31/12/2025
--"শুনলাম কেউ নাকি ঐ মেয়েটাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে চাচ্ছে। বিষয়টা কি সত্যি? "
বিশাল বড় এক আধুনিক বিল্ডিং। বিল্ডিং টার মতোই এই বাড়ির রুম গুলোও সুবিশাল আর আধুনিক ধাঁচের তৈরি। আধুনিক তো হবেই বিদেশের মাটিতে এই বাড়িটা সবার চোখ কাড়তে সক্ষম। এলাকা জুড়ে এটাই একমাত্র বাড়ি যেটা আসে পাশের বাড়ি গুলোর থেকে অনেকটা আলাদা। তবে এই বাড়িটার নিজস্ব সৌন্দর্য থেকে বাড়ির ভিতরের বসবাস করা মানুষটার পরিচিতিতে মানুষের মন যেন একটু বেশিই আকর্ষিত হয় । সেই বিশাল বাড়ির বিশাল ডাইনিং রুমে সকালের ব্রেকফাস্ট করতে ব্যস্ত বাড়ির সকলে।তবে এই মুহূর্তে বাড়ির বড় ছেলের মুখে এমন কথা শুনে শুধু একজন ছাড়া বাকি দুজনের খাবার আটকে গেলো গলায়। বেশ বড়োসড়ো এক কাঁচের ডাইনিং টেবিল যেখানে বসে আছে ৪ জন সদস্য। কাজের মেয়ে দুটো খুব সপ্তপর্ণে টেবিলের উপর খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। যেনো উনিশ থেকে বিশ হলেই আর রক্ষে নেই তাঁদের। টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস টা চেয়ারে বসে খাবার খেতে থাকা আসফিয়া হাতে তুলে নিলো। অতঃপর ঢকঢক করে পুরো অর্ধেক গ্লাসের পানি শেষ করে ফেললো এক নিমিষেই। যেনো এখান থেকে পালিয়ে যেতেই বেঁচে যায় মেয়েটা। আড় চোখে মায়ের দিকে একবার তাকালো আসফিয়া । রাবেয়া বেগম পুরো মনোযোগে খাবার খেতে ব্যস্ত। অতঃপর তাকালো বরাবর বসে প্রশ্ন করা ব্যক্তিটির উপর । সেও ঠিক নিজের আয়েসেই হাফ ভয়েল ভেজিটেবলস গুলো চিবুতে ব্যস্ত। তবে তার প্রশ্নের যথাযত উত্তর না পাওয়াতে বোধহয় কিছুটা তেতে উঠলো প্রশ্ন করা ব্যক্তিটি। পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ে বললো,
--"কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি? " অপেক্ষা জিনিস টা বরাবরই আমার অপছন্দের লিস্টে। "
নিত্যল সমুদ্রের মতো গভীর কণ্ঠসর। যেন এই মানুষটা জন্মগত ভাবেই এমন শান্তশিষ্ট স্বভাবের। রাগ তার ব্যক্তিত্বর সাথে যায়না। এবারও ছেলের মুখের এমন কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা রাবেয়া বেগম এর। তবে বড় ভাইয়ের মুখে এমন মৃদু কণ্ঠস্বরটা শুনেও থরথড়িয়ে কাঁপতে লাগলো আসফিয়া। এবং ঠিক তার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধা লোকটি ও।
--"আসফিয়া বলে দাও তোমার ভাইকে ঐ মেয়ের একটা নাম আছে। মার্জিত ভাবে কথা বলতে না পারলে যেন আগ বাড়িয়ে আর কোনো কথা বলতে না আসে।"
হাতে থাকা কাঁ"টা চামুচ টা দিয়ে হাফ ভয়েল শাকসবজি কাটছে তার ভাই । মায়ের কথা খুব স্পষ্ট ভাবেই কর্ণগোচর হলো তার। কাঁটা চামুচে লেটুস পাতা গুলো বিধিয়ে খোপ করে মুখে তুলে নিলো ব্যক্তিটি। অতঃপর মায়ের দিকে চেয়ে রাশ ভারী স্বরে বললো,
