15/08/2026
দ্বিতীয় পরিকল্পনা (প্রথম পর্ব)
Part 1-5
“সেই কোন সকালে বাজারে পাঠিয়েছি, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল—এখনো মহারাজের ফেরার নাম নেই! আজ তিন দিন ধরে ঘরে চাল, ডাল, তরকারি বাড়ন্ত। কত দিন আর চেয়ে-চিন্তে সংসার চালানো যায়?”
বাড়ির রোয়াকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন ছালেহা বেগম।
বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে, পুকুরপাড়ের আমড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সবটাই শুনছিলেন খালেদ সাহেব। এ ছাড়া তাঁর হাতে আর কোনো উপায়ও ছিল না।
খালেদ সাহেব শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। নিজেও গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। একসময় বেশ মোটা বেতনের চাকরিও করতেন। ছালেহা বেগমের পরিবারও ছিল গ্রামের প্রভাবশালী পরিবারগুলোর একটি। দুই পরিবারের সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাদীক্ষা—সবকিছু মিলিয়েই আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় আজ খালেদ সাহেব সবই হারিয়েছেন।
করোনাকালীন সময়ে অবসর নিয়েছেন তিনি। সৌখিন মানুষ ছিলেন; ভোগ-বিলাসের পেছনেই জীবনের সঞ্চয় করা সম্পদের বড় একটা অংশ খরচ হয়ে গেছে। এখন পেনশনের সামান্য টাকায় এই মন্দার বাজারে দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
থাকার মধ্যে আছে শুধু পাকিস্তান আমলে খালেদ সাহেবের বাবা করে যাওয়া বিশাল এক দোতলা বাড়ি। জরাজীর্ণ বাড়িটা, বিক্রি করার পর সামান্য কিছু চাষাবাদের জমি, আর দুটো পুকুর—এই-ই তাঁর অবশিষ্ট সম্বল।
বাড়িটাও যেন অভাবের এক নীরব সাক্ষী।
একসময় যে বাড়ির উঠোনে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত, আজ তার দেয়ালে শ্যাওলা, ছাদে ফাটল, জানালায় ভাঙা কাচ। জরাজীর্ণ বাড়িটা আর কত দিন টিকে থাকবে, সেটাই এখন একমাত্র চিন্তা। যে কোনো দিন ভেঙে পড়তে পারে—এই আশঙ্কা নিয়েই দিন কাটে।
আর এসব নিয়েও রোজ দুবেলা ছালেহা বেগমের ঝাঁপটা খেতে হয় তাঁকে।
মায়ের চড়া গলার আওয়াজ শুনে স্কুল পালিয়ে বাড়ি ফেরা পলক সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকার আর সাহস পেল না। ভাঙা জানালাটা দিয়ে ব্যাগটা ভেতরে ছুড়ে দিয়ে, যেই না শরীরের অর্ধেকটা ভেতরে ঢুকিয়েছে, অমনি ছালেহা বেগম গলার আওয়াজ আরও এক ধাপ উঁচু করে বলে উঠলেন—
— কিরে হতচ্ছাড়া! পেটে ভাত জোটে না, তাও বড় হওয়ার শখ নেই। আবার স্কুল পালিয়েছিস?
— না মা, আজকে পালাইনি। স্কুলের বেতন তিন মাস ধরে দিইনি। আজ স্যার সবার সামনে অপমান করেছে। তাই চলে এসেছি।
পড়াশোনায় পলক হিসেবে মন্দ নয়। বরং বেশ ভালোই। গতবার অষ্টম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় সে এ+ প্লাস পেয়েছে।
ছালেহা বেগম চোখ কুঁচকে তাকালেন।
— এজন্য জানালা দিয়ে ঢুকবি?
পলক মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে বলল—
— বাবাকে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুঝেছি, আজ হাওয়া টাইট।
দূর থেকে মা-ছেলের কথোপকথন শুনতে থাকা খালেদ সাহেব যেইনা রাস্তা ধরে অন্য দিকে হাঁটা শুরু করলেন পেছন থেকে ছালেহা বেগমের হাঁক ভেসে এল—
— এই যে জমিদার মশাই! বাজার এনেছেন? নাকি হাওয়া খেয়েই বাঁচতে হবে?
