10/09/2026
ক্ষমাই দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি: ভুলের পরেও যেভাবে টিকে থাকে ভালোবাসার সংসার
দাম্পত্য জীবন দুটি নিখুঁত মানুষের মিলন নয়; বরং দুটি অপূর্ণ মানুষের একসঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার অঙ্গীকার। তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল, মতবিরোধ, রাগ-অভিমান কিংবা কখনো বড় ধরনের ভুল হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি ভুল যদি অনুতাপ, সংশোধন এবং ক্ষমার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়, তবে সেটিই সংসারকে আরও পরিণত ও দৃঢ় করে তোলে। আর যদি প্রতিশোধ, অহংকার ও অতীতের ভুল বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তবে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটিও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
ইসলাম দাম্পত্য সম্পর্ককে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং রহমত, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি ইবাদত হিসেবে দেখেছে। তাই ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—যেখানে অনুতাপ আছে, সেখানে ক্ষমা থাকবে; যেখানে সংশোধনের চেষ্টা আছে, সেখানে নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকবে।
▫️ক্ষমা আল্লাহর প্রিয় গুণ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾
"তারা যেন ক্ষমা করে এবং উদারতা প্রদর্শন করে। তোমরা কি ভালোবাসো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন? আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
— সূরা আন-নূর, ২৪:২২
যে ব্যক্তি নিজের জন্য আল্লাহর ক্ষমা কামনা করে, তার উচিত অন্যদেরও যথাসম্ভব ক্ষমা করা। দাম্পত্য জীবনে এই শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
▫️স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সহনশীলতার নির্দেশ
আল্লাহ তা'আলা বলেন—
﴿ وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا ﴾
"তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের কোনো বিষয় তোমাদের অপছন্দ হয়, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।
— সূরা আন-নিসা, ৪:১৯
এই আয়াত শেখায়—একটি ভুল বা অপছন্দের কারণে পুরো মানুষটিকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
▫️মানুষ ভুল করবেই, কিন্তু উত্তম হলো তাওবাকারী
রাসূল ﷺ বলেছেন—
« كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ »
"আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।"
— তিরমিযী, হাদিস নং ২৪৯৯
যদি আল্লাহ নিজেই তাওবাকারী বান্দাকে গ্রহণ করেন, তবে দাম্পত্য জীবনে আন্তরিক অনুতাপের পর ক্ষমা করার মানসিকতা থাকা আরও জরুরি।
▫️সর্বোত্তম মানুষ সে-ই, যে পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে
রাসূল ﷺ বলেছেন—
« خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي »
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।"
— তিরমিযী, হাদিস নং ৩৮৯৫
পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণের অন্যতম দিক হলো—ভুল হলে ধৈর্য ধরা, সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং ক্ষমা করা।
▫️ক্ষমা সম্পর্ককে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করে
অনেকে মনে করেন, ক্ষমা করলে নিজের মর্যাদা কমে যায়। অথচ রাসূল ﷺ বলেছেন—
« وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا »
"কোনো বান্দা ক্ষমা করলে আল্লাহ তার মর্যাদা ছাড়া আর কিছুই বাড়িয়ে দেন না।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮৮
অর্থাৎ ক্ষমা দুর্বলতার পরিচয় নয়; এটি ঈমান, চরিত্র ও আত্মমর্যাদার পরিচয়।
▫️কখন ক্ষমা করা উচিত?
ক্ষমা তখনই অর্থবহ, যখন—
ভুলকারী নিজের ভুল স্বীকার করে। আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়। সংশোধনের চেষ্টা করে। একই ভুলকে অভ্যাসে পরিণত না করে।
তবে যদি কোনো সম্পর্কে নিয়মিত নির্যাতন, জুলুম বা নিরাপত্তাহীনতা থাকে, তাহলে ইসলাম সেই জুলুম মেনে নিতে বলেনি। সে ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত উপায়ে পরিবার, আলেম বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নেওয়া উচিত।
▫️দাম্পত্যে ক্ষমার কিছু বাস্তব উপকারিতা
ভালোবাসা ও বিশ্বাস পুনরুদ্ধার হয়।
সন্তানদের জন্য শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি হয়।
অহংকারের পরিবর্তে বিনয় জন্মায়।
শয়তানের বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ কমে যায়।
আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের আশা বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘস্থায়ী ও সুখী দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি মজবুত হয়।
▫️ভুলকে নয়, মানুষটিকে দেখুন
একজন স্বামী বা স্ত্রী হয়তো কোনো বড় ভুল করেছে, কিন্তু তার জীবনের অসংখ্য ত্যাগ, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতাও বিবেচনা করা উচিত। ইসলাম আমাদের শেখায়—একটি ভুলের জন্য একজন মানুষের সব ভালো দিককে অস্বীকার করা ন্যায়সঙ্গত নয়।
যেখানে ক্ষমা আছে, সেখানে সম্পর্ক নতুন জীবন পায়। যেখানে অহংকার জয়ী হয়, সেখানে ভালোবাসা ধীরে ধীরে নিভে যায়। তাই দাম্পত্য জীবনে ক্ষমা কেবল একটি আবেগ নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহৎ ইবাদত এবং একটি সুখী, স্থায়ী ও বরকতময় সংসারের অন্যতম ভিত্তি।
---আইন উদ্দিন আইনী