--"ঐ মেয়ে এই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। ব্যস এটাই শেষ কথা। "
সোজাসাপ্টা জবাব। বলেই পুনরায় আগের ন্যায় খাবার খেতে ব্যস্ত হয়ে পরলো লোকটি। এদিকে এতক্ষন ধরে খাবারে মনোনিবেশ করলেও এবার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না রাবেয়া বেগম। খাবারের প্লেটটা হালকা ধাক্কা মেরে কিছুটা দূরে সরিয়ে তেতে উঠলেন চেয়ার থেকে। অতঃপর তার বরাবর থাকা মানবটির দিকে চেয়ে পুনরায় ফেরফের করে বলে উঠলেন,
--"এটা আমার স্বামীর বাড়ি । কারো পাপের টাকায় কিনা বাড়ি নয়। এই বাড়িতে আমি যাকে খুশি নিয়ে আসবো। আমাকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা কারো নেই। "
অতঃপর খাবার চিবানো থেমে গেলো লোকটির। কাঁ"টা চামুচ টা আস্তে ধীরে নিঃসব্দে প্লেটের উপর রেখে চেয়ারে বসেই মায়ের দিকে শান্ত কণ্ঠে শুধালো,
--"মাসে দু একবার বাড়িতে আসাটাও বোধহয় কারো সহ্য হচ্ছেনা। বাড়িতে একবারে না আসার পায়তারা করছে সবাই মিলে। তাও আবার সামান্য একটা মেয়ের জন্য। হাহ!"
--"তোমাকে কেউ রিকোয়েস্ট করে আসতে বলেনি বাড়িতে। তোমার মন মর্জি মতোই তুমি চলো। আর তোমার ঐ পাপিষ্ঠ চেহারা আর শরীর দুটোই এই বাড়ির থেকে দূরে থাকলেই আমরা বাঁচি। "
---"বাহ্। বাইরের একটা মেয়ে আসতে না আসতেই এখনই ছেলেকে পর করে দিচ্ছেন মিসেস রাবেয়া খাতুন ওয়াহিদ? "
--"ওও কোনো বাইরের মেয়ে নয়। আর ভুলে যেয়োনা আমার বোনের মেয়ে হওয়া ছাড়াও ওর আরেকটা পরিচয় আছে। তুমি স্বার্থপরের মতো সম্পর্কের কথা ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি। মনে রেখো শী ইজ ইউর ওয়া...
এতক্ষন নিজেকে ধমিয়ে রাখতে পারলেও এবার আর নিজেকে সংযত করে রাখতে পারলোনা রাবেয়া বেগমের অপোজিটে বসে থাকা মানবটি। রাগে অনবরত ফুসছে। তার সামনে উঁচু সরে কথা বলা পছন্দ নয় তার। ঠিক এই মুহূর্তে তার মায়ের জায়গায় অন্য কেউ হলে তার কি পরিণতি হতো ভেবেই হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টি বদ্ধ করে নিলো তৎক্ষণাৎ। মা দেখে এতক্ষন এভাবে সহ্য করে গেছে সে । নাক টেনে বড় করে এক শ্বাস নিলো। অতঃপর আচানক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সেখান থেকে। আকস্মিক উঠাতে চেয়ার টাও উল্টিয়ে পরলো পিছনে। হাতের শিরা গুলো স্পষ্ট বিদ্যমান । ফর্সা গায়ের রঙে নীল রঙা শিরা গুলো ভেসে ভেসে উঠছে। রাগে ফুসতে ফুসতে মায়ের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় শাসানোর ন্যায় বলে উঠলো,
--"ঐ দু'টাকার মেয়ের সাথে আমাকে জড়ানোর চেষ্টা ভুলেও করোনা মম। হেতে বিপরীত না হয়ে যায় আবার। আমি ঐ মেয়েকে কক্ষনোই মেনে নিবোনা। এন্ড দিস ইজ মাই ফাইনাল ডিসিশন!"
--"তোমাকে মেনে নিতে বলেছে কে শুনি। ও এখানে তোমার পরিচয়ে নয় আমার মেয়ের পরিচয়ে থাকবে। ঠিক আসফিয়ার মতোই। মাঝে মাঝে নিজের করা কাজে নিজেই খুব অনুতপ্ত হই।তোমার মতো একটা অমানুষ এর সাথে আমার ফুলের মতো পবিত্র মেয়েটাকে কি মনে করে জড়িয়েছিলাম। আরেহ ওতো এই সম্পর্কে কিছু জানেওনা। "
মায়ের মুখের এমন কথায় রাগটা যেনো আরো জেকে বসলো সমগ্র মস্তিস্ক জুড়ে। নিজেকে শান্ত রাখার যথাযত চেষ্টা চালাচ্ছে সে। মনতো চাচ্ছে সবকিছু তছনছ করে দিতে। অতঃপর পুনরায় দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,
--"ঐ মেয়ে এখানে আসুক বা জাহান্নামে যাক আই ডোন্ট কেয়ার, তবে ভুলেও যদি আমার দৃষ্টি সীমানার মধ্যে কোনোদিন পড়েছে তো আই সয়ার এসিড লাগিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারবো সেদিন। এন্ড ইউ নো এবাউট দিস ভেরি ওয়েল দ্যাট "সাহভীর শাহান পূর্ব " এক কথার মানুষ। "
ছেলের এমন কথায় এবার আরো চটে গেলেন রাবেয়া বেগম। মাথাটা ভনভন করছে তার। রাগ উঠছে প্রচন্ড তবে ডক্টর তাকে হাইপার হতে নিষেধ করেছেন বিধায় নিজেকে দমিয়ে নিলেন। তবে ছেলে কে কথা শুনাতে দমাতে পারলোনা তার মস্তিস্ক। গটাগট বলে উঠলেন,
--"তুমি মারামারি খুন খারাপি ছাড়া আর কি পারো? মানুষ মারা ছাড়া আর কোনো কাজ শিখেছো এই জীবনে? মানুষ মারা তো তোমার নেশা। যেই নেশায় তোমাকে বুধ করে ফেলেছে। আমি তোমার মা হয়ে তোমাকে বলে দিলাম একদিন তোমার এই নেশাই তোমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সব হারাবে তুমি। নাম,ডাক, দাপট এঁগুলো কোনোকিছুই তোমাকে শান্তি দিতে পারবেনা। মিলিয়ে নিও সেদিন তুমি আমার কথা। তোমার এই আত্মসংযম, অহমিকার দেয়াল ভেঙে গুড়িয়ে যাবে সেদিন। যা তোমাকে নিঃস্ব করে ছাড়বে। "
শেষের কথা টুকু শুনার আগেই সেই স্থান ত্যাগ করলো পূর্ব। সে ভালো করেই জানে এখন এখানে থাকা টা ঠিক কতটা রিস্কি। যত যাইহোক জন্মদাত্রি মা তার। মায়ের প্রতি রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারবেনা কখনো । রাগ উঠলে নিজের মধ্যেই তো থাকেনা। তখন সে যদি জিদের বসে কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করে ফেলে তো? এইজন্যই মূলত এখানে থেকে চলে যাওয়া তার।
ওদিকে এতক্ষন মা ছেলের এমন মনোমালিন্য পত্যক্ষ ভাবেই দেখছিলো আসফিয়া আর তার দাদা আকবর মির্জা। তার এই নাতি টা ঠিক কার মতো হয়েছে ভেবে পায়না তিনি। তার জানা মতে তাঁদের বংশে এমন রগচোটা, মায়াদয়াহীন কোনো পুরুষ মানুষ ছিল বলে তো মনে হচ্ছেনা। তাহলে এই নাতি টা হলো কার মতো? যাক বুড়ো বয়সে এতসত ভেবে লাভ নেই তার। এমনিতেই ডাক্তার বলেছে টেনশন কম নিতে। এদিকে রাবেয়া বেগম ও ছেলেকে কথা শুনিয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্য চলে গেলেন। আসফিয়া যেন এতক্ষনে নিজের প্রাণ ফিরে পেল। বড় ভাই পূর্ব মানেই জ্বলজেন্ত একটা আতঙ্ক। তবে আসফিয়ার স্বস্তি ফিরে পাওয়াটা বেশিক্ষন দীর্ঘস্থায়ী হলোনা। এর মাঝেই কাঁচের সিঁড়িতে ধুপধাপ পা ফেলে পুনরায় নিচে নেমে এলো তার ভাই । পরনের ড্রেস আপ চেইঞ্জ। টাউজার আর টি শার্ট পাল্টিয়ে ওভার সাইজ কালো রঙা ফুল হাতা একটি হুডি জড়িয়েছে গায়ে। সাথে ব্ল্যাক জিন্স। হাতে কালো রঙের বাইকের গ্লাবস দেখেই বুঝা যাচ্ছে তার ভাই যে এখন বাইক রাইডিং এ বের হবে। হাঁটার তালে তালে ঘাড় ছুঁই ছুঁই সিল্কি চুলগুলো দোল খাচ্ছে। ফর্সা গায়ের রঙ,কুচকুচে কালো ভ্রু। শুধু ঠোঁট দুটো একটু কালচে। হবেই বা না কেনো সারাদিন ড্রিংকস, সিগারেট আর আজে বাজে নেশার উপরেই তো থাকে সবসময়। তবে দেখে বুঝা দায়। যে কেউ দেখলে ভাববে হয়তো হলিউড এর কোনো এক্টর তাও আবার যেমন তেমন এক্টর নয় বরং অ্যাকশন মুভির কোনো এক্টর হবে হয়তো তার ভাই। লস এঞ্জেলেস এর সবথেকে বড় ডিরেক্টর তার ভাইকে ফিল্মের অফার করেছিল অনেক বছর আগে। ইশ! যদি তার ভাইটা রাজি হতো তাহলে আজ হয়তো নিশ্চই কোনো বড় সুপারস্টার হতো তার ভাই। পরোক্ষনে আবার মনে পরলো তার ভাইতো মুভির মতো নাটকীয় ভাবে নয় বরং সত্যিকার অর্থেই খুন খারাপির সাথে যুক্ত। যেটা তার পেশা, যার জন্য তার মা এই বাড়িতে থাকতে দেয়না তাকে । মাঝে মাঝে এটা ভেবে ভীষণ আফসোস লাগে তার। তার ভাইটা কেনো আট দশটা মানুষের মতো নরমাল নয়। কেনো স্বাভাবিক ভাবে কোনো কিছু করতে পারেনা সে । এসব করে কি শান্তি পায় তার ভাই? তাঁদের তো অর্থ সম্পদ এর কোনো ভাব নেই।তাহলে?
**
লস এঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের কেলিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্যর বৃহত্তম একটি শহর। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে শহরটির যেমন বেশ নাম ডাক রয়েছে তেমনি এই শহর কে বাণিজ্যিক আয়ের প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। লস এঞ্জেলেস কে অনেকে আবার লালা ল্যান্ড বা এঞ্জেলস অফ সিটি হিসেবে চিনে।
বিকেল ৪ টা, লস এঞ্জেলেসের একটি এয়ারপোর্টে এসে কেবলই নেমেছে এক অষ্টাদশী।মাথায় তার হিজাব পেঁচানো। পরনে ব্লু রঙা লং টপ্স এর সাথে ম্যাচিং করা লেগিন্স। মুখে ওয়ান টাইম মাস্ক। পিছনে হ্যালো কীটি খচিত ছোট একটা ব্যাগ ঝুলানো। এই প্রথম বার বিদেশের মাটিতে পা রাখলো মেয়েটি। সারাটা পথ প্লেনে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। শরীরটা মেচমেচ করছে। মাথাটাও ধরে আছে ভীষণ রকম। কাঙ্খিত জায়গায় গিয়েই সর্বপ্রথম একটু ঘুমিয়ে নিবে সে । এমন সময় পিছন থেকে এগিয়ে খানিকটা সামনে এসে দাঁড়ালেন মধ্যম বয়সী একজন লোক। পরনে ব্ল্যাক ফর্মাল সুট। দুহাতে মাঝারি সাইজের দুটো লাগেজ। সামনে আসতে আসতে মেয়েটিকে ডেকে বলে উঠলেন,
--"মেহরিশ!"
পিছনে ঘুরে তাকালো মেহরিশ। এই লোকটা তার ভালো লাগার লিস্টে আছে। ভীষণ ভালোবাসে তাকে । বাবার চলে যাওয়া টা এখন আর আগের মতো বেশি মনে পড়েনা তার। মনে পরতে দেয়না সে। এইতো পাঁচবছর পেরুলো তার বাবার তাঁদের ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় । অতঃপর স্মিত হেসে পিছনে ঘুরে তাকিয়ে বলে উঠে মেহরিশ,
--"জিহ আংকেল!"