কথাগুলো ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলা হলেও খালেদ সাহেব ভদ্র প্রকৃতির মানুষ। এসব শুনে চুপ করে থাকা ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনো জবাবও নেই।
এমন সময় তিন্নি ওপর থেকে নেমে এসে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
— মা, বাবার সঙ্গে চেঁচিয়ে লাভ নেই। ছাদে যে লাউগাছটা লাগিয়েছিলাম, সেটায় এই লাউটা ধরেছে।
ছালেহা বেগম কোনো কথা না বলে লাউ আর কচি শাকগুলো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
তিন্নি বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
— ভিতরে চলে আসেন, আসামি সাহেব।
খালেদ সাহেবও বাধ্য ছেলের মতো চুপচাপ মেয়ের পিছু পিছু ঘরে ঢুকলেন।
তিন্নি এবার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা, উচ্চতাও আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের তুলনায় বেশ খানিকটা বেশি। এককথায়, গড়নে-বরণে যেন নিখুঁত। ঠিক মায়ের কপি।
যেমন পরিপাটি তিন্নি, তেমনি মিষ্টি তার আচরণ। এমন মেয়ে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। যৌবনে ছালেহা বেগমও ঠিক এমনই ছিলেন। তবে সময়ের অভিশাপে আজ তিনি অনেকটাই বদলে গেছেন। সংসারের অভাব-অনটন, দুশ্চিন্তা আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে করে তুলেছে খিটখিটে স্বভাবের।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে শোবার ঘরে এসে ছালেহা বেগম খালেদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
— বিদ্যুৎ বিল নিতে লোক এসেছিল। বলেছে, এবার বকেয়া সব বিল শোধ না করলে লাইন কেটে দেবে। দোকানিও আর বাকিতে কোনো জিনিস দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
এরপরও চলতে থাকল একের পর এক অভিযোগ। সোমত্ত মেয়ের বিয়ে, বাড়ির জরাজীর্ণ অবস্থা, সংসারের খরচ, বাজারের বাকি—সবকিছু নিয়েই তাঁর অভিযোগের যেন শেষ নেই।
খালেদ সাহেব নিশ্চুপ হয়ে সব শুনলেন। তারপর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
— আল্লাহ ভরসা।
এর বেশি কিছু বলার মতো তাঁর ছিলও না।
পরদিন জুমার নামাজ শেষে অনেক দিন পর বাল্যকালের বন্ধু ফারুক সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল খালেদ সাহেবের।
মসজিদের বাইরে পলককে বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করতে দেখে খালেদ সাহেব একটু ধমকের সুরে তাকে ডাকলেন। তারপর হাতে থাকা জিলাপিগুলো পলকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন—
— তোর মাকে বলিস, আমার ফিরতে একটু দেরি হবে।
পলক ফারুক সাহেবকে লম্বা সালাম দিয়ে জিলাপির প্যাকেট হাতে বাড়ির দিকে চলে গেল।
ফারুক সাহেব আর খালেদ সাহেব পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসলেন। চা খেতে খেতে কখন যে আধঘণ্টা কেটে গেল, দুজনের কেউই টের পেলেন না।
চা শেষ হলে ফারুক সাহেব বিল দিতে উদ্যত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে খালেদ সাহেব আপত্তি জানিয়ে বললেন—
— আরে না, আমি দিচ্ছি।
অথচ তাঁর পকেটে তখন এক আনাও নেই।
তবুও নিজের শিক্ষা, আত্মসম্মান আর ভদ্রতার খাতিরে আন্তরিকতাটা তাঁকে দেখাতেই হলো।
