Meem Islam Sukonna - মীম ইসলাম সুকন্যা

Meem Islam Sukonna - মীম ইসলাম সুকন্যা এলোমেলো অক্ষর সাজিয়ে ' কল্পনার ' বহিঃপ্রকাশের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র !

10/09/2025

আবারো বিরতি নিচ্ছি। কবে ফিরবো বা আর ফিরবো কিনা জানি না। লেখালেখি করতে ইচ্ছা করলেও ধৈর্য্য টা আর আগের মতো নেই। আমি জানি আমার লেখা আহামরি টাইপ ভালো না আমি এখনো শিখছি । তবে যখন অশ্লীল, যুক্তিহীন লেখা গুলোতেও অত্যধিক পরিমানে রিচ , এঙ্গ্যাজমেন্ট দেখি তখন সত্যি খুব খারাপ লাগে।

এখন অনেকেই বলতে পারেন আপনি কী এসবের জন্য লেখেন , নাকী নিজের মন ভালো করতে , শেখার জন্য ? উত্তর - হ্যাঁ মন ভালো করতেই, শেখার জন্য ই লেখি এখনো লিখবো শেখার জন্য চর্চার জন্য তবে পোস্ট করবো না , মোবাইলফোনটাই ব্যবহার কমিয়ে দিব খাতা, কলমে অভ্যস্ত হবো। যেহেতু মানুষ পড়ে না রিচ নেই এসব পোস্ট করে মন খারাপের তো দরকার নেই, আমার সময় এমনি খারাপ যাচ্ছে মন খারাপের আরো এমন বহু বিষয় আছে যা শুনলে আপনাদের হয়তো কাঁদতে ইচ্ছা করবে।

তবে হ্যাঁ যদি আগের মতো আবার ধৈর্য্য ফিরে পাই মনটাকে শক্ত করতে পারি তাহলে ফিরবো কখনো, আমার জন্য দোয়া করবেন যেন ফিরতে পারি আবার আর যখন ফিরবো তখন যেন সফলতা পাওয়ার যোগ্য হয়ে ফিরি। ভালো থাকবেন সবাই, আমার এই ক্ষনিকের পথ চলায় যারা সাথে ছিলেন তাদের সবাইকে অনেক ভালোবাসা ❤️❤️❤️❤️

 #শ্রাবণের_ছুঁয়ে_যাওয়া_দিনগুলি  #মীম_ইসলাম_সুকন্যা পর্ব- ১২ ( অন্তিম পর্ব )বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে রূপকথা। আজকাল...
08/09/2025

#শ্রাবণের_ছুঁয়ে_যাওয়া_দিনগুলি
#মীম_ইসলাম_সুকন্যা
পর্ব- ১২ ( অন্তিম পর্ব )

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে রূপকথা। আজকাল রাতে ঘুম হয় না তার। আজকাল বললে ভূল এখানে আসার পর থেকেই। কেন এমন হয় জানে না রূপকথা। একটানা শুয়ে থাকলেও পিঠে ব্যাথা হয় তাই বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে টেবিলের ওপর ল্যাম্পশেড জ্বালিয়ে চেয়ার টেনে বসল। কপালে হাত রেখে কিছু সময় চুপচাপ রইল। এখানে আসার পর থেকে তার দায়িত্ব কিছুটা কমেছে তুলতুলের খেয়াল রাখার আরো মানুষ হয়েছে রান্নাবান্নার খুব বেশি ঝামেলা তার করতে হয় না এই অবসরটুকু ই বোধ হয় তার সহ্য হয় না। এর আগে তো ব্যস্ত সময় পাড় করতো। এখন অবসরে থেকে বারবার পুরোনো কথা গুলো মনে পড়ে।

নিজের ফোনটা আজ সারাদিন হাতে নেয়নি প্রয়োজন হয় নি তাই। টেবিলের ওপর দেখে মনে হল একবার চেক করা উচিত কেউ যদি প্রয়োজনে কল দেয় আসলেই তাই লামিয়া কয়েকবার কল করেছিল। না পেয়ে মেসেজ দিয়েছে,

