29/09/2025
_*হিন্দুদের পূজার উৎসবে যাওয়া ও পূজার প্রসাদ খাওয়া হালাল না হারাম?*_
এই প্রস্বাদ নামক খাবারটা দেওয়া হয় হিন্দুদের মনগড়া নকল দেবতার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ হিন্দুরা নিজের হাতে নির্মিত বিভিন্ন মূর্তির, যার কোন ক্ষমতাই নেই, সেই নকল দেবতার উদ্দেশ্যে প্রসাদ দেন হিন্দুরা। অথচ, সনাতন ধর্মেই প্রতিমা পূজা নিষেধ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুর'আনের মোট চার জায়গায় উল্লেখ করেছেন-
* সূরাহ বাকারার ১৭৩নং আয়াতে,
* সূরাহ মায়িদাহ’র ৩নং আয়াতে,
* সূরাহ আন’আমের ১৪৫ নং আয়াতে,
এছাড়াও, সূরাহ নাহলের ১১৫নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
“আল্লাহ্ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস খাওয়া। আর যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে”
অর্থাৎ যা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয় সেটা আমাদের জন্য আল্লাহ্ হারাম করে দিয়েছেন। আর এই কারনেই পূজার প্রস্বাদ খাওয়া হারাম।।।
* এখন আসি পূজার অনুষ্ঠানে মুসলিমদের যাওয়ার বিষয়ে- আমাদের দেশে যখন হিন্দুদের পূজার উৎসব চলতে থাকে তখন অনেক মুসলিম-ই তাদের ঐ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে। ঐ অনুষ্ঠানে উপভোগ করে।অনেকে উৎসুক ভাবেই যায়। ঐ সমস্ত মুসলিমদের যদি বলি- ভাই হিন্দুদের পূজায় অংশগ্রহন করো না, উৎসুক ভাবেও যেও না, তাদের দেব-দেবীর নামে উৎসর্গকৃত প্রসাদও খেওনা।।।
তখন তারা উত্তরে খুব বুক ফুলিয়েই বলে-গেসি তো কি হয়েছে ???
গেলেই কি আমি হিন্দু হয়ে যাব ??? আমার ঈমান ঠিক আছে।এখন একটু ভেবে দেখুন,মূর্তিপূজা হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা।আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় অন্যায়, সবচেয়ে বড় অপরাধ।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
নিশ্চয়ই আল্লাহ্-র সাথে শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় অন্যায়।(সুরা লুকমানঃ ১৩)
আর শিরকের অপরাধ আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন :
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করবেন না,কিন্তু এর চেয়ে ছোট পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন,এবং যে কেউ আল্লাহর অংশী স্থির করে, সে মহাপাপে আবদ্ধ হয়েছে।
(সূরা নিসাঃ ৪৮)।
এখন দেখুন,সবচেয়ে বড় অন্যায় আপনার সামনে হচ্ছে। আর রাসুল (সাঃ) বললেন-
''তোমাদের কেউ কোন গর্হিত/ অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন নিজের হাতে (শক্তি প্রয়োগে)তা সংশোধন করে দেয়,যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে তবে যেন মুখ দ্বারা তা সংশোধন করে দেয়, আর যদি তাও না পারে তবে যেন সে ঐ কাজটিকে অন্তর থেকে ঘৃণা করবে। আর এটা হল ঈমানের নিম্নতম স্তর।'' [সহিহ মুসলিম,ঈমান অধ্যায়, হাদিস নং ৭৮]
অথচ আপনি ঐ অন্যায়কে বাঁধা তো দেনই না, মনথেকেও ঘৃণা করেন না বরং ঐ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে মনে মনে উপভোগ করেন। অন্তত মন থেকে ঘৃণা করলেও দুর্বলতম ঈমানদার হিসেবে আপনার ঈমান থাকত।