--"কতবার বলবো ওসব আংকেল টাংকেল বাদ দিতে তোকে? হয়তো বড় আব্বু ডাকবি নয়তো কিছুই ডাকার দরকার নেই আর। "
বলেই মুখটি মলিন করে ফেললো লোকটি। পুনরায় স্মিত হেসে জবাব দিলো মেহরিশ,
--"আচ্ছা আচ্ছা আর ভুল হবেনা বড় আব্বু। "
--"হ্যাঁ, মনে থাকে যেন। আচ্ছা শুন এখানে একটু দাড়া। প্রহর গাড়ি নিয়ে আসছে। "
প্রহর নামটি নতুন ঠেকলো মেহরিশ এর কাছে। তবে আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলোনা সে। আসলেই নাহয় দেখে নিবে লোকটিকে। প্রায় মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কালো রঙের মোটামুটি বড় সাইজের একটি গাড়ি এসে থামলো এয়ার পোর্ট এর সামনে। যা থেকে নেমে এলো থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর এস কালার এর একটি হুডি পরিহিত এক যুবক। এখানের মানুষ গুলো বোধহয় একটি বেশিই ফর্সা। আশে পাশের মানুষগুলোকে এতক্ষন ধরে মেহরিশ গভীর মনোযোগ দিয়েই পর্যবেক্ষণ করছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পোশাক আশাকের বেশ পরিবর্তন এখানে। এমন হার কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও মেয়েদের পোশাক আশাক দেখে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে মেহরিশ। এদর কি শীত লাগে না নাকি! এর মাঝেই যুবক টি এসে এক গাল হেসে নিয়ে দাঁড়ালো তাঁদের সম্মুখে। অতঃপর মেহরিশ এর সামনে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়ে আলগুছে হাত বাড়িয়ে ব্যাগ দুটো নিয়ে অনুনয়ের স্বরে বলে উঠল,,,,
--"সরি চাচ্চু একটু লেইট হয়ে গেছে ।"
--"সমস্যা নেই বাবা। তুই যে এসেছিস এটাই অনেক। এখন চল বাড়ি যেতে হবে, আমার আম্মাজান অনেক টায়ার্ড। ওহ তোকে তো পরিচয় করাইনি ও হচ্ছে মেহরিশ। আর মেহরিশ মা ও হচ্ছে প্রহর। আমার ভাইয়ের ছেলে।"
প্রহর এক পলক তাকালো মাস্ক পরা মেয়েটার পানে। চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখার উপায় নেই। তবে বলতে হবে মেয়েটার চোখ দুটোর ভার খুব গভীর। ক্ষনে ক্ষনে বড় বড় পাঁপড়ি গুলোর পলক ফেলছে তার দিকে তাকিয়ে। জবাবে প্রহর মুচকি হেসে বললো,
--"আচ্ছা আগে বাড়িতে যাওয়া যাক আস্তে আস্তে পরিচয় হওয়া যাবে।",,,
**
কালো রঙের গাড়িটি এসে থামালো মির্জা হাউস এর সামনে। ভিতর থেকে নেমে আসলেন ওয়াহিদ মির্জা। তার পিছন পিছন নেমে আসলো মেহরিশ। তাঁদের দেখা মাত্রই বাড়ির ভিতরে থাকা দুজন গার্ডস এসে গাড়ি থেকে লাগেজ গুলো হাতে নিয়ে নিলো। মেহরিশ বাড়িটা দেখে বেশ অবাক হলো। এমন সুন্দর বাড়ি হয় বুঝি? তার খালামনি এতো সুন্দর বাড়িতে থাকে? যদিও মেহরিশদের অবস্থাও ওতো খারাপ ছিলোনা। ঢাকায় নামি দামি বংশের মেয়ে সে। বাবার বেশ বড়োবড়ো কয়েকটা কোম্পানি ছিল। সবকিছু ভালোই তো চলছিল তাদের। স্কুল জীবন শেষ করে কলেজ লাইফ কোনো কিছুর কমতি ছিল কি? সবকিছু নিয়ে সুখেই তো ছিল তারা। হটাৎ তার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তো শুরু হয় তাদের অশান্তির দিন গুলো।
--"কিরে মা ভিতরে যাবি নাহ?"
