08/08/2026
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নেপথ্য শক্তি
মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আজ ৮ আগস্ট ২০২৬। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী। বাঙালির ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী, আজীবন সংগ্রামের সহযাত্রী, রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণাদাত্রী ও পরামর্শক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত সাধারণ বাঙালি নারী, বাঙালি স্ত্রী ও মায়ের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
বঙ্গমাতা ছিলেন এমন এক নারী, যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও ইতিহাসের গতিপথে গভীর প্রভাব রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর কিশোর বয়স থেকে শুরু করে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ছিলেন নীরব অথচ দৃঢ় সহযাত্রী। বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের দীর্ঘ সময়গুলোতে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া, সন্তানদের মানুষ করা, আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া—সবকিছুই তিনি অসীম ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে পালন করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যেমন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ইতিহাসে অমর হয়েছেন, তেমনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অংশীদার, ভুক্তভোগী, সাহসদাত্রী ও প্রেরণাদাত্রী হিসেবে স্বাধীনতার ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নিয়েছেন।
শৈশব, বিয়ে ও সংসারজীবনের সূচনা
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ডাকনাম ছিল রেণু। তিনি ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক এবং মাতা হোসনে আরা বেগম। শেখ ফজিলাতুন্নেছার পিতামহ শেখ মোহাম্মদ আবুল কাশেম এবং বঙ্গবন্ধুর পিতামহ শেখ আবদুল হামিদ ছিলেন পরস্পরের চাচাতো ভাই।
শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে রেণু বড় হন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের স্নেহ-ছায়ায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বিয়েটিও হয়েছিল অতি অল্প বয়সে। বঙ্গবন্ধু তাঁর অমর গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তাঁদের বিয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর বয়স তখন ১২-১৩ বছর এবং রেণুর বয়স ছিল আনুমানিক তিন বছর। রেণুর পিতা মারা যাওয়ার পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। পরে ১৯৪২ সালে তাঁদের আনুষ্ঠানিক দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।
সংসার জীবনে প্রবেশের সময় বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই শেখ ফজিলাতুন্নেছা বুঝতে পেরেছিলেন—তাঁর স্বামী কেবল একটি পরিবারের মানুষ নন; তিনি বৃহত্তর মানুষের অধিকার ও মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চলেছেন। তাই স্বামীর রাজনৈতিক ও সংগ্রামী জীবনকে তিনি কখনো বোঝা হিসেবে দেখেননি; বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
স্বামীর সংগ্রামের পাশে এক নির্ভীক নারী
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ কিংবা ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—বঙ্গবন্ধু যখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখন বঙ্গমাতাও তাঁকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হলে তাঁর সেবা করেছেন। নিজের সঞ্চিত অর্থও স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম হয়। তখন বঙ্গবন্ধু কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় ফিরে এসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনীতির কারণে তাঁকে পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকতে হয়েছে। আর সেই সময় টুঙ্গিপাড়ায় থেকে বঙ্গমাতা সন্তানদের লালন-পালন ও সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলেছেন।
বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন শুরু হলে তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। একদিকে সন্তানদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের খোঁজখবর—সবকিছু তাঁকে একাই সামলাতে হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জননী হন। সন্তানদের মানুষ করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।
কারাগারের বাইরে থেকেও সংগ্রামের সহযাত্রী
১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হলে বঙ্গমাতা সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় আসেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর শুরু হয় বঙ্গমাতার জীবনের এক দীর্ঘ সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর বারবার কারাবরণের সময় তিনি সংসারের হাল ধরেছেন। ভাড়া বাসায় থেকেছেন, অর্থকষ্ট সহ্য করেছেন, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালে অনেক দলীয় নেতাকর্মী ও ছাত্রনেতা তাঁর কাছে আসতেন। তিনি তাঁদের পরামর্শ দিতেন, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন এবং কারাবন্দি নেতাকর্মীদের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।
জেলগেটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তিনি দলের বাইরের পরিস্থিতির খবর দিতেন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা শুনে এসে তা সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তাঁকে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শকে পরিণত করে।
‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবন কাহিনি’
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী রচনার পেছনেও বঙ্গমাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর একপর্যায়ে বঙ্গমাতা স্বামীকে তাঁর জীবনের কথা লিখে রাখতে উৎসাহিত করেন।
বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন, তাঁর স্ত্রী রেণু কয়েকটি খাতা কিনে জেলগেটে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে লিখতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুপ্রেরণাতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের স্মৃতি লিখতে শুরু করেন।
ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ। কারণ বঙ্গমাতার সেই অনুপ্রেরণার ফলেই বাঙালি জাতি পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের এক অমূল্য দলিল—অসমাপ্ত আত্মজীবনী।
ছয় দফা, আগরতলা মামলা ও ঊনসত্তরের গণআন্দোলন
