14/08/2026
#রাগের_মাথায়_৬টি_কাজ_করতে_নেই_অভিজ্ঞতা_থেকে_পরামর্শ.
বাদল সৈয়দ
১) আফজাল সাহেবের ভাগ্য-
বেশ কয়েক বছর আগের কথা।
আব্বার বন্ধু আফজাল সাহেব খুব দীনহীন অবস্থায় মারা গেলেন। শেষ জীবনে ভালোভাবে চিকিৎসাও করাতে পারেননি। জানাজা শেষে ফিরে আসার সময় আব্বা আমাকে বললেন, ‘রাগ যে মানুষকে ধ্বংস করে, আফজাল তার প্রমাণ। ব্রিটিশ আমলের গ্র্যাজুয়েট, অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট, কিন্তু শুধু রাগের কারণে কিছুই করতে পারল না।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছিল, আব্বা?’
আব্বা বললেন, ‘আফজাল এবং তার এক বন্ধু একই সাথে পাকিস্তান আমলে ব্যাংকে যোগ দিয়েছিল। আফজাল একদিন তার বসের সাথে ঝগড়া করে রাগের মাথায় চাকরি ছেড়ে দেয়। আর তার বন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছিল। সেদিন রাগ করে চাকরি না ছাড়লে হয়তো আফজালের ভাগ্যও অন্যরকম হতে পারত।’
২) বাজে পরামর্শ দাতা- ফি অনেক
‘Anger is a poor adviser and an expensive companion.’
‘রাগ খুব খারাপ পরামর্শদাতা; কিন্তু তার ফি অনেক বেশি।’
অনেক ক্ষেত্রেই রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বিধ্বংসী হয়। তাই
রাগের মাথায় এমন কিছু করতে নেই, যা পরে সারাজীবন কষ্ট দেবে।
আজ এ ধরনের ছয়টি আচরণ নিয়ে আলোচনা করব।
ক) মগজ ফ্রিজে রাখুন: সিদ্ধান্ত পরে নিন
রাগের মাথায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন না। এটি যে কত ক্ষতিকর, আফজাল সাহেবের চাকরি ছেড়ে দেওয়া তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
খুব রাগ হলে কিছুক্ষণের জন্য একা হয়ে যান। ঠান্ডা মাথায় অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা চিন্তা করুন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে আলাপ করুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
কদিন আগে বলেছিলাম, উত্তপ্ত মগজ শয়তানের কারখানা। তাই মগজকে উনুনে নয়, ফ্রিজে রাখুন। কথাটি আবার মনে করিয়ে দিতে চাই।
খ) ইরেজার নেই: মুছতে পারবেন না
রাগের মাথায় অনেক সময় আমরা সোশ্যাল মিডিয়া বা ইমেইল অথবা টেক্সটে অনেক কিছু লিখে ফেলি। এটি ভয়ানক ক্ষতি করতে পারে। সম্পর্ক ভাঙতে পারে, মান-সম্মান নষ্ট হতে পারে, অযথা শত্রু বাড়তে পারে।
মনে রাখবেন, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট কখনোই পুরোপুরি মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। আপনি মুছে ফেললেও তা কারো না কারো কাছে থেকে যেতে পারে। সত্যি বলতে কী, এ ধরনের পোস্ট, মেইল বা মেসেজ মোছার ইরেজার আবিষ্কার হয়নি।
গ) রাগী চাকা খু*ন করে
রাগত অবস্থায় কখনো গাড়ি চালাবেন না। তখন মস্তিষ্ক উত্তেজিত থাকে। ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। তাই দুর্ঘটনা ঘটে। চালকও মারা যেতে পারে, অন্য কেউও মারা যেতে পারে। কিংবা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।
কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা মানে সারাজীবনের কান্না।’
ঘ) পুরোনো বই খুলবেন না
রাগের মাথায় আমরা অনেক পুরোনো ঘটনা টেনে আনি। এতে সমস্যা কমে না—বাড়ে। কারণ নতুন ক্ষতের সাথে যোগ হয় পুরোনো ক্ষত। যার ফলাফল ভালো হয় না। সম্পর্ক আরও তলানিতে যায়।
যে ক্ষতকে এত কষ্ট করে ড্রেসিং করে সামলে রেখেছেন, ব্যান্ডেজ খুলে তা বের করে আনার কোনো মানে হয় না।
ঙ) প্রতিশোধ গরম সিঙ্গারা নয়
প্রতিশোধ গরম সিঙ্গারা নয় যে, তৎক্ষণাৎ তা পরিবেশন করতে হবে।
রেগে গেলে সাথে সাথে প্রতিশোধ নিতে যাবেন না। যার সাথে রাগ করেছেন, তিনি হয়তো ভুল করেছেন। সময়ে এগুলো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে গেলে তা ঠিক হয় না। অনেক সময় অস্থায়ী শত্রু স্থায়ী শত্রুতে পরিণত হয়। তাই প্রতিশোধ না নিয়ে তাকে শোধরানোর সুযোগ দিন।
মনে রাখবেন, প্রতিশোধ প্রতিশোধই ডেকে আনে। এই চক্করে পড়লে সর্বনাশ!
চ) অপমানের দায় শোধ হয় না
কখনো রেগে গিয়ে অপমানসূচক কথা বলবেন না। প্রকৃতির একটি দাঁড়িপাল্লা আছে। তা সবসময় ভারসাম্য বজায় রাখে। আজ কাউকে অপমান করলেন, কাল হয়তো আপনাকেও অপমানের মুখোমুখি হতে হবে।
এভাবেই পাল্লা দুটো সমান সমান হয়ে যাবে।
৩) কলোনির হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি-
একটি সত্যি ঘটনা দিয়ে শেষ করি।
আমাদের কলোনিতে এক চাচা ছিলেন প্রচণ্ড বদরাগী। তাঁর ছেলেকে প্রায়ই প্রচণ্ড মারধর করতেন। মারের ভয়ে ছেলেটি একদিন পালিয়ে গেল। তারপর প্রায় পঞ্চাশ বছর তার খোঁজ মেলেনি। বাবার কাছে হারানো পুত্র আর ফিরে আসেননি! যেমনটি মৃত মানুষ ফিরে না!
কিছুদিন আগে আর জে কিবরিয়া ভাইয়ের একটি টক শোতে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, একজন ভদ্রলোক বলছেন, তিনিই সেই ছেলে-যিনি তাঁর বাবার উন্মাদনাগ্রস্ত রাগ সহ্য করতে না পেরে বাসা থেকে পালিয়েছিলেন! ঢাকায় এসে এটা-সেটা করে পড়ালেখা করেছেন। এখন একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের পাইলট।
আমি তাঁর ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। তাঁর সাথে কথা বলে বুঝলাম, বাবার উপর অভিমান তাঁর এখনো যায়নি!
শুধু রাগের কারণে ছেলে জীবিত থাকার পরেও বাবার কাছে মৃত হয়ে গেল! বাবা বেঁচে থাকার পরেও ছেলের কাছে লাশ হয়ে গেলেন!
রাগ কত ভয়ংকর! তা আর নিশ্চয় বুঝিয়ে বলার দরকার নেই!
[লেখাটি শেয়ার করা যাবে]
কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি জনাব বাদল সৈয়দ এর কাছে সুন্দর সুন্দর লেখা পাই তার কাছ থেকে, শেয়ার করা যাবে দেখলে মিস করি না সাধারণত, ভালো থাকবেন অনেক ভালো।
(ছবিটি এমনিতেই এ্যাড করা হয়েছে)