The Political Story

The Political Story The Political Story. Story Behind The Politics.

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নেপথ্য শক্তিমোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্টআজ ৮ আগস্ট ২...
08/08/2026

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নেপথ্য শক্তি

মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আজ ৮ আগস্ট ২০২৬। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী। বাঙালির ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী, আজীবন সংগ্রামের সহযাত্রী, রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণাদাত্রী ও পরামর্শক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত সাধারণ বাঙালি নারী, বাঙালি স্ত্রী ও মায়ের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
বঙ্গমাতা ছিলেন এমন এক নারী, যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও ইতিহাসের গতিপথে গভীর প্রভাব রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর কিশোর বয়স থেকে শুরু করে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ছিলেন নীরব অথচ দৃঢ় সহযাত্রী। বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের দীর্ঘ সময়গুলোতে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া, সন্তানদের মানুষ করা, আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া—সবকিছুই তিনি অসীম ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে পালন করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যেমন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ইতিহাসে অমর হয়েছেন, তেমনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অংশীদার, ভুক্তভোগী, সাহসদাত্রী ও প্রেরণাদাত্রী হিসেবে স্বাধীনতার ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নিয়েছেন।

শৈশব, বিয়ে ও সংসারজীবনের সূচনা

শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ডাকনাম ছিল রেণু। তিনি ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক এবং মাতা হোসনে আরা বেগম। শেখ ফজিলাতুন্নেছার পিতামহ শেখ মোহাম্মদ আবুল কাশেম এবং বঙ্গবন্ধুর পিতামহ শেখ আবদুল হামিদ ছিলেন পরস্পরের চাচাতো ভাই।
শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে রেণু বড় হন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের স্নেহ-ছায়ায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বিয়েটিও হয়েছিল অতি অল্প বয়সে। বঙ্গবন্ধু তাঁর অমর গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তাঁদের বিয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর বয়স তখন ১২-১৩ বছর এবং রেণুর বয়স ছিল আনুমানিক তিন বছর। রেণুর পিতা মারা যাওয়ার পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। পরে ১৯৪২ সালে তাঁদের আনুষ্ঠানিক দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।
সংসার জীবনে প্রবেশের সময় বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই শেখ ফজিলাতুন্নেছা বুঝতে পেরেছিলেন—তাঁর স্বামী কেবল একটি পরিবারের মানুষ নন; তিনি বৃহত্তর মানুষের অধিকার ও মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চলেছেন। তাই স্বামীর রাজনৈতিক ও সংগ্রামী জীবনকে তিনি কখনো বোঝা হিসেবে দেখেননি; বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

স্বামীর সংগ্রামের পাশে এক নির্ভীক নারী

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ কিংবা ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—বঙ্গবন্ধু যখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখন বঙ্গমাতাও তাঁকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হলে তাঁর সেবা করেছেন। নিজের সঞ্চিত অর্থও স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম হয়। তখন বঙ্গবন্ধু কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় ফিরে এসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনীতির কারণে তাঁকে পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকতে হয়েছে। আর সেই সময় টুঙ্গিপাড়ায় থেকে বঙ্গমাতা সন্তানদের লালন-পালন ও সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলেছেন।
বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন শুরু হলে তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। একদিকে সন্তানদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের খোঁজখবর—সবকিছু তাঁকে একাই সামলাতে হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জননী হন। সন্তানদের মানুষ করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।

কারাগারের বাইরে থেকেও সংগ্রামের সহযাত্রী

১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হলে বঙ্গমাতা সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় আসেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর শুরু হয় বঙ্গমাতার জীবনের এক দীর্ঘ সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর বারবার কারাবরণের সময় তিনি সংসারের হাল ধরেছেন। ভাড়া বাসায় থেকেছেন, অর্থকষ্ট সহ্য করেছেন, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালে অনেক দলীয় নেতাকর্মী ও ছাত্রনেতা তাঁর কাছে আসতেন। তিনি তাঁদের পরামর্শ দিতেন, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন এবং কারাবন্দি নেতাকর্মীদের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।
জেলগেটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তিনি দলের বাইরের পরিস্থিতির খবর দিতেন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা শুনে এসে তা সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তাঁকে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শকে পরিণত করে।

‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবন কাহিনি’

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী রচনার পেছনেও বঙ্গমাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর একপর্যায়ে বঙ্গমাতা স্বামীকে তাঁর জীবনের কথা লিখে রাখতে উৎসাহিত করেন।
বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন, তাঁর স্ত্রী রেণু কয়েকটি খাতা কিনে জেলগেটে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে লিখতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুপ্রেরণাতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের স্মৃতি লিখতে শুরু করেন।
ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ। কারণ বঙ্গমাতার সেই অনুপ্রেরণার ফলেই বাঙালি জাতি পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের এক অমূল্য দলিল—অসমাপ্ত আত্মজীবনী।

ছয় দফা, আগরতলা মামলা ও ঊনসত্তরের গণআন্দোলন

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে বঙ্গমাতা নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ঠিকানা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রনেতাদের অন্যতম যোগাযোগকেন্দ্র। নেতাকর্মীরা সেখানে এসে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। বঙ্গমাতা তাঁদের সাহস জোগাতেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন।
এই সময় তাঁর জীবনে ছিল একসঙ্গে বহু দায়িত্ব—স্বামীর কারাবাস, সন্তানদের লালন-পালন, সংসার পরিচালনা, আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশে থাকা। অথচ এসবের কোনো কিছুই তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি।

প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে দৃঢ় ভূমিকা

১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের পর আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই সেই প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে ছিলেন।
কিন্তু বঙ্গমাতা ছিলেন আপসহীন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া কোনো আপস নয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, বঙ্গমাতা কেবল একজন গৃহিণী ছিলেন না; তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতেন, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারতেন এবং সংকটময় সময়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তের পরামর্শ দিতে সক্ষম ছিলেন।

৭ মার্চের ভাষণের পেছনে বঙ্গমাতার প্রজ্ঞা

বঙ্গমাতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রাক্কালের ঘটনা।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছিল। বিভিন্ন নেতা ও ছাত্রনেতা নিজেদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি একটি লিখিত খসড়াও বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়া হয়েছিল।
ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। ঠিক তখনই বঙ্গমাতা তাঁকে বলেছিলেন—সামনে লাখো মানুষ, তাঁদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাশার কথা মাথায় রেখে নিজের বিবেক ও অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলতে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন—“তোমার মনে যা আসবে তাই তুমি বলবা। আর কারও কোনো পরামর্শ দরকার নাই।”
এই পরামর্শের গভীরতা ছিল অসাধারণ। বঙ্গবন্ধু সেদিন কোনো লিখিত বক্তব্য অনুসরণ না করে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা পরবর্তীকালে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই উচ্চারণে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার নয় মাস: এক অসীম সাহসের পরীক্ষা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিল বঙ্গমাতার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। বঙ্গবন্ধু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দি। পরিবারের সদস্যরা ছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের নজরবন্দি অবস্থায়।
গভীর অনিশ্চয়তা, ভয় ও শঙ্কার মধ্যেও বঙ্গমাতা দুই কন্যা ও ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে আগলে রেখেছেন। দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন—এই সত্যও তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে গোপন রেখেছেন।
স্বামীর জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তা, সন্তানদের নিরাপত্তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ভার যেন একসঙ্গে তাঁর কাঁধে এসে পড়েছিল। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি।

