05/06/2026
নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ হওয়ার পরে এত গুরুতর অসুস্থ শেহজিল আর কখনো হয়নি।
গত ৩১ তারিখ আমার একমাত্র বোনের বিয়ে ছিল। বিয়ের দিন সকাল থেকে সারাদিন আমরা শেহজিল কে নিয়ে হাসপাতাল ছিলাম।
আমাদের প্ল্যান থাকে একরকম। আর আল্লাহর প্ল্যান থাকে একরকম।
এই বিয়ে নিয়ে কত প্ল্যাণ,কত প্ল্যান, কত কত শপিং করেছি। অথচ কিছুই পড়তে পারিনি। বিয়েতেই থাকতে পারিনি।
শেহজিল আমাদের বাড়ির একমাত্র নাতি, পুরো প্রোগ্রামে যেখানে সবার আগে ওর থাকার কথা ছিল। সেখানে ও, আমি আমরা কোথাও নেই। একটা ছবি পর্যন্ত নেই
গত ২৫ তারিখ সকালে ওর জ্বর আসে,সাথে সর্দি। সেদিন ই ডক্টর দেখানো হয়।
কিন্তু ৫/৬ ঘন্টা পর পর সাপোজিটারি রিপিট করেও ওর জ্বর ১০১ এর কাছাকাছি, ঘন্টা খানেকের জন্য ১০০ বা তার নিচে নামে। তার সাথে সর্বক্ষণ গা স্পঞ্জ, জলপট্টি তো আছে।
ঈদের পরেরদিন ২৯ তারিখ আবার ডক্টর দেখালাম। উনি বুকের এক্সরে,ডেঙ্গু,সাথে কিছু ব্লাড টেস্ট করিয়ে এন্টিবায়োটিক চেঞ্জ করে দিলেন। সাথে প্যারাসিটামল না দিয়ে জ্বরের জন্য আইবুপ্রুফেন সিরাপ আর ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটারি দিলেন।
শেহজিল জ্বর তবুও নামে না।
দুপুর ২ টায় ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটারি দিয়ে রাত ৮ টায় আইবুপ্রোফেন দেয়া হল। তারপরেও জ্বরে ওর কাঁপুনি উঠে গেল। আবার আধা ঘন্টার মধ্যে নাপা সাপোজিটারি দেয়া হল। তবুও জ্বর নামে না।
এতদিন তাও জ্বর কমলে খেলত,আর জ্বর আসলে কাঁদত।
কিন্তু ৩০ তারিখ মানে গায়ে হলুদের দিন সকাল থেকে আর মাথাই তোলে না।সকালে জ্বর আসার পর ডায়ক্লোফেনাক সাপোজিটারি দেয়ার পর জ্বর গায়ে ছিল না তবুও সে মাথা তোলে না। যা ই তোলে ভাল ভাবে তাকায় না, হাসে না। সন্ধ্যা থেকে টানা কান্নাকাটি শুরু হল।
সারা রাত কাঁদল। সকালের দিকে একদম নেতিয়ে গেল,গায়ে জ্বর,কাশি,সর্দি,ঠোট,-চোখ সব ফুলে গেছে, মুখের ভিতরে কালা, থুতু মোটা হয়ে জমে সাদা হয়ে গেছে ঢোক গিলতে পারে না। পি আই সি ইউ তে থাকা কালীন আমার ছেলে চোখ বন্ধ করেনি ঘুম ছাড়া,অসুস্থতার জন্য তার স্বরে চিৎকার করত।
কিন্তু এবার সে এতটাই দূর্বল হয়েছে সে চোখ বন্ধ করে কাঁধে পড়ে ছিল।
এদিকে আইবুপ্রুফেন, ডাইক্লোফেনাক দুটোই একইজাতীয় মেডিসিন, NSAID, সাথে আবার প্যারাসিটামল সাপো ও দিয়েছি। আমার ভয় হচ্ছিল ওভারডোজড হয়ে গেল না তো!
বিয়ের দিন সকাল সাড়ে ৭ টায় আমরা স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হলাম। আগে থেকে গাড়ি বুক করা ছিল না। অটো নিয়ে যাচ্ছিলাম মাইক্রো স্ট্যান্ড। একদম স্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে আমাদের পুরো অটো উলটে গেছে। একেই মনে হয় বলে 'মরার উপর খারার গা"
আল্লাহর অশেষ রহমত,কেউ তেমন ব্যথা পাইনি। শেহজিল ওর বাবার কোলে ছিল,তাই ব্যথা পায়নি। ওর বাবা ওকে শক্ত করে ধরে রেখে নিজের পা,হাত দিয়ে সেফ করেছে। এতে শেহজিলের বাবা ব্যথা পেয়েছে কিছুটা।
আমার কোলে থাকলে আমি হয়তো এভাবে ধরে রাখতে পারতামনা।
গায়ে জ্বর বলে প্রথমে ইমার্জেন্সি তে ঢুকলাম। পেসক্রিপশন গুলো দেখিয়ে হিস্ট্রি বলে জিজ্ঞেস করলাম -আইবুপ্রুফেন কি ওভারডোজড হয়ে গেছে? শুধু জ্বর-সর্দিতে এতটা খারাপ অবস্থা তো হওয়ার কথা না।
উনারা বলল,ওভারডোজ তো অবশ্যই হয়েছে, আপনি এতবার কেন দিলেন আইবুপ্রোফেন?
আমি যখন বললাম,আমি পেসক্রিপশন অনুযায়ী ই দিয়েছি।
উনারা বলল ৬ দিন ধরে জ্বর,রোগীর অবস্থাও এমন এডমিশন নেন।
আমি বললাম,ও রাজ স্যারের পেশেন্ট,স্যার কে আগে দেখিয়ে নেই।
এপোয়েন্টমেন্ট ডেস্ক থেকে বলল- স্যারের আজ ওয়েটিং সিরিয়াল ও বুকড। সম্ভব না। অন্য কাউকে দেখান। কিন্তু আমার জোরাজুরিতে উনারা বললাম, আচ্ছা উপরে গিয়ে দেখেন,আপনিতো মা, যতই বুঝাই-বুঝবেন না।
তারপর নার্স ডেস্কে যাওয়ার শেহজিলের অবস্থ্যা দেখে নার্স রা বলল- আপনি মন খারাপ করবেন না, স্যার আসুক দেখিয়ে দিব।
এদিকে টানা ৬/৭ দিন নির্ঘুম থাকায় আমি ও মাথা তুলে রাখতে পারছিলাম না অই মুহুর্তে। আমি চেয়ারের মধ্যেই মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েছি। শেহজিলের বাবা এক কাঁধে শেহজিল কে নিয়ে আরেক হাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
কি একটা কঠিন অবস্থা।
স্যার আসল ১১ টায়। এপোয়েন্ট ছাড়া পেমেন্ট ই নিচ্ছিল না।সিস্টারদের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। উনারা পেমেন্ট ডেস্কে রেফার করে পেমেন্ট নেওয়ালেন এবং এপোয়েন্টমেন্ট ছাড়া উনারা আমাকে একদম প্রথম সিরিয়ালে দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন।
তারপর স্যার দেখে মেডিসিন দিলেন, যেই আইবুপ্রোফেন এবং ডাইক্লোফেনাক ওভারডোজ হওয়া নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম, স্যার বলল -ডোজ টা কম ছিল, আমি বাড়িয়ে দিচ্ছি।
উনি আইবোপ্রোফেনের ডোজ ২.৫ মিলি থেকে বাড়িয়ে ৫ মিলি করে দিলেন।
কিছু টেস্ট দিলেন, রিপোর্টে সামান্য ইনফেকশন পাওয়া গেল।
টেস্টের রিপোর্ট পেয়ে দেখাতে দেখাতে বিকাল হল। ঢাকা থেকে নরসিংদীর উদ্দেশ্যে রুওনা দিয়েছি এরাউন্ড বিকাল ৫ টার আশেপাশে।
বাড়ি এসে শুধু বোনকে বিদায় দিয়েছি। তারপর রিসিপশনে ও যাইনি শেহজিল অসুস্থ বলে।
এখনো সুস্থ হয়নি ও। জ্বর ঠিক হল এই ২ দিন।
টানা ৯ দিন ও শুধুমাত্র ফর্মূলা এবং ব্রেস্টফিড করে ছিল। তাও ১ কৌটা ফর্মূলা শেষ হতে সময় লাগল ১১ দিন। ২ বছরের একটা বাচ্চা ১২০ মিলি ফর্মূলা ও শেষ করতে পারত না একবারে। এক দানা, একটা সিংগেল দানা সলিড ও মুখে দেয়নি টানা ৯ দিন,মাঝখানে একদিন শুধু অল্প একটু জাউভাত মুখে দিয়েছিল।
গত পরশু সারাদিনে প্রসাব করেছে মাত্র ২ বার।
ও প্রায়ই অসুস্থ হয়। কিন্তু এরকম ভয়াবহ অসুস্থ সে এই ২০/২১ মাসে হয়নি। প্রায় ৬ মাস পর সর্দি লেগেছে এবার৷ কিন্তু কেন কিভাবে এতটা এফেক্টেড হল বুঝলাম ই না।
অসুস্থ হলে সে অলওয়েজ ই ট্যান্টার্ম বেশি করে।
এবার ও জ্বর থাকলে টানা কাঁদত, জ্বর নামলে খেলত। কিন্তু ৩০ ৩১তারিখ যেমন নেতিয়ে গিয়েছিল এরকম টা কখনো ই হয়নি। একেবারেই শরীর ছেড়ে দিয়েছিল,চোখ ই খোলেনি। যখন অই আই সি ইউ তে ছিল তখন ওআমার ছেলে তার স্বরে চেঁচাত৷ এভাবে চোখ বন্ধ করে ফেলেনি।
আল্লাহ ওকে রক্ষা করেছে। আল্লাহ'র দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া।
কি ঈদ, কি বিয়ে বাড়ি কিভাবে সব গেল একমাত্র আল্লাহ জানে।
আমার ছেলের ঈদের পাঞ্জাবী,হলুদের পাঞ্জাবি, বিয়ে-রিসিপশনের নতুন ড্রেস সবকিছু যেমন টা ভাজ করা ছ তেমন টা আছে। পড়তেই পারল না।
আমি কাঁদি আমার ছেলে নতুন জামা পড়তে পারলনা, আনন্দ করতে পারল না। আর আমার কাঁদে তার মেয়ে কত শখ করে শপিং করেছে, জামদানী পল্লী থেকে গিয়ে শাড়ি কিনেছে কিছুই পড়তে পারল না, শখ আহ্লাদ করতে পারলনা।
নাতির জন্য তো সাথে আবার ফ্রী কান্নাকাটি আছেই।
এই ছবিটা ১.৫ মাস বয়সের। যখন নিউমোনিয়ার জন্য ওকে নিয়ে হাসপাতালে এডমিট ছিলাম।