আলগুছে চোখের কোনায় জমা পানিটুকু মুছে নিলো মেহরিশ। এই মুহূর্তে মাকে খুব বেশি মনে পড়ছে তার। পরমুহূর্তে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে মুখের কোনে হাসি ফুটে উঠে মেয়েটির। এই মানুষটি পুরো তার মায়ের মতোই দেখতে। হবেইবা না কেনো? আপন বোন বলে কথা। দৌড়িয়ে গিয়ে জাপ্টে ধরলো খালামনিকে। রাবেয়া বেগম ও দু হাতে আগলিয়ে নিলেন মেয়ের বয়সী বোনের মেয়েটাকে। হিজাবের উপরেই হাত বুলিয়ে দিলেন ভরসার । শেষবার বছর এক আগে বিডিতে গিয়ে দেখেছিলো মেয়েটিকে এরপর আর যাওয়া হয়নি।
--"কেমন আছে আমার মা টা? "
খালামনির কথায় মেহরিশ মুখ তুলে তাকালো রাবেয়া বেগম এর দিকে। অতঃপর তপ্ত সরে বলে উঠলো,
--" এতক্ষন খারাপ লাগলেও তোমাকে দেখার পর সমস্ত খারাপ লাগা উবে গেছে খালামনি। আসফিয়া কে দেখছি না যে? বাসায় নেই?"
--"ভিতরেই আছে এতক্ষন তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলো। আয় ভিতরে আয়। "
--"আমাকে আসতে বলবা না মামনি?"
পিছন থেকে প্রহর কটাক্ষ করে বলে উঠলো উক্ত কথাটি। যা শুনে মৃদু হেসে রাবেয়া বেগম বলে উঠলেন,
--"তোকে কি ইনভাইট করে আসতে বলতে হবে? সারাদিন তো থাকিস এখানেই। ভিতরে আয়।"
--"নাহ থাক আজ না'হয় তোমার নতুন মেয়েকে খাতির আপ্পায়ন করো, আমি আসলে যদি আবার ভাগে কম পরে তো? কালকে না'হয় সকাল সকালেই চলে আসবো ভাগ বসাতে। "
**
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে। তখন মেহরিশ বাড়িতে ঢুকেই আরেক দফা অবাক হয়েছিল। বাড়িটির ভিতরে সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রত্যেকটি আসবাবপত্রই বেশ নামি দামি যা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আসফিয়ার সাথে মেহরিশ এর সম্পর্ক খুব ভালো। আগে থেকেই পরিচিত তারা। মায়ের সাথে ৩ থেকে ৪ বার বাংলাদেশে গিয়েছিলো আসফিয়া। আর তারপর আবার ফোনেও প্রায় যোগাযোগ হতো মেহরিশের সাথে। বয়সে প্রায় সমবয়সী দুজন। মেহরিশ কে থাকতে দেয়া হয়েছে উপরের কিনারের একটি রুমে। সকাল থেকে সার্ভেন্ট দিয়ে রুমটি গুছিয়েছেন রাবেয়া বেগম। যাতে কোনো কমতি না থাকে রুমে। মেহরিশ এর ব্যবহার করা সব জিনিস পত্রই রেখেছেন সেখানে। মেয়েটি যেনো কোনো কিছুর কমতিবোধ না করে এখানে। তখন রুমে এসে ফ্রেশ হতেই ডাক এসে পড়েছিল খাবার খাওয়ার জন্য। কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে খেয়ে পুনরায় উপরে আসতে আসতেই রাত হয়ে গেছে। তাই পুরো বাড়িটা আর ঘুরে দেখার সময় হয়নি তার। ওয়াশরুমে ঢুকে সময় করে শাওয়ার নিয়ে নিলো মেহরিশ। সুতির একটি ঢিলেঢালা পাকিস্তানী থ্রি পিস পরে বের হলো সেখান থেকে। মাথায় টাওয়াল পেঁচানো। কোমর পর্যন্ত চুলগুলো এখন শুখাতেই কাঠখোর পোহাতে হবে তাকে। তার বাড়িতে থাকতে তার মা মুছে দিতো সবসময় । তাই টাওয়াল টা মাথায়ই পেঁচিয়ে রাখলো সে। এমন সময় হটাৎ করেই রুমের লাইট টা অফ হয়ে গেলো । মুহূর্তে নেমে আসলো অন্ধকার। হয়তো লোড শেডিং হয়েছে। এখানেও লোড শেডিং হয় ভেবে মনে মনেএকটু হাসলো মেহরিশ। বাংলাদেশ কে শুধু শুধু সে আগে বকতো। এতো উন্নত দেশেও যেখানে লোড শেডিং হয় সেখানে বাংলাদেশে হলে দোষের কি। যেহেতু বাড়িতে বেশি মানুষ নেই তাই রুমের দরজা টা খুলেই রাখা ছিল তার। এমন সময় ঠিক তার বরাবর জ্বলজ্বল করে তাক করা সবুজ দুটো চোখ দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলো মেহরিশ।
--"ভুত, ভুত!"