সংসারের কাণ্ডারি থেকে ইতিহাসের অংশীদার

বঙ্গমাতার জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন স্নেহময়ী মা, দায়িত্বশীল স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়স্থল এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নেপথ্য শক্তি।
সন্তানদের লালন-পালন, লেখাপড়া, অসুস্থতা, সংসারের অভাব-অনটন—সবকিছুর দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে দলীয় নেতাকর্মীদের পরিবারের খবর নিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য করেছেন।
তিনি কখনো নিজের অবদানকে সামনে আনেননি। ইতিহাসের আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন।
বঙ্গবন্ধু নিজেও তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন—“আমার জীবনের দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটি হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী, আকৈশোর গৃহিণী।”
এই একটি বাক্যই বঙ্গমাতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর আস্থা ও ভালোবাসার অনেকখানি প্রকাশ করে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ অধ্যায়েও সহযাত্রী

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সুখে-দুঃখে, কারাবাসে-সংগ্রামে, সংকটে-সাফল্যে তিনি ছিলেন স্বামীর পাশে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের নির্মম হত্যাযজ্ঞে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গমাতাকেও শাহাদাতবরণ করতে হয়। নিয়তির নির্মম পরিহাসে যিনি জীবনভর বঙ্গবন্ধুর সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন, মৃত্যুতেও তিনি তাঁর সঙ্গী হলেন।

বঙ্গমাতা: ইতিহাসের নেপথ্যের এক মহান নারী

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং স্বামীর রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ সহযাত্রা তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথচলায় বঙ্গমাতার অবদান ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। তিনি বঙ্গবন্ধুকে শুধু সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখেননি; বরং তাঁকে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনও হয়ে উঠেছিল বাঙালির অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই বঙ্গমাতা কেবল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি বাঙালি নারী, স্ত্রী, মা ও সংগ্রামী সহযাত্রীর এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
আজ তাঁর ৯৬তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। শ্রদ্ধা জানাই তাঁর অসীম ত্যাগ, সাহস, ধৈর্য, দেশপ্রেম ও প্রজ্ঞার প্রতি।
বঙ্গমাতা আমাদের ইতিহাসের এক অনির্বাণ আলোকশিখা—যাঁর নীরব ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী পথ আরও দৃঢ় হয়েছিল এবং বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস পেয়েছিল এক অনন্য পূর্ণতা।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯৬তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা।

দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের বাংলা অনুবাদজনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের ভালোবাসি ...
07/08/2026

দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ
জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের ভালোবাসি এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে আসব।
--------------------------------দেশরত্ন শেখ হাসিনা
বাংলাদেশকে নিয়ে যারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও উনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা। বিশেষ করে যখন ক্ষমতাসীনরা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ইতিহাসের কঠিন সময়ে সেই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজ আমি শুধু বাংলাদেশের পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও আপনাদের সামনে কথা বলছি। আমি এমন একজন মানুষ, যিনি সারা জীবন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। আমাকে আমার দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু আমাকে কখনোই আমার জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।
বর্তমান সংকট নিয়ে কথা বলার আগে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, জাতীয় চার নেতাকে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদকে।
একই সঙ্গে গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার পরিবারের সেই সদস্যদের, যাদের আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হারিয়েছিলাম।
আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালের জন্মদিনও। তিনি আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুবনেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁর জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক ছিল। আজ আমি তাঁকে গভীর ভালোবাসা, বেদনা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি।
গত ২ বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছি। মানুষের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাঙ্গনে ভয় ঢুকে পড়েছে। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
আমি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট সম্পর্কে সত্য দিয়ে শুরু করতে চাই।
এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের দাবির আড়ালে সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী ছাত্রদের দাবিকে সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছিল।
২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন সরকার আপিল করেছিল, কারণ আমরা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে চেয়েছিলাম।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনজন মন্ত্রীও তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত আমার পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। প্রকৃত ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করা হয়, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে।
ডক্টর ইউনুস নিজেই বলেছেন এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি আন্দোলন, যার পেছনে একজন মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) ছিলেন। তাঁর নিজের বক্তব্যই সত্যকে প্রকাশ করে। এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না।
এখানে কোনো দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। নির্দেশনা আসছিল অদৃশ্যভাবে। পুরো বিষয়টি সংগঠিত ও পরিচালিত ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যালটের বাইরে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করা।
১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। শুরু হয় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট। ব্যাপক সম্পদ ধ্বংস করা হয়।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। শেখ রাসেল ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ভবন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, মিরপুর এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়, জাতীয় ডেটাবেস সেন্টার, কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
কারাগার থেকে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।
সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। আমার সরকারের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
গণমাধ্যমও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রায় ৫০টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাংবাদিকরাও নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও সংগঠিত হামলা চালানো হয়। পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
প্রায় ৪৬০টি থানায় বা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হন। অস্ত্র লুট করা হয়, কর্মকর্তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩,০০০ সদস্য নিহত, হামলার শিকার, নির্যাতিত বা গুরুতর সহিংসতার শিকার হন।
তাই আমি আপনাদের একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই।
এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানায় আগুন দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা হয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং অস্ত্র লুট করা হয়, তখন রাষ্ট্রের কি জীবন ও সম্পদ রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই?
পৃথিবীর প্রতিটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকদের, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করা। এটি কোনো অপরাধ নয়, আইন তাদের ওপর এই দায়িত্বই অর্পণ করেছে।
একই সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম সত্য উদঘাটিত হোক। সে কারণেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করি। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট , প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত করা, প্রতিটি সহিংস ঘটনার সত্য উদঘাটন করা এবং প্রতিটি পরিবারকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।
আমি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি।
সাংবিধানিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সমন্বিত আক্রমণ, পরিকল্পিত নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা এবং প্রচারণার মাধ্যমে পরিচালিত। এই ষড়যন্ত্র ৫ আগস্টে শেষ হয়নি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রূপ নেয় রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারাবাহিক অভিযানে।
১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মাধ্যমে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তা আজও থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দাবি করা হচ্ছে, অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ৩,৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আসামি করা হয়েছে। আরও ১০ লাখের বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধেই ৬০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা নির্যাতন, অপমান, হেফাজতে নির্যাতন ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারেও প্রাণ হারিয়েছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, খাদ্য না দেওয়া, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার অস্বীকারের বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, এমনকি রিকশাচালক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরাও হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার শিকার হয়েছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাদের কেউই নিরাপদ নন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও প্রতীক ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধাপে ধাপে আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়েছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়। এগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশের পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে ফেলতে “রিসেট বাটন” চাপার কথা বলেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিকে বদলে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস লিখতে চায়।
দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও ভয়, সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গভীর অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।
এখন দেশের অবস্থা দেখুন। আমরা যে অগ্রগতি গড়ে তুলেছিলাম, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮০ শতাংশ, সেখানে তা নেমে এসেছে ২.২ শতাংশে। শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে কমে গেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় ভেঙে পড়েছে। নতুন করে ২ কোটির বেশি মানুষ বেকার হয়েছেন। ৫০০-র বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধেকেরও বেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন।
সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চলছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন নিয়েও নিরাপদ বোধ করছেন না। চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমন এক মা যিনি সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারেন না, এবং এমন এক তরুণ, যে আর ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখতে পায় না।
কিন্তু বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন। মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল। আমার পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এই আদর্শের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও সেই আদর্শকে পূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে ধারণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পাঁচ মেয়াদে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছি। ২০০৮ সালের পর টানা ১৬ বছরে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।
আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিলাসিতা ছিল না; এগুলো ছিল জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো দান ছিল না, এগুলো ছিল মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলাম। আমরা বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত করেছিলাম।
বাংলাদেশের সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সকল বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তির সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ান।
একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশক পুনরুদ্ধার ও নবযাত্রার দশক হতে পারে, যদি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
তাই আমি স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি জানাচ্ছি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জন্য কাজ করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য নয়।
এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়, বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আমার ভাগ্যে যাই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে আসব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলার রায় কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু ভয় কখনোই জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।
অনেক আগেই আমার জীবন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাবের ঊর্ধ্বে চলে গেছে!
আমার বিরুদ্ধে যত বাধাই আসুক না কেন!
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।
তাই আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আমি দেশে ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের যোগ্য, যা তাদের সুরক্ষা দেবে, এমন একটি অর্থনীতির যোগ্য, যা তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে, এবং এমন একটি গণতন্ত্রের যোগ্য, যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে।
আমার ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।
এটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়।
আমি একটিমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের জীবন আরও উন্নত করতে।
জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের আস্থা রাখি, তাদের ভালোবাসি, এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে আসব।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
আমাকে ধৈর্য সহকারে শোনার জন্য এবং এতটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।

30/07/2026

মীরসরাইয়ে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত

কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে মীরসরাই উপজেলা যুবলীগের উদ্যোগে আজ সকালে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুমোদিত মীরসরাই উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে আয়োজিত এ কর্মসূচিকে ৫ আগস্টের পর মীরসরাইয়ে সংগঠনটির প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভ মিছিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মিছিলটি ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে মীরসরাই সদরের বিভিন্ন অংশ প্রদক্ষিণ করে। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তাদের দাবির পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেন।
আয়োজকদের দাবি, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে এবং এতে নব গঠিত উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক যুগ্ম আহ্বায়ক গণ সহ নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

ইতিহাসের আদালত, পঁচাত্তরের শিক্ষা এবং জুলাইয়ের রাজনীতির পুনর্মূল্যায়ন- মোহাম্মদ হাসান ইতিহাসের এক অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হলো...
29/07/2026

ইতিহাসের আদালত, পঁচাত্তরের শিক্ষা এবং জুলাইয়ের রাজনীতির পুনর্মূল্যায়ন

- মোহাম্মদ হাসান

ইতিহাসের এক অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হলো—তা কখনোই কোনো ঘটনার চূড়ান্ত বিচার তাৎক্ষণিকভাবে করে না। আবেগের উত্তাপ স্তিমিত হওয়ার পর, রাজনৈতিক কোলাহল থেমে গেলে এবং সময়ের ধুলিকণা সরে গেলে ইতিহাস নির্মোহ দৃষ্টিতে ঘটনাগুলোকে মূল্যায়ন করে। সেই কারণেই কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক বিজয় সবসময় ইতিহাসের বিজয় হয় না; আবার কোনো সাময়িক পরাজয়ও চূড়ান্ত পরাজয় হয়ে থাকে না। ইতিহাসের আদালত অপেক্ষা করে, পর্যবেক্ষণ করে, তারপরই রায় দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এমনই এক বিভীষিকাময় দিন, যার ক্ষত আজও জাতীয় স্মৃতিতে অমোচনীয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা হয়নি; স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ওপরও এক নির্মম আঘাত হানা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর ষড়যন্ত্রকারীরা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল। নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করে তারা সেই হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস নেয়। ক্ষমতা দখলকে বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, হত্যাকারীদের বীর হিসেবে উপস্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে সত্যকে আড়াল করার সেই প্রয়াস ছিল ইতিহাসের সঙ্গে এক নিষ্ঠুর প্রতারণা। কিন্তু সত্যকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা যায়নি। সময়ের ব্যবধানে বিচার হয়েছে, তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, ইতিহাস তার নিজস্ব ভাষায় রায় ঘোষণা করেছে। যারা নিজেদের ইতিহাসের নির্মাতা ভাবতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তারাই ইতিহাসের নিন্দিত চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মূল্যায়ন বিদ্যমান। এক পক্ষ এটিকে গণআন্দোলন হিসেবে দেখে, অন্যদিকে আরেক পক্ষের মতে, আন্দোলনের আড়ালে সংঘটিত সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের জন্য গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য—সহিংসতা, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ধ্বংস কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্যই কাম্য নয়।
রাজনীতির ইতিহাসে একটি পরিচিত প্রবণতা হলো—প্রতিটি পক্ষই নিজেদের কর্মকাণ্ডকে নৈতিক বৈধতার ভাষায় ব্যাখ্যা করতে চায়। ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা দখলকারীরাও নিজেদের রাষ্ট্ররক্ষার দাবিদার হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। আজও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থানকে জনগণের স্বার্থরক্ষার সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ইতিহাস কেবল ঘোষণাপত্র দেখে না; ইতিহাস বিচার করে কর্মের ফল, জনগণের অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা গত এক দশকে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং দারিদ্র্য হ্রাসের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছিল—এমন মূল্যায়ন সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশিত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগের গতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এসব প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অবকাঠামো নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতার দিকে গড়ায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল একটি সরকার বা একটি দল নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—অস্থায়ী ক্ষমতা কখনোই চূড়ান্ত সত্য নয়। প্রচারণা দিয়ে কিছু সময়ের জন্য জনমতকে প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও ইতিহাসকে প্রভাবিত করা যায় না। ইতিহাস আবেগের ভাষা বোঝে না; সে কেবল সত্য, প্রমাণ এবং সময়ের সাক্ষ্য গ্রহণ করে।
পঁচাত্তর আমাদের শিখিয়েছে, মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত কোনো রাজনৈতিক বয়ান স্থায়ী হয় না। ইতিহাসের বিচারে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সত্য, আর মুছে যায় কৃত্রিম মহিমার সব আয়োজন। একইভাবে সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোরও চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে সময়ের বিচারে, গবেষকের বিশ্লেষণে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মোহ দৃষ্টিতে।
সুতরাং ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগানের নয়, সত্যের আয়নায় দেখা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের রায় বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। সময়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়—কে রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল, কে জনগণের পক্ষে ছিল, আর কে ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পরিণতি নিজেই রচনা করেছে।
ইতিহাসের একটি অমোঘ সত্য হলো—সাময়িক বিজয় মানুষকে ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী মর্যাদা দেয় কেবল ন্যায়, সত্য এবং জনগণের আস্থা। আর সেই কারণেই ইতিহাসের আদালতে কোনো রায়ই রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে পরিবর্তন করা যায় না; সেখানে শেষ কথা বলে সময়, সত্য এবং জাতির সম্মিলিত স্মৃতি।

ইতিহাসের এই দিনে..আজ ২৯ জুলাই ২০২৬, বুধবার । একনজরে দেখে নিন ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশিষ্টজনদের জ...
29/07/2026

ইতিহাসের এই দিনে..

আজ ২৯ জুলাই ২০২৬, বুধবার । একনজরে দেখে নিন ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশিষ্টজনদের জন্ম-মৃত্যু দিনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু বিষয়।

ঘটনাবলি

১৫৬৭ - রাজা ষষ্ঠ জেমস স্কটল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন।

১৫৮৮ - ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনী এ্যাংলো-স্প্যানিশ যুদ্ধে ফ্রান্সের গ্রেভলাইনস সমুদ্র তীরে স্প্যানিশ আর্মাডাকে পরাজিত ও ধ্বংস করে।

১৮৫১ - অ্যানেবেল দ্য গ্যাসপ্যারিস ১৫ ইউনোমিয়া অ্যাস্টরয়েড আবিষ্কার করেন।

১৮৫৮ - যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে হ্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত।

১৮৭৬ - ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার উচ্চ শিক্ষার জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৯৯ - যুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত প্রথম হেগ কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়।

১৯১১ - কলকাতার মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ইষ্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট দলকে হারিয়ে প্রথম আইএফএ শিল্ড লাভ করে।

১৯২১ - এডলফ হিটলার জার্মানির জাতীয় সমাজতান্ত্রিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা নির্বাচিত হোন।

