01/09/2026
কিংবদন্তি মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিদায়
দুই দশকের মহাকাব্যিক যাত্রার শেষ অধ্যায়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না ‘নম্বর টেন’
ক্রীড়া ডেস্ক | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের আকাশে নেমে এলো এক আবেগঘন মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক ও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অসাধারণ পথচলার ইতি টানলেন ফুটবলের এই মহাতারকা।
মেসি তাঁর বিদায়ের ঘোষণা দেন ৩১ আগস্ট ২০২৬। তবে বিদায়ের বার্তাটি তিনি লিখেছিলেন ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১–০ গোলে হারের দুই দিন পর, ২১ জুলাই। পরবর্তীতে তাঁর বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সেই বার্তাটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
‘এই অধ্যায়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়’
বিদায়বার্তায় মেসি জানান, আর্জেন্টিনার জার্সি তাঁর কাছে সবসময় বিশেষ ছিল। তিনি অনুভব করছেন, এবার নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে। তাঁর সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না—বরং অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও কষ্টের।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিও ছিল বিশ্বকাপের ফাইনাল। নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মাঠে মেসির হতাশ মুখ, সতীর্থদের সান্ত্বনা এবং গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আবেগ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে এক যুগের বিদায়ের প্রতীক।
ব্যর্থতা থেকে মহিমান্বিত প্রত্যাবর্তন
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। দীর্ঘ সময় তাঁকে শুনতে হয়েছে সমালোচনা—ক্লাব ফুটবলে সাফল্য থাকলেও কেন আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই, সেই প্রশ্ন ছিল বারবার।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার এবং ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর মধ্যে ছিল। ২০১৬ সালে এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র ৬৬ দিন পর ফিরে আসেন জাতীয় দলে।
তারপর বদলে যায় গল্প।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন মেসি। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায়—আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।
পরিসংখ্যানেও মেসি অনন্য
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল নিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ ও গোল—দুই ক্ষেত্রেই তিনি আর্জেন্টিনার রেকর্ডধারী।
২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখে যান মেসি। টুর্নামেন্টে করেন ৮ গোল, ফলে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপে গোল করার পর দীর্ঘ ২০ বছরের পথচলায় তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজস্ব এক অনন্য অধ্যায় তৈরি করেছেন।
এবার সত্যিই শেষ
২০১৬ সালের বিদায় ছিল সাময়িক। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বিদায়কে মেসি নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে জানিয়েছেন। তাঁর সামনে এখন জাতীয় দলের বাইরে ক্লাব ফুটবলের অধ্যায় চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর সেই পরিচিত দৃশ্য দেখা যাবে না—মাঠের মাঝখানে বল পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ১০ নম্বর, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া কিংবা গোলের পর দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকানো।
একজন ফুটবলার নন, একটি যুগ
মেসির বিদায় শুধু একটি জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের অবসর নয়। এটি এমন এক ফুটবল যুগের সমাপ্তি, যেখানে একজন ছোটখাটো গড়নের খেলোয়াড় তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, অধ্যবসায় ও নেতৃত্ব দিয়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছেন।
একসময় যে মেসি আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য বারবার ব্যর্থ হয়ে কেঁদেছেন, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে আর্জেন্টিনার আকাশে উল্লাসের নায়ক হয়েছেন। তাই তাঁর গল্প কেবল সাফল্যের নয়—এটি ব্যর্থতা থেকে ফিরে আসা, সমালোচনা সহ্য করা, স্বপ্ন আঁকড়ে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর শেষ অধ্যায় শেষ হয়েছে হয়তো পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মেসির বিদায় লেখা থাকবে বিজয়ীর মতোই।
কারণ কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে যান,
আর কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে গেলেও ফুটবলের ইতিহাস থেকে কখনো বিদায় নেন না।