17/06/2026
যুদ্ধের প্রভাব ও যুদ্ধ-পরবর্তী ইসলাম গ্রহণ: সত্যের আলোয় সাহাবীদের প্রত্যাবর্তনঃ-
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কী জীবনে দীর্ঘ ১৩ বছর শান্তিপূর্ণভাবে দাওয়াত দেওয়ার পরও আরবের বড় একটি অংশ কুফর ও হঠকারিতায় লিপ্ত ছিল。 কিন্তু মাদানী জীবনে যখন একের পর এক যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হতে শুরু করে, তখন আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। যুদ্ধগুলো কাফেরদের মনে একদিকে যেমন মুসলিমদের শক্তির ব্যাপারে ভীতি ও সমীহ তৈরি করেছিল, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর অলৌকিকত্ব, ইনসাফ ও যুদ্ধবন্দীদের প্রতি মানবিক আচরণ তাদের অন্তরকে গলিয়ে দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, অধিকাংশ বড় বড় যুদ্ধ বা বড় কোনো বিজয়ের পর কাফেররা দলে দলে কুফুরী ছেড়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন।
* বিভিন্ন যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবীবৃন্দ যাদের কয়েকজনের নাম শুধু দিচ্ছি এখানে। যুদ্ধের মাঠেও ইসলাম গ্রহন করেছিলেন যিনি তার বর্ননাও শেষে তুলে ধরলাম সবাই পড়ে নিয়েন যেহেতু লেখাটা একটু লম্বাই হয়ে গেছে।
** বদর যুদ্ধের (২ হিজরি) পর ইসলাম গ্রহণ:
বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের অলৌকিক বিজয় মক্কার কুরাইশদের অহংকার ভেঙে চুরমার করে দেয়। এই যুদ্ধের প্রভাবে অনেকেই ইসলামের সত্যতা অনুধাবন করেন।
১/ উমাইর ইবনুল ওয়াহাব (রা.): তিনি রাসুল (সা.)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মদিনায় এসেছিলেন, কিন্তু বদর যুদ্ধের পর রাসুল (সা.)-এর অলৌকিক জ্ঞান দেখে তিনি মুসলিম হন।
২/ জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.): বদরের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে এসে রাসুল (সা.)-এর মুখে মাগরিবের নামাজে সূরা তূরের তিলাওয়াত শুনে তাঁর অন্তর ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
৩/ আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.): রাসুল (সা.)-এর আপন চাচা, যিনি বদর যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের আগেই প্রকাশ্য ইসলাম গ্রহণ করেন।
** ওহুদ ও খন্দক যুদ্ধের (৩ ও ৫ হিজরি) পর ইসলাম গ্রহণঃ-
এই যুদ্ধগুলোর রণকৌশল এবং মুসলিমদের ধৈর্য দেখে আরবের শ্রেষ্ঠ সেনানায়করা প্রভাবিত হন।
১/ খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.): ওহুদ ও খন্দকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও পরবর্তীতে হুদায়বিয়ার সন্ধি ও খাইবার যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ইসলামের সত্যতা বুঝতে পেরে মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।
২/ আমর ইবনুল আস (রা.): আরবের অন্যতম কূটনীতিবিদ, যিনি খালিদ বিন ওয়ালিদের সাথেই মদিনায় এসে রাসুল (সা.)-এর হাতে বাইয়াত নেন।
৩/ উসমান ইবনে তালহা (রা.): কাবার চাবির রক্ষক, যিনি এদের সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
** খাইবার যুদ্ধের (৭ হিজরি) পর ইসলাম গ্রহণঃ- খাইবারের শক্তিশালী ইহুদি দুর্গগুলোর পতন আরবের বেদুইন ও অন্যান্য কাফেরদের মনে বিশাল প্রভাব ফেলে।
১। হাজ্জাজ ইবনে ইলাত আস-সুলামী (রা.): খাইবার বিজয়ের দৃশ্য সশরীরে দেখে মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।
** মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধের (৮ হিজরি) পর ইসলাম গ্রহণঃ- মক্কা বিজয় ও হুনাইনের যুদ্ধ ছিল আরবে কুফুরীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত অধ্যায়। এই সময় আরবের সবচেয়ে বড় বড় কাফের নেতারা ইসলাম গ্রহণ করেন।
১/ আবু সুফিয়ান ইবনে হারব (রা.): কুরাইশদের প্রধান নেতা, যিনি মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে সেনাবহরের বিশালত্ব দেখে আত্মসমর্পণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
৩/ ইকরিমাহ ইবনে আবি জাহল (রা.): ইসলামের চরম শত্রু আবু জাহলের ছেলে। মক্কা বিজয়ের পর লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেলেও রাসুল (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমার কথা শুনে ফিরে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
৪/ সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া (রা.): মক্কার অন্যতম নেতা, যাকে রাসুল (সা.) হুনাইনের যুদ্ধের পর বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করেন, যা দেখে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
৫/ সুহাইল ইবনে আমর (রা.): হুদায়বিয়ার সন্ধিতে কাফেরদের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী বক্তা, মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন।
৬/ হাকিম ইবনে হিযাম (রা.): খাদিজা (রা.)-এর ভাতিজা এবং মক্কার প্রবীণ নেতা, মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।
৭/ মালিক ইবনে আউফ (রা.): হুনাইন যুদ্ধে কাফেরদের সেনাপতি ছিলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের পর রাসুল (সা.)-এর উদারতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।
** এ সকল প্রাসঙ্গিক যুদ্ধ ও বিজয়ের পর মানুষের দলে দলে ইসলামে প্রবেশের বিষয়টি আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:
১. সূরা আন-নাসর (আয়াত: ১-২): وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا - إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন,
মুফাসসিরিন গন ব্যাপারে যা বলেছেন - আয়াতটি মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়, যার পর আরবের গোত্রগুলো যুদ্ধের ভয় ও মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে)।
২. সূরা আল-আনফাল (আয়াত: ৭০): يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِمَنْ فِي أَيْدِيكُمْ مِنَ الْأَسْرَى إِنْ يَعْلَمِ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِمَّا أُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
"হে নবী, তোমাদের হাতকড়া পরা যুদ্ধবন্দীদের বলে দাও, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কোনো কল্যাণ (ঈমান) দেখেন, তবে তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে (মুক্তিরপণ), তার চেয়ে উত্তম কিছু তোমাদের দান করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন।"
** এ প্রাসঙ্গিক হাদিসে যা পাওয়া যায় !
১. সহীহ বুখারী (হাদিস নং- ৪৩৫৭): عَنْ عَمْرِو بْنِ سَلَمَةَ قَالَ: ... وَكَانَتْ أَحْيَاءُ الْعَرَبِ تَلَوَّمُونَ بِإِسْلَامِهِمْ الْفَتْحَ، فَيَقُولُونَ: اتْرُكُوهُ وَقَوْمَهُ، فَإِنَّهُ إِنْ ظَهَرَ عَلَيْهِمْ فَهُوَ نَبِيٌّ صَادِقٌ، فَلَمَّا كَانَتْ وَقْعَةُ أَهْلِ الْفَتْحِ بَادَرَ كُلُّ قَوْمٍ بِإِسْلَامِهِمْ. (صحيح البخاري:
আমর ইবনে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আরবের লোকেরা তাদের ইসলাম গ্রহণকে মক্কা বিজয়ের ওপর স্থগিত রাখত। তারা বলত, 'তাকে (মুহাম্মদকে) এবং তার কওমকে ছেড়ে দাও। তিনি যদি তাদের ওপর বিজয়ী হন, তবে তিনি সত্য নবী।' অতঃপর যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটল, তখন প্রত্যেক গোত্রই ইসলাম গ্রহণে তাড়াহুড়ো করতে লাগল।"
২. সহীহ বুখারী (হাদিস নং- ৪৬৯): عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْلًا قِبَلَ نَجْدٍ، فَجَاءَتْ بِرَجُلٍ مِنْ بَنِي حَنِيفَةَ يُقَالُ لَهُ ثُمَامَةُ بْنُ أُثَالٍ، فَرَبَطُوهُ بِسَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَطْلِقُوا ثُمَامَةَ». فَانْطَلَقَ إِلَى نَخْلٍ قَرِيبٍ مِنَ الْمَسْجِدِ، فَاغْتَسَلَ ثُمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ، فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ. (صحيح البخاري: ৪৬৯)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) নজদ অভিমুখে এক অশ্বারোহী দল পাঠান। তারা সুমামাহ ইবনে উছাল (ইয়ামামার বনু হানিফা গোত্রের প্রধান) নামক এক ব্যক্তিকে বন্দী করে নিয়ে আসে এবং মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। রাসুল (সা.) তার সাথে উত্তম আচরণ করেন এবং পরে তাকে বিনাশর্তে মুক্ত করে দেন। এই যুদ্ধবন্দী অবস্থা এবং মুসলিমদের আচরণ দেখে সুমামাহ পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।
যুদ্ধ পরবর্তী যারা ইসলাম গ্রহন করেছিলেন তারা মূলত যুদ্ধের প্রভাবেই ইসলাম গ্রহন করেছেন। যুদ্ধের মাঠেও যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও একজন সাহাবী ইসলাম গ্রহন করেছেন। হাদিসে এসেছে এমনঃ-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ: حَدِّثُونِي عَنْ رَجُلٍ دَخَلَ الْجَنَّةَ لَمْ يُصَلِّ صَلَاةً قَطُّ؟ فَإِذَا لَمْ يَعْرِفْهُ النَّاسُ سَأَلُوهُ: مَنْ هُوَ؟ فَيَقُولُ: أُصَيْرِمُ بَنِي عَبْدِ الأَشْهَلِ عَمْرُو بْنُ ثَابِتِ بْنِ وَقْشٍ. (رواه أحمد وحسنه ابن حجر)
আবু হুরায়রা (রা.) [লোকদের পরীক্ষামূলকভাবে] বলতেন, "তোমরা কি আমাকে এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে বলতে পারো, যে কখনো এক ওয়াক্ত নামাজ না পড়েই জান্নাতে প্রবেশ করেছে?" লোকেরা যখন তাঁকে চিনতে পারত না, তখন তারা জিজ্ঞেস করত, "তিনি কে?" আবু হুরায়রা (রা.) বলতেন, "তিনি হলেন বনু আব্দুল আশহাল গোত্রের 'আছীরাম'— আমর ইবনে ছাবিত বিন ওয়াকশ।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩৪, হাফেজ ইবনে হাজার একে হাসান বলেছেন)
যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর শাহাদাত ও রাসূল (সা.)-এর ঘোষণা
ওহুদ যুদ্ধ শেষে বনু আব্দুল আশহাল গোত্রের লোকেরা যখন রণক্ষেত্রে তাদের নিহত ও আহতদের খুঁজছিল, তখন তারা হঠাৎ আছীরামকে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাতে দেখে। তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুমি এখানে কেন? গোত্রের প্রতি টানে (জাতীয়তাবাদে) নাকি ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় যুদ্ধ করতে এসেছ?" আছীরাম চোখ খুলে বললেন, "না, বরং ইসলামের ভালোবাসায়। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং তলোয়ার নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে যোগ দিয়েছি। এখন আমি এই আঘাতে মারা যাচ্ছি।" এরপরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাহাবীরা যখন এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানালেন, তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক এই ঘোষণাটি এমন ভাবে দেন:
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّهُ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ» وفي رواية: «عَمِلَ قَلِيلاً وَأُجِرَ كَثِيرًا».
রাসূলুল্লাহ (সা.) [তাঁর কথা শুনে] বললেন: "নিশ্চয়ই সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।" অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, "সে আমল করেছে খুব সামান্য, কিন্তু প্রতিদান পেয়েছে বিশাল।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৮০৮)
সাম্প্রতিক একটা বক্তব্য শুনলাম যা শুনে সত্যি আমাদের মত নালায়েকদের অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এমন একজন বিজ্ঞ মানুষ কেমনে এমন ভুলবাল বক্তব্য দিতে পারেন। এতে করে তো পরোক্ষা ভাবে বাতেলকেই সহযোগীতা করা হয়ে যাচ্ছে। কারণ কোন একদিন দেখবেন বাতেল সম্প্রদায় এই বক্তব্যকেই তারা দলিল বানাবে। তখন কিন্তু কারও কিছু বলার থাকবে না। পরবর্তীতে যেন কারও মুখ থুবড়ে পরে না যায় সেজন্য প্রত্যেক বক্তব্যই সার্বিক দিন বিবেচনা করেই দেওয়া উচিৎ। আল্লাহ সবাই সঠিক বুঝ দান করুন।
তৈয়িবী-গাজীপুর