চলে গেলেন। রাজা সারাজীবন দান করেও শেষমেশ পাপের ভাগী হলেন।
যমরাজের বিচার
মৃত্যুর পর রাজা নৃগ যমালয়ে নীত হলেন। যমরাজ তাঁকে বললেন, "হে রাজন, তুমি অজস্র পুণ্য করেছ, যার ফলে তুমি দীর্ঘকাল স্বর্গে থাকার অধিকারী। কিন্তু তোমার একটি পাপও আছে—অজান্তে ব্রাহ্মণের ধন হরণ। তুমি কোনটি আগে ভোগ করতে চাও? পুণ্যের ফল স্বর্গসুখ, নাকি পাপের ফল?"
রাজা ভাবলেন, পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে স্বর্গে গিয়ে শান্তি পাওয়া যাবে না। তাই তিনি বললেন, "আমি আগে পাপের ফল ভোগ করে মুক্ত হতে চাই।"
যমরাজ বললেন, "যেহেতু তুমি না জেনেও ব্রাহ্মণের সম্পত্তি অধিকার করেছ, তাই তোমাকে অবিলম্বে মর্ত্যলোকে গিয়ে একটি গিরগিটি হয়ে কুয়োর মধ্যে বাস করতে হবে। তবে যেহেতু তুমি ভক্ত ছিলে, তোমার পূর্বস্মৃতি বজায় থাকবে।"
গিরগিটি রূপে কষ্ট ও উদ্ধার
তৎক্ষণাৎ রাজা নৃগ বিশাল এক গিরগিটি হয়ে দ্বারকার একটি গভীর শুকনো কুয়োর (অন্ধকূপ) মধ্যে পতিত হলেন। হাজার হাজার বছর তিনি সেখানে সেই কুৎসিত শরীর নিয়ে অনুতাপে দগ্ধ হতে থাকলেন। তিনি সর্বদা ভগবানের কাছে মুক্তির প্রার্থনা করতেন।
দ্বাপর যুগে একদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুত্ররা (সাম্ব, প্রদ্যুম্ন প্রমুখ) বনে বিহার করতে গিয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে সেই কুয়োর কাছে জল খুঁজতে গেলেন। তাঁরা কুয়োর ভেতরে পাহাড়সম বিশাল এক অদ্ভুত গিরগিটি দেখে অবাক হলেন। তাঁরা কৌতুকবশত দড়ি দিয়ে সেটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেটি নড়ল না।
অবশেষে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে খবর দিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এসে কুয়োর দিকে তাকালেন। তিনি জানতেন এই গিরগিটি কে। ভগবান তাঁর বাম হাত বাড়িয়ে অবলীলায় গিরগিটিটিকে স্পর্শ করে উপরে তুলে আনলেন।
ভগবানের দিব্য স্পর্শে রাজা নৃগের পাপ মোচন হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গিরগিটির দেহ ত্যাগ করে এক দিব্য অলংকারশোভিত দেবতুল্য রূপ ধারণ করলেন।
শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ
রাজা নৃগ কৃতাঞ্জলি হয়ে শ্রীকৃষ্ণের স্তব করলেন এবং বললেন, "হে প্রভু, আমি দানবীর রাজা নৃগ। অজান্তে সামান্য ব্রহ্মস্ব হরণের ফলেই আমার এই দুর্গতি হয়েছে। আজ আপনার স্পর্শে আমি মুক্ত হলাম।"
এরপর তিনি রথে চড়ে স্বধামে গমন করলেন।
রাজা চলে যাওয়ার পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং জগৎবাসীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বললেন:
"হে বন্ধুগণ, দেখলে তো! একজন রাজা, যিনি লক্ষ লক্ষ গাভী দান করেছিলেন, তিনিও কেবল একটি গাভী নিয়ে গোলযোগের কারণে নরকতুল্য গিরগিটি জীবন পেলেন। মনে রেখো, মঠ, মন্দির, গুরু বা বৈষ্ণবের অর্থ বা সম্পত্তি হরণ করা হলাহল বিষ পান করার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কেউ যদি ভুল করেও দেব-সম্পত্তি ভোগ করে, তার বংশে জল দেওয়ার মতোও কেউ অবশিষ্ট থাকে না। অতএব, তোমরা সর্বদা এই অপরাধ থেকে দূরে থেকো।"
মঠ বা মন্দিরের টাকা আত্মসাৎ করা, গুরুর সম্পত্তি ভোগ করা বা দান করা বস্তু ফিরিয়ে নেওয়া বা হরণ করা আধ্যাত্মিক ও জাগতিক—উভয় দিক থেকেই ধ্বংস ডেকে আনে। যদি অজান্তে কৃত অপরাধের শাস্তি এত ভয়াবহ হয়, তবে জেনে-শুনে যারা মঠ-মন্দিরের সম্পদ লুট করে, তাদের গতি যে আরও কত ভয়ঙ্কর হবে, তা সহজেই অনুমেয়। 🌷🌷