তাই হিন্দুদের পূজার উৎসবে কোন মুসলিমের যাওয়া হারাম।।।
------------------------------
*প্রশ্নঃ- অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো যাবে কি?*
*উত্তরঃ-*
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর। দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূল (সা) এর উপর। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।*
আল্লাহর সাথে শরিক করে,আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে,স্রষ্টা মনে করে, অন্য যা কিছুর পূজা করা হয়, কাউকে আল্লাহর সন্তান বলে (নাউযুবিল্লাহ)
যে দিবস পালন করা হয়, কিংবা আল্লাহ নিজেই এই দিনে মানবরুপে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ) বলে বিশ্বাস করে যে দিন উদযাপন করা হয়, মূর্তি/গাছ/মানব/দানব/চন্দ্র/সূর্য/পাথর/জ্বীন/শয়তান ইত্যাদির পূজা করে উপাসনা করে যেসব দিবস পালন করা হয়, এই দিবসগুলোতে একজন মুসলমানের বিধর্মীকে শুভেচ্ছা জানানো উইস করা কার্ড দেয়া গিফট পাঠানো ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম ও শির্ক-এ-আকবার উদযাপনের শামিল।
অতএব মুসলমানদের বুঝতে হবে সতর্ক থাকতে হবে ম্যারি ক্রিসমাস, হ্যাপি দিওয়ালী, পূজার শুভেচ্ছা, ইত্যাদি উইস করার মাধ্যমে ক্ষমার অযোগ্য সর্বনিকৃষ্ট মহাপাপ শির্কে যেনো আমরা জড়িয়ে না পড়ি। এটা সুস্পষ্ট কুফরি ও সম্পূর্ণ শির্কি ভ্রান্ত বিশ্বাস উদযাপনের নিকৃষ্ট এক দিবস। সুতরাং এই দিনে ম্যারি ক্রিসমাস বলে উইস করা, কার্ড দেয়া গিফট দেয়া সম্পূর্ণ হারাম ও শির্ক-এ-আকবার। কুফরির শেষ পর্যায়।
মহান আল্লাহ্ বলেন, “নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।” (সূরা আল ইমরানঃ১৯)
"হে লোক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না, প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন।" [সূরা হজঃ ৭৩]
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন।" [সূরা আন নিসাঃ১১৬]
ঘরের পাশে যে উৎসবটিতে স্বয়ং আল্লাহকে চরমভাবে অপমান করা হয় সে দিন আমরা সবাইকে ‘মেরি ক্রিসমাস’ জানাই, “শারদীয় শুভেচ্ছা” জানাই! আল্লাহর অপমান আমাদের গায়ে তো লাগেইনা বরং সেটাতে আনন্দের তকমা দেই। দুঃখজনক!!! শিরক সম্পর্কে আল্লাহ বলেন -
আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা সবচেয়ে বড় জুলুম। (সূরা লোকমানঃ 13)
জুলুম বলতে আমরা বুঝি অন্যায়, অপরাধ। শিরককে আল্লাহ সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘোষণা দিয়েছেন। এখন এই শিরকের অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা জানানো মানে হল কাউকে খুন করা, বা ধর্ষণ করার পর শুভেচ্ছা জানানোর অনুরুপ।
কেউ ধর্ষণ, হত্যা করে আসলে কি আপনারা বলেন , শুভ ধর্ষণ , শুভ হত্যা।
না তা কিন্তু কেউ বলে না। আর বলা মানে সে এটাকে সাপোর্ট দিচ্ছে।
“অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে” (ইউসুফঃ ১০৬)
কীভাবে ??