১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে বঙ্গমাতা নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ঠিকানা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রনেতাদের অন্যতম যোগাযোগকেন্দ্র। নেতাকর্মীরা সেখানে এসে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। বঙ্গমাতা তাঁদের সাহস জোগাতেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন।
এই সময় তাঁর জীবনে ছিল একসঙ্গে বহু দায়িত্ব—স্বামীর কারাবাস, সন্তানদের লালন-পালন, সংসার পরিচালনা, আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশে থাকা। অথচ এসবের কোনো কিছুই তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি।
প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে দৃঢ় ভূমিকা
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের পর আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই সেই প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে ছিলেন।
কিন্তু বঙ্গমাতা ছিলেন আপসহীন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া কোনো আপস নয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, বঙ্গমাতা কেবল একজন গৃহিণী ছিলেন না; তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতেন, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারতেন এবং সংকটময় সময়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তের পরামর্শ দিতে সক্ষম ছিলেন।
৭ মার্চের ভাষণের পেছনে বঙ্গমাতার প্রজ্ঞা
বঙ্গমাতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রাক্কালের ঘটনা।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছিল। বিভিন্ন নেতা ও ছাত্রনেতা নিজেদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি একটি লিখিত খসড়াও বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়া হয়েছিল।
ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। ঠিক তখনই বঙ্গমাতা তাঁকে বলেছিলেন—সামনে লাখো মানুষ, তাঁদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাশার কথা মাথায় রেখে নিজের বিবেক ও অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলতে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন—“তোমার মনে যা আসবে তাই তুমি বলবা। আর কারও কোনো পরামর্শ দরকার নাই।”
এই পরামর্শের গভীরতা ছিল অসাধারণ। বঙ্গবন্ধু সেদিন কোনো লিখিত বক্তব্য অনুসরণ না করে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা পরবর্তীকালে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই উচ্চারণে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার নয় মাস: এক অসীম সাহসের পরীক্ষা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিল বঙ্গমাতার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। বঙ্গবন্ধু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দি। পরিবারের সদস্যরা ছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের নজরবন্দি অবস্থায়।
গভীর অনিশ্চয়তা, ভয় ও শঙ্কার মধ্যেও বঙ্গমাতা দুই কন্যা ও ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে আগলে রেখেছেন। দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন—এই সত্যও তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে গোপন রেখেছেন।
স্বামীর জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তা, সন্তানদের নিরাপত্তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ভার যেন একসঙ্গে তাঁর কাঁধে এসে পড়েছিল। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি।
সংসারের কাণ্ডারি থেকে ইতিহাসের অংশীদার
বঙ্গমাতার জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন স্নেহময়ী মা, দায়িত্বশীল স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়স্থল এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নেপথ্য শক্তি।
সন্তানদের লালন-পালন, লেখাপড়া, অসুস্থতা, সংসারের অভাব-অনটন—সবকিছুর দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে দলীয় নেতাকর্মীদের পরিবারের খবর নিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য করেছেন।
তিনি কখনো নিজের অবদানকে সামনে আনেননি। ইতিহাসের আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন।
বঙ্গবন্ধু নিজেও তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন—“আমার জীবনের দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটি হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী, আকৈশোর গৃহিণী।”
এই একটি বাক্যই বঙ্গমাতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর আস্থা ও ভালোবাসার অনেকখানি প্রকাশ করে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ অধ্যায়েও সহযাত্রী
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সুখে-দুঃখে, কারাবাসে-সংগ্রামে, সংকটে-সাফল্যে তিনি ছিলেন স্বামীর পাশে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের নির্মম হত্যাযজ্ঞে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গমাতাকেও শাহাদাতবরণ করতে হয়। নিয়তির নির্মম পরিহাসে যিনি জীবনভর বঙ্গবন্ধুর সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন, মৃত্যুতেও তিনি তাঁর সঙ্গী হলেন।
বঙ্গমাতা: ইতিহাসের নেপথ্যের এক মহান নারী
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং স্বামীর রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ সহযাত্রা তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথচলায় বঙ্গমাতার অবদান ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। তিনি বঙ্গবন্ধুকে শুধু সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখেননি; বরং তাঁকে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনও হয়ে উঠেছিল বাঙালির অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই বঙ্গমাতা কেবল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি বাঙালি নারী, স্ত্রী, মা ও সংগ্রামী সহযাত্রীর এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
আজ তাঁর ৯৬তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। শ্রদ্ধা জানাই তাঁর অসীম ত্যাগ, সাহস, ধৈর্য, দেশপ্রেম ও প্রজ্ঞার প্রতি।
বঙ্গমাতা আমাদের ইতিহাসের এক অনির্বাণ আলোকশিখা—যাঁর নীরব ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী পথ আরও দৃঢ় হয়েছিল এবং বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস পেয়েছিল এক অনন্য পূর্ণতা।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯৬তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা।