30/12/2025
এক ছিলেন এক অতি সৎ ও ধার্মিক যুবক। নাম তার জুনাইদ। সে ছিল গরিব, কিন্তু হৃদয়ে এমন ঈমানের নূর যে, মানুষ তাকে দেখলেই বলত, “এ যেন জীবন্ত ওলি।” তার স্ত্রী ফাতেমাও ছিলেন অসম্ভব রূপসী এবং চরিত্রে পবিত্র। দুজনের সংসারে ছিল না অভাবের কষ্ট ছাড়া আর কিছু, কিন্তু ছিল অগাধ ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি ভয়।
একালে এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষ পড়ল। গ্রামের পর গ্রাম খালি হয়ে গেল। জুনাইদের ঘরেও তিন দিন ধরে অন্নের একটি দানা নেই। ফাতেমা ক্ষুধায় কাতর হয়েও স্বামীকে বললেন, “আমি তো ক্ষুধায় মরব না। কিন্তু তুমি হজে যাওয়ার মানতো টাকা কোথায় পাবে? আল্লাহ যদি চান, একদিন না একদিন হজ করাবেন।”
জুনাইদ বললেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বাইতুল্লাহ শরিফের দর্শন। যদি আল্লাহ এবার না নিয়ে যান, আর কবে নেবেন?”
ঠিক সেই সময়ে গ্রামের এক ধনী ব্যবসায়ী এসে বলল, “জুনাইদ, আমার কাফেলা হজে যাচ্ছে। তুমি আমার মালামালের দেখাশোনা করবে, বিনিময়ে তোমার হজের সব খরচ আমি দেব।” জুনাইদ আনন্দে কেঁদে ফেললেন।
হজে যাওয়ার আগে জুনাইদ স্ত্রীকে বললেন, “আমি না থাকতে আমার বড় ভাই হাসান তোমার দেখাশোনা করবে। সে আমার চেয়েও বেশি তোমাকে ভালোবাসে।”
কিন্তু হাসানের মনে ছিল কালো ছায়া। জুনাইদ চলে যেতেই সে ফাতেমার কাছে গিয়ে কুপ্রস্তাব দিল। ফাতেমা কঠোর গলায় বললেন, “আমার স্বামী তোমার ছোট ভাই, আমি তোমার ভাবি। আল্লাহর কসম, এমন কথা আর মুখে এনো না।”
হাসান লজ্জায় ও ক্রোধে জ্বলে উঠল। সে গ্রামে রটিয়ে দিল, “ফাতেমা চরিত্রহীনা। আমি নিজের চোখে দেখেছি সে পরপুরুষের সাথে...” চারজন দুর্নামকামী লোককে টাকা দিয়ে সাক্ষী বানাল। কাজী ফাতেমাকে রজমের (পাথর মারার) হুকুম দিলেন।
পাথরের আঘাতে ফাতেমা আধমরা হয়ে গেলেন। রাতের অন্ধকারে কবরখানার পাশে ফেলে দেওয়া হল তাঁকে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে ছিলেন। এক ফকির তাঁকে দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে নিয়ে চিকিৎসা করলেন। অনেক দিন পর ফাতেমা সুস্থ হলেন।
সুস্থ হওয়ার পর ফকির বললেন, “বেটি, এখানে থাকলে আবার বিপদ হবে। তুমি আমার সাথে মদিনায় চলো।” ফাতেমা রাজি হলেন। পথে এক জায়গায় ডাকাত পড়ল। ফকিরকে হত্যা করল, আর ফাতেমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের সর্দারের হাতে তুলে দিল।
সর্দার ফাতেমার রূপ দেখে মুগ্ধ। বলল, “তুমি আমার বেগম হও।” ফাতেমা বললেন, “আমি বিবাহিতা।”। সর্দার হাসল, “তোমার স্বামী হয়তো মরেই গেছে।” ফাতেমা আবার প্রত্যাখ্যান করলেন।
তখন সর্দার রেগে গিয়ে তাকে একটা পুরনো কূপে ফেলে দিল। কূপটা এত গভীর যে নিচে পড়ে মানুষ আর বেঁচে না। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে কূপের নিচে একটা গুহা ছিল, আর সেখানে পানি। ফাতেমা বেঁচে গেলেন।
কয়েকদিন পর একদল মানুষ সেই কূপে পানি খুঁজতে এল। তারা ফাতেমাকে দেখে অবাক। তুলে নিয়ে এক শহরে বিক্রি করে দিল দাসী হিসেবে। ক্রেতা ছিল এক ইহুদি ধনী। তার স্ত্রী ছিল না, সে ফাতেমাকে বিয়ে করতে চাইল। ফাতেমা আবার না বললেন। তখন ইহুদি রাগ করে তাকে শেকলে বেঁধে রাখল।
একদিন ইহুদির বাড়িতে আগুন লাগল। সবাই পালাল, কিন্তু ফাতেমা শেকলে বাঁধা। তিনি আল্লাহকে ডাকলেন, “ইয়া আল্লাহ! তুমি যদি আমাকে নির্দোষ জেনে থাকো, আমাকে বাঁচাও।” সাথে সাথে শেকল খুলে গেল, আর আগুন তাঁকে স্পর্শ করল না। তিনি বেরিয়ে এলেন।
শহরের লোকেরা এই অলৌকিক ঘটনা দেখে তাঁকে “নবীর বোন” বলে ডাকতে লাগল। খবর রাজদরবারে পৌঁছাল। রাজা নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি ফাতেমাকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং বললেন, “আমি মরার আগে তোমাকেই রাজা বানিয়ে যাব।” লোকেরা প্রথমে অবাক হল, কিন্তু ফাতেমার ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও অলৌকিক ক্ষমতা দেখে সবাই মেনে নিল।
বহু বছর পর জুনাইদ হজ থেকে ফিরলেন। দেখলেন ঘর নেই, স্ত্রী নেই। ভাই হাসান অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। হাসান কাঁদতে কাঁদতে সব সত্য বলল। জুনাইদের মাথায় বাজ পড়ল।
তারপর শুনল এক নেককার রাজা আছেন, যাঁর দোয়ায় অসুখ সারে। তিনি হাসানকে, সেই ডাকাত সর্দারকে (যে এখন পঙ্গু), আর সেই ইহুদিকে (যে আগুনে পুড়ে বীভৎস হয়ে গিয়েছিল কিন্তু বেঁচে ছিল) নিয়ে সেই রাজার দরবারে হাজির হলেন।
রাজা (যিনি ফাতেমা) সবাইকে চিনলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে চিনল না। তিনি বললেন, “তোমরা পাপ স্বীকার না করলে দোয়া হবে না।” তিনজনেই কেঁদে কেটে নিজেদের জঘন্য কাজের কথা বলল।
তখন ফাতেমা পর্দা সরিয়ে বললেন, “আমিই সেই ফাতেমা। যাকে তোমরা মেরে ফেলেছিলে, বিক্রি করেছিলে, কূপে ফেলেছিলে।”
সবাই হতভম্ব। ফাতেমা দোয়া করলেন, তিনজনেই সুস্থ হয়ে উঠল। তারপর তিনি জুনাইদের হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে বললেন, “আমার আর কিছু চাই না। আমি শুধু আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে চাই।”
বলেই তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন এবং সেখানেই তাঁর রূহ কবজ করা হল।
লোকেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আজ আমরা একজন ওলিয়ে কামেলাকে হারালাম।”
ধৈর্য আর তাকওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের কত উঁচুতে তুলে দেন, এ গল্প তারই প্রমাণ।