11/08/2026
অনেক মানুষের ভিড়ে নিজের মুখ হারিয়ে ফেলার চেয়ে, একা একটি ঘরে বসে নিজের মুখটাকে নতুন করে চিনে নেওয়া অনেক বেশি জরুরী। কারণ, নির্জনতা একদিনে আপন হয় না।
প্রথমদিকে সে ছিল অচেনা এক অন্ধকারের মতো। সন্ধ্যা নামলেই মনে হতো, চারপাশের নীরবতা ধীরে ধীরে আমার নাম ধরে ডাকছে। ঘরটা অকারণে বড় হয়ে উঠত, দেয়ালগুলো যেন একটু একটু করে কাছে আসত, আর নিজের ভেতরের শব্দগুলো এত জোরে শোনা যেত যে বাইরে পৃথিবীর কোনও শব্দই আর আলাদা করে শুনতে পেতাম না।
তখন খুব ইচ্ছে করত কারও সঙ্গে কথা বলতে। কোনও বিশেষ কথা নয়। শুধু এতটুকু জানার জন্য যে ওপাশে সত্যিই কেউ আছে। কেউ একজন, যে আমার নীরবতাটুকুও শুনবে।
একা থাকার অভ্যাস আমার কোনওদিন ছিল না। ছোটবেলায় মনে হতো, মানুষ যত বেশি, জীবনও বুঝি তত পূর্ণ। বিকেলের বারান্দায় জমে থাকা আড্ডা, পাড়ার চেনা মুখ, অকারণ হাসি, রাত জেগে কারও একটি মেসেজের অপেক্ষা, হঠাৎ ফোন বেজে ওঠার আনন্দ, কারও সঙ্গে কোনও কারণ ছাড়াই কথা বলে যাওয়া।
এসব দিয়েই যেন পৃথিবীটা সম্পূর্ণ ছিল। তখন বুঝিনি, মানুষের ভিড় আর মানুষের সঙ্গ এক জিনিস নয়। অনেক মানুষের মাঝেও মানুষ নিঃসঙ্গ হতে পারে। অনেক কণ্ঠের ভেতরেও নিজের কণ্ঠটা হারিয়ে যেতে পারে। আবার কখনও এমনও হয়, একটি নিঃশব্দ ঘরে একা বসে মানুষ নিজের সঙ্গেই এমন এক গল্পে ডুবে যায়, যে কখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়, সে টেরই পায় না।
সময় বোধহয় মানুষকে শেখানোর জন্য সরাসরি কোনও পথ বেছে নেয় না। সে মানুষকে শেখায় হারিয়ে দিয়ে। যাদের চলে যাওয়ার ছিল, তারা একদিন চলে গেল। যাদের ভুলে যাওয়ার ছিল, তারা ভুলে গেল।
কিছু সম্পর্ক কোনও শব্দ না করেই শেষ হয়ে গেল। কিছু মানুষ বিদায় না বলেই দূরে সরে গেল। কিছু দরজা বন্ধ হয়ে গেল নিঃশব্দে, অথচ তার শব্দ অনেকদিন ধরে বুকের ভেতর বাজতে থাকল।
একসময় বুঝলাম, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি শব্দ হয় প্রত্যাশা থেকে।
আর সবচেয়ে গভীর নীরবতা জন্ম নেয় সেই প্রত্যাশাগুলো একে একে নিভে যাওয়ার পর। তারপর একদিন খেয়াল করলাম, অপেক্ষা করার মতো মানুষ কমে গেছে, অথচ অপেক্ষা করার অভ্যাসটা এখনও রয়ে গেছে। ফোনের পর্দা জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। কেউ ফিরে আসবে সেই অপেক্ষা। কেউ হয়তো হঠাৎ মনে করবে, সেই অপেক্ষা। কেউ হয়তো আবার আগের মতো কথা বলবে, সেই অপেক্ষা।
মানুষ কখনও কখনও চলে যায়, কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করার অভ্যাসটা থেকে যায় অনেকদিন। তারপর সেই অপেক্ষাও একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, নিঃশব্দে। কোনও অভিযোগ না করে। আর ঠিক তখনই মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত শান্তি। এমন এক শান্তি, যার খবর পৃথিবীর আর কারও জানার প্রয়োজন হয় না।
এখন ছুটির দিনে মাঝে মাঝে ফোনটা উল্টে রেখে জানালার পাশে বসে থাকি। কোনও গান বাজে না। কাউকে ফোন করার তাড়াও থাকে না। বাইরে একটা কাক ধীরে ধীরে জল খায়। পাশের বাড়ির বারান্দায় কেউ কাপড় মেলে দেয়। দূরে কোথাও ট্রেন চলে যায়। তার শব্দ এসে কিছুক্ষণ জানালার কাঁচে থেমে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় শহরের অন্যসব শব্দের ভিড়ে। অদ্ভুত লাগে। একসময় যেসব শব্দকে এত তুচ্ছ মনে হতো, এখন তারাই যেন আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। একটা বিকেল কীভাবে নিঃশব্দে শেষ হয়ে যায়, জানালার পাশে বসে তা দেখতে দেখতে বুঝেছি, জীবন সবসময় বড় কোনও ঘটনার নাম নয়। জীবন কখনও কখনও খুব ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মধ্যে। জানালার কার্নিশে এসে বসা একটি পাখির মধ্যে দূরের ট্রেনের শব্দে। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘরের মেঝেতে নেমে আসার মধ্যে। অথবা নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার মধ্যেও।
আমরা ভাবি, একাকীত্ব মানেই শূন্যতা। কিন্তু একা থাকতে থাকতে বুঝেছি, নির্জনতা আসলে শূন্যতা নয়। নির্জনতা একটি আয়না। সেখানে অন্য কারও মুখ দেখা যায় না। শুধু নিজের মুখটাই বারবার ফিরে আসে। প্রথমে সেই মুখটাকে অচেনা লাগে।
নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু ভয়, কিছু দুর্বলতা, কিছু অভ্যাস, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, কিছু না-বলা কথা, কিছু পুরোনো ক্ষত হঠাৎ একে একে চোখে পড়ে, অস্বস্তি হয়। নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পালাব কোথায়? চারপাশে কেউ নেই। অথচ পালানোর পথও নেই। তাই একসময় বসে থাকতে হয় নিজের সঙ্গেই।
নিজের ভাঙা অংশগুলোর পাশে। নিজের না পারা, না বলা আর না পাওয়াগুলোর পাশে। নিজের সেইসব গল্পের পাশে, যেগুলো কাউকে কোনওদিন বলা হয়ে ওঠেনি। আর ধীরে ধীরে তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। যে মানুষটাকে এতদিন এড়িয়ে চলেছি, তার সঙ্গেই একদিন বন্ধুত্ব হয়ে যায়, নিজের সঙ্গে। হয়তো একা থাকার সবচেয়ে বড় শক্তিটা এখানেই। যে মানুষটা একা বসে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, তাকে ভয় দেখানোর জন্য পৃথিবীর হাতে খুব বেশি অস্ত্র থাকে না। কারণ সে হারানোর আগেই হারিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনেছে।
অপেক্ষা শেষ হওয়ার আগেই অপেক্ষার স্বাদ চিনেছে। মানুষ চলে গেলে বুকের ভেতর কেমন শূন্যতা জন্মায়, সে জানে। আবার মানুষ না থাকলেও কীভাবে নিজের পাশে দাঁড়াতে হয়, সেটাও সে শিখে গেছে।
সবাই ভাবে, নির্জন মানুষগুলো বুঝি কাউকে খুঁজে পায় না। আসলে হয়তো তারা কাউকে খুঁজতে খুঁজতেই একদিন নিজের কাছে ফিরে আসে। অনেক দরজায় কড়া নেড়ে, অনেক নাম ভুলে, অনেক অপেক্ষা পেরিয়ে, অনেক রাত জেগে, অনেক কান্না লুকিয়ে। শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে নিজের কাছেই। আর নিজের কাছে ফিরে আসার পর পৃথিবীর ভিড়টা আর আগের মতো ভয়ংকর লাগে না। কারণ তখন বোঝা যায়, সবসময় কারও পাশে থাকা জরুরি নয়। কখনও কখনও নিজের পাশে নিজে বসে থাকাটাই যথেষ্ট। কারও হাত ধরে বাঁচতে হয় না সবসময়। কখনও নিজের হাতটা নিজেকেই শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। কারও ফিরে আসার অপেক্ষায় জীবন থামিয়ে রাখতে হয় না। কখনও কখনও জানালার পাশে বসে সন্ধ্যাটা শেষ হতে দেখতে হয়। তারপর অন্ধকার নামলে নিজেকেই বলতে হয়, "আমি আছি"।
হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা কোনও মানুষের মুখে নয়।
হয়তো সেটা লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট স্বীকারোক্তির মধ্যে- "সবাই চলে গেলেও, আমি যেন নিজের কাছ থেকে আর কোনদিনও না হারাই"।
✍️ কে.পি'র আত্মঅন্বেষণের গল্প ‘নিজের কাছে ফিরে আসা’ থেকে চুম্বক অংশ।