05/06/2026
**মাজারে কুমির না থাকায় ধর্ম ব্যবসায় ভাটা।**
একটু খেয়াল করে দেখবেন, ধর্ম ব্যবসা চাঙ্গা রাখতে উপমহাদেশের প্রায় সব মাজারেই এমন কোনো না কোনো "বিশেষ আকর্ষণ" থাকে। কোথাও কচ্ছপ, কোথাও গজার মাছ, কোথাও কুমির। মানুষের কৌতূহল, ভয়, অলৌকিকতার প্রতি দুর্বলতা—এসবকেই পুঁজি করে বছরের পর বছর গড়ে ওঠে এক ধরনের ব্যবসা।
পুরো লেখাটা পড়েই কেবল মন্তব্য করার অনুরোধ রইলো!
সাম্প্রতিক সময়ে বাগেরহাটের খান জাহান আলী মাজারের দিঘির কুমির নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ এখন সেই ঐতিহাসিক দিঘি কার্যত কুমিরশূন্য। আর তার আগে ঘটেছে আরও ভয়াবহ ঘটনা। দিঘিতে এক শিশুকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, খোলা দিঘিতে এমন বিশাল আকারের হিংস্র প্রাণী পালন কতটা যৌক্তিক?
বছরের পর বছর ধরে এই কুমিরকে ঘিরে নানা গল্প, কাহিনি, মানত, তাবিজ-কবজ, অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চলে এসেছে। অনলাইনেও এমন সব দাবি ছড়ানো হয়েছে যে, এই কুমিরের সঙ্গে নাকি রোগমুক্তি, ভাগ্য পরিবর্তন বা নানা রহস্যময় শক্তির সম্পর্ক আছে। অথচ বাস্তবে কুমির একটি বন্য প্রাণী, এর সঙ্গে মানুষের ভাগ্য বা রোগ নিরাময়ের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবিত প্রাণী কুমিরের খাবার হিসেবে নিক্ষেপ করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি জীবন্ত প্রাণীকে জনসমক্ষে এমনভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কখনো ধর্মীয় অনুশীলন হতে পারে না।
এখন আসি ইতিহাসে।
ইতিহাসে উল্লেখ আছে, কথিতভাবে খান জাহান আলী দিঘিতে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন—‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত। তবে গবেষক ও সংবাদসূত্র বলছে, সেই মূল বংশধারা ২০১৫ সালেই শেষ হয়ে যায়। এরপর দিঘিতে থাকা কুমিরগুলো বাইরের উৎস থেকে এনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালে দিঘির পুরুষ কুমির ‘মাদ্রাজী’ মারা যায়। এরপর শুধু স্ত্রী কুমির ‘পিলপিল’ বেঁচে ছিল।
অর্থাৎ যে কুমিরকে ঘিরে আজও অনেকে অলৌকিক গল্প বলেন, তার সঙ্গে ৬০০ বছর আগের ইতিহাসের সরাসরি সম্পর্ক আছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বরং বাস্তবতা হলো, কুমির ছিল একটি সংরক্ষিত প্রাণী; মানুষ তাকে অলৌকিকতার প্রতীকে পরিণত করেছে।
আর এখানেই আমাদের সমস্যা।
আমরা সত্য যাচাই করি না।
কেউ বলল কুমিরকে মুরগি খাওয়ালে মানত পূরণ হয়—বিশ্বাস করি।
কেউ বলল তাবিজ নিলে বিপদ কেটে যাবে—বিশ্বাস করি।
কেউ বলল কুমিরের সঙ্গে অলৌকিক শক্তির সম্পর্ক আছে—বিশ্বাস করি।
কিন্তু প্রশ্ন করি না।
যে জাতি প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই জাতির সামনে ধর্মের নামে ব্যবসা করা সবচেয়ে সহজ।
ধর্ম মানুষের বিবেক জাগ্রত করার জন্য এসেছে, বিবেক বন্ধ করার জন্য নয়।
আজ যদি কুমির না থাকে, কাল অন্য কিছু খুঁজে নেওয়া হবে। কারণ ব্যবসার মূল পুঁজি কুমির নয়, মানুষের অন্ধ বিশ্বাস।
আপনার মতামত কী?
ধর্মীয় স্থানে বন্য প্রাণীকে অলৌকিকতার প্রতীক বানিয়ে রাখা, মানত-তাবিজ-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চালু রাখা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করা—এসব কি বন্ধ হওয়া উচিত?
আলোচনা হোক তথ্যের ভিত্তিতে।