" আমি তো কয়েকদিনের মধ্যেই দেশে আসছি আপা। সামনেই ভাইয়ার মৃত্যু বার্ষিকী আমি চাইছিলাম একটু মিলাদের আয়োজন করতে ওই মাদ্রাসার ছেলে মেয়েদের দিয়ে ভাইয়ার জন্য দোয়া করে কোরআন পড়াতে । রবি ভাইকে বলতেই বলল তোমার সাথে কথা বলতে কারন মাদ্রাসার দায়িত্ব এখন তোমার তাই। সময় মতো আমাকে ফোন করো। "

রূপকথা মেসেজটা পড়ে ফোন রেখে দিল । তারিফের বিদেশের ব্যবসায়ের ভাগের টাকা গুলো দিয়ে আলিম হোসেন তাদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই একটা মাদ্রাসা করে ছিলেন । অনেক এতিম ছেলে মেয়েরাও থাকে সেখানে। সেটার দেখা শোনা আমির করতো বর্তমানে বয়স হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকায় রূপকথা সব দেখাশোনা করে।

রূপকথা বরাবর থাকা ক্যালেন্ডারে তাকিয়ে রইল সময় কত দ্রুত চলে যায় তাই না ? আসলেই কী দ্রুত যায় ? তারিফের মৃত্যুর পঁচিশ বছর হবে সামনে। রূপকথার চোখে সেইদিন হাসপাতালের ঘটনা ভেসে উঠলো। মনে হল এইতো সেদিনের ঘটনা,

রূপকথা তখন দৌড়ে কেবিনে যেয়ে দেখে তারিফ কেমন যেন করছে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল বুক ওঠানামা করছে। ডাক্তার নার্স সহ সবাই ততক্ষনে চলে এসছে। ডাক্তাররা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। হুট করেই রূপকথা খেয়াল করল তারিফ স্থির হয়ে যাচ্ছে নিজেকে সামলাতে না পেরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারিফের হাত ছুঁয়ে ডাকল,

" শুনছেন ..."
তারিফ বোধ হয় শুনেছিল তার ডাক কেমন চোখ ঘুরাল, তাকাল রূপকথার দিকে। রূপকথার মনে হল তার ধরে রাখা হাতের মুঠোয় তারিফের আঙুল গুলো নড়ছে আসলেই তাই রূপকথা দেখল তার আঙুল গুলো ছুঁতে চাইছে তারিফ কিন্তু পারছে না। নিজেই হাত বাড়িয়ে তারিফের আঙুল ছুঁলো। তারিফের দৃষ্টি তখন স্থির রূপকথার দিকে।

আস্তে আস্তে তারিফের বুকের ওঠানামা বন্ধ হয়ে গেল। তারিফের শরীরে লাগানো মেশিন গুলো কেমন শব্দ করে উঠলো ডাক্তারদের মুখে হতাশার ছাপ একজন জানিয়ে দিলেন,' সরি সে আর নেই। ' রূপকথার কেন যেন বিশ্বাস হতে চাইলো না কারন তারিফের দৃষ্টি তখনো তার দিকেই। একজন নার্স এসে তারিফের খোলা চোখ দুটো বন্ধ করে দিলেন। রূপকথার আঙুল থেকে তারিফের আঙুল ছুটে পড়ল বিছানায়।

রূপকথা চোখের পানি মুছে হাত বাড়িয়ে নিজের ডায়রিটা নিল। এখানে আসার পর থেকে একটু অবসর পেয়ে ডায়রি লিখতে শুরু করেছে। তার জীবনের সব বিশেষ বিশেষ ঘটনা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই লেখা আছে। কেনো লেখে জানে না। লিখতে ভালো লাগে তাই লেখে। ডায়রির ওপরে লেখা ' শ্রাবণের ছুঁয়ে যাওয়া দিনগুলি ' এই নামটা সে নিজের ইচ্ছায় লিখে নি কিছু ভাবতে ভাবতে লিখে ফেলেছিল। লেখার পর কাটতে ইচ্ছা করে নি আর।

ডায়রির ভেতর থেকে একটা চিঠি বের করল রূপকথা। পঁচিশ বছরের পুরোনো চিঠি। রূপকথা ভীষণ যত্ন করে রেখেছে এখনো , যখনি খুব বেশি পুরোনো কথা গুলো মনে পড়ে বিশেষ একজনকে মনে পড়ে তখনি কেবল চিঠিটা হাতে নেয়। আজ আবারো রূপকথা চিঠিটা শুরু থেকে পড়তে শুরু করল,

" প্রিয় রূপকথা,

‘প্রিয়’ বলছি বলে রাগ করো না। আসলে কখন কে কার প্রিয় হয়ে ওঠে, সেটার ওপর তো কারো হাত থাকে না। তবে তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো আজকের পর আর কখনো তোমাকে প্রিয় বলার জন্য আমি থাকবো না। আমার এই চিঠি পড়ে হয়তো তোমার বিরক্ত লাগবে, তবুও পড়ে নিও একবার। কারণ মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো কাউকে বলতে না পারলে আমার শান্তি লাগছিল না।

জানো রূপ, ছোটবেলা থেকেই আমি ভীষণ একা। দাদা সবসময় বলতো “তুই বয়সের তুলনায় খুব বুঝদার।” হয়তো তাই ছিলাম। এজন্যই খুব ছোট বেলায়ই আপন মানুষগুলোকে চিনে ফেলেছিলাম। চারপাশে মানুষ ছিল, তবুও যেন কেউ ছিল না। যৌথ পরিবারে থেকেও মায়ের কূটকচালি আমাকে সবার থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সবাই কাছে টানতে ভয় পেত।

মনে আছে, ছোটবেলায় মেজ চাচি রবিকে মুখে তুলে খাওয়াতেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। চাচি ডাকতো আমায়, কিন্তু মায়ের ভয়ে কাছে যেতাম না। মা এসব পছন্দ করতো না। আজ অবধি আমার মনে পড়ে না শেষ কবে কেউ আমায় খাইয়ে দিয়েছে, কিংবা শুধু আমার জন্য যত্ন করে রান্না করেছে। কত রাত জ্বরে নির্ঘুম কাটিয়েছি গায়ে কাঁথা তুলে দেওয়ার, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

বন্ধু-সঙ্গীও কোনোদিন পাইনি। কেউ তাদের ছেলেমেয়েদের আমাদের সঙ্গে মিশতে দিত না। মাঠে খেলতে গেলে সবাই বলতো “বাটপারের ছেলে।” অপমান আর লজ্জায় লুকিয়ে লুকিয়ে কত কেঁদেছি। অথচ কখনো কাউকে কিছু বলতে পারিনি। সেই না-পাওয়া কথাগুলো জমে জমে বিশাল পাহাড় হয়ে উঠেছিল আমার ভেতরে।

তুমি বলেছিলে “দু’দিনের পরিচয়ে কাউকে ভালোবেসে ফেলে কী করে ?” আমি ভেবেছিলাম , আমার সব না-পাওয়া হয়তো তোমার কাছ থেকে পাবো। আমি তোমাকে দেখেছিলাম আর বারবার অবাক হয়েছিলাম কী করে একজন মানুষ রক্তের সম্পর্ক হীণ মানুষগুলো কে আপন করে নিতে পারে! দীপার হাত কেটে গিয়েছিল তুমি কী ব্যস্ততায় ছুটে গিয়েছিলে! রাজুর পড়াশোনার জন্য কী শাসন করছিলে! দাদা ঠিক মতো ওষুধ খায়নি বলে কী বকলে সেদিন!

এমনকি আমি এটাসেটা খাই না শুনে আলাদা করে রান্না করে দিলে যদিও তুমি বলেছিলে খালাকে সাহায্য করার জন্য করছো। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওই সামান্য কাজটুকু ও আমার জন্য কেউ কোনোদিন করেনি।

তুমি যখন রাজুকে খাইয়ে দিতে, আমার ভীষণ লোভ হতো ইস! আমাকেও যদি কেউ এভাবে খাইয়ে দিত! তখন মনে হতো তুমি ভেতর থেকে দুঃখী বলেই অন্যের দুঃখ এত সহজে বুঝতে পারো। যে মানুষ সম্পর্কহীন মানুষকেও এতটা ভালোবাসতে পারে, সে তার আত্মার আপন মানুষকে কতটা ভালোবাসবে ? এটাই ভেবেছিলাম।

রূপকথা, একটু ভালোবাসা পাওয়ার লোভ আমায় পেয়ে বসেছিল। সেই সঙ্গে মনে হয়েছিল আমি তো আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারিনি, তোমার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে অন্তত পাশে থাকি। তাই হয়তো তোমার জীবনে সমস্যা হয়ে এসেছিলাম।

আমি ভীষণ দুঃখিত, রূপকথা। তুমি হয়তো ভাবছো আমিও অন্য ছেলেদের মতো শুধু তোমার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তোমাকে চাই। কিন্তু আমি তেমন নই। আমি শুধু একটু ভালো থাকার জন্য তোমাকে চেয়েছিলাম। অথচ আল্লাহ আমার কপালে ভালো থাকা লেখেননি।

তোমার জীবনে যে সামান্য ঝড় আমি তুলেছি, তারিফ নামের এই সমস্যাটা তুমি খুব দ্রুত ভুলে যাও এই দোয়াই করি। তোমার সব স্বপ্ন পূরণ হোক, খুব ভালো থেকো তুমি।

আমার তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো অভিমানও। শুধু চাই এই ' শ্রাবণের ছুঁয়ে যাওয়া দিনগুলি ' যেন কখনো তোমার জীবনে কালো দাগ না ফেলে।

শেষ মুহূর্তে মাফ করে দিও তোমার অপরাধীকে, বিদায়..। "

রূপকথার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে টেবিলের ওপর‌ টপ টপ শব্দে। এই পঁচিশ বছরে অসংখ্যবার চিঠিটা পড়ে এভাবেই কেঁদেছে সে। কিন্তু আজকের কান্না যেন অন্যরকম আজ বুক ভরে উঠছে কিছু বলার জন্য, যেন ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে।

চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে হাহাকার করে বলে উঠল রূপকথা,

“আমি আপনাকে মাফ করব না, তারিফ করব না! কেন আমার জীবনে এতো অল্প সময়ের জন্য এসেছিলেন আপনি? কেন?”

কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে উঠল সে। একটু দম নিয়ে আবার বলল,

“এতো কিছু থাকতে আমায় দুর্বল করার জন্য আপনার চোখগুলোই কেন ব্যবহার করলেন, তারিফ? আপনার সেদিনের দৃষ্টি আজও আমার পিছু ছাড়েনি। খালা কত চেষ্টা করেছেন আমার বিয়ে দেওয়ার, আমিও তো ভূলে থাকার জন্য জায়গা ত্যাগ করেছি, খালার ঠিক করা ছেলেদের সাথেও দেখা করেছি। কিন্তু কোনো কিছুতেই পারিনি আপনার সেই মায়া ভরা করুণ চাহনি ভুলতে। বারবার মনে হয়েছে ওই দৃষ্টি দিয়ে আপনি আমায় ডাকছেন, বলছেন ‘আমায় ছেড়ে অন্য কারো হয়ো না রূপ।’”

কথাগুলো বলতে বলতে আবার থেমে গেল রূপকথা। দম নিয়ে, নাক টেনে থেমে থেমে বলল,

“আমি আপনাকে এই জীবনে মাফ করব না, তারিফ। শেষ পর্যন্ত আপনার দীর্ঘশ্বাসের কারন হয়েই আমায় বাঁচতে হয়েছে। যেমন নিঃসঙ্গ ছিলেন আপনি, আমাকেও তেমনই নিঃসঙ্গ করে রেখে গেছেন। কখনো যদি আপনার দেখা আমি পাই - এই জীবনেই হোক বা অন্য কোনো জীবনে আমি আপনাকে ছেড়ে দেব না… আর…”

