07/01/2021
ফেলানি হত্যার এক দশক পুর্ণ হলো আজ। কাঁটাতারের সীমান্তে ঝুলে থাকা ফেলানির লাশের সাথে গত এক দশকে আরো যুক্ত হয়েছে তিন'শয়ের অধিক ফেলানি। ফেলানির লাশ নিছক সীমান্ত হত্যা কিম্বা কাঁটাতারে ঝুলে থাকা চিহ্ন সর্বস্ব মরা লাশ নয় যা দেখে আমাদের মানবিক বিবেক কেবল কাতর হয়ে পড়ে বরং ইতিহাসের এই ঘটনা আমাদেরকে সম্পর্ক বন্ধুত্ব ও রাজনীতির কিছু গুরুত্বপুর্ন সবক দিয়ে গেছে।
_________________________ ___________________________
ফেলানি বাংলাদেশের জনগণের আবেগ, নিজেদের সম্পর্কে স্বাতন্ত্র বোধ এবং আগ্রাসী দিল্লীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই ধরণের ঘটনা যখন রাজনীতির মৌলিক উপাদানে রূপান্তরিত হয় তখন তা আর স্রেফ একটি ঘটনা থাকে না। ফেলানি তাই দিল্লীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দীর্ঘাস্থায়ী ও সুদূর প্রসারী লড়াইয়ের বীজ হিশাবে অংকুরিত হয়েছে।
ফেলানি কাঁটাতারে ঝুলেই থাকবে, তাকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নামিয়ে না আনলে সে স্মৃতি ও রাজনীতির মধ্যে কাঁটা হয়ে হাজির থাকবে। ইতিহাস বড়ই বিচিত্র ব্যাপার!
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর হিশাব অনুযায়ী দুই হাজার সাল থেকে আজ অবধি ১২৩৬ জন বাংলাদেশী নাগরিকদের খুনি ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটী ফোর্স হত্যা করেছে।
ফেলানি হত্যা কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির অর্থ একাট্টা ভারত বিরোধিতা নয়, কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক উস্কানির ফাঁদে পা দেওয়া নয়। বরং সুনির্দিষ্ট ভাবে দিল্লী এবং হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা। উপমহাদেশের বিশৃংখলা এবং অশান্তির গোড়া এখানে।
দ্বিতীয়ত ভারতেও গরিব, সর্বহারা ফেলানিরা আছে, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সর্বহারার কোন দেশ নাই। এখন দেশ বা রাষ্ট্রের নামে যেভাবে সীমান্ত এবং কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে তা অনিবার্য ভাবেই ভাঙা হবে। ইতিহাসের অভিমুখ আমরা চাই বা না চাই, ঐদিকেই। পণ্য ও পুঁজির অবাধ চলাচল চলবে সেখানে কোন কাঁটাতার নাই,কিন্তু মানুষের বেলায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে – সেটা আর বেশীদিন চলবে না।
কাঁটাতারের বেড়া ও বর্ডার সে কারণ একালে তথাকথিত ফাঁপা বেলুনের মতো আকাশে উড়িয়ে রাখা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রদর্শনীর অধিক কোন মর্ম ধারণ করে না। অবাধ বাণিজ্য, নানা ভূয়া ও মিথ্যা যুক্তিতে যুদ্ধ বিগ্রহ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে মাটিতে গুঁড়িয়ে দিয়ে স্রেফ ভূখণ্ডে পরিণত করা এবং সেখানে তেল, দাহ্য পদার্থ এবং খনিজ সম্পদ লুটের মচ্ছব -- এইসব আমরা দেখেছি।
তাই একালে দেয়াল কিম্বা কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে বেশ কিছু জিজ্ঞাসা রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে আগামিতে যে রাজনীতির উত্থান ঘটতে যাচ্ছে তাকে নতুন জিজ্ঞাসার মীমাংসা করে আসতে হবে।
১. একালে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিচারের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে উন্মূল, উদবাস্তু মানুষের দেশান্তরী হওয়া। ‘রাষ্ট্রহীন’ হওয়া, সেটা রোহঙ্গাদের মতো গণহত্যার ফল হিশাবে হোক, কিম্বা হোক ফেলানিদের মতো জীবিকার তাগিদে বর্ডার অতিক্রম করা। নীট ফল হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনী সুরক্ষার বাইরে স্রেফ মানুষের জীবে পর্যপসিত হবার প্রক্রিয়া। যাদের রাষ্ট্র যেমন নাই, তেমনি কোন নাগরিক অধিকারও নাই।
২. এরই আরেক রূপ আমরা দেখি হিন্দুত্ববাদী ভারতে আইন করে নাগরিকদের ‘রাষ্ট্রহীন’ করা– এটা নতুন বাস্তবতা, রাষ্ট্র ও রাজনীতির পর্যালোচনার নতুন ক্ষেত্র। অতএব অভিবাসন, রাষ্ট্রহীনতা এবং মানুষকে সকল প্রকার আইনী সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই একালের প্রধান রাজনীতি। এ লড়াই আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক এবং অনিবার্য ভাবেই বর্ডার ছাপিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে এবং পড়ছে।
৩. এই নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরে অন্য সকল প্রাচীন ‘সার্বভৌমত্ব’ কেন্দ্রিক রাজনীতি বা রাজনৈতিক চিন্তার কোন ভবিষ্যৎ নাই। অতএব নতুন রাজনৈতিক পরিসর এবং আমাদের কর্তব্য নিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে না শিখলে আমরা চিন্তা চেতনার দিক থেকে এক বিন্দু এক সুতাও এগিয়ে যেতে পারব না। গর্তে পড়ে থাকব।
৪. ফেলানি অতএব আগামি ইতিহাসের অভিমুখ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিশা। সস্তা আবেগ ও হাহুতাশ বাদ দিতে শিখুন।, বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গণক্ষমতা নিয়ে ভাবতে শিখুন এবং নিজেদের কর্তব্য নির্ধারণ করুন।। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জনের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে না পারলে বাংলাদেশের রাজপথে যতোই আমরা দাপুটে ভাব দেখাই না কেন, তার কোন ফল পাওয়া যাবে না।
