21/03/2026
২৭ জুলাই ২০১৯। কানাডার ক্যাস্টেলমোর অ্যাভিনিউতে একটি বাংলাদেশী পরিবারের দিনটি শুরু হয়েছিল অন্য সাধারণ দিনের মতোই। উচ্চাবিলাসী জীবনযাত্রার খরচ জোগাতে পরিবারটির কর্মজীবী মানুষেরা প্রতিদিনের মতোই বেরিয়ে পড়েছিলেন কাজে। তবে বিকেল গড়াতেই দিনটি রূপ নয় পরিবারেরটির জীবনের অন্যতম বীভৎস একটি দিনে। সেদিন সকালেও যে মা পরম মমতায় নাস্তার টেবিল সাজিয়ে দিয়েছিলেন, যে বাবা ক্লান্ত শরীরে টেক্সীর চাবি নিয়ে বেরিয়েছিলেন কাজে- তারা কেউই জানতেন এটিই তাদের জীবনের শেষ দিন হতে চলেছে। তবে জানতো পরিবারটির একমাত্র ছেলে- মিনহাজ জামান। কেবলমাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে পরিবারের সকলকে এক নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়ে এই তরুণ ব্যস্ত ছিলেন ভিডিও গেমসে। বন্ধুদের সাথে নিজের কৃতকর্ম শেয়ার করে করেছেন সেলিব্রেশন! তবে যেভাবে শেষ হয় এই ঘটনা, তা প্রতিটি পরিবারের জন্যে একটি শিক্ষা, একটি নিকষ সত্যের উন্মোচন। চলুন শুরু করা যাক এই অন্যরকম জীবনের গল্প।
৯০ এর দশকে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মনিরুজ্জামান ও মমতাজ জামান দম্পত্তি নিজেদের উন্নত জীবনের আশায় স্বপ্ন দেখেন বিদেশে পাড়ি জমানোর। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে ২০০২ সালে কানাডার ভিসা পাওয়ার মাধ্যমে। নতুন দেশ, নতুন জীবন- সব মিলিয়ে ভালোই কাটছিলো পরিবারটির। পরিবারটি দুই সন্তান, ছেলে মিনহাজ জামান ও মেয়ে মালিসা জামান। মনিরুজ্জামান নিজে পেশা হিসেবে শুরু করেন টেক্সী চালানো শুরু করলেও স্ত্রী মমতাজকে কোনো কাজ করতে দেননি। তার একমাত্র কারণ নিজের দুই সন্তানদের পরিপূর্ণ খেয়াল রাখা। যাতে পড়াশোনায় ভালো করে সন্তানেরা ভালো চাকরি পায়, বিদেশের মাটিতে তার মতো কষ্টের কাজ না করা লাগে।
মনিরুজ্জামান ও মমতাজ জামান স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি ছিলেন পরস্পরের ভালো বন্ধু, আদর্শ দম্পত্তি বলতে যা বোঝায় তারা ছিলেন তেমনটাই। ঘটনার কয়েকদিন আগে মমতাজ জামানের মা ফিরোজা বেগম বাংলাদেশ থেকে কানাডায় বেড়াতে যান মেয়ের বাসায়। এই দম্পত্তির ২৫তম বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাদের বাড়িতে আয়োজিত একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন অনেক বাংলাদেশি। মোটকথা, কানাডার বাঙালি কমিউনিটিতেও সকলেই তাদের একটি আদর্শ পরিবার হিসেবেই জানতো। এই পরিবারের দুই সন্তান মিনহাজ ও মালিসাও সকলের চোখে ভালো বাবা মায়ের ভালো সন্তান বলেই পরিচিত ছিলো।
পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারে সচ্ছলতা আনতে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে পরিবারটির একমাত্র মেয়ে মালিসা জামান ফুড ব্যাসিক্স নামক একটি সংস্থায় চাকরিতে যোগ দেন। মালিসার ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা শেষ করে একজন নিউরো সার্জন ডাক্তার হবার। শুধু মালিসাই নয়, মিনহাজও ছিল বাবা মায়ের অতি আদরের সন্তান। মমতাজ বেগম প্রায়ই বলতেন, তার সন্তান মিনহাজ চুপচাপ স্বভাবের একটি শান্ত ছেলে। সে পড়াশোনাটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে বলেই এখনো কোনো কাজে যোগ দিচ্ছে না।
আর দশটি বাঙালি পরিবারের মতোই পরিবারটির স্বপ্ন ছিল মেয়ে মালিসা ডাক্তার হলে ছেলে মিনহাজ হবে ইঞ্জিনিয়ার। কাজেই কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে যখন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয় মিনহাজ, তখন বাবা মা যেন তাদের দীর্ঘ স্বপ্নের বাস্তবায়নের শুরুটা দেখতে পান। তারা এমনটাই ভাবেন যে, ঠিক যেভাবে মালিসা পরিশ্রম করে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করছে, মিনহাজও একই রকম পরিশ্রম করছে পড়াশোনায়।
কলেজে প্রথম বর্ষে মিনহাজের ফলাফলও হয় খুব আশানুরূপ। দুটো সন্তানের এই সফলতার যাত্রা দেখে মনিরুজ্জামান ও মমতাজ জামান আনন্দে চোখের পানি মোছেন। দেশ, আপনজন ছেড়ে তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম সফল হবার পথে। যেদিন একটি মালিসা ডাক্তার, আর মিনহাজ ইঞ্জিনিয়ার হবে সেদিন ফুরাবে তাদের এই সংগ্রাম।
কিন্তু মালিসার কলেজ জীবন ভালো চললেও মিনহাজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল মূলত এক ভয়ংকর মিথ্যা। সকলের অন্যরালে এক অন্য জীবন যাপন করতো মিনহাজ!
