01/08/2026
"মা বলেন, 'বউমা আমাকে দেখে না।' স্ত্রী বলেন, 'মা আমাকে সহ্য করতে পারেন না।' আর ছেলেটা?"
মা ও স্ত্রীর মাঝে চাপা পড়া একজন স্বামীর গল্প।
মা ফোন করে বললেন, "বউমা আজ আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলেনি।" স্বামী বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বললেন, "মায়ের সাথে এমন কেন কর?" স্ত্রী বললেন, "মা সকালে আমাকে এমনিতেই অপমান করেছেন, আমি কী করব।" স্বামী চাপে পড়েন। মায়ের পক্ষ নিলে স্ত্রী কষ্ট পান, স্ত্রীর পক্ষ নিলে মা কষ্ট পান। এই চাপ বছরের পর বছর চলতে থাকে।
আর এই চাপটা শুধু ওই এক মুহূর্তের নয়। একই টানাটানি সংসারের নানা ছোট ছোট ঘটনায় বারবার ফিরে আসে। চেনা কয়েকটা দৃশ্য মিলিয়ে দেখুন।
রান্নাঘরে। মা বললেন, "বউমা তরকারিতে লবণ বেশি দিয়েছে, আমার কথা তো শোনেই না।" স্ত্রী বললেন, "আমি তো আম্মার কথামতোই রেঁধেছি, তবু দোষ।" স্বামী খেতে বসে বুঝে পান না, কার কথায় সায় দেবেন। মুখে কিছু বললেই একজন কষ্ট পাবেন।
সন্তানকে ঘিরে। মা চান বাচ্চাকে তাঁর মতো করে মানুষ করতে, "আমরা তো এভাবেই বড় করেছি।" স্ত্রী চান নিজের মতো করে, "আম্মা, এখন সময় বদলেছে।" বাচ্চাকে শাসন করা বা আদর করা, প্রতিটাতেই দুজনের দুই মত, আর মাঝখানে বাবা।
টাকা-খরচে। স্বামী মায়ের হাতে কিছু টাকা দিলে স্ত্রী মনে মনে ভাবেন, "আমাদের সংসারের কথা ভাবে না।" আবার স্ত্রীর প্রয়োজনে কিছু খরচ করলে মা বলেন, "বউয়ের আঁচলে বাঁধা পড়েছিস।" যাকেই দিন, অন্যদিক থেকে কথা আসে।
ছোট ছোট কথায়। মা বলেন, "তোর বউ আমাকে সালাম দেয় না।" স্ত্রী বলেন, "আমি সালাম দিলাম, আম্মা শুনলেনই না।" এখন কে সত্যি বলছেন স্বামী জানেন না। কিন্তু যেকোনো একজনকে অবিশ্বাস করলেই সম্পর্ক তেতো হয়।
দৃশ্য আলাদা, কিন্তু ভেতরের চাপটা এক। প্রতিবারই স্বামী দুই ভালোবাসার মানুষের মাঝখানে চাপা পড়ছেন, আর নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন, "আমি কার পক্ষ নেব?" আর এখানেই আসল ভুলটা লুকিয়ে। কারণ প্রশ্নটাই ভুল।
এই টানাটানির গভীরে আছে Life Center (লাইফ সেন্টার — জীবনের কেন্দ্র)-এর প্রশ্ন। ঘড়ির কাঁটা যেমন মাঝখানের একটা বিন্দুকে ঘিরে ঘোরে, তেমনি প্রতিটি মানুষের জীবনও একটা কেন্দ্রকে ঘিরে ঘোরে। যাকে ঘিরে তার সব সিদ্ধান্ত, ভালোবাসা আর অগ্রাধিকার সাজানো থাকে। প্রশ্ন হলো, আপনার জীবনের সেই কেন্দ্রে কে বসে আছে? চাপে পড়লে আপনি অজান্তেই কোন দিকে ঝুঁকবেন, সেটা আসলে এই কেন্দ্রই আগে থেকে ঠিক করে রাখে।
কেউ মাকে জীবনের কেন্দ্রে রাখেন। তখন প্রতিটি ঝগড়ায় না ভেবেই মায়ের পক্ষ নেন, স্ত্রীর কষ্টটা চোখেই পড়ে না। স্ত্রী ধীরে ধীরে দূরে সরে যান, ভেতরে অভিমান জমতে থাকে।
কেউ স্ত্রীকে কেন্দ্রে রাখেন। তখন ঘরের শান্তির জন্য প্রতিবার মাকেই থামিয়ে দেন, "আম্মা, আপনি এসব বাদ দেন তো।" মা বুকভরা কষ্ট নিয়ে চুপ করে যান, ভাবেন, ছেলেটা পর হয়ে গেল।
কেউ নিজের আরামকে কেন্দ্রে রাখেন। ঝামেলা এড়াতে দুপক্ষকেই এড়িয়ে চলেন, চুপ থাকেন, বাইরে বেশি সময় কাটান। ফল হয় এই যে, কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না, দুজনেই ভাবেন তাঁদের অবহেলা করা হচ্ছে।
কিন্তু মা বা স্ত্রী, কেউই জীবনের কেন্দ্র হওয়ার জন্য তৈরি নন। এঁরা রক্ত-মাংসের মানুষ, এঁদের আবেগ আছে, ভুল আছে, আর একদিন এঁরা থাকবেনও না। যাঁকে আপনি কেন্দ্র বানাবেন, তাঁর সাময়িক রাগ বা অভিমানেই আপনার পুরো মনের শান্তি ওঠানামা করবে। মা-কেন্দ্রিক স্বামীর সংসার ভাঙে স্ত্রীর নীরব কান্নায়, স্ত্রী-কেন্দ্রিক স্বামী বয়ে বেড়ান মায়ের দীর্ঘশ্বাসের বোঝা। মানুষকে কেন্দ্র বানালে সেই মানুষ একটু নড়লেই গোটা জীবন কেঁপে ওঠে।
এই সব সাময়িক কেন্দ্রের বিপরীতে আছে একটিমাত্র কেন্দ্র, যা কখনো নড়ে না, কখনো ফুরিয়ে যায় না। সেটি আল্লাহ-কেন্দ্রিক জীবন। যাঁর জীবনের কেন্দ্রে আল্লাহ, তিনি "কে আমার বেশি আপন" এই হিসাব করেন না। তিনি হিসাব করেন, "আল্লাহ এই সম্পর্কে আমার ওপর কী দায়িত্ব রেখেছেন।" তখন মা আর স্ত্রী দুই প্রতিপক্ষ থাকেন না, বরং দুজন হয়ে যান আল্লাহর দেওয়া আলাদা দুটি আমানত, যাঁদের প্রত্যেকের আলাদা হক আমাকে আদায় করতে হবে। মায়ের প্রতি সদাচরণ আল্লাহ ফরয করেছেন, স্ত্রীর প্রতি সদাচরণও আল্লাহ ফরয করেছেন। এ দুটি কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না।
মূল কথাটা আমাদের দ্বীন সরাসরিই বলে দিয়েছে।
مَنِ الْتَمَسَ رِضَا اللَّهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ، وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَا النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ
"যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজে, আল্লাহ তাকে মানুষের হাত থেকে যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি খোঁজে, আল্লাহ তাকে মানুষের হাতেই ছেড়ে দেন।" (সুনানে তিরমিযি ২৪১৪)
রহস্যটা এখানেই। আপনি যখন শুধু মাকে খুশি করা বা বউকে খুশি করার দৌড়ে নামেন, তখন আপনি মানুষের সন্তুষ্টির পেছনে ছুটছেন, আর সেই দৌড়ের কোনো শেষ নেই। দুজনকে একসাথে সবসময় খুশি রাখা অসম্ভব। কিন্তু আপনি যখন খোঁজেন এতে আল্লাহ কী চান, তখন আল্লাহ নিজেই দুদিক সামলে দেন।
মায়ের হক নিয়ে আল্লাহর ঘোষণা:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
"তোমার রব ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা আল-ইসরা ২৩)
আর মায়ের মর্যাদা কতটা, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝিয়ে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমার সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" তিনি বললেন, "আপনার মা।" লোকটি বললেন, "তারপর কে?" বললেন, "আপনার মা।" আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" বললেন, "আপনার মা।" চতুর্থবারে বললেন, "তারপর আপনার বাবা।" (সহীহ বুখারি ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম ২৫৪৮)
আবার স্ত্রীর হক নিয়ে আল্লাহর নির্দেশ:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা ১৯)
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণকে বানিয়েছেন একজন মানুষের ভালোত্বের মাপকাঠি:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।" (সুনানে তিরমিযি ৩৮৯৫)
খেয়াল করুন, মায়ের হক আর স্ত্রীর হক, দুটোই আল্লাহর হুকুম, দুটো আলাদা আয়াত ও হাদীসে। তাই একটাকে বাঁচাতে আরেকটা কোরবানি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ-কেন্দ্রিক স্বামীকে দুটোই আদায় করতে হবে।
এবার দেখি, আল্লাহ-কেন্দ্রিক একজন স্বামী উপরের দৃশ্যগুলোতে ঠিক কী করবেন। শুধু নীতি নয়, বাস্তবে হাতে-কলমে।
এক। আগে শুনুন, তখনই রায় দেবেন না। বাসায় ফিরে স্ত্রী নালিশ করলে সঙ্গে সঙ্গে "মায়ের সাথে এমন কেন কর" বলে বিচার করে দেবেন না। আবার মা ফোনে নালিশ করলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেবেন না যে বউমাই বেয়াদবি করেছে। আগে দুপক্ষের কথাই শান্তভাবে শুনুন, "আচ্ছা, আমাকে খুলে বলো তো কী হয়েছিল।" মানুষ প্রথমেই পক্ষ চায় না, আগে চায় কেউ তার কথাটা মন দিয়ে শুনুক। এই শোনাটাই অর্ধেক রাগ গলিয়ে দেয়।
দুই। কারো সামনে কাউকে দোষ দেবেন না। স্ত্রীর সামনে মাকে, বা মায়ের সামনে স্ত্রীকে কখনো ধমক দেবেন না। এতে যাঁকে দোষ দিলেন তিনি অপমানিত হন, আর যাঁর পক্ষ নিলেন তিনি ভাবেন এবার থেকে আমি যা বলব তা-ই হবে। দুদিকেই ক্ষতি। যা বলার, প্রত্যেককে আলাদা করে, একান্তে বলুন।
তিন। মাকে একান্তে, সম্মানের সাথে বোঝান। মায়ের কাছে গিয়ে হাত ধরে বলুন, "আম্মা, আমি আপনার ছেলে, আপনার হক সবার আগে, আপনি আমার কাছে যা বলার নিঃসংকোচে বলবেন। তবে বউমাও তো আমার আমানত, আল্লাহ তার একটা হক আমার ওপর রেখেছেন। কোনো কষ্ট পেলে আপনি আমাকে বলবেন, আমি নিজে দেখব। কিন্তু তার সাথে অন্যায় করলে আল্লাহর কাছে আমাকেই জবাব দিতে হবে।" মা যখন বোঝেন ছেলে তাঁকে অসম্মান করছে না, বরং আল্লাহর হুকুম পালন করছে, তখন অধিকাংশ মা-ই নরম হয়ে যান।
