23/06/2026
আতঙ্কের জনপদ সিরাজদিখান কোলা: নেপথ্যে রুশি-সিদ্দিক দম্পতির ‘মোল্লা রাজত্ব’
মুन्সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার কোলা ইউনিয়ন। গত কয়েক দশক ধরে এই জনপদের মানুষের কাছে একটি নামই ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক—‘মোল্লা পরিবার’। পারিবারিক অন্তন্দ্বন্দ্ব, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, জমি দখল আর একের পর এক নৃশংস অপরাধের কারণে বারবার আলোচনায় এসেছে পরিবারটি। গত শুক্রবার প্রকাশ্য দিবালোকে ইলিয়াস মোল্লা হত্যাকাণ্ড এবং তার চাচা এছাক মোল্লাকে পঙ্গু করার বর্বরোচিত ঘটনার পর এবার বেরিয়ে আসছে এই পরিবারের দীর্ঘ অপরাধের খতিয়ান। যার নেপথ্যে রয়েছেন সাবেক ইউপি সদস্য রওশন আরা রুশি ও তার স্বামী সিদ্দিক মোল্লা।
আশির দশক থেকে ত্রাসের রাজত্ব:
স্থানীয়দের মতে, মোল্লা পরিবারের নৃশংসতার ইতিহাস বেশ পুরনো। আশির দশকে এই পরিবারের ভাগ্নে আক্তারের দুটি চোখ প্রকাশ্যে উপড়ে ফেলে এলাকায় প্রথম ভীতি সৃষ্টি করা হয়। সেই অন্ধত্ব নিয়েই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন আক্তার। এরপর ১৯৯২ সালের দিকে পারিবারিক সম্পত্তির জেরে আপন ভাইদের সাথে কলহে জড়ান সিদ্দিক মোল্লা। সে সময় ভাই এছাক মোল্লার টেঁটার আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তখন থেকেই থানা-পুলিশের খাতায় এই পরিবারটি নিয়মিত ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিছুদিন পর পর নিজেদের মধ্যে মারামারি এবং পরে আবার আপস করা—এটাই ছিল তাদের চেনা কৌশল।
বিতর্কিত বিয়ে ও অপরাধের বিস্তার:
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সম্পর্কে নিজের ভাতিজি (বাবার ফুফাতো ভাইয়ের মেয়ে) রওশনারা রুশিকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে তোলেন সিদ্দিক মোল্লা। সামাজিকভাবে বিতর্কিত এই বিয়ে নিয়ে সিদ্দিক মোল্লার ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এরপর থেকেই শুরু হয় এই ‘দম্পতি’র বেপরোয়া অপরাধ যাত্রা।
সবিতার আত্মহত্যা ধামাচাপা:
এলাকাবাসী জানান, এক সন্ধ্যায় কোলা গ্রামের সুমন্তের স্ত্রী সবিতা বিষপানে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি স্বজনদের জানিয়েছিলেন—চরিত্র নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে রুশি মেম্বার তার চুল কেটে পুরো এলাকায় ঘোরাতে চেয়েছিলেন। সেই অপমানেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এমনকি তার দাহ করার আগে বাড়িতে লাশ থাকা অবস্থাতেও সিদ্দিক মোল্লা পরিবারটিকে হুমকি দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেন। এর কিছুদিন পরেই পান্না নামের এক অসহায় তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে এলাকাছাড়া করতে রুশি ও সিদ্দিক মোল্লা মূল ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘আলাদিনের চেরাগ’ ও রাজনৈতিক খোলস বদল:
স্থানীয় রাজনীতিতে এই পরিবারটি সবসময়ই সুবিধাবাদী চরিত্র বজায় রেখেছে।ライス সহিংস আচরণের কারণে একসময় বিএনপি তাদের দল থেকে দূরে রাখলেও, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রুশি ও সিদ্দিক মোল্লা যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়ে যান। তৎকালীন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের আস্থাভাজন হয়ে রওশনারা রুশি কোলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর জোরেই তিনি পরপর তিনবার প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন—যদিও স্থানীয়দের দাবি, রুশি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তও পড়াশোনা করেননি।
ক্ষমতার দাপটে একে একে ওসমান বেপারীর সাথে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, নয়ন মাস্টার ও বাবুর বাড়ি নির্মাণে বাধা এবং নিজের আপন ভাই ইতালি প্রবাসী মান্নানের ঘর লুট করেন তারা। ভয়ে মান্নান দেশ ছেড়ে ইতালিতেই স্থায়ী হন। এমনকি রুশির নিজের মা-ও মেয়ের বেপরোয়া আচরণে গ্রামে আসা বন্ধ করে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন।
ছাত্রনেতা আসিফ হত্যাকাণ্ড ও সালিশ বাণিজ্য:
