17/08/2026
এয়ারটেলকে কেন সার্কেল হতে হল?
বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম এয়ারটেল। বিশেষ করে তরুণদের কাছে ০১৬ নম্বর সিরিজ, আলাদা অফার, ক্যাম্পেইন এবং এয়ারটেলের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতি একসময় এটিকে অন্য অপারেটরদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। কিন্তু সেই পরিচিত এয়ারটেল ব্র্যান্ড এখন নতুন পরিচয়ে এসেছে সার্কেল নামে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এয়ারটেলকে কেন সার্কেল হতে হল?
গল্পটা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরতে হবে।
বাংলাদেশে এয়ারটেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ওয়ারিড টেলিকমের মাধ্যমে। ২০১০ সালে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান Bharti Airtel ওয়ারিডের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে ওয়ারিডের নাম পরিবর্তন করে এয়ারটেল করা হয়।
এরপর আসে ২০১৬ সালের বড় পরিবর্তন। এয়ারটেল বাংলাদেশ এবং রবি আজিয়াটা একীভূত হয়ে যায়। সেই সময় থেকে এয়ারটেল আর আলাদা মোবাইল অপারেটর হিসেবে কাজ করেনি। মূল অপারেটর হয়ে যায় রবি আজিয়াটা এবং এয়ারটেল পরিণত হয় রবির অধীনে পরিচালিত একটি আলাদা ব্র্যান্ডে।
তবে কোম্পানি এক হলেও গ্রাহকের কাছে রবি এবং এয়ারটেলকে আলাদা দুটি ব্র্যান্ড হিসেবেই রাখা হয়েছিল। ০১৮ সিরিজ রবির সঙ্গে এবং ০১৬ সিরিজ এয়ারটেলের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। আলাদা অফার, প্রচারণা এবং তরুণদের কেন্দ্র করে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে এয়ারটেলের নিজস্ব একটি পরিচয় তৈরি হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল এয়ারটেল নামের মালিকানা।
এয়ারটেল নামটি রবির নিজস্ব ট্রেডমার্ক ছিল না। রবি বাংলাদেশে এয়ারটেল ব্র্যান্ড ব্যবহারের জন্য Bharti Airtel India-এর সঙ্গে ট্রেডমার্ক লাইসেন্সিং চুক্তির আওতায় কাজ করত। রবি আজিয়াটার ২০২০ সালের আইপিও প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছিল, তখনকার Airtel ব্র্যান্ড ব্যবহারের লাইসেন্সিং চুক্তির মেয়াদ ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ছিল।
এরপর চুক্তিটি কীভাবে এবং কতদিনের জন্য নবায়ন হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে থাকা তথ্য খুব বেশি পরিষ্কার নয়। তাই এয়ারটেল নাম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো লাইসেন্স ফি বা রয়্যালটির অঙ্ক নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।
তারপরও এয়ারটেল নামটি বাংলাদেশে আরও বহু বছর টিকে যায়।
এর অন্যতম কারণ ছিল ব্র্যান্ডটির জনপ্রিয়তা। এয়ারটেল তখন শুধু একটি সিম বা মোবাইল নেটওয়ার্কের নাম ছিল না। তরুণদের কাছে এটি একটি আলাদা ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি করেছিল। ০১৬ নম্বর, এয়ারটেলের অফার, অ্যাপ, বিভিন্ন ক্যাম্পেইন এবং ডিজিটাল উপস্থিতি মিলিয়ে রবি ও এয়ারটেলের মধ্যে একটি আলাদা বাজার পরিচয় তৈরি হয়েছিল।
এমনকি রবি আজিয়াটার নিজস্ব করপোরেট তথ্যেও দীর্ঘ সময় ধরে রবির পাশাপাশি এয়ারটেলকে তাদের দুটি প্রধান ব্র্যান্ডের একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আলাদা ব্র্যান্ড কাঠামো নিয়ে নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে প্রশ্নও উঠতে থাকে। ২০২৫ সালে এয়ারটেল ব্র্যান্ডিং, ০১৬ সিরিজ এবং আলাদা প্রচারণা নিয়ে প্রতিযোগী অপারেটরদের পক্ষ থেকে আপত্তির খবর সামনে আসে। এখানে মূল প্রশ্ন ছিল, ২০১৬ সালের একীভূতকরণের এত বছর পরও এয়ারটেলকে কেন আলাদা ব্র্যান্ড হিসেবে রাখা হচ্ছে।
এরপর ২০২৬ সালে এসে দৃশ্যপট বদলে যায়।
এয়ারটেলের পরিবর্তে সামনে আসে নতুন নাম Cirkle।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। Cirkle আসা মানেই নতুন কোনো মোবাইল অপারেটর বা নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়া নয়। ০১৬ নম্বরের গ্রাহকদের জন্য নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, সিম এবং মোবাইল সেবা মূলত আগের মতোই রবির নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। বাংলাদেশে ০১৬ সিরিজের সিমকে রবি আজিয়াটার সিস্টেমের অংশ হিসেবেই বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ পরিবর্তনটা মূলত ব্র্যান্ডের।
এয়ারটেলের পুরোনো youth-focused পরিচয়ের জায়গায় Cirkle-কে আরও digital-first একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। গেমিং, বিনোদন, অনলাইন কমিউনিটি, কনটেন্ট এবং ভবিষ্যতে AI-ভিত্তিক বিভিন্ন সেবা এই নতুন ব্র্যান্ডের অংশ হতে পারে।
তাহলে কি এয়ারটেল পুরোপুরি শেষ?
ব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশে এয়ারটেলের অধ্যায় শেষ হওয়ার দিকে গেলেও এর অর্থ এই নয় যে ০১৬ নম্বরের গ্রাহকরা হঠাৎ করে নতুন কোনো অপারেটরে চলে যাচ্ছেন। বরং একই কোম্পানির নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোর ওপর একটি নতুন ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি হচ্ছে।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। রবি আজিয়াটার মালিকানা কাঠামোতেও Bharti Airtel-এর উপস্থিতি রয়েছে। রবির বর্তমান বিনিয়োগকারী তথ্য অনুযায়ী Axiata Group Berhad-এর নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারিত্ব ৬১.৮২ শতাংশ এবং Bharti Airtel Singapore-এর অংশীদারিত্ব ২৮.১৮ শতাংশ।
তাই এয়ারটেল নাম পরিবর্তন মানেই Bharti Airtel রবির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বা বাংলাদেশ থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়েছে এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পুরো ঘটনাটাকে যদি এক লাইনে বলা যায়, তাহলে গল্পটা এমন
Warid থেকে Airtel
Airtel থেকে Robi-এর সঙ্গে merger
তারপর Robi-এর অধীনে Airtel sub-brand
আর এখন Airtel থেকে Cirkle
অর্থাৎ কোম্পানি বা নেটওয়ার্কের গল্পটা নতুন করে শুরু হচ্ছে না। বদলাচ্ছে মূলত ব্র্যান্ডের পরিচয়।
পুরোনো এয়ারটেল ব্যবহারকারীদের কাছে বিষয়টি নিঃসন্দেহে আবেগের। কারণ একটি মোবাইল ব্র্যান্ডের সঙ্গে শুধু নম্বর বা সিম নয়, অনেক সময় জড়িয়ে থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি, অফার, বিজ্ঞাপন, গান, ক্যাম্পেইন এবং তরুণ বয়সের নানা গল্প।
তাই এয়ারটেল থেকে Cirkle হওয়া শুধু একটি নাম পরিবর্তন নয়। এটি বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে একটি পরিচিত ব্র্যান্ড যুগের পরিবর্তন এবং একই নেটওয়ার্কের ওপর নতুন ধরনের ডিজিটাল ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরির একটি বড় পদক্ষেপ।
____কপি পেষ্ট____