কোন হিন্দুকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা-সম্ভাষণ জানানো অর্থ তার এই পূজা করাতে আপনার সায় আছে। আপনাকে যদি আজকে ‘বাস্টার্ড’ গালি দেওয়া হয় তাহলে আপনি রেগে তেড়ে আসবেন, পিতৃত্বে শরিক করলে আমাদের আঁতে ঘাঁ লাগে…
অথচ যে আল্লাহ আমাদের অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনলেন, প্রতি মুহূর্ত অক্সিজেন দিচ্ছেন ফ্রি, আহার-পানীয়-পোশাকের ব্যবস্থা করে দিলেন সেই আল্লাহর সাথে প্রতিনিয়ত শরিক করা হলেও আমাদের ভ্রুটাও অবধি কুচকে উঠেনা। সেই আল্লাহর জায়গায় মাটির একটা মূর্তি বসিয়ে করা পূজা দেখে শুভেচ্ছা জানায় – শারদীয় শুভেচ্ছা। এখন আপনিই বলেন এই কাজটা কি শিরক না ?
ইমাম হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহ:) তার ‘আহকাম আহ্ল আল-দিম্মা’ গ্রন্থে বলেন কাফিরদের তাদের উৎসবে সম্ভাষণ জানানো মুসলিম ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ আমাদের ইসলাম জানার, বোঝার এবং বুঝে মানার সামর্থ্য দিন। আমিন….।
জাহেলি যুগেও রাসুল (সা) ও তার সাহাবীরা মূর্তিপূজারকদের যেকোন অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন, নিষেধ করেছেন। কারন সেখানে সরাসরি “শিরক” হচ্ছে। আর অন্যান্য অনৈসলামিক কর্মকান্ড তো হচ্ছেই। কাফিরদের যে কোন উৎসবে অংশগ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য হারাম।
*উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন, "তোমরা মুশরিকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনগুলোতে প্রবেশ করো না। কারণ সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হতে থাকে।"*
*(ইবনুল ক্বাইয়্যিম(রাহিঃ) তাঁর 'আহকামুল জিম্মাহ ১/৭২৩-৭২৪ এ সহিহ সনদে বায়হাক্বী থেকে এই রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।)*
মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম(আঃ) মূর্তিপূজকদের উদ্দেশ্যে বলেন, "তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।" [সূরা মুমতাহিনাঃ ৪]
একজন মুসলিম কি তবে একজন হিন্দু প্রতিবেশীর শুভ কামনা করবে না? তার খ্রীষ্টান সহপাঠীর ভালো চাইবে না? নিশ্চয়ই চাইবে। ভাল চাওয়ার প্রথম কাজটাই হবে তাকে আল্লাহর একত্ববাদ বোঝানো, তাকে সে দিকে আহবান জানানো। একজন মানুষকে অনন্তকালের জন্য আগুনে পোড়া থেকে বাচাঁনোর চেয়ে আর ভাল কাজ কি হতে পারে? অমুসলিম ভাই-বোনদের সাথে সামাজিক লেনদেন কুশল বিনিময় বিপদে আপদে সাহায্য করা, মানবিক প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ইত্যাদি আমাদের মানবিক দায়িত্ব কর্তব্য।
কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার তাওফিক দিন। আমিন।
-----------------------
*মুসলিমরা কি অমুসলিমদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনা?*
((5:51 সূরা মায়েদাহ))
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصٰرٰىٓ أَوْلِيَآءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُۥ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظّٰلِمِينَ
হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না।
অষ্টম রুকূ‘
[১] আল্লামা শানকীতী বলেন, বিভিন্ন আয়াত থেকে এটাই বুঝা যায় যে, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটি ঐ সময়ই হবে, যখন ব্যক্তির সেখানে ইচ্ছা বা এখতিয়ার থাকবে। কিন্তু যখন ভয়-ভীতি বা সমস্যা থাকবে, তখন তাদের সাথে বাহ্যিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কস্থাপনের অনুমতি ইসলাম শর্তসাপেক্ষে দিয়েছে। তা হচ্ছে, যতটুকু করলে তাদের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও আন্তরিক বন্ধুত্ব থাকতে পারবে না। [আদওয়াউল বায়ান]
===========================
((5:55 সুরা মায়েদাহ))
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكٰوةَ وَهُمْ رٰكِعُونَ
তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে বিনীত হয়ে।
[১] এ আয়াতে মুসলিমদের গভীর বন্ধুত্ব ও বিশেষ বন্ধুত্ব যাদের সাথে হতে পারে, তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, প্রথমতঃ তারা পূর্ণ আদব ও শর্তাদিসহ নিয়মিত সালাত আদায় করে। দ্বিতীয়তঃ স্বীয় অর্থ-সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে। তৃতীয়তঃ তারা বিনম্র ও বিনয়ী; স্বীয় সৎকর্মের জন্য গর্বিত নয়, তারা মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করে। [সা’দী]
[২] ফাইরোয আদ-দাইলামী বলেন, তার সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাদের প্রতিনিধি পাঠালেন। তারা এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো ঈমান এনেছি, এখন আমার বন্ধু-অভিভাবক কে? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। তারা বললঃ আমাদের জন্য এটাই যথেষ্ট এবং আমরা সন্তুষ্ট। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৩২]
[৩] আয়াতে উল্লেখিত (وَهُمْ رٰكِعُوْنَ) এ (ركوع) শব্দের কয়েকটি অর্থ হতে পারে। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ এখানে ‘রুকূ’ অর্থ পারিভাষিক ‘রুকূ’, যা সালাতের একটি রুকন। অর্থাৎ আর তারা রুকুকারী। [ফাতহুল কাদীর] এটা যেমন ফরয সালাতের সাধারণ রুকু উদ্দেশ্য হতে পারে, তেমনিভাবে নফল সালাত আদায়কারী অর্থেও হতে পারে। [বাগভী, জালালাইন] পক্ষান্তরে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে রুকু বলে বিনম্র ও খুশু-খুযু সম্পন্ন হওয়া বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর, সা’দী] প্রথম অর্থের ক্ষেত্রে (واو) টি (عطف) এর জন্য। আর দ্বিতীয় অর্থের ক্ষেত্রে (واو) টি (حال) বা অবস্থা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবন কাসীর এ অর্থটি গৌন বিবেচনা করেছেন।
===========================
(( 5:57 সুরা মায়েদাহ ))
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتٰبَ مِن قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَآءَ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
হে মুমিনগণ, তোমরা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যারা তোমাদের দীনকে উপহাস ও খেল-তামাশারূপে গ্রহণ করেছে, তাদের মধ্য থেকে তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে ও কাফিরদেরকে। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।
নবম রুকূ‘
[১] অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাদেরকে সাখী অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যারা তোমাদের দ্বীনকে উপহাস ও খেলা মনে করে। এরা দুই দলে বিভক্ত এক. আহ্লে কিতাব সম্প্রদায়। দুই. মুশরিক সম্প্রদায়। আয়াতে বলা হচ্ছে যে, তোমাদের কাছে যে ঈমান আছে তার চাহিদা হচ্ছে, তোমরা তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাবে না। তাদের কাছে গোপন ভেদ প্রকাশ করবে না। তাদের সাথে বৈরীভাব রাখবে। তোমাদের কাছে যে তাকওয়া আছে তাও তোমাদেরকে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করে। [সা’দী]
===========================
(( 5:58 সুরা মায়েদাহ ))
وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلٰوةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ۚ ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ
আর যখন তোমরা সালাতের দিকে ডাক, তখন তারা একে উপহাস ও খেল-তামাশারূপে গ্রহণ করে। তা এই কারণে যে, তারা এমন কওম, যারা বুঝে না।
===========================
হে বিশ্বাসীগণ! তোমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তাঁরা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে, রাসুলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাক (তাহলে তাদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না)। তোমরা গোপনে তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমরা যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের যে কেউ এটা করে, সে ত সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়।” (মুমতাহিনাহঃ ১)
“ হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতৃ গন যদি ইমানের মুকাবিলায়কুফুরকে পছন্দ করে, তাহলে তাদেরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা যাদেরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করবে তাঁরাই হবে অত্যাচারী।” (তাওবাহঃ২৩)
==========================
(((((((60:13 সুরা মুমতাহিনাহ)))))))))
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا مِنَ الْءَاخِرَةِ كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحٰبِ الْقُبُورِ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ রাগান্বিত হয়েছেন। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছে, যেমনিভাবে কাফিররা কবরবাসীদের সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে।
===========================
(((((((60:8 সুরা মুমতাহিনাহ)))))))))
لَّا يَنْهٰىكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقٰتِلُوكُمْ فِى الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।
[১] যেসব কাফের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কারেও অংশগ্রহণ করেনি, আলোচ্য আয়াতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ও ইনসাফ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ন্যায় ও সুবিচার তো প্রত্যেক কাফেরের সাথেও জরুরী। এতে যিস্মি কাফের, চুক্তিতে আবদ্ধ কাফের এবং শক্র কাফের সবাই সমান। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আসমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার জননী আবু বকর সিদীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর স্ত্রী ‘কুতাইলা” হুদায়বিয়া সন্ধির পর কাফের অবস্থায় মক্কা থেকে মদীনায় পৌঁছেন। তিনি কন্যা আসমার জন্যে কিছু উপঢৌকনও সাথে নিয়ে যান। কিন্তু আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা সেই উপঢৌকন গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেনঃ আমার জননী আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন, কিন্তু তিনি কাফের। আমি তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ জননীর সাথে সদ্ব্যবহার কর। [বুখারী: ২৬২০, ৩১৮৩, মুসলিম: ১০:০৩, আবু দাউদ: ১৬৬৮, মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩৪৭, ইবনে হিব্বান: ৪৫২]
===========================
((((((((60:9 সুরা মুমতাহিনাহ))))))))))
إِنَّمَا يَنْهٰىكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قٰتَلُوكُمْ فِى الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُم مِّن دِيٰرِكُمْ وَظٰهَرُوا عَلٰىٓ إِخْرَاجِكُمْ أَن تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُمْ فَأُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُونَ
আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছে ও তোমাদেরকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো যালিম।
===========================
((((((60:7সুরা মুমতাহিনাহ)))))))))
عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً ۚ وَاللَّهُ قَدِيرٌ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
যাদের সাথে তোমরা শত্রুতা করছ, আশা করা যায় আল্লাহ তোমাদের ও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আর আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা ইঙ্গিত করেছেন যে, আজ যারা কাফের, ফলে তারা তোমাদের শত্রু ও তোমরা তাদের শক্ৰ, সত্বরই হয়তো আল্লাহ তা'আলা এই শক্রতাকে বন্ধুত্বে পর্যবসিত করে দিবেন। অর্থাৎ তাদেরকে ঈমানের তওফীক দিয়ে তোমাদের পারস্পরিক সুসম্পর্ককে নতুন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী মক্কা বিজয়ের সময় বাস্তবরূপ লাভ করে। ফলে নিহতদের বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সকল কাফের মুসলিম হয়ে যায়। [আল-ওয়াহেদী: আসবাবুন নুযুল, ৪৫০] পবিত্র কুরআনের এক আয়াতে এর বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,
وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا
অর্থাৎ “আর আপনি দেখতে পাবেন মানুষদেরকে যে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করবে” [সূরা আন-নাসর:২] বাস্তবেও তাই হয়েছে। আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইসলামের ভীষণ দুশমন ছিলেন। কিন্তু এ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলা আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বাদশা নাজাসী তাকে রাসূলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন, ফলে আবু সুফিয়ানের বিরোধিতায় ভাটা পড়ে, তিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্ৰহণ করেন। তার পুত্ৰ মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুও ইসলাম গ্ৰহণ করেন। তারা পরবর্তীতে ইসলামের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের শক্তিকে কাজে লাগান। [দেখুন-কুরতুবী]
-------------------
*ইসলামের_দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ*
রহমান রহীম আল্লাহ্ তায়ালার নামে-
ভূমিকা
নববর্ষ বা New Year’s day – এই শব্দগুলো নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, রাতে অভিজাত এলাকার ক্লাব ইত্যাদিতে মদ্যপান তথা নাচানাচি, পটকা ফুটানো – এই সবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৭ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন ? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে ।
ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা
অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন।
মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হত ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল এই যে, ঐ দিন খ্রীস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাত হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” [বুখারী, মুসলিম]
বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন:
“উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ [আল-মায়িদাহ :৪৮]
‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ [আল-হাজ্জ্ব :৬৭]
যেমনটি কিবলাহ, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।…নিঃসন্দেহে তাদের সাথে এসব অনুষ্ঠান পালনে যোগ দেয়া একজনকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা.) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন:
‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ [বুখারী, মুসলিম]
এছাড়া আনাস ইবনে মালিক(রা.) বর্ণিত:
“রাসূলুল্লাহ(সা.) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি(সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ(সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর ।’ ” [সূনান আবু দাউদ]
এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।
ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়, এবং এই বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, যা হচ্ছে:
অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর কারণে।
অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন:
“আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।” [সূরা যারিয়াত:৫৬]
সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা ।
তাইতো দেখা যায় যে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ পালন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালনের পর পরই মুসলিমরা পালন করে ঈদুল ফিতর, কেননা এই দিনটি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারীর জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন – এদিন এজন্য উৎসবের নয় যে এদিনে আল্লাহর দেয়া আদেশ নিষেধ কিছুটা শিথিল হতে পারে, যেমনটি বহু মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দিনে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, বরং মুসলিমের জীবনে এমন একটি মুহূর্তও নেই, যে মুহূর্তে তার ওপর আল্লাহর আদেশ নিষেধ শিথিলযোগ্য। তেমনিভাবে ঈদুল আযহা পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হাজ্জ পালনের প্রাক্কালে। কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে ইয়াওমুল আরাফা, এদিনটি আরাফাতের ময়দানে হাজীদের ক্ষমা লাভের দিন, আর তাই ১০ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন – ঈদুল আযহা। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটো দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন – এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।
নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক
নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মু্হাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীজীর(সা.) মৃত্যুর বহু পরে, উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্য কোন নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?
কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে আল্লাহ এই উপলক্ষের দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:
“নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদাহ :৭২]
নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোন কোন সূত্রে দাবী করা হয় , যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব: সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন
আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: পটকা ফুটিয়ে বা আতশবাজি পুড়িয়ে রাত ১২টায় হৈ হুল্লোড় করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের শান্তি বিনষ্ট করে নববর্ষকে স্বাগত জানানো, ব্যান্ড সঙ্গীত বা অন্যান্য গান-বাজনার ব্যবস্থা, সম্ভ্রান্ত পল্লীর বাড়ীতে বা ক্লাবে গান-বাজনা, মদ্যপান ও পান শেষে ব্যভিচারের আয়োজন ইত্যাদি – এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র ও “রাশিফল” প্রকাশ।
এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকান্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক:
নতুন দিন তথা সূর্যকে স্বাগত জানানো:
এ ধরনের কর্মকান্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রীস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনি ভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রীস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রীস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রীস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়। ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির সাথে আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “ক্লাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে তুলে ধরেছেন:
“আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…”[সূরা আন নামল :২৪]
নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা:
নববর্ষের পার্টি বা “উদযাপন আয়োজনের” অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নারীর সহজ-লভ্যতা – নিউ-ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারে অথবা ঢাকার গুলশান ক্লাবে – পশ্চিমেও এবং তাদের অনুকরণে এখানেও ব্যাপারটা একটা অলিখিত প্রলোভন। নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। নববর্ষের পার্টি বা উদযাপন আয়োজনের সবর্