২০১৫-১৬ সালের ইউপি নির্বাচনের পর এক প্রতিপক্ষের বাড়িতে গভীর রাতে হামলা করতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন রুশি ও তার ছেলে বিদ্যুৎ মোল্লার সাথে থাকা ছাত্রনেতা আসিফ হাসান। পুলিশ তাকে আহত অবস্থায় জেলে পাঠালে সেখানেই মারা যান আসিফ। এই মৃত্যুকে পুঁজি করে নতুন রাজনীতি শুরু করেন রুশি মেম্বার। আসিফের বাবাকে বাদী করে এলাকার প্রায় এক ডজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়। এই মামলার ভয়ে রফিকুল ইসলাম তারনসহ অনেক প্রভাবশালী নেতা বিপাকে পড়েন এবং রুশির ব্যাপক উত্থান ঘটে।
মামলার ভয় দেখিয়ে শুরু হয় রুশির ‘সালিশ বাণিজ্য’। প্রতিবেশী তন্তর ও আটপাড়ার প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, রুশির টাকার দাপটেই তারা এসব সালিশে এসে অংশ নিতেন। এলাকার যেকোনো জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে সালিশের নামে পুরো জমির দাম ধরে তা হাতিয়ে নিয়ে, অর্ধেক দামে প্রতিপক্ষকে দিয়ে দিতেন রুশি ও সিদ্দিক। আর এই সালিশ বাণিজ্য ও জমি দখল করেই একসময় অন্যের বাড়িতে কাজ করা রওশনারা রুশি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান, তৈরি করেন আলিশান এসি বাড়ি।
৫ই আগস্টের পর রূপ বদল:
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিলেও, রওশনারা রুশি দ্রুত স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে এলাকায় পুনরায় রাজত্ব শুরু করেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি দাবিও করেন যে, গত সংসদ নির্বাচনে এক প্রার্থীকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন তিনি।
ইলিয়াস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ:
পূর্বশত্রুতা ও ৪২ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ৮-৯ মাস আগে এছাক মোল্লাকে পুনরায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেন রুশি ও সিদ্দিক। এরপর থেকে এছাক মোল্লা হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন। এই বিরোধের জের করেই গত শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটায় কোলা প্রাইমারি স্কুল সংলগ্ন টেম্পু স্ট্যান্ডে নাস্তা করতে আসেন এছাক মোল্লা ও তার ভাতিজা ইলিয়াস মোল্লা।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, রওশনারা রুশি, তার স্বামী সিদ্দিক মোল্লা, দুই ছেলে বিপ্লব ও বিদ্যুৎ মোল্লা দেশীয় অস্ত্র (চাপাতি, ছুরি, চাকু) নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আক্রমণের সময় রুশি হুংকার দিয়ে বলছিলেন, "কেউ বাঁচাতে আসলে তাকেও কোপানো হবে।" রক্তক্ষয়ী অবস্থায় দুজনকে ফেলে যাওয়ার সময় সাক্ষীদেরও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত ইলিয়াস মোল্লা श्यामলীর একটি হাসপাতালে মারা যান।
হত্যাকাণ্ডের পর রুশি তার নিজের ছোট বোন (এছাক মোল্লার স্ত্রী) লিলিকে ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন, "এছাকের চিকিৎসার দরকার নেই, ও ওভাবেই মরবে। তুই চলে না আসলে তোকেও কুপিয়ে মারব।" একটি অনলাইন ডিজিটাল প্ল্যাটর্মে তার সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও বিচারপ্রার্থনা:
হত্যাকাণ্ডের পর শনিবার রাতে সিরাজদিখান থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত ইলিয়াসের স্ত্রী। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে পরিকল্পনাকারী ও ৪ নম্বর আসামি রওশনারা রুশি মেম্বার এবং ঢাকা থেকে তার বড় ছেলে বিপ্লব মোল্লাকে গ্রেফতার করে। ইতিমধ্যে বিপ্লব মোল্লা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে মূল খুনি সিদ্দিক মোল্লা ও বিদ্যুৎ মোল্লা এখনো পলাতক রয়েছে। এই মোল্লা পরিবারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এলাকার সমাজসেবক ও মালয়েশিয়া প্রবাসীর মতো অনেক পরিবার আজ নিঃস্ব। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় দেলোয়ার হোসেন মোসার পৈতৃক বাড়িও জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে এই পরিবার। কোলা অঞ্চলের সাধারণ মানুষের এখন একটিই দাবি—এই মূর্তিমান আতঙ্ক রুশি-সিদ্দিক চক্রের যেন সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
(তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: স্থানীয় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী)