21/09/2026
এই কথাগুলো আমি আরও চার-পাঁচ দিন আগেই বলবো বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু কর্মব্যস্ততার কারনে আসলে সময় করে উঠতে পারি নাই। দেরিতে হলেও আজ লিখতে বসলাম।
গত সপ্তাহে বিখ্যাত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট জনাব Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য একটা ভিডিও তৈরী করেছিলেন যেখানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রচলিত ইন্ডিভিজুয়াল ফিজিকাল ফিটনেস টেস্ট বা আইপিএফটি নিয়ে বেশ কিছু বক্তব্য আর প্রশ্ন রেখেছেন। ইতোমধ্যেই তার সেই ভিডিও’র প্রেক্ষিতে আমার বেশ কয়েকজন সিনিয়র তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, হয় লিখে না হয় ভিডিও তৈরী করে। তবুও আমার মনে হল এই ব্যাপারে একান্তই নিজস্ব কিছু কথা আমার বলা প্রয়োজন।
জনাব পিনাকী ভট্টাচার্য আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াইয়ে আমাদেরই একজন সহযোদ্ধা। আমি একাধিকবার তাঁর সাথে অনলাইন টকশো বা পডকাস্ট করেছি, তাঁর ইন্টারভিউ করেছি। ফ্যাসিবাদের পতনের পর তাঁর সাথে আমাদের অনেকের মত পার্থক্য তৈরী হলেও একজন সহযোদ্ধা হিসাবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আমার সবসময়ই থাকবে। কিন্তু তাঁর এই ভিডিও’র প্রতিক্রিয়ায় কিছু কথা আমাকে বলতেই হচ্ছে।
*ট্যাংক দুর্ঘটনার সঙ্গে আইপিএফটির সম্পর্ক কোথায়?*
সপ্তাহখানেক আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে একটা ফিল্ড ফায়ারিং এর সময় ট্যাংকের গোলা বিস্ফোরন দুর্ঘটনায় দুইজন সৈনিক শহীদ হন এবং একজন অফিসার গুরুতর আহত হন। আহত সেই অফিসার এখনও চিকিৎসাধীন। তো জনাব পিনাকী সেই দুর্ঘটনায় দুই সৈনিক পিয়াস ও রিফাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে নিয়ে গেলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটা বিষয়ে - যেটা হচ্ছে আইপিএফটি।
*বেনামি চিঠি—তথ্যের ভিত্তি কতটা নির্ভরযোগ্য?*
আইপিএফটি নিয়ে তার এই সম্পূর্ণ আলোচনার ভিত্তি ছিল নাম পরিচয়বিহীন তথাকথিত একজন সৈনিকের লেখা একটা বেনামী চিঠি। এই চিঠিতে লেখা কিছু কথা এবং জনাব পিনাকীর দাবি অনুযায়ী সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারের সাথে আলোচনা করেই তিনি এই ভিডিও তৈরী করেছেন।
ভিডিও’র শুরুতে তিনি পানিশূন্যতা, হিট এক্সোশন এবং হিট স্ট্রোক নিয়ে সাধারন মানুষের বোঝার উপযোগী করে খুব সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু এরপরেই সেই কথিত সৈনিকের বেনামী চিঠির উপর ভিত্তি করে যে সমস্ত তথ্য তিনি আলোচনা করলেন তাতে আমার সন্দেহ বেশ দৃঢ় যে আদৌ এই চিঠি কোন সৈনিকের লেখা কিনা।
*আইপিএফটিতে সবার মানদণ্ড কি একই?*
এই চিঠির উপর ভিত্তি করে তিনি বললেন, আইপিএফটিতে নাকি সবাইকে একই মানদন্ডে ফেলে বিচার করা হয়। তিনি উদাহরন দিয়ে বললেন, ২২ বছর বয়সী একজন আর ৪০ বছর বয়সী একজন নাকি একই স্ট্যান্ডার্ডে আইপিএফটি দিবে! এরচেয়ে হাস্যকর কিছু আর হতে পারে না! বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আইপিএফটির ২০২০ সালের সর্বশেষ যে নীতিমালা, সেখানে ৫টা বয়সভিত্তিক গ্রুপ আছে - ২৫ বছরের নিচে, ২৫ থেকে ৩০, ৩০ থেকে ৩৫, ৩৫ থেকে ৪০ এবং ৪০ থেকে ৪৫। এই সর্বশেষ ৪০ থেকে ৪৫ বছরের গ্রুপটা আবার শুধুই পুরুষ সেনাসদস্যদের জন্য। ৪০ এর পর থেকে নারীদেরকে অব্যহতি দেওয়া হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অব্যহতিটা ৪৫ এর পর। এবং এই নীতিমালা অফিসার, জেসিও, সৈনিক - সবার জন্যই একই ভাবে প্রযোজ্য। উদাহরনস্বরুপ, আইপিএফটির একটা আইটেম - ধরি ৩ কিলোমিটার দৌড় - বয়স এবং লিঙ্গ অনুযায়ী, একেক গ্রুপের পাস করার সময় আলাদাভাবে নির্ধারন করা। অবশ্যই ৪০ বছর বয়সী কাউকে সেখানে ২৫ বছর বয়সী কারও জন্য নির্ধারিত সময়ে পাস করতে বলা হবে না।
*ইঞ্জুরি বা অসুস্থতা থাকলে কী হয়?*
তিনি বললেন, চোট নিয়ে দৌড় দেওয়ার কথা। কারো যদি এমন কোন চোট বা ইঞ্জুরি থাকে যার কারনে তার পক্ষে স্বাভাবিক সামরিক দায়িত্ব পালন কষ্টসাধ্য হয়ে যায়, সেনাবাহিনীতে তাদের জন্য মেডিকেল ক্যাটাগরি ডাউন করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সব দিক থেকে যে ফিট, তার ক্যাটাগরি এ। কেউ যদি কোন কারনে মেডিকেল ক্যাটাগরি ডাউন হয়ে বি বা সি ক্যাটাগরিতে তে চলে যায়, যতদিন পর্যন্ত সেই ব্যক্তি আবার ক্যাটাগরি এ ভুক্ত না হবে, তাকে আইপিএফটি করা থেকে অব্যহতি দেওয়া হবে। ক্যাটাগরি আপগ্রেড করার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট একটা পদ্ধতি আছে যেখানে একাধিক ডাক্তারের সমন্বয়ে গঠিত একটা মেডিকেল বোর্ড তার শারীরিক সুস্থতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তার ক্যাটাগরি আপগ্রেড করবে।
*রাতের ডিউটির পরই কি আইপিএফটি?*
তিনি বললেন, আগের রাতে গার্ড ডিউটি করা মানুষকেও নাকি আইপিএফটিতে শামিল করা হয়েছে, যে কিনা আগের রাতে মাত্র দুই ঘন্টা ঘুমিয়েছে। আবারও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটা তথ্য! সেনাবাহিনীর যে কোন ইউনিটে সদ্য যোগ দেওয়া একটা সৈনিকও জানে, রাতের গার্ড ডিউটি কিভাবে বন্টন করা হয়, খুবই বেসিক একটা নলেজ এটা। সন্ধ্যা ৬ টা থেকে শুরু করে পরের দিন ভোর ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টার ডিউটিকে ভাগ করা হয় ৩ শিফটে। প্রতিটা শিফটের ক্ষেত্রেই, ২ ঘন্টা ডিউটি ৪ ঘন্টা রেস্ট - এই রোটেশন অনুসরন করা হয়। অর্থ্যাৎ, যে সৈনিক প্রথম শিফটে ৬ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত ডিউটি করবে, সে ৮ টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিশ্রামের সুযোগ পাবে। আবার সে ১২ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত ডিউটি করে করে, ২ টা থেকে ৬ টা পর্যন্ত বিশ্রামের সুযোগ পাবে। এবং, তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, লাস্ট শিফটের কাউকেই সকালের সাধারন কোন পিটি বা আইপিএফটিতে শামিল করা হয় না। পরের দিন কোন আইপিএফটি থাকলে, আইপিএফটিতে অংশ গ্রহণকারী সবার আগের রাতের ডিউটি সেভাবেই বন্টন করা হয়।
*এপ্রিল-মে মাসে বেলা ১১টায় আইপিএফটি?*
সবচেয়ে হাস্যকর যে প্রশ্নটা তিনি করলেন - এপ্রিল/ মে মাসে বেলা ১১টায় কেন আইপিএফটি নেওয়া হচ্ছে? ভিডিওর এই জায়গায় এসে আমার সন্দেহ অনেকটাই চলে গেল - এই চিঠি নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোন সৈনিক লিখে নাই। সদ্য ইউনিটে যোগ দেওয়া কোন নবীন সৈনিক তো অনেক দূরের কথা, একজন রিক্রুটও জানে, যে আইপিএফটি অনুষ্ঠিত হয় মৌসুমভেদে, গরমের সময়; অর্থ্যাৎ যখন সূর্যোদয় আগে হয়, তখন সকাল ৬টায়। আর শীতের সময় সাড়ে ৬টায়। তর্কের খাতিরে ধরে নেই, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ১১টায় মাইল টেস্ট নেওয়া হয়। আমি নিজে আমার বেসিক কমান্ডো কোর্স বা প্যারাট্রুপিং কোর্সের সময় দিয়েছি। সকাল ১১টায় কেন, ভর দুপরে ১২-১টার সময়ও দিয়েছি। কিন্তু সেটা স্পেশালাইজড ট্রেনিং এর জন্য; নিয়মিত আইপিএফটির জন্য না। আর এই ট্রেনিংটাও আমাদের থাকা প্রয়োজন। যুদ্ধের সময় তো শত্রু আমার আরাম আয়েশের কথা চিন্তা করে, আমার কখন কষ্ট কম হবে, সেটা হিসাব করে আমাকে আক্রমন করবে না। আমাকে সব ধরনের পরিস্থিতি, সব ধরনের আবহাওয়ার জন্যই নিজেকে তৈরী করে রাখতে হবে।
*বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও রয়েছে বয়সভিত্তিক চার্ট*
তিনি ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে ইউএস আর্মির একটা চার্ট দেখালেন যে কিভাবে সেখানে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে ফিটনেস টেস্ট নেওয়া হয়। একই চার্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও আছে। এগুলোকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিএও (বাংলাদেশ আর্মি অর্ডার) বা এসবিএও (স্পেশাল বাংলাদেশ আর্মি অর্ডার) বলি। এখন বাংলাদেশে মিডিয়া বা ওপেন সোর্সে এসমস্ত জিনিস প্রকাশ করা হয় না দেখে এর মানে এই না যে এরকম চার্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নেই। সাধারনত, ইউনিটের সৈনিকদের ব্যারাকের সামনেই বড় বোর্ডে বা ব্যানার টানিয়ে সম্পূর্ণ আইপিএফটি চার্ট সেখানে লেখা থাকে, যেন সবাই ঢুকতে বের হতে সেটা দেখতে পারে। সেই বয়সভিত্তিক চার্ট মেনেই সেনাবাহিনীতে ফিটনেস টেস্ট নেওয়া হয়, যেটা একটু আগেই আমি ব্যাখ্যা করেছি।
*অসুস্থ বা আহত হলে আইপিএফটি বাধ্যতামূলক নয়*
আহত বা অসুস্থ থাকলে কাউকেই আইপিএফটি দেওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় না। আমি নিজে আইপিএফটি বোর্ড মেম্বার হিসাবে অসংখ্য আইপিএফটি নিয়েছি। আইপিএফটি’র ফল-ইন এর সামনে দাঁড়িয়ে স্টপ ওয়াচ হাতে নেওয়ার আগেই প্রথম যে প্রশ্নটা আমি সবসময় করতাম, সবাই সুস্থ আছে কিনা? সবাই আইপিএফটি দেওয়ার জন্য ফিট কিনা? কেউ যদি আইপিএফটি দিতে অসমর্থ থাকতো, তাকে আইপিএফটিতে সেদিনের জন্য অব্যহতি দেওয়া হত। তবে সেই ব্যক্তি যদি মেডিকেল ক্যাটাগরি এ ভুক্ত হয়, নিজ দায়িত্বেই তাকে অন্য আরেকদিন অন্য কোন গ্রুপের সাথে আইপিএফটি করে ফেলতে হতো।
*কানাডা ও ইজরায়েল: প্রেক্ষাপট কি এক?*
তিনি কানাডা বা ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর উদাহরন টেনেছেন - যেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন একই মাঠে দাঁড়ানো দুইজন ব্যক্তির জন্য দুই রকমের স্ট্যান্ডার্ড সেট করা থাকে। ইজরায়েলি সেনাবাহিনীতে পরিচালিত হিট টলারেন্স টেস্টের উদাহরন তিনি টেনেছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো খুবই চমৎকার রেফারেন্স। কিন্তু কানাডা বা ইজরায়েলে কোন কিছুর প্রচলন থাকলেই যে সেটা আমাদেরও প্রয়োজন হবে, ব্যাপারটা কি এরকম? কানাডা পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে অভিবাসীবান্ধব দেশগুলোর একটি। তার মোট জনসংখ্যার ২৩% হচ্ছে অভিবাসী। পৃথিবীর নানাপ্রান্তের, নানা আবহাওয়া, জলবায়ু এবং জেনেটিক্সের মানুষ কানাডায় যাচ্ছে, সেখানকার সেনাবাহিনীতেও তারা যোগ দিচ্ছে। কানাডার প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়ায় আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ থেকে যাওয়া কারো পক্ষে মানিয়ে নেয়াটা সহজ কোন কাজ না। অন্যদিকে ইজরায়েলের সেনাবাহিনী একটা বড় অংশই হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসন করে ইজরায়েলে চলে যাওয়া বা হিব্রু ভাষায় ‘আলিয়া’ করা ইহুদী জনগোষ্ঠী থেকে আসা। তার উপর মধ্যপ্রাচ্যের প্রচন্ড গরমে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের কোন দেশ থেকে যাওয়া একজন মানুষের জন্য নিজেকে এডজাস্ট করানোটা সহজ কোন কাজ না। সুতরাং, তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তাদেরকে এই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশে এধরনের কোন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়, যথা সময়ে সেটা বিবেচনা করা যেতেই পারে।
*আইপিএফটি থেকে সিনিয়র অফিসারদের প্রসঙ্গ কেন?*
ভিডিও’র শুরুটা হয়েছিল, ট্যাংকের গোলা বিস্ফোরন দুর্ঘটনায় দুই সৈনিকের প্রাণহানি দিয়ে, সেখান থেকে অপ্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসলো আইপিএফটি, সেখান থেকে আরও অপ্রাসঙ্গিকভাবে শুরু হয়ে গেল সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের বিরুদ্ধে বিষোদগার। এই জায়গায় এসে তিনি তার আলোচনায় সিনিয়র অফিসার আর সৈনিকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন।
*ফিটনেস টেস্ট ও নীতিমালার ধারাবাহিক পরিবর্তন*
আমি নিজে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সামরিক বাহিনীর সিনিয়রদের নিষ্ক্রিয় ও তাঁবেদারি ভূমিকার কম সমালোচনা করি নাই; এখনও সেটা আমি করি। কিন্তু এই আইপিএফটির ব্যাপারে অফিসারদের ব্যাপারে বা সিনিয়র অফিসারদের ব্যাপারে তিনি যে মন্তব্য করলেন, সেটা একেবারেই অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিক ছিল। তাঁর ভাষ্যমতে শুধু বিদেশে ট্রেনিং, সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে আসা অফিসাররা কেউ কিছু শিখছে না। আমার ধারনা এখানে তিনি মীন করছেন, বিদেশ থেকে এসমস্ত আধুনিকায়নের ব্যাপারে কোন কিছু অফিসাররা শিখে আসছে না। তাঁর জ্ঞাতার্থে জানাতে যাই, ১৯৯০ সাল থেকে নিয়ে আজ অবধি গত ৩৬ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফিটনেস টেস্ট এবং তার নীতিমালা ৫ বার রিভিউ এবং রিভাইজ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীতে আমার চাকরিকাল বেশি না, মাত্র সাড়ে বারো বছর। এই সাড়ে বারো বছরে আমি নিজে ৩ ধরনের ফিটনেস টেস্ট দিয়েছি। ২০০৬ সালে আমি যখন কমিশন পাই, সেই আমলের ফিটনেস টেস্টের নাম ছিল ফিজিকাল এফিশিয়েন্সি টেস্ট বা পিইটি। ২০১১ সালে সেটা রিভাইজ হয়ে টেস্টের আইটেম বদলে তার নতুন নাম হয় বর্তমানের ইন্ডিভিজুয়াল ফিজিকাল ফিটনেস টেস্ট বা আইপিএফটি। ২০১৮ সালে সেটা আবারও পরিবর্তন হয়; আমি চলে আসার পর ২০২০ সালে আবারও সেটা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান অবধি সেটা চলছে। আমার ধারনা ভবিষ্যতেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় সময় এই ফিটনেস টেস্ট বা তার নীতিমালা রিভিউ এবং রিভাইজ করা হবে।
*WBGT মিটার: একটি গঠনমূলক প্রস্তাব*
এত নেতিবাচক পয়েন্টের ভেতরে তিনি একটা ভালো পয়েন্ট অবশ্যই বলেছেন - WBGT মিটারের ব্যবহার। ইউএসএ, ইউকে, ন্যাটোভুক্ত অধিকাংশ দেশ, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সহ আধুনিক অনেক সেনাবাহিনীতেই WBGT মিটার ব্যবহারের প্রচলন আছে। অবশ্যই এটা একটা গঠনমূলক পয়েন্ট ছিল।
*পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে উন্নতির সুযোগ*
আমি কখনই দাবি করছি না, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রচলিত সব কিছুই ১০০% পার্ফেক্ট। পৃথিবীতেই কোন কিছুই ১০০% পার্ফেক্ট না। সবকিছুরই উন্নতির অবকাশ আছে। আমি আশা করছি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও ভবিষ্যতে এই ধরনের ইভালুয়েশন, রিভিউ এবং রিভিশন জারি রাখবে।
*আইপিএফটি শেষে দুই সেনাসদস্যের মৃত্যু*
ভিডিও’র শুরুতেই তাঁর সম্ভবত খুব আবেগী একটা হুক লাইন দরকার ছিল। তাই, তিনি সবাইকে ট্যাংক দুর্ঘটনায় নিহত সৈনিক পিয়াস ও সৈনিক রিফাত - এই দুই সৈনিকের নাম মনে রাখতে বললেন। যদিও আইপিএফটির সাথে তাদের মৃত্যুর কোনই সম্পৃক্ততা ছিল না। শেষ করার আগে আমি না হয় অন্য দুটো নাম বলে যাই - ল্যান্স কর্পোরাল ইসরাইল হোসেন এবং লেঃ কর্নেল আকিব জাভেদ। ল্যান্স কর্পোরাল ইসরাইল এ বছর ২৩ এপ্রিল আইপিএফটি শেষ করে সকাল ৭ টার দিকে নিজ ব্যারাকে ফিরে যায়। সেখানে হঠাৎ করে অচেতন হয়ে গেলে তাকে নিকটস্থ সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন। লেঃ কর্নেল আকিবকে আমি চিনতাম, আমার অল্টার্নেট জুনিয়র কোর্সের একজন অফিসার ছিল। খুবই বিনয়ী এবং অমায়িক একজন মানুষ, সাভারে একটা ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল। এবছর ১৩ মে আইপিএফটিতে ১ মাইল বা ১.৬ কিলো দৌড় শেষ করার পর হঠাৎ করেই সে অচেতন হয়ে যায়। তাৎক্ষনিকভাবে তাকে সিএমএইচে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
পরপর দুই মাসে সেনাবাহিনীর দুইজন সদস্য, যারা প্রায় আমার সমবয়সী (অর্থ্যাৎ, ৪০ এর আশেপাশে বয়স), আইপিএফটি শেষে মৃত্যুবরণ করেছেন - একজন সৈনিক, একজন অফিসার। খুবই বেদনাদায়ক একটা ব্যাপার। এবং সেটা নিয়ে নিঃসন্দেহে চিন্তাভাবনার সুযোগ আছে। কিন্তু এই জন্য ঢালাওভাবে সেনাবাহিনীকে বা আইপিএফটিকে দোষারোপ করাটাও যৌক্তিক না। বিগত কয়েক বছরে আমি আমার সমবয়সী বা আমার থেকে কম বয়স্ক অনেক মানুষকেই কিডনী, লিভার এবং বিশেষ করে হার্টের বিভিন্ন অসুস্থতাজনিত কারনে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি; তারা কেউই সামরিক বাহিনীতে চাকরিরত কেউ ছিল না। তাদের মৃত্যুর জন্যও আমি কি আইপিএফটি কে দোষ দেব? বরং, আমাদেরকে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত বিষয়ে বিস্তর গবেষনার কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের এয়ার কোয়ালিটির কথা ভাবতে হবে, আমাদের ফুড হ্যাবিটের কথা ভাবতে হবে, বাজার থেকে আমরা যা যা কিনে খাচ্ছি, সেগুলোর কোয়ালিটি নিয়ে ভাবতে হবে, যেই সয়াবিন তেল দিয়ে আমি খাবার রান্না করছি, সেটার ব্যাপারে ভাবতে হবে।
*শেষ কথা*
সেনাবাহিনীর ভেতরে আইপিএফটির আধুনিকীকরন, বা পিরিয়ডিক রিভিউ এন্ড রিভিশন একটা চলমান প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে আমি আশা করব, সংশ্লিষ্ট সবাই মনোযোগ দিবেন। কিন্তু একই সাথে সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে সবাইকেই আমি অনুরোধ করব কোন স্পর্শকাতর বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে বা না বুঝেই কোন উপসংহারে চলে যাবেন না। সেনাবাহিনী টিকেই আছে, কমান্ডার এবং আন্ডার কমান্ড; অফিসার এবং সৈনিকদের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সহমর্মিতার উপর। আমার সৈনিকের যদি আইপিএফটি করতে কষ্ট হয়, অফিসার হিসেবে সেই একই কষ্ট তো আমাকেও করতে হবে। আমি যদি একজন অফিসার হিসাবে মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট দিয়ে আমার সৈনিককে মেরেই ফেলি, আমি কাকে কমান্ড করব? আমরা কেউ যেন এমন কোন কিছু না করি বা না বলি যার ফলে কারো মনে কোন রকম বিভ্রান্তি তৈরী হয়।
সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।
Credit: https://www.facebook.com/shafayat.ahmad.5