21/09/2026
দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দিতে হলে নিজেকে সত্যিকার ওয়ারিশে নবী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে: মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া
ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে নবীদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ও জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না। তবে নবুওয়াতের দায়িত্বের যেসব অংশ উম্মতের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে, সেসব দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের ওপর অর্পিত হয়েছে। তাই একজন আলেমের দায়িত্ব শুধু ইলম অর্জন করা নয়, বরং সেই ইলম, হিদায়াত ও দ্বীনের দায়িত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নিজের জীবনেও তা বাস্তবায়ন করা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বাদ মাগরিব ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দীনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া ইলমুল ইলাহী বাগবাড়ী মাদ্রাসার ছাত্র সংসদ আত-তাবলীগ ছাত্র পাঠাগারের বার্ষিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামিয়ার মুহতামিম মাওলানা নূর মোহাম্মাদ কাসেমী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাজেমে তা'লিমাত মাওলানা খন্দকার ফখরুদ্দীন আহমদ হোসাইনী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, ‘আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী’। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পর নবুওয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও নবীদের রেখে যাওয়া ইলম, হিদায়াত ও দ্বীনের দায়িত্ব মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজ আলেমদের করতে হয়।
তিনি হাদিসটি উদ্ধৃত করে বলেন,
الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ
অর্থাৎ, ‘আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।’
তাঁর ব্যাখ্যায়, এখানে ‘উত্তরাধিকার’ বলতে নবুওয়াতের মর্যাদা বোঝানো হয়নি। বরং নবীদের রেখে যাওয়া ইলম, হিদায়াত এবং দ্বীনের দায়িত্ব বহন করাকেই বোঝানো হয়েছে।
নবীর উত্তরসূরিদের চার প্রধান দায়িত্ব
মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, নবীদের উত্তরসূরি হিসেবে আলেমদের কয়েকটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে চারটি দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দায়িত্ব হলো আয়াত ও দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নবী ﷺ যে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁর উত্তরসূরিদের অন্যতম দায়িত্ব হলো মানুষের কাছে কুরআন ও সুন্নাহর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। তবে এই দাওয়াত হতে হবে হিকমত, প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতির মাধ্যমে এবং মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব হলো সহিহ ইলম শিক্ষা দেওয়া। মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাহফিল, ওয়াজ, লেখনীসহ বৈধ বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষকে কুরআন-হাদিস ও দ্বীনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে। শুধু তথ্য জানিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়; মানুষ যেন সেই জ্ঞান বুঝতে পারে, আমল করতে পারে এবং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারে, সে ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করা আলেমদের দায়িত্বের অংশ।
তৃতীয় দায়িত্ব হলো তাযকিয়া ও চরিত্র গঠন। নবীর উত্তরসূরির দায়িত্ব কেবল বক্তৃতা দেওয়া কিংবা জ্ঞান বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানুষ তৈরি করাও তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব। মানুষের আকিদা বিশুদ্ধ করা, ইবাদত সহিহ করা, চরিত্র সুন্দর করা, আমলকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করা এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ শেখানো তাযকিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ সমাজের পরিবর্তন শুধু আইন কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে আসে না; মানুষের অন্তর ও চরিত্রের পরিবর্তনের মাধ্যমেও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
চতুর্থ দায়িত্ব হলো নিজেদের জীবনে নববী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা। মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, নবীর উত্তরসূরিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাঁদের নিজেদের জীবনেই নববী আদর্শের প্রতিফলন ঘটানো। কারণ মানুষ শুধু একজন বক্তার বক্তব্য শোনে না, তাঁর চরিত্রও দেখে।
তিনি বলেন, কেউ যদি আমানতদারির কথা বলেন, তাহলে তাঁর নিজের জীবনেও আমানতদারির প্রকাশ থাকতে হবে। ইনসাফের কথা বললে তাঁকে নিজের জীবনে ইনসাফ করতে হবে। তাকওয়ার কথা বললে তাঁর নিজের জীবনেও তাকওয়ার প্রতিফলন থাকা জরুরি। বক্তব্য ও জীবনের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে দাওয়াতের প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আকাবির-আসলাফের জীবন অনুসরণের আহ্বান
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও আলেমে দ্বীন মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন শিক্ষার্থীদের আকাবির ও আসলাফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের ছাত্রজীবন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পূর্ববর্তী আলেমরা শুধু জ্ঞান অর্জন করেননি; অর্জিত জ্ঞানকে তাঁরা নিজেদের বাস্তব জীবনে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁদের ইলমের সঙ্গে ছিল আমল, চরিত্র, অধ্যবসায় এবং দ্বীনের জন্য একনিষ্ঠ মেহনত।
মাওলানা যাইনুল আবেদীন দারুল উলুম দেওবন্দের বিশিষ্ট আদীব মাওলানা খলিল আহমদ আল-আমিনী (রহ.)-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, একনিষ্ঠ মেহনত, অধ্যবসায় এবং আকাবির-আসলাফের অনুসরণ একজন সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তানকেও এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তিনি পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত আদীব হিসেবে সম্মানিত হন।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ছাত্রজীবনকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং এই সময়কে ইলম, আমল, আদব, আখলাক ও আত্মগঠনের সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। পূর্ববর্তী মনীষীদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজেদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিয়মিত ও একনিষ্ঠ মেহনত করতে হবে।
ইলমের সঙ্গে আদব-আখলাকের সমন্বয়ের তাগিদ
বিশেষ অতিথি মাওলানা আবু সালেহ তাঁর বক্তব্যে ইলম অর্জনের পাশাপাশি আদব ও আখলাকের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পূর্ববর্তী আকাবির ও আসলাফের জীবনী অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট হয়, তাঁরা ইলম অর্জনের পাশাপাশি আদব-আখলাককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের কাছে জ্ঞান অর্জন ছিল মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর বিষয় নয়; বরং নিজেকে সংশোধন করা এবং মানুষের কল্যাণে সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর মাধ্যম।
মাওলানা আবু সালেহ বলেন, ইলমের মধ্যে যদি আদব ও আখলাক না থাকে, তাহলে সেই ইলম মানুষের উপকারে আসার পরিবর্তে অহংকারের কারণ হয়ে উঠতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানের সঙ্গে যদি বিনয়, শিষ্টাচার, উত্তম ব্যবহার ও দায়িত্ববোধ যুক্ত না হয়, তাহলে তার অর্জিত জ্ঞানের প্রকৃত সুফল সমাজ পাবে না।
তিনি শিক্ষার্থীদের ইলমের পাশাপাশি উস্তাদদের সম্মান, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ, উত্তম ব্যবহার এবং নিজের চরিত্র সংশোধনের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও যারা উপস্থিত ছিলেন
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জামিয়া ইসলামিয়া দারুল ফালাহ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মুফতি ইলিয়াস হাসান কাসেমী, জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ মাদ্রাসার সিনিয়র মুদাররিস মাওলানা আনোয়ার হোসাইন ঢাকুবীসহ জামিয়া ইসলামিয়া ইলমুল ইলাহী বাগবাড়ী মাদ্রাসার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে ছাত্র পাঠাগারের বার্ষিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। বক্তারা শিক্ষার্থীদের ইলম অর্জনের পাশাপাশি আমল, আদব-আখলাক, আত্মশুদ্ধি এবং দ্বীনি দায়িত্ববোধ নিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।