03/09/2026
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল বিজয়ের পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ২৫তম মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসন ও আইনি লড়াই শেষে তাঁর এই ক্ষমতায় আরোহন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। তবে ক্ষমতায় আসার পরও তাঁর রাজনৈতিক সমীকরণ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশিষ্ট কবি, চিন্তক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছে। ছবিতে উল্লেখিত তাঁর বক্তব্য: "আজকে আমি তারেকের জন্য খুবই চিন্তিত। তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই। তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।" প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই নতুন প্রেক্ষাপটে ফরহাদ মজহারের এই উক্তির অন্তর্নিহিত গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা হলো:
১. প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বনাম কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমান বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকার প্রধান হলেও ফরহাদ মজহারের এই "চিন্তা" বা "উদ্বেগ" ক্ষমতার গভীর কাঠামোগত সংকটকে নির্দেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াগুলোর কারণে সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এখনো নানা দৃশ্যমান বা অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফরহাদ মজহার সম্ভবত সেই প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
২. "তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছে"—এর নেপথ্য অর্থ
প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা সত্ত্বেও এই উক্তিটির রাজনৈতিক অর্থ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে:
• ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ: ক্ষমতার শীর্ষে এলেও বাংলাদেশ যে গভীর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে নীতিনির্ধারণী অনেক সিদ্ধান্ত নিতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পক্ষের সাথে আপস বা সমঝোতা করতে হয়। [5]
• সংস্কারের ধীরগতি: গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের যে আমূল সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের অধীনে তা হয়তো ফরহাদ মজহারের মতো মুক্ত চিন্তকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীকে চারপাশে থাকা বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল এক প্রকার নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে "সীমাবদ্ধ" বা "বসিয়ে" রেখেছে—এমন আশঙ্কাও এখানে প্রকাশ পেয়ে থাকতে পারে।
৩. তারেক রহমানের বর্তমান নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তারেক রহমান ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের মতো বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা বলে আসছেন। ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্যটি মূলত একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বা কড়া সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এক ধরনের সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাই চূড়ান্ত ক্ষমতা নয়; রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদী বা আমলাতান্ত্রিক জট উপড়ে ফেলে সত্যিকারের জনবান্ধব ও স্বাধীন ক্ষমতার চর্চা নিশ্চিত করাই এখন তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ফরহাদ মজহারের এই মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ। এটি প্রকাশ করে যে, দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হওয়ার পরও কীভাবে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সমীকরণগুলো একজন নেতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা ও "বসিয়ে রাখা"র জাল ছিন্ন করে তারেক রহমান কীভাবে তাঁর পূর্ণ রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়ন করবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বর্তমান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা।