24/01/2026
আমাদের ঘরগুলোতে এখন আর চোর ঢোকার ভয় নেই, কারণ রাতভর কোনো না কোনো ঘরের বাতি জ্বলে থাকে। এক ঘরে বাবা-মা ঘুমানোর চেষ্টা করছেন ফেলে আসা দিনের হিসাব মেলাতে, আর পাশের ঘরে সন্তান জেগে আছে অনাগত এক ভবিষ্যতের স্বপ্নে। এই এক ছাদের নিচে দুই প্রজন্মের বাস, অথচ তাদের মাঝখানে বয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য নদী। যার এক তীরে অভিজ্ঞতার পাহাড়, অন্য তীরে কৌতূহলের জোয়ার। আমরা এই দূরত্বকে বলি ‘জেনারেশন গ্যাপ’, কিন্তু আসলে এটা হলো এক চিরন্তন ভুল বোঝাবুঝির গল্প।
বাবা-মায়েরা জীবনকে দেখেন তাদের জীবনের ক্ষতগুলো দিয়ে। তারা অভাব দেখেছেন, অনিশ্চয়তা দেখেছেন, দেখেছেন কীভাবে তিল তিল করে একটি সংসার গড়তে হয়। তাই তাদের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো ‘নিরাপত্তা’। তারা চান সন্তান যেন এমন এক পথে হাঁটে যেখানে কোনো কাঁটা নেই। অন্যদিকে, সন্তানদের কাছে জীবন মানে হলো এক অজানাকে জানার নেশা। তারা শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাকে জীবন মনে করে না, তারা চায় জীবনের একটি অর্থ খুঁজে পেতে। বাবা-মা খুঁজছেন বাঁচার উপায়, আর সন্তান খুঁজছে বাঁচার কারণ।
সমস্যাটা বাঁধে যখন অভিজ্ঞতা শাসন করতে চায়, আর তারুণ্য চায় মুক্তি। বাবা-মায়েরা যখন সন্তানকে আগলে রাখতে চান, সন্তান তখন সেটাকে মনে করে শিকল। তারা ভুলে যান যে, খাঁচায় রেখে পাখিকে নিরাপদ রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে আকাশের সাথে পাখির পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় না। আবার সন্তানরাও ভুলে যায়, তাদের আজকের এই উড়তে পারার আকাশটা তৈরি করে দিয়েছেন ওই মানুষগুলোই, যারা নিজেদের ডানা ছেঁটে সন্তানদের জন্য বাসা বুনেছেন।
আজকের দুনিয়ায় প্রযুক্তির গতি এত বেশি যে, বাবা-মায়ের জমানো জ্ঞান অনেক সময় সন্তানের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। তারা যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা সন্তানকে দেখেন, তখন তারা একাকীত্ব অনুভব করেন। তারা বোঝেন না যে এই ছোট পর্দার ভেতরেই তাদের সন্তানের রুটি-রুজি, বন্ধুত্ব আর ভার্চুয়াল এক বিশাল জগত। তারা ভয় পান এই ভেবে যে, সন্তান হয়তো তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর সন্তান বিরক্ত হয় এই ভেবে যে, কেন তাকে বারবার সন্দেহ করা হচ্ছে। অথচ এই বিরক্তির আড়ালে যে গভীর মমতা লুকানো থাকে, তা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
সম্মান মানে এখন আর কেবল মাথা নিচু করে কথা মেনে নেওয়া নয়। আজকের প্রজন্ম যুক্তি দিতে শিখেছে, প্রশ্ন করতে শিখেছে। বাবা-মায়েরা একে অনেক সময় অবাধ্যতা ভাবেন। কিন্তু যে সন্তান পৃথিবীর সাথে লড়াই করার সাহস সঞ্চয় করছে, সে ঘরের ভেতরেও নিজের যুক্তিটা স্পষ্ট করে বলবে এটাই তো স্বাভাবিক। চুপচাপ থাকা মানেই যেমন সম্মান নয়, তেমনি চিৎকার করা মানেই জয় নয়। দুই প্রজন্মের মাঝে যখন তর্কের দেয়াল ওঠে, তখন জয়ী কেউ হয় না, পরাজিত হয় কেবল তাদের মাঝখানের সুন্দর সম্পর্কটা।
দিনের শেষে আমরা সবাই আসলে ভালোবাসারই কাঙাল। বাবা-মা চান সন্তান তাদের মূল্য দিক, আর সন্তান চায় বাবা-মা তাকে একটু বুঝুক। এই ‘বোঝা’ আর ‘মূল্য দেওয়া’র মাঝখানের সেতুটা হলো আলোচনা। পৃথিবীর সব মানুষ স্বার্থপর হতে পারে, কিন্তু বাবা-মায়ের মতো নিঃস্বার্থ আশ্রয় আর কোথাও নেই। আবার সন্তানদেরও মনে রাখা উচিত, একদিন তারাও বাবা-মা হবেন এবং সেদিন তারাও হয়তো তাদের সন্তানদের কাছে একইরকম ‘পুরানো’ মনে হবেন।
সময়ের স্রোত কাউকে থামিয়ে রাখে না। তাই দেয়াল তুলে দূরত্ব না বাড়িয়ে, একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই আসল মানুষের পরিচয়। ঘরের বাতিগুলো যেন নিভে না যায়, আর মনের ভেতরের জানলাগুলো যেন খোলা থাকে—যাতে দুই প্রজন্ম একে অপরের আলো দেখতে পায়।
-
আলী এইচ শাওন
#জেনারেশনগ্যাপ #বাংলাদেশি_পরিবার #বাবা_মা_ও_সন্তান #পারিবারিক_সম্পর্ক #অদৃশ্য_দেয়াল #ভালোবাসার_গল্প #সময়ের_কথা ানুষ #জীবনের_দর্শন #সমাজ_ও_আমরা #আজকের_তরুণ #বাবা_মায়ের_চিন্তা #ভাবনার_খোরাক #বাংলা_লেখালেখি #বাংলা_কলাম