14/09/2026
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯২৯ সালের ১৪ দফা
----------------------------------
১৯২৮ সালে প্রকাশিত 'নেহেরু রিপোর্ট'-এ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত হওয়ায়, ১৯২৯ সালের ২৮ মার্চ দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষার জন্য তাঁর ঐতিহাসিক ১৪ দফা প্রস্তাব পেশ করেন।
১. যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা: ভারতের ভাবি সংবিধান হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় (Federal) কাঠামোর, যেখানে অবশিষ্টাংশ ক্ষমতা (Residuary powers) প্রদেশের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
২. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন: দেশের সব প্রদেশকে সমান মাপের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
৩. সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব: দেশের সকল আইনসভা ও নির্বাচিত সংস্থায় সংখ্যালঘুদের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, তবে কোনো প্রদেশেই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে সংখ্যালঘু বা সমতায় নামিয়ে আনা যাবে না।
৪. কেন্দ্রীয় আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব: কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের প্রতিনিধি সংখ্যা কোনোভাবেই মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) কম হওয়া যাবে না।
৫. পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা: সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের জন্য পৃথক নির্বাচন (Separate Electorate) ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। তবে কোনো সম্প্রদায় ইচ্ছা করলে তা ত্যাগ করে যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
৬. সীমান্ত সংষ্কার ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা: প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে এলাকা বা সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হলেও তা যেন বাংলা, পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর কোনো প্রভাব না ফেলে।
৭. পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা: ধর্মীয় বিশ্বাস, উপাসনা, শিক্ষা, প্রচার ও সংগঠনের ক্ষেত্রে সব সম্প্রদায়কে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।
৮. আইন প্রণয়নে ভেটো ক্ষমতা: কোনো আইনসভায় সংশিষ্ট সম্প্রদায়ের তিন-চতুর্থাংশ (৩/৪) সদস্য প্রস্তাবিত কোনো বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে, তা তাঁদের স্বার্থবিরোধী বিবেচনায় পাস করা যাবে না।
৯. সিন্ধু প্রদেশ পৃথকীকরণ: বোম্বে প্রেসিডেন্সি থেকে সিন্ধু অঞ্চলকে পৃথক করে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করতে হবে।
১০. সীমান্ত ও বেলুচিস্তানে সংস্কার: উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানে অন্যান্য ভারতের বাকি প্রদেশগুলোর মতো সমপর্যায়ের সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর করতে হবে।
১১. সরকারি চাকরিতে সুযোগ: যোগ্যতা সাপেক্ষে রাষ্ট্রের সব সরকারি চাকরি এবং স্থানীয় সংস্থায় মুসলিমদের জন্য উপযুক্ত অংশ ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
১২. সংস্কৃতি ও ধর্মের সাংবিধানিক সুরক্ষা: মুসলমানদের ভাষা, ধর্ম, ব্যক্তিগত আইন (Personal Law), শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা সংবিধানে নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. মন্ত্রিসভায় আসন: কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক - কোনো মন্ত্রিসভাই গঠিত হতে পারবে না যদি না তাতে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) মুসলিম মন্ত্রী থাকেন।
১৪. সংবিধান সংশোধনে প্রদেশের সম্মতি: ভারতীয় ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলোর/প্রদেশগুলোর সম্মতি ছাড়া কেন্দ্রীয় আইনসভা সংবিধানের কোনো সংশোধন করতে পারবে না।
এই ১৪ দফা প্রস্তাব ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যকার দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। জিন্নাহ এটিকে "পথের বিভাজন" (Parting of ways) বলে উল্লেখ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান সৃষ্টির অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।