05/08/2026
২০২৪ সালের জুলাই। রাস্তায় রক্ত, বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর একটা শব্দ—শুধু একটা শব্দ—লক্ষ কণ্ঠে বেজে উঠেছিল যেন এক অভিন্ন হৃদস্পন্দন। এক দফা। আর কিছু নয়। আর কোনো সমঝোতা নয়, আর কোনো আশ্বাস নয়, আর কোনো “দেখা যাক” নয়। শুধু একটাই পথ, একটাই লক্ষ্য, একটাই দাবি—পতন।
কী আশ্চর্য এক মুহূর্ত ছিল সেটা, যখন হাজারো পৃথক স্বপ্ন, পৃথক ক্ষোভ, পৃথক কান্না এসে মিশে গিয়েছিল একটামাত্র বাক্যে। কারো ভাই গুলিতে লুটিয়ে পড়েছে রাজপথে, কারো বোন হারিয়েছে চোখের আলো, কারো মা এখনো দরজার দিকে চেয়ে থাকে অপেক্ষায়—তবু সবার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছিল একই আওয়াজ। এ কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না শুধু, এ ছিল এক জাতির যৌথ আত্মার চিৎকার, যে আত্মা বহু বছর ধরে নিঃশব্দে সয়ে গেছে অবিচার, অপমান, আর ভয়ের এক দীর্ঘ শীতনিদ্রা।
এক দফা মানে কী ছিল তবে? এক দফা মানে ছিল—আর নয়। আর নয় গুম হওয়া মানুষের ফিরে না আসা রাত। আর নয় ভোটের নামে প্রহসন। আর নয় ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা এক শাসকের কাছে জবাবদিহিতাহীন আনুগত্য। এক দফা ছিল হাকিমিয়্যাহ্র সেই চিরন্তন প্রশ্নের নতুন উচ্চারণ—কর্তৃত্ব কার? জনতার, না এক ব্যক্তির? ন্যায়ের, না ভয়ের?
আর সবচেয়ে বিস্ময়কর যা ছিল, তা এই যে—এই দাবির পেছনে কোনো এক নেতা ছিলেন না, কোনো একক দল ছিল না। ছিল শুধু কফিনের সারি, ছিল মায়ের আর্তনাদ, ছিল তরুণের বুকে গাঁথা গুলির ক্ষত। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সন্তানকে সন্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চেয়েছিল, তখনই বোধহয় জন্ম নিয়েছিল এই এক দফা—এক অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য জনজোয়ার, যাকে থামানোর সাধ্য আর কোনো সাঁজোয়া যানের ছিল না।
আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই সেই দিনগুলোর দিকে, তখন এক দফা শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়—এ এক প্রশ্নচিহ্ন, যা প্রতিটি প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা কি ভুলে যাব সেই রক্তের দাম? নাকি মনে রাখব যে, একটি জাতি যখন সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো ক্ষমতাই তার সামনে টিকে থাকতে পারে না?
এক দফা তাই শুধু একটি দাবি ছিল না—এ ছিল এক জাতির জেগে ওঠার নাম। আর যে জাতি একবার জেগে উঠতে শেখে, সে আর কখনো পুরোপুরি ঘুমাতে পারে না।
#জুলাইয়ের_জবানবন্দি