10/07/2023
তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসে দেখা যায়, ‘চোর-ডাকাতের বংশের ছেলে’ নিতাইচরণ আচমকা ‘কবি হইয়া গেল’। লেখকের ভাষায় ‘এ দস্তুরমতো বিস্ময়কর ঘটনা’।
নিতাইচরণের সঙ্গে নুরুল হক নুরের অমিল হলো, তিনি নিতাইয়ের হঠাৎ কবি হওয়ার মতো আচমকা নেতা হননি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর থেকে কমপক্ষে ২০ বার ছাত্রলীগের হাতে মার খেয়ে; পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে, আবার পড়ে আবার দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতা হয়েছেন। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
নেতা নুরের আত্মপ্রকাশের মধ্যে নিতাইয়ের রাতারাতি কবি হওয়ার মতো ততটা আকস্মিকতা ছিল না—এটি ঠিক। কিন্তু নুর যে কায়দায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন, তা নিতাইয়ের ফট করে কবি হয়ে ওঠার মতোই ‘দস্তুরমতো বিস্ময়কর ঘটনা’।
নুর পটুয়াখালীর গলাচিপার কৃষক মো. ইদ্রিস হাওলাদারে ছেলে। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
খবরের কাগজের প্রতিবেদন বলছে, নুর যখন ২০১৯ সালে ডাকসুর ভিপি হন, তখনো এত বড় সংসারের ঘানি টানতে তাঁর বাবা কৃষিকাজ করার পাশাপাশি উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নের একটি বাজারে চায়ের দোকান চালাতেন। মূলত এ দোকানের আয় দিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। তাঁর দুই ভাই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় কলা বিক্রি করতেন।
আন্দোলনের মাঠে নুরের গায়ে প্রথম দিকে সাধারণ জামা দেখা যেত। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর সেই জামার জায়গায় আটপৌরে দ্যোতনাহীন সাধারণ সুতির পাঞ্জাবি দেখা গেল। একই পাঞ্জাবি গায়ে তাঁকে অনেক দিন দেখা যেত।
অর্থাৎ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণেরা যে নুরুল হককে নেতা হিসেবে সমীহ করেছে, ভালোবেসেছে, বিশ্বাস করেছে; সেই নুরুল হক একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান, সেই নুরুল হকের চেহারা-ছবিতে বাবুয়ানা মার্কা মাখোমাখো লালটু ভাব নেই, সেই নুরুল হকের শরীরী ভঙ্গিমায় সরকারবিরোধী দৃঢ় দ্রোহ থাকলেও সহযোদ্ধাদের প্রতি ঔদ্ধত্য নেই; সেই নুরুল হকের পোশাক–পরিচ্ছদে কোনো ব্যয়বহুল আভিজাত্যের ফোড়ন নেই।
তবে ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়’—এই থিওরি মেনে নুরুল হকের মধ্যে বিবর্তন দেখা গেছে। সোজাসাপ্টা ভাষায় ‘গোঁয়ারের’ মতো দরাজ গলায় প্রতিবাদমুখর দাবি তোলা আন্দোলনকর্মী থেকে মেপে মেপে অতি সতর্কতাপূর্ণ চালাকির সঙ্গে কথা বলতে শিখে যাওয়া রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন তিনি।
নুরুল হক বাংলাদেশের বাস্তবতায় বর্তমানে একজন বেশ সচ্ছল মানুষ। তিনি একা সচ্ছল নন। তাঁর পুরো পরিবার বেশ সচ্ছল হয়ে উঠেছে। এই সচ্ছলতা এসেছে গত দুই থেকে আড়াই বছরে।
প্রথম আলোর পটুয়াখালী প্রতিনিধি, নুরুল হকের এলাকা চরবিশ্বাসী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, দুই বছর আগে নুরুল হকের বাবা গ্রামে যে দোকানটি চালাতেন, সে দোকান তিনি এখন আর চালান না। দোকানটি তাঁরা ভাড়া দিয়েছেন। নুর যখন ডাকসুর ভিপি হন, তখন তাঁদের মাটির মেঝের টিনের ঘর ছিল, এখন সেখানে একটি বিল্ডিং উঠেছে। নুরুল হকের দুই ভাই ছোট্ট দোকান চালাতেন, এখন তাঁরা বেশ বড় ব্যবসায়ী।
গণ অধিকার পরিষদের একজন প্রথম সারির নেতা বলেছেন, যে গাড়িটি নুরুল হক ব্যবহার করেন, সেটির মালিক তাঁর (নুরুল হকের) একজন আত্মীয় বলে প্রথম দিকে নুরুল হক দাবি করেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেছেন, ২০২১ সালে গাড়িটি তিনি কিস্তিতে ২৬ লাখ টাকায় কিনেছেন।
আমাদের মনে থাকার কথা, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার যখন প্রতিদিন নতুন নতুন ডিজাইনের দামি দামি পাঞ্জাবি পরে বিবৃতি দেওয়া শুরু করেছিলেন, তখন এসব পাঞ্জাবির উৎস কী বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। এই গুঞ্জন অতি স্বাভাবিক। কারণ, তখন গণজাগরণ মঞ্চ যে চেতনার কথা বারবার বলছিল, তার সঙ্গে ইমরান এইচ সরকারের নিত্যনতুন পাঞ্জাবি প্রদর্শন মিল খাচ্ছিল না।
ঠিক একইভাবে নুরুল হক নুরের বেশভূষা ও শারীরিক ভাষায় একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি তাঁকে যে ফ্যাশনদুরস্ত এবং দামি পরিচ্ছদে দেখা যাচ্ছে, তা তাঁকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে অচেনা করে তুলছে। পোশাকে-চেহারায় তাঁকে এখন আর আগের মতো খেটে খাওয়া মানুষের কাছের মানুষ মনে হয় না।
খেয়াল করতে হবে, নুরুল হক তাঁর উপার্জনের যে উৎসগুলোর কথা বলেছেন, তার জন্য একটা প্রাথমিক পুঁজির দরকার হয়। রাজধানীতে কোনো কোম্পানির ডিলারশিপ নিতে জামানত হিসেবে যে অর্থের প্রয়োজন, তা আচমকা জোগাড় করা কঠিন। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা বলছে, সেই পুঁজি জোগাড় মাত্র দুই বছরের মধ্যে। নুরুল হকের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার সময়কালের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে এই সময়কাল মিলে যাচ্ছে।
নুরুল হক তাঁর অর্থের উৎসের যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে আমাদের প্রথাগত দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও রাজনীতিকদের ব্যাখ্যার মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত দেখা যাচ্ছে না। প্রায়ই আমরা প্রভাবশালী আমলা ও রাজনীতিকদের ভাই, ভাগ্নে, শ্যালকদের আচমকা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি। তাঁদের মধ্যে বিশেষ করে মাছের খামার করার প্রবণতা খুবই সাধারণ।
জীবনযাপনের ধরনে, পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনে তিনি নিজের গায়ের সেই গৌরবময় ‘গরিবি গন্ধ’ মুছে ফেলতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ক্রমেই তিনি ‘অভিজাত’ হয়ে উঠতে চাইছেন। ভাগ্য খুলছে। তাঁর চেহারায়-পোশাকে পরিবর্তন আসছে। তাঁর ভাই-বোন-ভগ্নিপতি-শ্যালকদেরও ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি বদলাচ্ছেন আর দলের কর্মী-সমর্থকেরা মনে মনে বলছেন, ‘এ কোন নুর? একে তো আমরা চিনি না।’
লিখেছেন: সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
#ভিপিনুর