ফারুক সাহেব অবশ্য খালেদ সাহেবের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো করেই জানতেন। তাই কোনোভাবেই তাঁকে বিল দিতে দিলেন না। নিজেই বিল মিটিয়ে দিয়ে একরকম জোর করেই খালেদ সাহেবকে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
বন্ধুত্বের টানে, নাকি পুরোনো দিনের স্মৃতির টানে—তা কে জানে! তবে বহুদিন পর সেদিন খালেদ সাহেবের মনে হলো, পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছে, যাদের সামনে নিজের অভাব লুকানোর প্রয়োজন পড়ে না।
দুজনের পরিচয় বহু বছরের। সেই ছোটবেলা থেকে পাড়ায় একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, অন্যের গাছের ফল চুরি করে খাওয়া, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, সিনেমা দেখতে যাওয়া—এমনকি প্রেমের গল্পও একে অপরের কাছে লুকোননি তাঁরা। চাকরি জীবনের শুরুও হয়েছিল একই জায়গায়।
জীবনের পঞ্চান্ন বছরে এসে তাঁদের একজন আজ সফলতার শিখরে, আর অন্যজন পরিবারটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই জীবনের সবটুকু রস নিংড়ে দিচ্ছেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষে তাঁরা বাড়ির আয়তনে বিশাল উঠোনটায় চেয়ার পেতে বসলেন। শীতের দুপুরে এমন ভুড়িভোজ করে নিশ্চিন্তে রোদ পোহানোর সুযোগ খালেদ সাহেব কতকাল পাননি, তা ঠিক গুনে উঠতে পারলেন না।
হঠাৎ স্ত্রী-সন্তানদের কথা মনে পড়তেই তাঁর মনটা কেমন করে উঠল।
ফারুক সাহেব বারির চাকরকে ডেকে চা আনতে বললেন। তাতেই যেন খালেদ সাহেবের ভাবনার ঘোর কাটল।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে ফারুক সাহেব বললেন—
— তা ভাই খালেদ, তোমার অবস্থা তো শুনলাম সবই। বাল্যকালের বন্ধু তুমি। তোমার এই অবস্থা আর দেখা যায় না। যদি বলো, একটা উপায় বলতে পারি—তোমার এই দৈন্যদশা থেকে উত্তরণের। যদিও সে পথ খুব একটা সহজ নয়। যদি সায় দাও, তাহলে বলতে পারি।
খালেদ সাহেব নিজের জীবনের বিনিময়েও যদি এই অভাবের কালো হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন, তবুও তিনি তা চান। কিন্তু তিনি একবারও ভাবেননি, প্রশ্নটি আসলে তাঁর নিজের জীবন নিয়েই।
ফারুক সাহেব তাঁকে সবকিছু বুঝিয়ে বললেন। তাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেল। একদম নীরব, বাধ্য ছেলের মতো খালেদ সাহেব নিশ্চুপে সব শুনলেন।
উত্তর দেওয়ার মতো কিছুই খুঁজে পেলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে।
যে মানুষ জীবনে কখনো অন্যের কানাকড়ির দিকে তাকাননি, যার মাথায় কোনোদিন আসেনি কাউকে ঠকিয়ে একটি পয়সাও আত্মসাৎ করার কথা—সেই মানুষকেই কিনা আজ এমন একটি কাজের কথা ভাবতে হচ্ছে!
ভাবতেই খালেদ সাহেবের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
ফারুক সাহেব আবার বললেন—
— ওহে বন্ধু, এমন জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো উপায় কি আছে তোমার কাছে? চাকরি শেষে কত কিছুই তো চেষ্টা করলে। কিছুতেই কি সুবিধা করতে পেরেছ? বরং জায়গা-জমি যা ছিল, সবই তো হারিয়েছ। সংসারের খরচ, ছেলের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে—কীভাবে করবে, ভেবে দেখেছ?