চার। স্ত্রীকেও একান্তে, একই মমতায় বোঝান। স্ত্রীকে আলাদা করে বলুন, "তোমার কষ্টটা আমি বুঝি, আমি তোমার পাশে আছি। কিন্তু উনি আমার মা, আল্লাহ তাঁর সাথে সদাচরণ আমার ওপর ফরয করেছেন। তুমি যদি তাঁর দুটো কথা ধৈর্য ধরে সহ্য করো, আল্লাহ এটাকে তোমার জন্য বিরাট সদকা আর মর্যাদা বানিয়ে দেবেন, ইন শা আল্লাহ।" স্ত্রীকে দমন করা নয়, বরং তাঁর ধৈর্যের বদলে আল্লাহর কাছে যে পুরস্কার আছে, সেদিকে ভালোবেসে ইশারা করুন।
পাঁচ। সমাধানটা নিজের কাঁধে নিন, দুজনের ওপর ছেড়ে দেবেন না। "তোমরা দুজন বুঝে নাও" বলে হাত তুলে নেবেন না। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল, এতে চাপ কমার বদলে বাড়ে। বরং মাঝের সেতু আপনিই হোন। মাঝেমধ্যে স্ত্রীকে দিয়ে মায়ের পছন্দের কিছু রান্না করিয়ে মাকে বলুন, "আম্মা, বউমা বিশেষভাবে আপনার জন্য করেছে।" আবার স্ত্রীর ভালো কাজের প্রশংসা মায়ের সামনে করুন, আর মায়ের স্নেহের কথা স্ত্রীর কাছে তুলে ধরুন। ছোট ছোট এই সেতুবন্ধনই বছরের পর বছরের জমে থাকা বরফ গলিয়ে দেয়।
আর যদি সত্যিই একজন অন্যায় দাবি করেন? এই প্রশ্নটা অনেকের মনে আসে। দুটো হক আদায় করব বুঝলাম, কিন্তু কোনো বিষয়ে যদি সরাসরি সংঘর্ষ বাধে, তখন? উত্তর হলো, যেহেতু দুটো হক আলাদা, বেশিরভাগ সময় এরা মুখোমুখি হয়ই না। কিন্তু যদি কখনো একজন অন্যজনের ওপর সত্যিকারের জুলুম দাবি করেন, তখন আপনি পক্ষ নেবেন না, নেবেন ন্যায়ের পক্ষ। প্রয়োজনে নিজের মাকেও পূর্ণ আদব ও কোমলতার সাথে বলতে হবে, "আম্মা, এই দাবিটা তো ঠিক হচ্ছে না।" কারণ আল্লাহ-কেন্দ্রিক মানুষের কাছে সবার আগে আল্লাহর হুকুম, আর আল্লাহ কারো ওপর জুলুম পছন্দ করেন না। এটা মাকে অসম্মান নয়, বরং মাকে ভুল থেকে বাঁচানো, যা প্রকৃত সদাচরণেরই অংশ।
কেন্দ্রটা বদলে দেওয়ায় গোটা ছবিটাই বদলে গেল। "কার পক্ষ নেব" প্রশ্নটা আর রইল না, তার জায়গায় এল "কার কোন হকটা আমি আদায় করব।" মা পেলেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান, স্ত্রী পেলেন তাঁর প্রাপ্য মমতা, আর মাঝখানের চাপা-পড়া মানুষটি হয়ে উঠলেন দুটো সম্পর্ক জোড়া লাগানো একটা মজবুত সেতু।
একটা কথা শাশুড়িদের জন্যও। এই পুরো ভারটা কিন্তু শুধু ছেলের কাঁধে নয়। একজন প্রজ্ঞাবান শাশুড়ি যখন বউমাকে পরের মেয়ে না ভেবে নিজের মেয়ের মতো করে বুকে টেনে নেন, তখন এই চাপটা তৈরিই হয় না। মনে রাখা দরকার, আজকের বউমাও কাল কারো শাশুড়ি হবেন। আমরা যেমন আচরণ ছড়াই, ঘুরেফিরে তেমন আচরণই আমাদের কাছে ফিরে আসে।
সংসারের এই চাপ থেকে মুক্তির পথ একটাই। জীবনের কেন্দ্র থেকে মানুষকে সরিয়ে সেখানে আল্লাহকে বসানো। আল্লাহকে কেন্দ্রে বসান, বাকি সব সম্পর্ক আপনাআপনি নিজের সঠিক জায়গা খুঁজে নেবে।
আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে মা ও স্ত্রীর হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দিন, আর আমাদের ঘরগুলোকে শান্তির নীড় বানিয়ে দিন। আমীন।