24/08/2026
একটা ফোন… নাকি তার চেয়েও বড় কিছু?
একটা দামি ফোন।
একটা কিস্তি।
একটা বাবার সঙ্গে ঝগড়া।
তারপর পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে এক তরুণ।
ঘটনাটা এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষটা হয়েছিল এমন, যা কোনো পরিবার কখনো কল্পনাও করতে পারে না।
একটি ছোট্ট চাওয়া কীভাবে ধীরে ধীরে একজন মানুষের কাছে এত বড় হয়ে উঠতে পারে যে, সে নিজের জীবনকেই তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে?
ঘটনাটি আমাদের থমকে দিয়ে একটা প্রশ্ন করে যায়—
আমরা কি সন্তানকে জিনিসের মূল্য শেখাচ্ছি, নাকি জিনিস দিয়ে নিজের মূল্য মাপতে শেখাচ্ছি?
অনেক সময় সন্তান যখন বলে, “আমারও এটা চাই”, আমরা শুধু তার চাওয়াটাই দেখি। কিন্তু সেই চাওয়ার পেছনে কী আছে, সেটা দেখি না।
হয়তো বন্ধুরা সবাই নতুন ফোন ব্যবহার করছে।
হয়তো কেউ তার পুরোনো ফোন নিয়ে হাসাহাসি করেছে।
হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন সে এমন একটা জীবন দেখছে, যেটাকে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করছে।
তখন একটা ফোন আর শুধু ফোন থাকে না।
সেটা হয়ে যায়—গ্রহণযোগ্যতা, আত্মসম্মান, বন্ধুদের মধ্যে নিজের অবস্থান এবং ‘আমি অন্যদের মতো কি না’—তার প্রতীক।
এখানেই বাবা-মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে সবকিছু দিয়ে বড় করবেন না। আবার এমনও করবেন না যে তার প্রতিটি চাওয়াকে অকারণে দমন করতে হবে।
তাকে শেখান পরিমিতিবোধ।
সে কোনো কিছু চাইলে বলুন—
“তোমার জিনিসটা ভালো লেগেছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এখনই হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা চাইলে পরিকল্পনা করে পরে নিতে পারি।”
এই কথার মধ্যে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনই আছে সীমারেখা।
সন্তানকে অপেক্ষা করতে শেখান।
সঞ্চয় করতে শেখান।
নিজের সামর্থ্য বুঝতে শেখান।
কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা শুধু মুহূর্তের আবেগ—সেটার পার্থক্য বুঝতে শেখান।
কারণ চাওয়া মাত্র সবকিছু পেয়ে গেলে সন্তান হয়তো পাওয়ার আনন্দটা বুঝবে, কিন্তু অপেক্ষা, ধৈর্য আর না-পাওয়াকে সামলানোর শক্তিটা শিখবে না।
আবার প্রতিটি চাওয়ায় “না” শুনতে শুনতে তার ভেতরেও জমে যেতে পারে এক ধরনের অভিমান, বঞ্চনা আর হাহাকার।
তাই সন্তানকে না হয় বলুন, কিন্তু তাকে ছোট করবেন না।
“তুই এত লোভী কেন?”
“অমুকের ছেলে তো এসব চায় না।”
“তোর এত কিছু দরকার কী?”
এসব কথা সন্তানের সমস্যার সমাধান করে না। বরং তাকে বাবা-মায়ের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
আমাদের পরিবারে তাই একটা বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করি—চাওয়া প্রকাশ করা যাবে, কিন্তু চাওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া নয়।
কোনো কিছু সত্যিই ভালো লাগলে সন্তান সেটা বলতে পারবে। তারপর আমরা দেখি সেটা তার জন্য প্রয়োজনীয় কি না, আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে আছে কি না এবং এখন কিনলে পরিবারের স্বাভাবিক বাজেটে চাপ পড়বে কি না।
প্রয়োজনে একটা সময় ঠিক করি।
অপেক্ষা করতে হয়—
সেটা সে শিখবে।
কিছু পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হয়—
সেটাও সে শিখবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অন্যকে দেখানোর জন্য কিছু করার প্রয়োজন নেই—এই বোধটাও তার মধ্যে তৈরি হবে।
কারণ ব্র্যান্ড মানুষকে বড় করে না। দামি জিনিস মানুষকে মূল্যবান করে না।
আমরা বড়রাই যখন অন্যের বাড়ি, গাড়ি, পোশাক, গয়না, ফোন কিংবা জীবনযাপন দেখে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করি, তখন সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা কিছু আশা করার সুযোগ খুব কম।
তারাও শিখে যায়—
“ওর কাছে আছে, আমারও চাই।”
“ওর জীবন সুন্দর, আমারটা কেন নয়?”
“আমার কাছে এটা নেই, তাই আমি কম।”
এই তুলনাটাই ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
Peer pressure তাকে বন্ধুদের মতো হতে বাধ্য করতে পারে।
Social comparison তাকে নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট করতে পারে।
Status anxiety তাকে ভাবাতে পারে—কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ছাড়া তার সম্মান নেই।
আর নিজের মূল্য যদি ধীরে ধীরে “আমার কী আছে” দিয়ে নির্ধারিত হতে থাকে, তাহলে ছোট একটা প্রত্যাখ্যানও কখনো কখনো তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
তাই সন্তানকে শুধু ভালো স্কুল, ভালো পোশাক, ভালো ফোন আর ভালো জীবন দেওয়ার চিন্তা করবেন না।
তার সঙ্গে কথা বলুন।
তার না-পাওয়ার কষ্ট শুনুন।
তার রাগকে বুঝতে চেষ্টা করুন।
তার হতাশাকে তুচ্ছ করবেন না।
তাকে বোঝান—জীবনে “না” আসবেই, কিন্তু একটা “না” তার জীবনকে ছোট করে দেয় না।
সন্তানকে অভাবের ভয় দেখিয়ে বড় করার দরকার নেই।
আবার অতিরিক্ত বিলাসিতার মধ্যেও বড় করার দরকার নেই।
তাকে এমনভাবে বড় করুন, যেন সে জানে—
“আমার যা আছে, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
যা চাই, তার জন্য আমি অপেক্ষা করতে পারি।
আর যা এখন আমার সামর্থ্যের বাইরে, সেটা না পেলেও আমি ছোট হয়ে যাই না।”
হয়তো এটাই সন্তানের জন্য আমাদের দেওয়া সবচেয়ে দামি শিক্ষাগুলোর একটি। ❤️