৫. আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠবার গোড়ায় খ্রিস্টিয় পাশ্চাত্যে তথাকথিত Westphilian Sovereignty-র সূত্রে রাষ্ট্রীয় ‘সার্বভৌমত্ব’ নামক যে ধারণার উদয়, আধিপত্য এবং চর্চা জারি রয়েছে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন সেই সার্বভৌমত্বের প্রায় সবই হরণ করেছে। এই হরণ পর্ব শুরু হয়েছে নিউ লিবারেল বা কাছাখোলা বাজার ব্যবস্থার কালপর্ব শুরুর পর থেকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র – বিশেষ ভাবে বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্র -- কাঠামোগত সংস্কার এবং তার ধারাবাহিকতায় কাছা খোলা অবাধ বাজার ব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে অনেক আগেই। তা আর ফিরে পাবার সম্ভাবনা নাই। এখন দুর্নীতি, ডাকাতি ও লুটপাট নিয়ে কপাল না চাপড়িয়ে ডাকাত কিভাবে সিঁদ কাটল সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ সিঁদ কাটা ঘরে আপনি এখনও বাস করেন।
৬. রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নামক ধারণার বুকে শেষ পেরেকটা গাঁথা হয়েছে হিউমেনিটারিয়া ইন্টারভেনশানের নামে , শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যে কোন মূহূর্তে যে কোন অজুহাতে যে কোন দুর্বল দেশের ‘রেজিম চেইঞ্জ’ করতে সক্ষম। অর্থাৎ কোন সরকারই আসলে নিরাপদ নয়। বর্তমান ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীন শক্তি ক্ষমতায় থাকতে পারছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিকে বুঝিয়ে যে একমাত্র তারাই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের শক্তি বৃদ্ধি বা ক্ষমতায় আসা রুখে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তির জন্যর ইসলাম প্রধানও ভীতিকর সম্ভাবনা।
৭. সীমান্তে আগে পাহারা দিত বিডিআর। কিন্তু এখন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) সেই দায়িত্ব পালন করে। ঐতিহ্যগতভাবে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই বাহিনীর নাম ছিল বাংলাদেশ রাইফেলস্ যা বিডিআর নামেই অধিক পরিচিত ছিল। বিডিআর ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা রাখে, এই নামের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম জনগোষ্ঠি হিশাবে আমাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা করবার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত হোত। সীমান্ত ‘রক্ষা’ করার ব্যাপার নয়, নিছকই ‘পাহারা’ দেবার ব্যাপার, সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে আমাদের চিন্তার এই রূপান্তর সাম্প্রতিক ঘটনা। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এটাই প্রমাণ করে যে আমরা অরক্ষিত এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবার অঙ্গীকার ও হিম্মত উভয়ই হারিয়েছি। আগামি দিনের রাজনীতির প্রধান বিষয় অতএব ‘গণপ্রতিরক্ষা’। অর্থাৎ জনগণ কিভাবে তাদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে এই প্রশ্নের মীমাংসা ছাড়া কোন ইতিবাচক রাজনীতি গড়ে তুলবার সম্ভাবনা নাই।
৮. ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকতে পারছে নিজেদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের সেনাপতি প্রমাণ করে।এই প্রমাণ নানান ভাবে তাদের বারবারই দেওয়ার দরকার পড়ে। তাই জো বাইডেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত হবার পর বাংলাদেশে ইসলামি শক্তি ও দল সমূহের ওপর ক্ষমতাসীনদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেটা রিহার্সাল করে নতুন ভাবে দেখাতে ও বোঝাতে হয়েছে। তথাকত্থিত মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে বিবাদ এই আলোকে বূঝতে হবে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রধান প্রধান ধারা মূলত ক্ষমতাসীনদের ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করে নিজেদের নিজেরা নির্মূল করবে কিনা সেটা তাদের ভেবে দেখতে হবে।
৯. যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব তার রাজনৈতিক মর্ম হারিয়েছে সেই ক্ষেত্রে নতুন করে বর্ডার বানানো, দেয়াল তোলা এবং কাঁটাতারের বেড়া বসানো খুবই ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়। তাই কাঁটাতারের বেড়াকে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে বিচার করতে হবে। যেমন, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন ও রেজিম চেইঞ্জের অনিবার্য ফল হিশাবে রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতা হারাবার পর নিজের বৈধতা বা ন্যায্যতা নতুন করে প্রমানের জন্যই কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে।
রাষ্ট্র ভেতর থেকে ফাঁপা কিন্তু তাকে প্রদর্শন করতে হচ্ছে যে আধুনিক রাষ্ট্র এখনও নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে।না পারে না। এই নগ্ন সত্যটা বোঝার ওপর আগামির রাজনীতি নির্ভর করবে। সব কিছুই নতুন ভাবে ভাবতে শিখতে হবে।
ফরহাদ মজহার