জ্বলজ্বলে সবুজ মনি দুটোর মালিক টা এখনও অপলক ভাবে চেয়ে আছে তার দিকে। পলক টাও ফেলছে না। মেহরিশ এক লাফে বেডের উপর গিয়ে বসে পরলো। চোখ মুখ খিচে চেঁচিয়েই যাচ্ছিলো সেই কখন থেকে ভুত, ভুত বলে এমন সময় আচমকা রুমের লাইট জ্বলে উঠলো সাথে রুমে প্রবেশ করলো আসফিয়া। মেহরিশ কে এভাবে বেডের উপর বসে চোখ মুখ খিচে কাঁপতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
--"কি হয়েছে মেহরিশ? কোথায় ভুত?"
--"ঐখানে আমি দেখেছি সবুজ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে তাকিয়েছিল আমার দিকে। এক দৃষ্টে। "
কিছু একটা মনে করলো আসফিয়া। হয়তো কিছু বুঝতে পারলো মেয়েটি। পরক্ষণে উচ্চস্বরে হেসে ফেললো তৎক্ষণাৎ। পরপর বলতে লাগলো,,,
--"বুঝেছি তুই মেবি অডি কে দেখেছিস তাইনা। "
মেহরিশ বুঝলো না আসফিয়া ঠিক কার কথা বলছে। তাই প্রশ্নণাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
--"অডি? অডি কে? "
--ওয়েট, দেখাচ্ছি। বলেই চু চু শব্দ তুলতেই আচমকা দরজার কোণা থেকে লাফিয়ে আসফিয়ার কোলের উপর বসে পরলো বেশ বড়োসড়ো, মোটা সোটা এক কালো বিড়াল। পৃথিবীতে মেহরিশ একমাত্র মেয়ে যে কিনা এই বিড়াল প্রাণীটিকে ভীষণ ভয় পায়। তারউপর নরমালি বিড়াল দেখতে সাদা আর কতো সুন্দর হয়ে থাকে। তার ফ্রেন্ডের তো একটা পার্শিয়ান কেট ছিল ওটাও তো ভয়ে ছুঁয়ে দেখতোনা সে। তারউপর এমন কালো ভুতুম পেঁচার মতো বিড়াল কে পালে ভেবে পাচ্ছেনা মেহরিশ। একে দেখলেই তো গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়। ওদিকে ওডি আসফিয়ার কোলে গুটিসুটি বেঁধে বসে চেয়ে আছে মেহরিশ এর দিকে।
--"ঐই হচ্ছে অডি। ভয় পাস না খুব লক্ষী আমাদের অডি।মনে হচ্ছে অডি তার মালিক কে খুঁজতে এসে অন্ধকারে ভুলে তোর রুমে ঢুকে পড়েছে। "
--"অডির মালিক কে? এমন অদ্ভুত বিড়াল কে পালে এই বাড়িতে?
--"কে আবার পূর্ব ভাইয়া। "
চলবে....
#সে_আমার_ভীষণ_অপ্রিয়০২
#সূচনা_পর্ব
#সুহাসিনি_মিম