07/09/2026
সংসদে তখন গাম্ভীর্যের চাদর বিছানো। আইনমন্ত্রী মহোদয় ‘ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’-এর ধারা-উপধারা এমনভাবে ব্যাখ্যা করছেন, যেন জমিজমার ভোগাধিকার নিয়ে দেশের মানুষের সমস্ত চিন্তা তিনি একাই দূর করে দেবেন। স্পিকার মহোদয়ও খুব মনোযোগ দিয়ে হাতুড়িটা ধরে বসে আছেন।
বক্তব্য শেষে নিয়ম মাফিক বিরোধী দলের আনা ‘জনমত যাচাইয়ের’ প্রস্তাবটি স্পিকার ভোটে দিলেন-
“যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে আছেন, তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো সংসদ কক্ষ কাঁপিয়ে একযোগে ধ্বনি উঠলো “হ্যাঁ-আ-আ-আ!”
বিরোধী দল তো বটেই, সরকারি দলের এমপিরাও অতি উৎসাহে গলা ফাটিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে উঠলেন। দলের হুইপের নির্দেশ হয়তো মাথায় ছিল না, কিংবা ‘হ্যাঁ’ বলার যে আনন্দ, তা ধরে রাখতে পারেননি।
স্পিকার মহোদয়ও অতি অভ্যাসে না দেখেই রায় দিয়ে দিলেন “না-জয়যুক্ত হয়েছে, না-জয়যুক্ত হয়েছে!”
পাশে বসে থাকা এক সংসদ কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারের দিকে ঝুঁকে নিচু স্বরে বললেন, “মাননীয় স্পিকার, একটু ভুল হয়ে গেছে। সবাই কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বলেছে, কেউ ‘না’ বলেনি। কিন্তু আপনি ‘না’ জয়যুক্ত ঘোষণা করে ফেলেছেন!”
স্পিকার মহোদয় অভিজ্ঞ মানুষ। এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই পরিস্থিতি সামলে নিলেন। মাইকটা চেপে ধরে বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, আমি প্রস্তাবগুলো আবারও ভোটে দিচ্ছি। আপনারা দয়া করে প্রস্তাবটি ভালোভাবে শুনে, বুঝে তারপর ভোট দেবেন।”
কথাটার আসল বার্তা সরকারি দলের এমপিদের মগজে পৌঁছাতে এবার আর দুই সেকেন্ডও লাগলো না। পঞ্চদশ সংশোধনীর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিশাল এক কাল্পনিক ভূত যেন এক লহমায় সংসদ ভবনের ছাদে এসে ভর করলো!
এমপিদের চোখের সামনে ভেসে উঠলো- ৭০ অনুচ্ছেদের সেই অমোঘ বাণী: “দলের বিপক্ষে ভোটদান করিলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে...”
ভাবতেই এমপিদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এক মুহূর্তে ‘হ্যাঁ’ বলা মানেই তো দলের বিপক্ষে ভোট! আর দলের বিপক্ষে ভোট মানেই কাল সকালে আর এমপি পদ থাকবে না! গাড়ি, বাড়ি, প্রটোকল, লোগো লাগানো প্যাড- সব শেষ!
স্পিকার এবার গলা খাকারি দিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, “যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে আছেন, তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন।”
এবার বিরোধী দলের দু-একজন মৃদু স্বরে ‘হ্যাঁ’ বললেন।
“যারা এর বিপক্ষে আছেন, তারা ‘না’ বলুন।”
আর যায় কোথায়! এবার সরকারি দলের এমপিরা জীবনের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন “না-আ-আ-আ-আ!”
সেই ‘না’-এর আওয়াজে সংসদ ভবনের কাঁচের জানালাগুলো বুঝি কেঁপে উঠলো! যারা প্রথমবার ভুলে ‘হ্যাঁ’ বলে ফেলেছিলেন, তারা যেন অনুশোচনায় নিজের সবটুকু ফুসফুসের বাতাস দিয়ে ‘না’ বললেন, যাতে পদটি অন্তত বেঁচে যায়।
স্পিকার মহোদয় এবার পরম তৃপ্তির হাসি হেসে হাতুড়ি ঠুকে ঘোষণা করলেন, “না-জয়যুক্ত হয়েছে! না-জয়যুক্ত হয়েছে!”
সংসদের বাইরে এসে এক তরুণ এমপি বুক চেপে ধরে নিঃশ্বাস ফেললেন।
পাশে থাকা প্রবীণ এমপি তাকে পিঠ চাপড়ে বললেন, “কী হে তরুণ, রাজনীতির ৭০ অনুচ্ছেদ বুঝতে পেরেছ তো? এই অনুচ্ছেদ বেঁচে থাকতে সংসদে আইন পাস হোক আর না হোক, তোমার এমপি পদ অন্তত কোনোদিন ভুল করে হাতছাড়া হওয়া চলবে না!”