খালেদ সাহেব এবারও চুপ করে রইলেন।
সামনে পাহাড়ের শেষ সীমানা জেনেও সেখানে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকলে মানুষের মনের অবস্থা যেমন হয়, খালেদ সাহেবেরও ঠিক তেমনই অনুভূতি হতে লাগল।
— বাড়ি গিয়ে গিন্নির সঙ্গে আলোচনা করে দেখো। এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় আমার জানা নেই।
বলতে বলতে ফারুক সাহেব সিগারেট ধরালেন।
রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজেদের ঘরে একান্তে বসলেন খালেদ সাহেব ও ছালেহা বেগম।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর খালেদ সাহেব ধীরে ধীরে বললেন—
— একটা পরিকল্পনা আছে… এই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে বাঁচার।
ছালেহা বেগম শুরুতে কথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। নিজের মনে বিছানা গোছানো আর অন্যান্য টুকিটাকি কাজ করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর খালেদ সাহেব তিন্নি আর পলককে নিজেদের ঘরে ডাকলেন।
এবার ছালেহা বেগমও একটু মনোযোগ দিলেন।
বুঝতে পারলেন, কর্তা মজা করছেন না। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার আছে।
তিন্নি ও পলক একসঙ্গে ঘরে ঢোকার আগে বাইরে দুজন খানিকটা কানাফুসো করল—কী হয়েছে, কেন ডাকা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনো ধারণা না পেয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুজনেই ঘরে ঢুকে পড়ল।
খালেদ সাহেব তাদের দুজনকে বসতে বললেন।
ঘরে উপস্থিত সবাই যখন তাঁর দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিল, তখন তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
— সারাজীবন সৎপথে থাকার চেষ্টা করেছি। প্রথম জীবনে অনেক টাকা-পয়সা কামাই করলেও ধরে রাখতে পারিনি। নিজের ভোগ-বিলাসেই সব শেষ করেছি। তবে হাজার দারিদ্র্যের মাঝেও কখনো অসৎ পথে পা বাড়াইনি।
তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।
তারপর ভারী গলায় বললেন—
— কিন্তু এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, তিন্নির বিয়ে, পলকের পড়াশোনা তো দূরের কথা—দু’বেলা পেটে খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা সমাজে প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁদের সেই গৌরব আমি ধরে রাখতে পারিনি।
খালেদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
— আজ ফারুকের ওখানে গিয়ে ওর সঙ্গে আলোচনা করে একটা রাস্তা দেখেছি। এই দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা পথ। কিন্তু সে পথ সহজ নয়।
তিন্নি, পলক ও ছালেহা বেগম একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
অবশেষে ছালেহা বেগমই নীরবতা ভাঙলেন—
— তা কী উপায় শুনে এলে?
খালেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
— নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তবে তা আমাকে করতেই হবে। তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য হলেও।
ছালেহা বেগম কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন—
— আচ্ছা, আগে বলো। শুনি।
— ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে ফারুকের অনেক ওপরমহল পর্যন্ত হাত আছে। যেকোনো ধরনের ব্যাংকের কাজ ওর এক কথাতেই হয়ে যায়। ওদের ব্যাংকে হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু আছে। অর্থাৎ শারীরিক কোনো সমস্যা হলে হাসপাতালের খরচ ইন্স্যুরেন্স পলিসির আওতায় বহন করা হয়। পাশাপাশি জীবনবীমার ব্যবস্থাও আছে। মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখলে বীমার মেয়াদ শেষে একসঙ্গে পুরো অর্থ ফেরত পাওয়া যায়।
— এসব তো নতুন কিছু নয়। তাতে আমাদের লাভ কোথায়? আমরা তো বীমা চালানোর মতো আর্থিক পরিস্থিতিতে নেই।
বাবার দিকে তাকিয়ে বলল তিন্নি।
খালেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন—
— যদি কোনো ব্যক্তি বীমা করার পর পুরো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, ধরো ন্যূনতম ছয় মাস পর মারা যায়, তাহলে সে যে পরিমাণ টাকার বীমা করেছে, তার সম্পূর্ণ অর্থ নগদে পাওয়া যায়।
কথাটা শুনে ছালেহা বেগম, তিন্নি ও পলক—তিনজনই একসঙ্গে চমকে উঠল।
— তার মানে তুমি কী করতে চাইছ? এসব অলক্ষুণে কথা চিন্তাও করো কী করে?
চিৎকার করে ধমক দিয়ে উঠলেন ছালেহা বেগম।
পরিস্থিতি যতই তাঁকে খিটখিটে করে তুলুক, মুখে যতই দিন-রাত খালেদ সাহেবকে গালমন্দ করুন না কেন, খালেদ সাহেব ছিলেন ছালেহা বেগমের স্বপ্নের পুরুষ।
কত রাত তিনি জানালার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছেন—বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন খালেদ সাহেব। স্কুলে যাওয়ার সময় কতবার যে দূর থেকে তাঁর পিছু পিছু হেঁটেছেন, তার হিসাব নেই। খেলার মাঠে কখনো খালেদ সাহেবের সামান্য চোট লাগলেও ছালেহা বেগমের বুকটা কেমন করে উঠত।
এসবই তো তাঁদের শৈশব-কৈশোরের গল্প।
পারিবারিক সিদ্ধান্তে সামাজিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দুজন দুজনকে চেয়েছিলেন মন থেকে। ভালোবেসেছিলেন অসম্ভব গভীরভাবে। সুখে-দুঃখে জীবনের পঁচিশটি বছর পাশাপাশি কাটিয়ে দিয়েছেন।
সংসারের হাজারো ঝড়ঝাপটা, অভাব-অনটন, রাগ-অভিমান—কত কিছুই তো এসেছে তাঁদের জীবনে। ছালেহা বেগম যত কথাই তাঁকে শুনিয়েছেন, খালেদ সাহেব কোনোদিন তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি।
আর আজ সেই মানুষটাই নাকি নিজের পরিবারের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিতে চাইছেন!
ভাবতেই ছালেহা বেগমের চোখ অজান্তেই ছলছল করে উঠল।
খালেদ সাহেব সবাইকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বললেন—
— তোমরা যেমনটা ভাবছ, আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। আগে পুরোটা শোনো।
একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন—
— আমি আড়াই কোটি টাকার একটা বীমা করব, বিশ বছরের জন্য। মাসে পাঁচ হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিতে হবে।
— পাঁচ হাজার টাকা!
ছালেহা বেগমের চোখ কপালে উঠল।
— এত টাকা দিয়ে বীমা করার সাহস পেলে কীভাবে? কে দেবে এত টাকা? নাকি পূর্বপুরুষের কোনো গুপ্তধন পেয়েছ?
নিজের চিরচেনা ব্যঙ্গাত্মক সুরেই কথাগুলো বললেন তিনি।
পাশ থেকে তিন্নি মুচকি হাসল।
খালেদ সাহেবও মৃদু হেসে বললেন—
— ফারুক আট মাস পর্যন্ত বীমার প্রিমিয়াম চালাবে। ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রমও সে নিজেই সামলাবে। আর যখন বীমার পুরো টাকা পাব, তখন ওকে বিশ লাখ টাকা লাভসহ দিয়ে দিতে হবে।
ছালেহা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
— আমরা খুবই সাধারণ মানুষ। কোনোদিন থানা পর্যন্ত যাইনি। আমার মনটা কেমন কু-ডাকছে। এসব কি আমাদের দিয়ে হবে?
পলক এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে নীরবতা ভেঙে বলল—
— আর মারা যাওয়ার ব্যাপারটা কী হবে? মারা গেলেই তো পুরো টাকা পাওয়া যাবে!
নীরবতা ভেঙে এই প্রথম পলক কিছু বলল।
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল।
খালেদ সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— মরব না। সব প্ল্যান আছে। সবকিছুই বলছি। একটু সময় দে আমাকে।
তারপর ছালেহা বেগমের দিকে তাকালেন তিনি।
কণ্ঠটা এবার অনেক নরম হয়ে এল।
— তোমার মন সায় না দিলে, কু-ডাকলেও বা কী করার আছে? এই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ আছে তোমার কাছে? সংসারের খরচ, তিন্নির বিয়ে, তোমাদের দুজনের পড়াশোনা—কীভাবে চালাব? তোমার কাছে যদি কোনো উপায় থাকে, আমাকে বলো। আমি সব করতে রাজি আছি।
ছালেহা বেগমের আর কিছু বলার রইল না।
চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি।
মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। বুকের ভেতরটা বারবার কেঁপে উঠছে। প্রবল ইচ্ছে হচ্ছে খালেদ সাহেবকে বাধা দিতে। মনের গভীর থেকে কে যেন বারবার বলে উঠছে—এই পথের পরিণতি ভালো নয়।
কিন্তু কী করবেন তিনি?
সংসারের চারদিকে যে অভাবের অন্ধকার, তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার মতো কোনো শক্তি তাঁর নেই।
তাই শেষ পর্যন্ত নীরব হয়ে রইলেন ছালেহা বেগম।
চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু লুকিয়ে, শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া যেন তাঁর আর কিছুই করার ছিল না।
খালেদ সাহেব সম্মতি বুঝে আবার বলতে শুরু করলেন—
—আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়বে। তোমরা পুরো বিষয়টা এখন থেকেই এমনভাবে রপ্ত করবে, যেন সময় এলে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে যে সবকিছু সাজানো। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ব্যাংক থেকে লোকজন আসবে ভেরিফিকেশনের জন্য। পুলিশ, আইন-আদালত না থাকলে হয়তো গা-ঢাকা দিয়ে কয়েক বছর কাটিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু লাশ শনাক্তকরণ, মেডিকেল সার্টিফিকেট—এ রকম নানা ধরনের ঝামেলা আছে। সবকিছু ঠিকঠাক না হলে টাকা পাওয়া সম্ভব হবে না। ফারুক যতটা পারে, আমাদের সাহায্য করবে। তোমরা ভয় পেও না।
তিন্নি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে প্রশ্ন করল—
—এত বড় ঝুঁকি ফারুক আংকেল কেন নেবেন? আর মাঝপথে যদি উনি আমাদের ছেড়ে দেন, তখন কী হবে? তার ওপর একজন জীবিত মানুষকে লাশ বানানোই বা সম্ভব কীভাবে? ডাক্তারই বা ডেথ সার্টিফিকেট দেবেন কীভাবে?
খালেদ সাহেব তিন্নির দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন—
—ফারুকের এখানে মোটা অঙ্কের টাকার স্বার্থ আছে। আর ডাক্তারও ওর পরিচিত। টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।
কথা বলতে বলতে তিনি কিছুক্ষণ থামলেন। ঘরের সবাই তখন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
—এখন পুরো দুনিয়ার সামনে ঘটনাটাকে সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাকে সামাজিকভাবে কবর দিতে হবে। আর সেই কবর থেকেই মাটির নিচে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করে এমন একটি ঘর বানাতে হবে, যেখানে একজন মানুষ থাকতে পারবে। মাটির নিচের ওই ঘরের সঙ্গে আমাদের বাড়িরও একটি সংযোগ থাকবে। সেই পথ দিয়েই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও প্রতিদিন দুবেলা খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি একটু থেমে আবার বললেন—
—খাবার কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস যখন যা লাগবে, আমি রাতে এসে নিয়ে যাব। তবে তোমরা কেউ ভুলেও ওই ঘরের ভেতরে যাবে না।
পরিবারের সবাই নীরবে কথাগুলো শুনল। কারও মনই পুরোপুরি সায় দিচ্ছিল না। তবু প্রত্যেকেই বুঝতে পারছিল, এই মুহূর্তে তাদের মাথার ওপর চেপে বসা অভাব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো পথ তাদের হাতে নেই।
পরদিন থেকেই নিচতলার ভাঙা, পরিত্যক্ত ঘরটাকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু হলো।
খালেদ সাহেব ফারুক সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে বরিশাল গিয়ে বীমার কাজ সেরে সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলেন। এরপর রাতের আঁধারে পরিবারের সবাই মিলে শুরু করল সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ। সামনে সময় মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই সবকিছু শেষ করতে হবে।
এভাবেই কেটে গেল চারটি মাস।
সুড়ঙ্গের প্রায় আশি শতাংশ কাজ শেষ হয়ে এসেছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই—এই সাধারণ বাড়িটির মাটির নিচে কত বিশাল এক জগত তৈরি হয়ে গেছে।
বাড়ির একটি ঘর থেকে মাটির নিচ দিয়ে প্রায় তিনশো মিটার দীর্ঘ একটি সরু পথ তৈরি করা হয়েছে। এতটাই সরু যে সেখানে একজন মানুষকে কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে পারে। সুড়ঙ্গটি শেষ হয়েছে একটি বিশাল ফাঁকা ঘরে।
ঘরটির উত্তর দিকে তৈরি করা হয়েছে একটি ছোট শোবার ঘর। দক্ষিণ দিকে মাটি খুঁড়ে কিছুটা দূরে বানানো হয়েছে একটি ছোট বাথরুম। দুটো কক্ষই মূল ঘরটির সঙ্গে যুক্ত। ওপর থেকে পানি ও বিদ্যুতের জন্য দুটি পাইপও নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘরের ভেতরে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু না হলেই নয়, শুধু ততটুকুই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি ছোট খাট, পানি রাখার জন্য মাটির কলস, পানি খাওয়ার গ্লাস এবং কয়েকটি জামাকাপড় রাখার জন্য একটি ছোট আলনা।
ঘরটির পূর্ব দিকে আরও একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় দুইশো মিটার দীর্ঘ সেই সুড়ঙ্গ গিয়ে সরাসরি যুক্ত হবে কবরের সঙ্গে।
হাতে আর মাত্র দুই মাস সময়।
এরই মধ্যে ফারুক সাহেব খালেদ সাহেবকে বুঝিয়ে দিলেন, এখন থেকে কী করতে হবে। সুড়ঙ্গের বাকি কাজটুকু বাড়ির অন্য তিনজনকেই শেষ করতে হবে। কারণ খালেদ সাহেবের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া কিংবা মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যেন কারও মনে কোনো সন্দেহ না জাগে। তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে মারা গেলেন, কবে মারা গেলেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়।
সে কারণেই আগামী পাঁচ-ছয় মাসের জন্য তাঁকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। এমন কোনো জায়গায়, যেখানে তাঁর পরিচিত কেউ নেই।
সবকিছু শুনে খালেদ সাহেব পরিবারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন—
—বাকি সুড়ঙ্গটুকু শেষ করতে পারবে না তোমরা?
ছালেহা বেগম, তিন্নি ও পলক—তিনজনই একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর একই সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তাদের চোখে ভয় ছিল, মনে ছিল অজানা আশঙ্কা। তবু সেই মুহূর্তে কেউ আর পিছিয়ে আসার কথা ভাবল না।
নির্ধারিত দিন অবশেষে এসে গেল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে হালকা কুয়াশার চাদর। দূরের গাছপালার ফাঁক দিয়ে পাখির ডাক ভেসে আসছে। অথচ খালেদ সাহেবের কাছে সেদিনের সকালটা অন্য সব সকালের চেয়ে ভীষণ ভারী মনে হচ্ছিল।
নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে আজ তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হবে।
ঠিকানাটা তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়েও নিয়েছেন। বাড়ির সবাইকে শেষবারের মতো কিছু নির্দেশনা দিয়ে তিনি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। একবার পেছন ফিরে তাকালেন।
এই বাড়ি, এই উঠোন, পরিচিত মুখগুলো—সবকিছুই আজ হঠাৎ যেন অন্যরকম লাগছে।
কেউ কিছু বলল না।
কথা বলার মতো শব্দ যেন কারও মুখে নেই।
খালেদ সাহেব ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর ধীর পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পেছনে পড়ে রইল তাঁর পরিবার।
আর সামনে—এক অজানা জীবন।
প্রায় তেরো ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রাপথ। বাসের জানালার পাশে বসে পুরোটা সময় খালেদ সাহেব কখনো বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কখনো চোখ বন্ধ করে ভাবলেন পরিবারটির কথা। বারবার মনে পড়ছিল সেই মাটির নিচের ঘরটার কথা। কয়েক মাস ধরে রাতের পর রাত যে জায়গাটা বানাতে তাঁর পরিবারের মানুষগুলো নিজেদের জীবন পর্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
তিনি কি সত্যিই আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন?
নাকি আজ থেকেই তিনি ধীরে ধীরে পৃথিবীর চোখে একজন মৃত মানুষ হয়ে যাচ্ছেন?
প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
রাতের দিকে তিনি দিনাজপুরের একটি সাধারণ হোটেলে উঠলেন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, অজানা ভবিষ্যতের চিন্তা আর বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা—সব মিলিয়ে শরীরটা যেন আর চলতে চাইছিল না।
শুধু বাড়িতে এবং ফারুক সাহেবকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন যে তিনি নিরাপদে পৌঁছেছেন।
এরপর বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই কখন ঘুমিয়ে পড়লেন, নিজেও টের পেলেন না।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে।
হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন খালেদ সাহেব। আজ থেকে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু।
ফারুক সাহেব যে ঠিকানাটা দিয়েছিলেন, সেটি ছিল একেবারে প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চলে। বলা যায়, অজপাড়াগাঁ। আশপাশে জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি।
বাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছাতেই খালেদ সাহেবের মনে হলো, জায়গাটা যেন ইচ্ছে করেই পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।
চারপাশে নানা ধরনের ফলের গাছ। নারকেল, আম, কাঁঠাল—গাছের ঘন পাতায় বাড়িটা এমনভাবে ঢাকা যে দূর থেকে তাকালে বাড়িটির অস্তিত্বই বোঝা যায় না।
আর দীর্ঘদিন কেউ এখানে বসবাস না করায় চারপাশ আগাছায় ভরে গেছে। কোথাও কোমরসমান ঘাস, কোথাও লতাগুল্ম উঠে দেয়াল পর্যন্ত ঢেকে ফেলেছে। বাতাসে শুকনো পাতার মৃদু খসখস শব্দ। মাঝে মাঝে অচেনা কোনো পাখি হঠাৎ ডেকে উঠছে।
বাড়ির সামনে বেশ বড় একটি উঠোন।
উঠোন পেরোলেই একটি পুকুর।
পুকুরের পানি স্থির। চারপাশের গাছপালার ছায়া পড়ে পানিটাকে আরও কালচে দেখাচ্ছে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পানির নিচে যেন কিছু একটা নিঃশব্দে অপেক্ষা করে আছে।
খালেদ সাহেব পকেট থেকে চাবিটা বের করলেন।
চাবিটা হাতে নিতেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
এই বাড়িতে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে কয়েক মাসের নিঃসঙ্গ জীবন।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।
দরজার সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর চাবি ঢুকিয়ে তালাটা খুললেন।
কড়কড়ে শব্দ করে দরজা খুলে গেল।
ভেতর থেকে একটা স্যাঁতসেঁতে, পুরোনো গন্ধ বেরিয়ে এল।
খালেদ সাহেব নাক কুঁচকে ভেতরে ঢুকলেন।
বাড়িটা মাটির তৈরি। ওপরে টিনের চালা। টিনগুলো বহুদিনের পুরোনো। একদিকে একটি বড় নারকেলগাছের ডগা ভেঙে পড়ে টিনের চালার একটা অংশ চেপে রেখেছে। চালের বিভিন্ন জায়গায় জং ধরে ছোট ছোট ছিদ্র হয়েছে। বৃষ্টির পানি ঢোকার দাগও স্পষ্ট।
দুটি ঘর।
প্রথম ঘরটিতে একটি পুরোনো কাঠের চৌকি। তার পাশে বিশাল একটি কাঠের আলমারি। কাঠে ঘুণ ধরেছে, দরজার একপাশ সামান্য বেঁকে আছে।
অন্য ঘরটিতে পুরোনো থালা-বাসনসহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তুলে রাখা হয়েছে। মনে হয়, বছরের পর বছর কেউ সেগুলো ছুঁয়েও দেখেনি।
মেঝের বিভিন্ন জায়গায় ইঁদুরের গর্ত।
একটি গর্তের পাশ দিয়ে শুকনো মাটি ছড়িয়ে আছে। কোথাও কোথাও পুরোনো জালের মতো মাকড়সার জাল ঝুলছে। ছাদের ফাঁক দিয়ে আসা সরু একফালি আলো ঘরের ধুলোমাখা বাতাসে স্থির হয়ে আছে।
খালেদ সাহেব ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।
চারপাশে তাকালেন।
কেউ নেই।
কোনো কোলাহল নেই।
কোনো পরিচিত মুখ নেই।
শুধু নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ তাঁর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
এতদিন তিনি ভেবেছিলেন, পরিবারকে বাঁচানোর জন্য এই পরিকল্পনা তাঁর একমাত্র পথ। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হলো—তিনি যেন শুধু বাড়ি থেকে নয়, নিজের জীবন থেকেই নির্বাসনে এসেছেন।
জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি।
দূরে বিশাল মাঠ।
তারও ওপারে কয়েকটি গাছ।
আর কোথাও কোনো মানুষ নেই।
খালেদ সাহেবের মনে হলো, পৃথিবীটা যেন তাঁকে ভুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি ধীরে ধীরে কাঠের চৌকির ওপর বসলেন।
কাঠটা তাঁর ভারে কেঁপে উঠল।
চোখ বন্ধ করলেন তিনি।
মনে হলো, যেন শত জীবনের অভিশাপ এসে এক জীবনের ওপর জমা হয়েছে।
আর সেই জীবনের নাম—খালেদ সাহেব।
চলবে....
পরবর্তী পর্বের জন্য পেইজে কানেক্ট থাকুন।।