02/09/2026
বারযাখে আমার প্রথম দিন🤔⁉️
বারযাখে আমার প্রথম দিনটি কেমন হবে, এই প্রশ্নটি ভাবলে কেমন এক অদ্ভুত শূন্যতা এসে বুকের মধ্যে চেপে ধরে। মৃত্যুর কথা আমরা অনেক শুনেছি, জানাজা দেখেছি, কবরস্থানে দাঁড়িয়ে মাটি দিতে দেখেছি। কিন্তু যে মানুষটিকে সেদিন মাটির নিচে রেখে আসা হবে, সে-ই যে আমি, এই সত্যটিকে মন কোনোদিন ঠিকমতো নিজের বলে মানতে চায়নি।
🌼একদিন আমারও জানাজা হবে। পরিচিত কণ্ঠগুলো আমার নাম ধরে ডাকবে, অথচ আমি কোনো উত্তর দিতে পারব না। যারা একদিন আমার সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটেছে, কতশত কথা শেয়ার করেছে, একই টেবিলে খেয়েছে, তারা হয়তো আমার নিথর শরীরটিকে শেষবারের মতো একটিবার দেখে নেবে। তারপর চারজন মানুষ আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবে সেই জায়গাটির দিকে, যেখানে যাওয়ার কথা মানুষ সারাজীবন জানে, অথচ নিজের যাওয়ার দিনটির কথা খুব কমই ভাবে।😓
কবরের পাশে যখন শেষ মাটিটুকু পড়বে, তখন পৃথিবীর সঙ্গে আমার সম্পর্কটি যেন এক নিমেষে অন্যরকম হয়ে যাবে। যারা আমাকে ভালোবাসতো, তারা চলে যাবে। কারও ঘরে সন্ধ্যার বাতি জ্বলবে, কারও সন্তান তাকে জড়িয়ে ধরবে, কারও চুলায় ভাত চড়বে। পৃথিবী কাউকে থামিয়ে রাখবেনা। আমার অনুপস্থিতিও একদিন তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে যাবে। অথচ আমার সামনে তখন খুলবে এমন এক অধ্যায়, যার কোনো খবর পৃথিবীর মানুষ জানে না।😓🍂
আল্লাহ বলেন, “তাদের সামনে রয়েছে বারযাখ, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।” সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:১০০।
এই ‘বারযাখ কী গভীর একটি শব্দ! পৃথিবীর জীবন শেষ, অথচ কিয়ামত এখনও আসেনি। দুয়ের মাঝখানে এক অদৃশ্য জগৎ, যেখানে মানুষ অপেক্ষা করবে সেই দিবসের জন্য। সেইদিন আমার প্রথম দিনটি কেমন হবে এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই । কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ তার সবকিছুই আভাস দিয়েছিল।
কারও জন্য সেই কবর হতে পারে প্রশান্তির স্থান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। তখন সে জান্নাতের সুগন্ধ ও প্রশান্তি লাভ করবে। (সহিহ বুখারি)। 📖
কী দারুণ সৌভাগ্য হবে সেই মানুষের, যার জন্য মাটির নিচের অন্ধকারই হয়ে উঠবে আলোর দিকে যাত্রার প্রথম প্রহর! পৃথিবীর ঘরটি যার জন্য শেষ হয়ে গেল, অথচ কবরের সেই ক্ষুদ্র ঘরটিই যদি তার জন্য হয়ে যায় জান্নাতের সুবাসমাখা অপেক্ষার ঘর তবে মৃত্যুকে আর কেবল শেষ বলে মনে হয় না।
কিন্তু সবার জন্য কি সেই প্রথম রাত এমন?
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, কবরের আযাব সত্য; আর মানুষকে তার কবরের অবস্থার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।📖
তখন মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় নিঃসঙ্গতা হয়তো পৃথিবীতে একা হয়ে যাওয়া নয়। সবচেয়ে বড় নিঃসঙ্গতা হলো যখন পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, অথচ নিজের পরিণতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সময় এসে যায়।
দুনিয়াতে মানুষ কত কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায়, নিজের দুর্বলতাকে কথার আড়ালে রাখা যায়, বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে অন্যরকম দেখানো যায়। কিন্তু কবরের দরজা পেরিয়ে গেলে মানুষের সঙ্গে তার নিজের বাস্তবতার আর কোনো পর্দা থাকে না।
আর তখন হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে এই পৃথিবীটাকেই এই ধুলোমাখা পথ, বর্ষার গন্ধ, বিকেলের আলো, মায়ের মুখ, প্রিয় মানুষের কণ্ঠ, জানালার পাশে বসে থাকা একটি নিরিবিলি সন্ধ্যা। অথচ পৃথিবী তখন আমার নাগালের বাইরে। আমি শুধু অপেক্ষা করব।
কত আশ্চর্য এই জীবন! যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে এত হিসাব করি, একদিন সেই মাটিই আমাদের শরীরটাকে নিজের মধ্যে নিয়ে নেবে। যে ঘরকে নিজের বলে মনে হয়, একদিন সেখানে অন্য কেউ থাকবে। যে নামটি নিয়ে এত অহংকার, একদিন সেটির আগে শুধু একটি শব্দ বসবে ‘মরহুম’।
আর আমার জন্য শুরু হবে বারযাখ।
আমি জানি না, সেই প্রথম দিনটি আমার জন্য কেমন হবে। জানি না, কবরের নীরবতা আমাকে স্বস্তি দেবে, নাকি আতঙ্কে ভরে দেবে। শুধু এইটুকু জানি সেই দিনটি আসবে এমন এক নিশ্চিততায়, যেভাবে প্রতিটি সন্ধ্যার পর রাত নামে।
হয়তো পৃথিবীর মানুষ সেদিন আমাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাবে।
কিন্তু আমার জন্য সেটিই হবে শেষ বিদায় নয়
সেটিই হবে এক নতুন জীবনের প্রথম দিন।🌼🍂😓