08/06/2026
কেমন সিনেমা বনলতা এক্সপ্রেস? কী আছে এই চলন্ত ট্রেনে? কারা আছে, কী করছে তারা? তাদের গন্তব্যই বা কোথায়?
বনলতা এক্সপ্রেসের চরিত্রগুলোর মতো করে আমিও উঠছি এই ট্রেনে— বগি থেকে বগিতে ছুটে জেনে নেব সিনেমার মর্মকথা। সিনেমাকে বুঝতে হলে সিনেমার পার্সপেক্টিভ গভীরভাবে বুঝতে হয়। সিনেমা কী বলতে চায়, সেই বলতে চাওয়াটা কতটা সফলভাবে তুলে ধরেছে— সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেনে অনেকগুলো কামরা। সবগুলোই স্লিপার কোচ। আর সেই কামরাগুলোতে ছড়িয়ে আছে নানা শ্রেণি-পেশা, নানা বিশ্বাস, নানা সংকট আর নানা স্বপ্নের মানুষ। কেউ ক্ষমতা হারাচ্ছে, কেউ জমি বেচতে যাচ্ছে, কেউ বিয়ে থেকে পালাচ্ছে, কেউ বা বুকের ভেতর একটা পুরনো শোক বহন করে চলেছে। আর এই সবার অজান্তেই একটি কামরায় নতুন একটি জীবন পৃথিবীতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একই ট্রেনে একটি জন্মাবার সম্ভাবনা ও সংকট। একই ট্রেনে একটি লাশ। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাকি সব মানুষ— যাদের প্রত্যেকের আলাদা গল্প আছে, আলাদা ব্যথা আছে, আলাদা গন্তব্য আছে। তবে বিশেষ এক মুহূর্তে, বিশেষ এক ঘটনায় তারা সবাই এক হয়ে যায়।
সিনেমাকে বুঝতে হলে, সিনেমার পারসপেকটিভ গভীর ভাবে বুঝতে হয়। সিনেমা কি বলতে চায়, সেই বলতে চাওয়াটা কতটা সফল ভাবে তুলে ধরেছে-সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। চলুন- বনলতায় উঠে খুঁজি।
গল্প
একটি চলন্ত ট্রেন। কতগুলো চলন্ত চরিত্র। একটি থমকে যাওয়া লাশ। আর মাঝখানে— একটি অনাগত শিশু, যার জন্মই হয়ে ওঠে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
বনলতা এক্সপ্রেসের গল্প পৃষ্ঠে সরল, কিন্তু ভেতরে বহুস্তরী। ট্রেনের প্রতিটি কামরায় আলাদা মানুষ, আলাদা সংকট— শিক্ষামন্ত্রী ও তার ভঙ্গুর ক্ষমতা, জমি বেচতে যাওয়া গ্রাম্য পরিবার, বিয়ে থেকে পালানো তরুণী, চেইন স্মোকার অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রেমিক-প্রেমিকা। এই বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো সবাই এক কেন্দ্রে মিলিত হয়— যখন একটি শিশুকে নিরাপদে পৃথিবীতে আনার সংকট তৈরি হয়।
"শিশুটি জন্মায়। শিশুটি বেঁচে যায়। শিশুটিকে বাঁচাতে হয়। গল্প, মূলত, এইটুকুই— কিন্তু এই সামান্য গল্পের মধ্যে কত শত জীবন জেগে ওঠে।"
রবার্ট অল্টম্যানের Short Cuts বা ইনিয়াররিতুর Babel-এর মতো সমান্তরাল-আখ্যানের কাঠামো এখানেও কার্যকর— তবে বনলতা এক্সপ্রেস তার আন্তর্জাতিক সমগোত্রীয়দের মতো বিশৃঙ্খল নয়।
সুতোটা অনেক বেশি স্পষ্ট, অনেক বেশি উষ্ণ। সিনেমাটি তার হুমায়ূনীয় উৎস থেকে এই
উষ্ণতাটুকু সযত্নে আহরণ করেছে।
ট্রেনের ভেতরে মন্ত্রীর ক্ষমতা হারানোর দৃশ্যটি একটু আলাদা করে বলতে হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় সরে যায়, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়— এই একটি দৃশ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার যে তীক্ষ্ণ স্যাটায়ার আছে, তা সময়ের জ্বলন্ত দলিল।
অভিনয়
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি এর অভিনয়শিল্পীরা— এবং তাদের কথা বলতে হলে মোশাররফ করিম দিয়েই শুরু করতে হয়। রেললাইনের ধারে বসে মৃত ছেলের কথা বলার যে দৃশ্যটি, সেখানে সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে তার কণ্ঠের ভাঙন, চোখের ভাষা, মুখের নীরবতা। অ্যান্থনি হপকিন্স একবার বলেছিলেন, "The art of acting is not to act." করিম এই দৃশ্যে ঠিক সেই কাজটিই করেন।
