18/06/2026
দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে সংগঠনের সাবেক এলামনাই ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ও জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন, চবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নদীভাঙন কবলিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক কৃষক পরিবারের সন্তান। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে একসময় জীবিকার সন্ধানে নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টস কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হয়েছে সেই শিক্ষার্থীকে। নানা প্রতিকূলতা ও কর্মব্যস্ততার মধ্যেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে আঁকড়ে রেখেছিলেন সেই শিক্ষার্থী। সেই মেধা, সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের জোরেই অবশেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ভর্তির সুযোগ পান জামালপুরের এক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী। তবে মেধাতালিকায় স্থান পেয়েও অর্থাভাবে যখন সেই শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখনই পাশে দাঁড়িয়েছে জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন, চবি। পরবর্তীতে সংগঠনের সাবেক এলামনাই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীর সহযোগিতায় সেই শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ভর্তি সম্পন্ন হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত নদীভাঙন এলাকা থেকে উঠে আসা এই শিক্ষার্থী পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। কৃষক বাবার সীমিত আয়ের সংসারে পরিবার ও নিজের শিক্ষাজীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হয়েছে সেই শিক্ষার্থীকে। এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জনের পর অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে জীবিকার প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টস কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হয়। কর্মব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৭৫ অর্জন করেন। তবে প্রতিকূলতা সেই শিক্ষার্থীর পথচলা থামাতে পারেনি। মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয়ে সেই শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ‘বি’ ও ‘ডি’ ইউনিটের মেধাতালিকায় প্রথম কয়েক শতকের মধ্যে স্থান করে নেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সেই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভর্তি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে না পেরে সেই শিক্ষার্থী শেষ আশ্রয় হিসেবে যোগাযোগ করেন ‘জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন, চবি’-এর ফেসবুক পেজে। ভর্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে বিষয়টি জানতে পেরে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সেই শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ভর্তি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে জামালপুর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক জিয়াউল হক স্যারের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সংগঠনের সাবেক এলামনাই ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীর নজরে আনা হলে তিনি সেই শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ভর্তির সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সহযোগিতায় ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করে বর্তমানে ওই শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত রয়েছেন।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি এত দ্রুত এত মানুষের সহযোগিতা পাব। অর্থাভাবে যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন এবং ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী স্যার আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের সহযোগিতার কারণেই আজ আমার ভর্তির অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে। আমি তাঁদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, তাঁরা আমাকে মানসিকভাবেও সাহস ও প্রেরণা দিয়েছেন। আমি চেষ্টা করবো তাঁদের এই আস্থা ও ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে এবং ভবিষ্যতে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করতে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন, চবি-এর সভাপতি আরাফাত বিন ফারুক বলেন,
“আমরা বিষয়টি জানার পর থেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ শুরু করি। ভর্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র একদিন বাকি ছিল। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল ফারুক স্যার, সংগঠনের সাবেক সহ-সভাপতি এহসান আহমেদ প্রত্যয় এবং সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম ভাইয়ের সহযোগিতায় দ্রুত তাঁর প্রাথমিক ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে জামালপুর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক জিয়াউল হক স্যারের মধ্যস্থতায় আমরা আমাদের সংগঠনের সাবেক এলামনাই ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। আমরা এসব কাজ আগেও করেছি এবং আমাদের সম্মানিত শিক্ষক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন স্যার এর নির্দেশনায় উক্ত সংগঠন সার্বক্ষণিক জামালপুরের শিক্ষার্থীদের যেকোনো সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“আসলে পুরো বিষয়টিতে অর্থের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহযোগিতার মানসিকতা। সমাজে যদি সামর্থ্যবান ও সচেতন মানুষদের মধ্যে এগিয়ে আসার এই মানসিকতা তৈরি হয়, তাহলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বেঁচে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই একটি সুন্দর সমাজ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি। দেওয়ার মানসিকতা যাদের মধ্যে রয়েছে, তারাই প্রকৃত অর্থে দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।”
এ বিষয়ে সংগঠনের সাবেক এলামনাই ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন,
“আমার মরহুম পিতা ভাষা সৈনিক আ.জা.মু আশরাফ হোসাইন ফারুকী সবসময় শিক্ষা, মানবিকতা ও সমাজসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর আদর্শকে ধারণ করেই ভাষা সৈনিক আ.জা.মু আশরাফ হোসাইন ফারুকী স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। এই শিক্ষার্থীর সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং শিক্ষার প্রতি অدم্য আগ্রহ আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। অর্থাভাবে কোনো মেধাবীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়। তাই বিষয়টি জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। আমরা বিশ্বাস করি, সুযোগ পেলে এ ধরনের শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি এবং সমাজের সকল সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
উল্লেখ্য, জামালপুর স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন, চবি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত জামালপুরের শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে সংগঠনের সাবেক এলামনাই ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীর পৃষ্ঠপোষকতায় ভাষা সৈনিক আ.জা.মু আশরাফ হোসাইন ফারুকী স্মৃতি ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, মানবকল্যাণ ও সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। দরিদ্র এই মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাটি মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।