১৯৪১ - নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন থেকে নিজের বাড়ি (জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে) চলে যান‌।

১৯৫৭ - আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন গঠিত হয়।

১৯৫৮ - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্‌স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অথবা নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮৭ - ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ইংলিশ চ্যানেলের নিচে সুরঙ্গ পথ (ইউরোটানেল) নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

২০০৫ - জ্যোর্তিবিদরা সৌরজগতের অন্যতম বামন গ্রহ এরিস আবিষ্কার করেন।

২০১৮ - জাবালে নূর পরিবহনের দুইটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীর ওপর তুলে দেয়। এতে ৯ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে রমিজউদ্দিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম (১৬) ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিম রাজিব (১৭) বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যান।

জন্ম

৮৬৯ - মুহম্মদ আল-মাহদী, মুসলমানদের দ্বাদশী শিয়া ইমাম।

১৮৪১ - অঁরি ফেয়ল, ফরাসি খনি প্রকৌশলী ও খনির পরিচালক।

১৮৪৩ - ইয়োহানেস শ্মি‌ট‌, জার্মান ভাষাবিজ্ঞানী।

১৮৬৯ - বুথ টার্কিংটন, মার্কিন ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার।

১৮৮৩ - বেনিতো মুসোলিনি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কালে ইতালির সর্বাধিনায়ক।

১৮৮৮ - দীনেশরঞ্জন দাশ, বাঙালি লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক।

১৮৯২ - উইলিয়াম পাওয়েল, মার্কিন অভিনেতা।

১৯০৪ - জাহাঙ্গীর রতনজী দাদাভাই টাটা, ভারতীয় শিল্পপতি।

১৯০৫ - দগ হামারহোল্ড, সুয়েডীয় কূটনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং লেখক।

১৯৩৫ - সৈয়দ হাসান ইমাম, বাংলাদেশি অভিনেতা, ও আবৃত্তিকার।

১৯৫১ - রেজাউল বারী ডিনা, বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ।

১৯৫৩ - অনুপ জালোটা ভজন ও গজলের খ্যাতিমান ভারতীয় গায়ক।

১৯৫৯ - সঞ্জয় দত্ত, ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা।

মৃত্যু

২৩৮ - বালবিনাস, রোমান সম্রাট।

২৩৮ - পুপিয়েনাস, রোমান সম্রাট।

১০৯৯ - পোপ দ্বিতীয় আরবান।

১১০৮ - ফরাসি রাজা প্রথম ফিলিপ।

১৮৯০ - ভিনসেন্ট ভ্যান গখ, ওলন্দাজ চিত্রকর।

১৮৯১ - ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার।

১৯৬২ - রোনাল্ড ফিশার, বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ।

১৯৬৯ - আন্দলিব সাদানী, ফারসি ও উর্দু ভাষার কবি, গল্পকার, গবেষক এবং সমালোচক।

১৯৮৩ - রেমন্ড ম্যাসি, কানাডীয়-মার্কিন অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক।

১৯৮৩ - লুইস বুনুয়েল, স্পেনীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ও সুরিয়ালিস্ট আন্দোলনের নেতা।

১৯৯৪ - ডরোথি মেরি হজকিন, ব্রিটিশ রসায়নবিদ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

১৯৯৬ - ভারতরত্ন অরুণা আসফ আলী, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামী ও সমাজকর্মী।

১৯৯৬ - মার্সেল পল শোয়োতজেনবার্গার, ফরাসি গণিতবিদ।

১৯৯৮ - জেরোম রবিন্স, মার্কিন পরিচালক, নৃত্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক ও মঞ্চ প্রযোজক।

২০০৪ - প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় , বাঙালি নেপথ্য সংগীতশিল্পী।

২০১৮ - রমাপদ চৌধুরী , বাঙালি ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার।

অন্যান্য

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস

Address

23, Bangabandhu Avenue
Dhaka
1100

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when The Political Story posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share