সত্য এই যে- মিনহাজ কোনোদিন ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে যায়ইনি! কেননা ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষাতে অংশ নিলেও এতে পাশই করতে পারেনি মিনহাজ! কিন্তু নিজের পরিবারকে মিনহাজ জানায়, সে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চাঞ্চ পেয়েছে। আদতে একটি লোকাল কলেজে নামমাত্র ভর্তি হয় মিনহাজ। আর এই ভয়ঙ্কর মিথ্যের কারণ ছিল, তার ছোটবোন মালিসার সফলতা। কানাডার একাধিক নামকরা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে মালিসা। আর বোনের এই সফলতার কাছে নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ করতে চায়নি মিনহাজ। অপরদিকে মিনহাজের পিতা মনিরুজ্জামান চেয়েছিলেন মিনহাজ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হোক। তাই সেও পরিবারের সকলকে জানায় ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে তার চাঞ্চ পাওয়ার কথা।
মিনহাজের ভাবনা ছিল, এক বছর মিথ্যে বললেও পরের বছরের ভর্তি পরীক্ষায় আবারো অংশ নিয়ে ঠিকই চাঞ্চ পাবে সে। কিন্তু সেই লোকাল কলেজে ক্লাস শুরু করার পরই মিনহাজ বুঝতে পারে, পড়াশোনায় সে মোটেই ভালো নয়। ক্লাসের প্রতিটি পরীক্ষাতেই লাগাতার ফেল করতে থাকে সে। এবং একসময় ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি প্রস্তুতির পড়াশোনাতেও আর মন বসাতে পারে না মিনহাজ! চাপা স্বভাবের মিনহাজ লোকাল সেই কলেজেও মিশতে পারতো না কারো সাথেই, তার ছিল না কোনো উল্লেখযোগ্য বন্ধু। এক সময় লাগাতার ফেইলের কারণে সেই কলেজে যাওয়াও বন্ধ করে দেয় মিনহাজ।
কিন্তু সপ্তাহে চারটি ক্লাস তো অন্তত হয় ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। আর তাই সপ্তাহের চারদিন মিনহাজকেও বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার নাম করে বের হতে হয়। সপ্তাহে চারদিন সকাল ৮ টায় বাসা থেকে বের হয় মিনহাজ। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাসে উঠে কখনো শপিং মল, কখনো কমিউনিটি জিম এসব জায়গায় ৪-৫ ঘন্টা সময় কাটিয়ে দুপুর ১ টায় বাসায় ফিরে। খাবার টেবিলে বাবা মায়ের সাথে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প করে, পড়াশোনার গল্প- আদতে যা সবই বানোয়াট। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এভাবেই নিজের পরিবারকে ৩ বছর মিথ্যে বলে মিনহাজ। সময় আসে শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার।
ঠিক এই সময় নিরুপায় একবার মিনহাজ সিদ্ধান্ত নেয় নিজের পরিবারকে সবকিছু জানিয়ে ক্ষমা চাওয়ার। কিন্তু তখনই মিনহাজের বোন মালিসার জীবনযাপন কিছুটা উশৃঙ্খল হতে শুরু করে। আর মনিরুজ্জামান ও মমতাজ বেগম নিজেদের সকল প্রত্যাশায় চোখ ফেরায় মিনহাজের দিকে। তারা ভাবে- মেয়ে উচ্ছনে গেলেও ছেলে তো রয়েছে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে। পরিবারের এই প্রত্যাশা অনুমান করেই সত্যটা বলতে পারেনা মিনহাজ। কাজেই চলতে থাকে তার মিথ্যে জীবন যাপন।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করে বাহিরে ঘুরার সময় একটি গেম্স্ ক্যাফের দিকে নজর যায় মিনহাজের। সেখানেও জীবনে প্রথম ওয়ার গেম্স্ খেলে মিনহাজ। Perfect Zero নামক মাল্টিপ্লেয়ার এই গেম্স্ হতাশাগ্রস্ত মিনহাজকে যেন নতুন জীবন দেয়। যেহুতো গেমাসটি ছিল মাল্টিপ্লেয়ার, তাই এতে অন্য প্লেয়ারদের সাথে কথা বলা যেতো। এই ব্যাপারটিই যেন বন্ধু শূন্য মিনহাজের জীবনে আশীর্বাদ কিংবা অভিশাপ হয়ে আসে। গেমসে নিজের ক্যারেক্টরকে পাওয়ারফুল করতে থাকে মিনহাজ, যা বাস্তব জীবনে করতে সে পুরোপুরি ব্যর্থ। গেমসটিতে চরম পর্যায়ে এডিক্টেড হয়ে যায় মিনহাজ। যুক্ত হয় গেমারদের সোশ্যাল মিডিয়া ডিসকোর্ড সার্ভারে। কারণ কেবলমাত্র এই সময়টাতেই নিজের সকল টেনশন ভুলে যায় সে। কলেজের টেনশন, বাবা মায়ের প্রত্যাশার চাপ- সবকিছু!
ডিসকোর্ড সার্ভারে অন্যান্য গেমারদের সাথে দীর্ঘ চ্যাটের সুযোগ পেয়ে যেন নিজেকে মেলে ধরে চাপা স্বভাবের মিনহাজ। একটি বাংলাদেশী মুসলিম পরিবারের সন্তান মিনহাজ এক সময় সরে যায় ধর্মের বিশ্বাস থেকে। নিজের প্রোফাইল বায়োতে নিজেকে এথিস্ট বা নাস্তিক বলে প্রচার করে সে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়। এক সময় গ্রূপ চ্যাটে ইসলামিক নামের কোনো গেমারকে দেখলেই কুটুক্তিপূর্ণ মন্তব্য করতে থাকে মিনহাজ। এ কারণে তাকে কিছুদিনদের জন্যে ব্যানও করা হয় গ্রূপ চ্যাট থেকে। তো মিনহাজের এরকম আচরণের কারণে অন্য গেমাররা সকলে এটা মেনেই নেয় যে, সে কিছুটা উইয়ার্ড। কাজেই তার কোনো কুটুক্তি, আক্রমনাত্মক মেসেজ এলেও সেভাবে পাত্তা দেয়না কেউ! কিন্তু একদিন এমন কিছু মেসেজ পাঠায় মিনহাজ- যা চমকে দেয় সবাইকে! সেই মেসেজটি ছিলো -
"এই মাত্র আমি আমার পুরো পরিবারকে খু'ন করেছি"
২৭ জুলাই ২০১৯
এদিন মিনহাজ "পারফেক্ট ওয়ার্ল্ড জিরো" নামক সেই গ্রূপ চ্যাটে লিখে "আমি আমার মা ও নানীকে খুন করেছি। অপেক্ষা করছি আমার বোনের জন্যে, যা ৫ মিনিটের মধ্যেই ঘটবে। আর ১ ঘন্টা পর বাবা!"
অন্য গেমাররা শুরুতে এই মেসেজকে প্র্যাংক ভেবে পাত্তা দেয়না, কেননা মিনহাজ যে স্বভাবগতভাবে কিছুটা অস্বাভাবিক এটা তারা সবাই এতদিনে জেনে গেছে। কিন্তু এরপর মিনহাজ চ্যাটে একটি ছবি পাঠায় এবং লিখে "এটাই আমার মা"! সেই ছবিটি দেখে গ্রুপের অন্য গেমাররা এবার নড়েচড়ে বসে! কিছু গেমার এরই মধ্যে ছবিটিতে রিভার্স সার্চ করে সার্চ ইঞ্জিনে- বোঝার চেষ্টা করে কোনো ওয়েবসাইট থেকে ছবিটি ডাউনলোড করে তাদের ভয় দেখাচ্ছে কিনা মিনহাজ। কিন্তু না- ইন্টারনেটে এই ছবিটির অস্তিস্ব নেই ইতঃপূর্বে। অর্থাৎ- এটি বাস্তব!
একজন গেমাররা মিনহাজের অবস্থান জানতে চাইলে, মিনহাজ জবাব দেয় সে বাসাতেই রয়েছে। এসময় অনেকেই মিনহাজকে ম্যানশন করে জানতে চায়- কি হয়েছে তার? কিন্তু কিছুক্ষনের জন্যে মিনহাজকে অফলাইন দেখায়। কয়েক মিনিট পরেই অনলাইনে এসে আরেকটি ছবি পাঠায় মিনহাজ। সাথে লিখা "বোনকেও মেরে ফেললাম! এখন বাবার জন্যে অপেক্ষা করছি!"
ডিসকোর্ড সার্ভারের অন্য গেমাররা এবার ভয় পেতে শুরু করে। অনেকেই খুঁজতে থাকে- মিনহাজ কখনো কারো সাথে তার বাড়ির ঠিকানা শেয়ার করেছিল কিনা। কিন্তু না- মিনহাজকে তারা গেমসে চিনলেও বাস্তবে তাকে চিনে না কেউ। তাই এই মুহূর্তে ঠিক করা উচিত ভেবে পায়না তারা।
অন্য গেমারা মিনহাজের পাঠানো ছবিগুলো তাদের পরিচিত জনদের পাঠাতে শুরু করে, কেউ হত্যার শিকার মনুষদের চিনে কিনা এই উদ্দেশে। কিন্তু এই পুরো সময়টায় পারফেক্ট ওয়ার গেমসটি খেলতে থাকে মিনহাজ। সন্ধ্যায় গরূপে সর্বশেষ আরেকটি মেসেজ পাঠায় মিনহাজ। "আমি এই মাত্র আমার পুরো পরিবারকে শেষ করলাম!"
প্রিয় দর্শক, পুরো কথোপকোথনটিই হয় ইংরেজিতে। সকলের বোঝার সাথে এটিকে ভাবানুবাদ করে বলা হচ্ছে ভিডিওতে।
এই মেসেজের পর অনেকেই গ্রূপের বাইরে মিনহাজকে পার্সোনালি মেসেজ পাঠাতে থাকে। সেসময় মিনহাজ একজনকে রিপ্লাইতে জানায়- "হ্যা, আমি শাস্তির যোগ্য!" প্রতি উত্তরে সেই গেমার জানায়- "এটি করার আগে তুমি যদি এই ব্যাপারে কথা বলতে!" উত্তরে মিনহাজ জানায়, "এটি আমার ৩ বছরের পরিকল্পনা। আমার বাবা মাকে জানিয়েছিলাম, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন ২৮ জুলাই। আমার পক্ষে এটিকে আর পেছানো সম্ভব ছিলো না।"
আরো কিছু চ্যাটের এক পর্যায়ে ওই গেমার মিনহাজকে প্রশ্ন করে- "তুমি এটি গ্রূপ চাটে জানাতে গেলে কেন?"
এর উত্তরে মিনহাজ যা লিখে তা হলো-
"আমি আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছি, এবং যদি বেঁচে থাকতে পারি তাহলে সম্ভবত সারা জীবন জেলে কাটাবো। আশা করি আমি তোমাদের হাসিয়েছি, আশা করি তোমরা সেই ভালো সময়গুলো মনে রাখবে। আমি তোমাদের সবাইকে মিস করব। আমার অটিজম সহ্য করার জন্য ধন্যবাদ ভাই, আমি তোমাদের মিস করব।"
এসময় ওই গেমার মিনহাজকে জিজ্ঞেস করে, "তোমার গার্লফ্রেন্ডের কি হলো?"
মিনহাজ জানায়, "তার সাথে অনেক আগেই ব্রেকআপ হয়েছে। আমি তাকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাইনি"
ঠান্ডা মাথার খুনি মিনহাজ জানতো সে কি করছে। সে আসলে ধরা পড়তেই চেয়েছিলো। কিন্তু আর পেছনে কারণটা ছিল কি? কেন মিনহাজ নিজের পরিবারের সবাইকে শেষ করলো?
এই সবকিছুই শুরু হয়েছিল যখন পর পর দুইবার মিনহাজ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করে। কিন্তু নিজের পরিবারকে এই সত্যটি জানাতে পারেনি সে। মিথ্যে ক্লাসের নাটক করে চার বছর কাটিয়ে যখন ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফলের সময় এলো তখন নিজের পরিবারের মুখোমুখি হয়ে এই হত্যা বলার সাহস ছিল না মিনহাজের। কেননা ইতোমধ্যেই তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছে তার বাবা মা- তা মুহূর্তেই ধুলিস্বাৎ হয়ে যেত ওই সত্য বেরিয়ে এলে। এই অবস্থায় মিনহাজকে হয় নিজেকে মারতে হতো, নাহয় পরিবারের সকলকে।
২৭ জুলাই সেই দিনটিতে সকাল বেলাতেই মিনহাজের বাবা মনিরুজ্জামান ও বোন মালিসা বেরিয়ে পড়ে যার যার কাজে। মিনহাজ অপেক্ষা করতে থাকে বিকেলের। কারণ সে জানে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন দুপুরের পরেই ঘুমাতে যায় মিনহাজের মা ও নানী। সেদিনও একইভাবে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরে মিনহাজের মা ও নানী। এসময় একটি ধারালো চুরি দিয়ে প্রথমে মা এবং তারপর নানীকে হত্যা করে মিনহাজ। এরপর ছুরিটি সেখানে রেখেই নিজের ঘরে গিয়ে গেমসে মগ্ন হয় মিনহাজ। এসময় সেই গ্রুপ চ্যাটে প্রথম মেসেজটি পাঠিয়েছিল মিনহাজ। এরপর সন্ধ্যায় বোন মালিসা ফিরলে সিঁড়ির প্রবেশমুখেই একই কায়দায় তাকেও হত্যা করে মিনহাজ, এবং পরবর্তীতে বাবাকে।
পুরো পরিবারকে হত্যা করলেও মিনহাজ এতটাই কাপুরুষ ছিলো যে, নিজেকে হত্যা করতে পারেনি সে। নিজেকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে,সমাজে সম্মানিত বলে পরিচিত তার পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পুরো পরিবারকেই এক চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেয় মিনহাজ।
পুলিশ ঠিক কার তথ্যের ভিত্তিতে এসেছিলো, এই তথ্যটি জানা যায়নি। কিন্তু অবশ্যই- মিনহাজ আটক হয়েছিল ঘটনার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই।
০৭ নভেম্বর ২০২০
সেসময় বিশ্বজুড়ে করণের প্রাদুর্ভাব থাকায় অনলাইনে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় মিনহাজ জামানের। আদালতে মিনহাজ জানায়- বাবা মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে সে এই কাজ করেছে। তবে প্রকৃত অর্থে মিনহাজ এমন এক কাপুরুষ যে, নিজের অপরাধ আড়াল করতে বাঁকি সবাইকে দোষারোপ করতে ছাড়েনা। জামান পরিবারের মতো একটি সুন্দর গুছানো পরিবারে হয়তো মিনহাজের মতো সন্তানের জন্ম না হলেই ভালো হতো। প্রায় কয়েক ঘন্টার এই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুবক ২৮ বছর বয়সী মিনহাজ জামান কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় কানাডার অন্টারিওর আদালত। একইসঙ্গে আগামী ৪০ বছর তার প্যারোল মুক্তি রহিত করা হয়। অর্থাৎ কোনোভাবেই ৪০ বছরের আগে কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই মিনহাজের। এরপর থেকে কানাডার কোনো এক জেলেই রয়েছে শয়তান রুপি সন্তান - মিনহাজ জামান!
এই ঘটনা থেকে আমরা একটি গভীর নৈতিক শিক্ষা পাই, যা পিতামাতার অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং সন্তানের দায়িত্ববোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরে। পিতামাতার প্রত্যাশা এবং সন্তানের স্বপ্নের মধ্যে একটি সুস্থ সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরি। পিতামাতার উচিত তাদের সন্তানদের উপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া এবং তাদের স্বপ্ন ও সক্ষমতাকে সম্মান করা। অন্যদিকে, সন্তানেরও উচিত পিতামাতার ভালোবাসা ও পরিশ্রমের মূল্য বোঝা এবং তাদের প্রত্যাশার প্রতি সৎ ও দায়িত্বশীল আচরণ করা।
👉 বিশ্বের আলোচিত এই ঘটনাটি নিয়ে Unknown Fact BD এর বিস্তারিত ডকুমেন্টারি এর লিংক কমেন্টসে বক্সে দেয়া হলো। এধরণের আরো অনেক ঘটনার ভিডিও পেতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করার অনুরোধ রইলো।