08/08/2026
ভিয়া কনস্তিতুসিওনের আসিন্দার কারখানায় হেলমেটের রঙ দেখে লোক চেনা যেত। কে ঢালাইয়ের লোক, কে রক্ষণাবেক্ষণের, কে শিফট সুপারভাইজার। লাল হেলমেট ছিল কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইন্সপেক্টরদের। বছরের পর বছর ওই লাল হেলমেট মাথায় দিয়ে যিনি প্ল্যান্টের ভেতর হেঁটে বেড়িয়েছেন, তাঁর নাম হোর্হে মেসি।
আসিন্দার আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড়ো ইস্পাত কারখানাগুলোর একটা। রড আর স্টিল বানায়। কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইন্সপেক্টরের কাজ সোজা ভাষায় প্রতিটা ব্যাচ থেকে নমুনা তোলা, পরীক্ষা করা, তারপর রায় দেওয়া। ব্যাচ স্পেসিফিকেশনে মিলল কি মিলল না। মিললে চালান যাবে। না মিললে বাতিল।
১২ ঘণ্টার রোটেটিং শিফট। শনি, রবি, ছুটির দিন বাদ যেত না। রোজারিওর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ভোরের বাস ধরে তিনি ভিয়া কনস্তিতুসিওনে যেতেন, কোনোদিন সহকর্মীদের সঙ্গে গাড়ি ভাগ করেও যেতেন।
হোর্হে মেসির বাবা এউসেবিও মেসি ছিলেন রাজমিস্ত্রি, পরে বেকারি খুলেছিলেন। হোর্হে ও তাঁর বাবা মিলে রোজারিওর দক্ষিণে নিজেদের হাতে একটা ছোটো বাড়ি তুলেছিলেন, মেসি পরিবার ওই বাড়ি আজও রেখে দিয়েছে। হোর্হে নিজে নিওয়েলসের ইয়ুথ দলে মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় ঢোকার পর সেই খেলা আর এগোয়নি। ফিরে এসে বিয়ে করলেন কেলিয়া কুচ্চিত্তিনিকে। দুজনে কিছুদিন অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। এক মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের বিল আদায়কারী হিসেবে কাজ করেছেন। এক ওয়ার্কশপে স্ক্রু বানিয়েছেন। তারপর বুঝলেন কিছু একটা পড়া দরকার, আর পড়লেন কেমিক্যাল টেকনিশিয়ানের কোর্স।
১৯৯২ সালে পাড়ার ক্লাব আবানদেরাদো গ্রান্দোলিতে তাঁর তৃতীয় সন্তান প্রথম বল পায়ে নেয়। ছেলেটার বয়স তখন পাঁচ। ওই মাঠে তিনি ছেলেকে ট্রেনিং করাতেন।
লাল হেলমেট খুলে বাড়ি ফিরে তিনি যে সমস্যার মুখোমুখি হতেন, সেটাও যেন তাঁর কারখানার ভাষাতেই লেখা ছিল। ১১ বছর বয়সে ছেলের শরীরের মাপ নেওয়া হলো। মাপটা স্পেসিফিকেশনে মিলল না: গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি।
বড়ো ক্লাবের ইয়ুথ সেটআপে ছেলেদের বছরে অন্তত একবার দেয়ালের সামনে দাঁড় করানো হয়। উচ্চতা লেখা হয়, সেই হিসাব জমা থাকে। তারপর একদিন ওই সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, কে থাকবে আর কে বাদ পড়বে। ১২ বছর বয়সে যে ছেলে গড় উচ্চতার অনেক নিচে, তাকে বাদ দেওয়ার জন্য আলাদা কোনো কারণ খুঁজতে হয় না। সংখ্যাই যথেষ্ট। কোয়ালিটি কন্ট্রোলের লোক সংখ্যার সঙ্গে তর্ক করে না। হোর্হে মেসিও করেননি। তিনি মাপ মেনে নিয়েছিলেন, লড়েছিলেন প্রসেসের সঙ্গে।
চিকিৎসা চলত প্রতি রাতে ইনজেকশনে। মাসে খরচ পড়ত হাজার ডলারের কাছাকাছি। কারখানার অবরা সোসিয়াল, কর্মীদের যৌথ স্বাস্থ্যবিমা, কিছুদিন খরচ বহন করার পর আর এগোল না। নিওয়েলসও সাহায্যের কথা বলেছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুত টাকা পুরোপুরি আসেনি। রিভার প্লেট ছেলেকে চেয়েছিল, কিন্তু চিকিৎসার খরচের দায় নিতে চায়নি।
রিভারের সেই ট্রায়ালের দিন তারের বেড়ার ওপাশ থেকে হোর্হে ছেলেকে বলেছিলেন, “দেখো, নামায় কি না। ট্রায়াল তো শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
তখন তিনি বুঝলেন, ছেলের জন্য শুধু ক্লাব বদলালেই হবে না, তাঁকেও নিজের জীবন বদলাতে হবে।
