11/05/2026
বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা শিক্ষার্থী কমিউনিটির পক্ষ থেকে গভীর শোক, উদ্বেগ ও জবাবদিহির দাবি
বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকার ২৭ ব্যাচের একজন চলমান শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় আমরা, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা, গভীর শোক প্রকাশ করছি। এই অপূরণীয় ক্ষতিতে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা রইল। একজন তরুণ শিক্ষার্থীর এমন অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো শাহীন পরিবার, বর্তমান শিক্ষার্থীসমাজ এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য গভীর বেদনার বিষয়।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, শিক্ষার্থীটি ক্লাস চলাকালীন সময়ে কলেজে উপস্থিত না থেকে কলেজ থেকে দূরবর্তী একটি স্থানে গিয়েছিল এবং সেখানেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা আমাদের সামনে অত্যন্ত গুরুতর কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে। একজন চলমান শিক্ষার্থী কীভাবে নিয়মিত কলেজ সময়ের মধ্যে কলেজের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বাইরে চলে গেল? কলেজ কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি যাচাই, ক্লাস মনিটরিং, গেট পাস, অভিভাবক অবহিতকরণ এবং শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা—এসব প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল? যদি একজন শিক্ষার্থী ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বহু দূরে চলে যেতে পারে, তাহলে কলেজের প্রশাসনিক তদারকি কোথায় ছিল?
আমরা মনে করি, এই ঘটনাকে কেবল “দুঃখজনক দুর্ঘটনা” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন, একটি শৃঙ্খলাগত ব্যর্থতার প্রশ্ন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পরীক্ষার ফলাফল, আনুষ্ঠানিকতা, পোশাকনীতি বা বাহ্যিক শৃঙ্খলার জায়গা নয়; এটি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, উপস্থিতি, আচরণ এবং সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জায়গা।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা লক্ষ্য করছি, কলেজের শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত শিক্ষার্থীকল্যাণের বদলে বাহ্যিক ও আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কলেজ প্রাঙ্গণকে অতিরিক্ত কঠোর, অস্বস্তিকর ও বন্ধ পরিবেশে পরিণত করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কলেজজীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততা কমিয়ে দিচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান যখন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাণবন্ত, নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন শিক্ষার্থীরা সেই পরিবেশ এড়িয়ে বাইরে অনিরাপদ আনন্দের পথ খুঁজতে পারে। এই বাস্তবতা কলেজ কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা আরও মনে করি, কেবল শোকবার্তা প্রকাশ, আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ বা সাময়িক সহানুভূতি যথেষ্ট নয়। কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটার পর “আমরা শোকাহত”—এমন বক্তব্য দেওয়া সহজ; কিন্তু প্রশ্ন হলো, মৃত্যুর আগে প্রতিষ্ঠান তার দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছে? উপস্থিতি যাচাই কোথায় ছিল? ক্লাস ফাঁকি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা কোথায় ছিল? শিক্ষার্থীদের গতিবিধি নিয়ে প্রশাসনিক সতর্কতা কোথায় ছিল? অভিভাবককে দ্রুত অবহিত করার ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও লিখিত তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে—
১. শিক্ষার্থীটি কলেজ সময়ের মধ্যে কীভাবে কলেজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল;
২. সংশ্লিষ্ট দিনে তার উপস্থিতি, ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং কলেজ ত্যাগের বিষয়টি কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল;
৩. কলেজের গেট, ক্লাস মনিটরিং ও প্রশাসনিক নজরদারির কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না;
৪. ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কলেজ কর্তৃপক্ষ কী বাস্তব পদক্ষেপ নেবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে দাবি জানাচ্ছি, কলেজ কর্তৃপক্ষ যেন এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে। শিক্ষার্থীদের ওপর শুধু নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়, বরং তাদের জন্য নিরাপদ, মানবিক, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাণবন্ত কলেজ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শৃঙ্খলা মানে শুধু বাধা দেওয়া নয়; শৃঙ্খলা মানে দায়িত্বশীল তদারকি, কার্যকর উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থী-শিক্ষক সংযোগ, অভিভাবক যোগাযোগ এবং ঝুঁকি প্রতিরোধ।
আমরা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার দায় নির্ধারণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই। কোনো শিক্ষার্থীর জীবন যেন আর অবহেলা, দুর্বল তদারকি বা কেবল আনুষ্ঠানিক শৃঙ্খলার আড়ালে ঝুঁকির মুখে না পড়ে—এটাই আমাদের স্পষ্ট অবস্থান।
শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা আছি। একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃত শোক তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা শিক্ষার্থী কমিউনিটি