চঞ্চল চৌধুরী মন্ত্রী চরিত্রে নাটকীয়তার প্রলোভনে পা দেননি— চরিত্রটিকে সংযত রেখেছেন, যা আসলে অনেক বেশি কঠিন কাজ। শরিফুল রাজকে এখানে ভিন্ন রকম লেগেছে— অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত, অনেক বেশি পরিণত। শামিমা নাজনীন বরাবরের মতোই— তিনি অভিনয় করেন না, চরিত্র হয়ে ওঠেন।
প্রেগন্যান্ট আফিয়া চরিত্রে মম অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই দর্শককে আটকে রাখেন। চোখ, মুখ, শরীরী ভাষায় মাতৃত্বের আতঙ্ক ও মমতা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। বাধনের অভিনয়ে পরিণতি আছে, ভারসাম্য আছে। সাবিলা নূর ঝরঝরে— চরিত্রের অস্থিরতা, সাহস এবং দুর্বলতা সুন্দরভাবে মিলেমিশে গেছে।
বিশেষ উল্লেখ না করলে অন্যায় হয়— শ্যামল মাওলা। বাংলাদেশের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড অভিনেতাদের একজন। কণ্ঠ, জেসচার, সংলাপের গতি, তাকানোর ভঙ্গি— সবকিছুতেই একজন পরিণত শিল্পীর ছাপ। কিছু কিছু দৃশ্যে তিনি এমন এক্সপ্রেশন দিয়েছেন যা সত্যিই চমকে দেয়।
সংলাপ
এই সিনেমার চরিত্রগুলোর মতোই আরেকটি প্রাণ আছে— সংলাপ। সহজ, সরল, অথচ গভীর। কখনও হাসায়, কখনও খোঁচা দেয়, কখনও হঠাৎ বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতাকে নাড়িয়ে দেয়। এই সংলাপে বোঝা যায়— গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ সিনেমার পরতে পরতে উপস্থিত। তাঁর বিচিত্র মানুষ, অদ্ভুত রসবোধ, জীবনদর্শন— সব মিলিয়ে এই সংলাপ শুধু কথা নয়, চরিত্রের আত্মা।
নির্মাণ ও সংগীত
চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন পলাশ সংকীর্ণ কামরার ভেতরেও দমবন্ধ না করে একটা নিঃশ্বাসের জায়গা রেখেছেন। চলন্ত ট্রেনের ছোট্ট স্পেসে চরিত্রগুলোর প্লেসমেন্ট, মুভমেন্ট, আলো-ছায়ার খেলায় ট্রেনকে চলন্তই রেখেছেন। পরিচালকের পরিকল্পনা ছিল হিসেবী— ঝুঁকি না নিয়ে, চতুরতার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছেন।
"ঠেকাই মাথা" গানটির ব্যবহার এই সিনেমায় কেবল আবেগের আয়না নয়— এটি একটি স্যাটায়ারিক অস্ত্রও। গানটি যে মুহূর্তে বাজে, তখন পর্দায় যা ঘটছে তার সঙ্গে কথাগুলো মিলিয়ে পড়লে একটা তীক্ষ্ণ অর্থ তৈরি হয়। সংগীত এখানে সাজসজ্জা নয়— গল্পের সক্রিয় অংশ, সময়ের বয়ান।
সেই লাশ ও কাব্যিকতা
গল্পে একটি থেমে যাওয়া জীবন আছে। একটি লাশ। কিন্তু মৃত হয়েও সে জীবিতদের পর্যবেক্ষণ করে, বিচার করে, প্রশ্ন তোলে— অনেকটা যাত্রাপালার বিবেক চরিত্রের মতো। জাপানি চলচ্চিত্রকার মিজোগুচির Ugetsu-য় মৃত্যু যেমন বিচ্ছেদ নয়, সংলাপের আরেকটি মাধ্যম— এখানেও তাই। এই জায়গাটায় সিনেমাটি একটি বিশেষ কাব্যিক উচ্চতা স্পর্শ করে।
টুইস্টটা বললাম না। দেখার আনন্দ নষ্ট করা যাবে না।
শেষ কথা
বনলতা এক্সপ্রেস একটি রাষ্ট্রের রূপক— যে রাষ্ট্র তার শিশুদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। ক্ষমতার ক্ষণভঙ্গুরতা, মানবিক দায়বদ্ধতা, নবজাতকের আলোর প্রতিশ্রুতি— সব মিলিয়ে এটি স্রেফ একটি ট্রেন-যাত্রার গল্প নয়। সংকটে নাগরিকেরা পরস্পরের দায়িত্ব নেবে, শিশুরা নিরাপদে পৃথিবীতে আসবে, মৌলিক অধিকার স্বাভাবিকভাবেই পাবে— এটা নিশ্চিত করার কথা রাষ্ট্রের। সিনেমার এই পার্সপেক্টিভ আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
ট্রেনের কর্মচারী (একে আজাদ সেতু) বলেছিল, "চলন্ত ট্রেনে আমরাই সরকার।" এর চেয়ে ভালো রায় আর কী হতে পারে।
বনলতা এক্সপ্রেস
পরিচালক: তানিম নূর • উপন্যাস: হুমায়ূন আহমেদ ('কিছুক্ষণ') • চিত্রগ্রহণ: বরকত হোসেন পলাশ
রেটিং ৪/৫
(কেনো ৫/৪ পেলো না। কোথায় ১ কম পেলো। গল্প যতটা ধীরে, যত্নে বিস্তার পায়— শেষটা ততটা সময় নেয় না। পরিচালক হিসেবী ছিলেন, ঝুঁকি নেননি— এই সংযমই কখনও কখনও সিনেমাকে একটু বেশি নিরাপদ করে ফেলে। তাই পাঁচে চার।)
মোস্তফা মনন
লেখক, সমালোচক