২০০০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হোর্হে আর এজেন্ট ফাবিয়ান সোলদিনির সঙ্গে ১৩ বছরের ছেলেটা বার্সেলোনায় নামল, ট্রায়াল দিতে। ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর এক টেনিস ক্লাবে কার্লেস রেশাক একটা ন্যাপকিনে সই করলেন। ওই কাগজ নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। যেটা নিয়ে হয়নি: এর কিছুদিন পর ৪২ পেরোনো হোর্হে আসিন্দারের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দিলেন। পুরোনো সহকর্মী দানিয়েল রেচে পরে বলেছিলেন, কারখানায় শেষ দিকের এক আলাপে হোর্হে তাঁকে বলেছিলেন, লিওর ভবিষ্যতের জন্য বার্সেলোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে কেউ সরাতে পারবে না।
স্পেনে গিয়ে দেখা গেল ক্লাব চুক্তির শর্ত ঠিকমতো রাখছে না। ২০০১ সালে হোর্হে সরাসরি বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট জোয়ান গাসপার্তকে চিঠি লিখলেন। এল গ্রাফিকো বহু বছর পর ওই চিঠি ছাপে। চিঠির শুরুর লাইন ছিল, আমার আর আমার পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। মাঝখানের দালালদের কাজকর্ম পছন্দ না হওয়ায় এরপরই তিনি ছেলের প্রতিনিধিত্বের ভার নিজের হাতে তুলে নেন।
কেলিয়া কুচ্চিত্তিনি বাকি তিন সন্তানকে নিয়ে রোজারিও ফিরে গেলেন। ওরা বার্সেলোনার জীবনটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। বার্সেলোনায় থেকে গেলেন শুধু হোর্হে আর লিও। জীবনীকার গিয়েম বালাগে লিখেছেন, ওই সময়টায় হোর্হেকেই ছেলের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠতে হয়েছিল। তিনি লিওকে সাহস দিতেন, পাশে থাকতেন, একা লাগলে সঙ্গ দিতেন। ছেলেটা অনেক সময় বাবার আড়ালে গিয়ে কাঁদত।
আধুনিক ফুটবলে এজেন্টের আয় অনেকটাই নির্ভর করে খেলোয়াড়ের ক্লাব বদলানো বা নতুন চুক্তির ওপর। ট্রান্সফার হলে কমিশন, নতুন ক্লাব খুঁজে দিলে কমিশন, চুক্তি নবায়নেও কমিশন। ফলে খেলোয়াড় যত বেশি নড়াচড়া করে, এজেন্টের আয়ের সুযোগও তত বাড়ে।
হোর্হে মেসির ক্ষেত্রে হিসাবটা ছিল আলাদা। তিনি ছিলেন নিজের ছেলের প্রতিনিধি। তাঁর আয়ের উৎস ছিল মেসি পরিবারেরই আয়, আলাদা করে লিওকে এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে নেওয়ার ওপর তাঁর ব্যক্তিগত কমিশন নির্ভর করত না। লিও দুবার ক্লাব বদলালেও হোর্হের নিজের আয় সেভাবে বাড়ত না।
শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে এমন উদাহরণ খুব একটা মেলে না। ফল দাঁড়াল ২১ বছর, এক ক্লাব, ৭৭৮ ম্যাচ। ২০২১ সালে লিও যখন বার্সেলোনা ছাড়লেন, ওই সিদ্ধান্ত এজেন্টের ছিল না। লা লিগার ওয়েজ ক্যাপ ক্লাবকে চুক্তি রেজিস্টার করতে দেয়নি।
গত জুনে বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করার পরপরই লিও ভেঙে পড়েছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, ব্যাপারটা খেলার বাইরের, কয়েকটা কঠিন দিন গেছে। পরে আরেকজন জানতে চাইলে যোগ করলেন, পরিবারের জন্যই বেশি।
গতকাল শুক্রবার রাত ১০টায়, রোজারিওর এক স্যানাটোরিয়ামে দীর্ঘ অসুস্থতার পর হোর্হে মেসি মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৬৮।
১৯৯২ সালে গ্রান্দোলির মাঠে তিনি পাঁচ বছরের ছেলেটাকে ট্রেনিং করাতেন। তিরিশ বছর পর, লুসাইলে বিশ্বকাপ মাথার উপর তোলার কয়েক মিনিটের মধ্যে ছেলের পাশে যে লোকটা এসে দাঁড়িয়েছিলেন, উনিই গ্রেটেস্ট ফুটবলার লিও মেসির বাবা হোর্হে মেসি।
Deepest condolences to Leo Messi and his entire family.❤️🩹
Behind one of the greatest footballers the world has ever seen was a father who stood by him through every uncertainty, every setback, every difficult decision, and every step of his extraordinary journey.
May Jorge Messi’s memory be a source of strength and comfort to Leo and his family during this heartbreaking time.
Wishing them strength, peace, and courage in the days ahead. 🤍🕊️