এরপর আর কোনো শব্দ পাওয়া গেল না। সকাল হতে হতে রূপকথা নিজেকে ঠিক সামলে নেবে। কেউ তাকে দেখে বুঝবেই না কী ঝড় বয়ে চলেছে তার মনে। এমন তো চলছে পঁচিশ টা বছর ধরে কখনো খুব বেশি ভেঙে পড়েছে কখনো বা কম। সেই ' শ্রাবণের ছুঁয়ে যাওয়া দিনগুলি'র রেশ কেউ ই সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারে নি কেউ সেটা প্রকাশ করে কেউ করে না।

______________________

পরের দিন ঘুম থেকে উঠে রূপকথা তুলতুলকে কোথাও খুঁজে পেল না। ভাবল হয়তো কোথাও ঘুরতে গেছে মন খারাপ হতে পারে এই মেয়ের আবার হুটহাট মন খারাপ হয়। রূপকথা নিজের কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তখন রবি ছুটে এলো তার কাছে ব্যস্ত হয়ে বলল,

" রায়ান আর তুলতুল কী করেছে জানিস ? "
রূপকথা ভ্রু কুচকালো কিছু জানে না সে। রবি একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

" পড় রায়ান রেখে গেছে। "
রূপকথা কাগজ খুলে দেখল লেখা আছে,

" বাবাই আমি তোমার ভাইয়ের মতো বোকামি করতে পারলাম না। কিন্তু তোমরা যদি কোনো সমস্যা করো কেন যেন ভরষা করতে পারছি না, তাই তুলতুলকে নিয়ে পালালাম। রূপ ফুপি বলেছে ভালোবাসলে প্রয়োজনে পালিয়ে যেতে তবুও আফসোস রাখতে না। কিছু দিন পর যোগাযোগ করবো চিন্তা করো না আমাদের জন্য। "

রূপকথা নিজের কপাল চাপড়ালো দ্রুত তুলতুলের ঘরে গিয়ে খুঁজল কিছু রেখে গেছে কিনা, খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল সে লিখে গেছে,

" এই যে আমার না হওয়া মামি, আমি তোমার মতো সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগে নিজের জীবনের তেরোটা বাজাতে পারলাম না , অনেক ভেবে দেখলাম তোমার না হওয়া বরের মতো দেখতে লোকটাকে ভরষা করাই যায় , ভালোবেসে একটা জীবন পাড় করা যায়। তাই চলে যাচ্ছি তার সাথে দোয়া করো যেন দ্রুত তোমার নাতি নাতনি নিয়ে ফিরতি পারি। "

রূপকথা এই চিঠি পড়ে দাঁতে দাঁত চাপলো। তুলতুলকে মেসেজ দিলো,

" সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি না ফিরলে নাতি নাতনি হওয়ার পর কেড়ে নিয়ে আসবো তোমাদের জায়গা হবে না এই মিলিটারি বাড়িতে মনে রেখ। "

রবিও ছুটে এসেছিল রূপকথার সাথে হতাশ হয়ে বলল,

" ওরা আমাদের বললেই তো পারতো কথা আমরা কী আমাদের বাপ চাচাদের মতো ? "

রূপকথা কিছুই বললো না। নিজের কাজে চলে গেল।

________________________

রায়ান, তুলতুল বেশি দূর যায় নি রূপকথার মেসেজ দেখে বিকেলেই ফিরে এসছে। রূপকথা কেন যেন আর দেরি করতে চায় নি সব আনুষ্ঠানিকতা পরে হবে কাজি ডেকে দুজনের বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে।

রাত হয়েছে অন্য দিনের মতো আজো রূপকথার ঘুম আসছে না। তবে আজ বুকের ভেতরটা তার শান্ত তেমন কোনো অস্থিরতা নেই। আকাশে মেঘ জমেছে বৃষ্টি হতেও পারে নাও হতে পারে। রূপকথার আজো মন চাইলো পুকুরঘাটে গিয়ে বসতে। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল আজকাল আর জ্বীন- ভূতের ভয় পায় না বরং মনে মনে দোয়া করে তারিফ নামক জ্বীন তার সামনে আসুক। এই অদ্ভুত ভাবনা ভেবে নিজেই আবার বিরক্ত হয়ে ওঠে এ কী সম্ভব ?

দূর থেকেই দেখতে পেল নব দম্পতি পুকুর ঘাটে বসে সময় কাটাচ্ছে। তাকে দেখলে লজ্জা পাবে তাই রূপকথা সরে গেল। কোনো রকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বাড়ির শেষ দিকে হাঁটা ধরল। হাঁটতে হাঁটতে একদম শেষ মাথায় পৌঁছাল যেখান থেকে কবরস্থান দেখা যায়। রূপকথার একটু ভয়ও কাজ করল না।‌ টিমটিমে আলোতে পাকা করা উঁচু কবরটার দিকে তাকিয়ে রইল বিরবিরিয়ে বলল,

“আমাদের একটা সুন্দর জীবন হলেও পারত… একটা ছোট সংসার, ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে…। আমি আপনার জন্য রান্না করতাম, মাঝেমাঝে নিজ হাতে খাইয়ে দিতাম। আপনি কাজ থেকে ফেরার সময় আমার জন্য বেলি ফুলের মালা নিয়ে ফিরতেন। কখনো আপনার দেরি হলে আমি গাল ফুলিয়ে বসে থাকতাম, আর আপনি আমার পিছু ঘুরে ঘুরে মান ভাঙাতেন। আমাদের ঝগড়া হত, রাগ-অভিমান হতো, আবার ঠিকই ভাবও হয়ে যেত।

বলেন তো তারিফ… কী এমন ক্ষতি হতো, যদি আপনি আমায় পেতেন আর আমি আপনাকে পেতাম? "

এ কথা বলেই চুপ করে গেল রূপকথা। বুকটা যেন এক অদৃশ্য শূন্যতায় ভরে উঠল। যেন এই পঁচিশ বছরের সমস্ত অপূর্ণতা, হাহাকার আর ভালোবাসার ব্যথা সে প্রকাশ করে ফেলল।

রূপকথা চোখ বন্ধ করল… মনে হলো এই তো একটু দূরেই তারিফ দাঁড়িয়ে আছে, করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হয়তো বাস্তবে নয়, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে, যে আজও বেঁচে আছে রূপকথার মাঝে, যতদিন রূপকথা বাঁচবে তারিফও বেঁচে থাকবে তার স্মৃতি হয়ে.....।

সমাপ্ত
কপি করা নিষেধ।

( আজকে সবাই একটু গঠনমূলক কমেন্ট করবেন। )

08/09/2025

#শ্রাবণের_ছুঁয়ে_যাওয়া_দিনগুলি শেষ পর্ব আসবে আজ ।

07/09/2025

#ভালোবাসার_মরশুম ( দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ )
লেখনিতে- #মীম_ইসলাম
পর্ব- ১১

( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত )

" আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই কেমন আছেন ? "
পেখম কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লো। কাঁকন কাকে ফোন দিয়েছে বুঝতে বাকি নেই। এখন এ ও ওদের সাথে যোগ হবে ? ইরফান ওপাশ থেকে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,

" কে বলছেন ? "

" সে কি চিনতে পারলেন না আমি আপনার শালি। "
পেখম চোখ পাকাচ্ছে। ইরফান বলল,

" সরি রং নাম্বারে কল করেছেন। "
কাঁকন সাথে সাথে চেঁচিয়ে বলল,

" আরে আমি ঠিক নাম্বারে কল করেছি। "
ইরফান চেঁচানো তে গেস করলো কাঁকনের স্বর। অপ্রুস্তুত ভাবে বলল,

" সিনড্রেলা তুমি ? "
কাঁকন জিভে কামড় দিলো বলল,

" চিনে ফেললে ? "

" ফাজলামি হচ্ছে পড়ালেখা নেই। আমি আন্টি কে ফোন করছি দাঁড়াও। "
কাঁকন ভ্রু কুঁচকে বলল,

" এই যে দুলাভাই বিচার দেয়ার ভুল করবেন না তাহলে আমি ও অনেক কিছু জানি বলে দেবো। "
ইরফান বিস্মিত হলো। আর পেখম কপালে হাত দিয়ে চেয়ার টেবিলে বসে আছে। ইরফান ব্যস্ত ভাবে বলল,

" কি জানো ? কোথায় আছো তুমি ? "

" আপনার বউয়ের ঘরে বসে আছি। জানেন সাপের মতো ফুঁসছে কিন্তু মারতে পারছে না সব বলে দেবো যে তাই। আর কি জানি ? বলতে গেলে কিন্তু লম্বা কাহিনী হয়ে যাবে। "

" পেখম কে দেও ফোনটা। "

" এ বাবা আমি তো বলি ই নি আমি পেখুপুর ঘরে তারমানে পেখু পু আপনার বউ ? "
বলে হাসছে কাঁকন। ইরফান বলল,

" পেকেছো অনেক। পেখম কে দেও তোমার সাথে পরে কথা বলছি। "
কাঁকন পেখমের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিতেই পেখম ফোন নিয়ে বারান্দায় গিয়ে ' হ্যালো ' বলল। ইরফান বলল,

" ইঁচড়ে পাকা টা জানলো কি করে ? "

" আড়ি পেতে ছিলো। "

" ব্ল্যাক মেইল করছে তোমাকে ? "

" আমি ব্ল্যাক মেইলের স্বীকার হচ্ছি না। "

" তাহলে ? "

" ও যা ভাবছে তা কিছুই ঠিক না তাই আমাকে ব্ল্যাক মেইল করতে পারছে না। "
কাঁকন উঁকি দিয়ে বলল,

" সব ঠিক জানি আমি। তুই ঝগড়া করেছিস না বন্ধুর সাথে ? "

" তুই ঘরে যা। "

" ফোন দে আমি কথা বলবো। "
পেখম দিয়ে দিলো কাঁকন বলল,

" ওর বিষয় ছাড়ো বন্ধু আমার মুখ বন্ধ রাখতে চাইলে ঘুষ দিতে হবে এখন। "
ইরফান বলল,

" জেনে যখন গেছো ঘুষ তো দিতেই হবে বলো শালি সাহেবা কি চাও ? "

" বাইকে করে বৃষ্টি ভেজা রাতের শহর ঘুরে দেখাও। "
ইরফান চোখ কপালে তুলে বলল,

" কি সাহস ! ধরা পড়লে কি হবে জানো ? "

" পড়বো না। কখন আসছো বলো আমি লুকিয়ে যাবো। "
পেখম ঘরে উঁকি দিলো সত্যি সত্যি কি ওকে নিয়ে যাবে নাকি ? ইরফান বলল,

" সিনড্রেলা নিতে পারি একটা শর্তে। "

" কি শর্ত "

" আমার হবু বউটাকে ও রাজি করাও আসতে সাথে। "

" তিনজন বাইকে অসুবিধা হবে না। "

" সেসব আমি দেখছি তুমি ওকে রাজি করাও আমি এগারোটায় তোমাদের বাড়ির পেছনের গেটে থাকবো। "
ইরফান ফোন কাটলো। কাঁকন ভাবছে ওর তেড়া বোন কে রাজি করাবে কি করে ? পেখম এসে জিজ্ঞেস করলো,

" কি বললো ? "
কাঁকন চুপ। পেখম বলল,

" নিবে না তোকে একা জানি আমি। কেউ দেখলে উল্টো পাল্টা বলবে। "
বলে নিজের বিছানা ঠিকঠাক করছে। কাঁকন হঠাৎ জোরে বলল,

" কে বলল নিবে না ? নিবে তো ইরফান ভাইয়ের বিদেশি বান্ধবীর বাড়ি নাকি আশেপাশে তাকে ও নিবে। তিনজন একসাথে যাবো। "
পেখম সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়ালো জিজ্ঞেস করলো,

" বন্ধু না বান্ধবী ? "

" বান্ধবী? "
পেখম বিরবিরালো,

" বৃষ্টিতে বান্ধবী নিয়ে ঘুরবে বাহ খুব ভালো। "

" তো আর কি তুই তো বেরসিক হয়ে গেছিস। তাই বান্ধবী কে আর আমাকে নিবে। ইশ আমি যদি একটা প্রেম করতাম না বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতাম এই বৃষ্টির রাতে কি ভালো... "

" একটা থাপ্পড় মারবো অসভ্য মেয়ে। যা ঘুমো কোথা ও যেতে হবে না। "

" আমি না গেলে বন্ধু আর ওই মেয়ে একা একা ঘুরবে আমি যাবো। "
পেখম ও ভাবলো আসলেই তো একা ওই বিদেশীর সাথে ঘুরবে ওরা যা অসভ্য হয় । একটু থেমে রেগে রেগে বলল,

" আমি ও যাবো তোর সাথে বৃষ্টিতে রাতের শহর দেখতে তোকে একা ছাড়বো না আমি। "

" কি ? এক বাইকে তিনজন কষ্ট করে না হয় বসতাম চারজন কিভাবে বসবো। "

" সে আমি জানি না আমি যাবো। যাহ তোর রেইন কোর্ট নিয়ে এখানে চলে আয়। "
কাঁকন মনে মনে হাসতে হাসতে বের হলো। ঘরে যেতে যেতে বিরবিরালো,

" এই জেলাসি ই তো আমার পেখুপুর আসল রুপ। আহা এতোদিন নিরামিষ লাগছিল এখন আমিষ আমিষ ভাব লাগছে। "
আর পেখম ওই দিকে রেইন কোর্ট বের করতে করতে বিরবিরালো,

" বান্ধবী কে নিয়ে রাতের শহর দেখবে না দেখাচ্ছি বেশি করে। "

**

রোদেলা কখনো এইরকম টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমায় নি। জন্ম থেকেই তো কিচিরমিচিরে আছে। আর আত্মীয় স্বজন গ্ৰামে কেউ নেই। এই টুপ টাপ শব্দ খুব ভালো লাগছে। সাহেদ ওপাশ ফিরে ফোনে কিছু করছে। রোদেলা উঠে বসে একটু জানালা ফাঁক করলো। পুকুরে কি সুন্দর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই দিকেই তাকিয়ে রইলো রোদেলা। হালকা ঠান্ডা বাতাস গাঁয়ে লাগতেই সাহেদ ঘুরে দেখে রোদেলা জানালা খুলে বসে আছে। সাহেদ ও ফোনটা রেখে উঠে বসলো। সাহেদের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসলো। রোদেলা এক মনে বাহিরে তাকিয়ে। আর সাহেদ একদম শব্দ না করে রোদেলার মাথার উপর দিয়ে একটু ঝুঁকে জানালায় মুখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,

" ভূত আসছে রোদ ... "

" ও মাগো.. "
সাহেদের বলতে দেরি রোদেলার লাফ দিতে দেরি হয় নি। আসলে ও সাহেদের স্বর শুনেই ভয় পেয়ে গেছে। এমন সময় ফিসফিসানো স্বর।
রোদেলা ভয়ে ঘুরতে গিয়ে সাহেদের বুকে বাড়ি খেয়ে ওর গলা কাঁধের কাছে টি-শার্ট মুঠো করে ধরেছে। সাহেদ তো ওর ভয় পাওয়া দেখে হু হা করে হেসে ফেলেছে। রোদেলা কতোক্ষন সাহেদের হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো একটু পর ওর জামা ছেড়ে জানলার পাশে থেকে সরে বসে কান্না ভাব করে বলল,

" আপনি আমাকে এই ভাবে ভয় দেখালেন যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। ভয়ে মরে যেতাম। "
সাহেদ ওর এই অবস্থা দেখে থেমে গেলো। তাড়াতাড়ি ওর কাছে এসে বলল,

" আরে কাঁদছ কেনো ? আমি তো মজা করে .... "

" আপনাকে তো আমি ভালো ভেবেছিলাম আপনি আমার ভাই গুলোর থেকে ও ফাজিল। "
রোদেলার চোখের কোনে এক ফোঁটা পানির মতো দেখা যাচ্ছে। সাহেদ এবার ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

" আচ্ছা সরি আর ভয় দেখাবো না। আরে তুমি যে আমার কথা তে ভয় পাবে সেটাই তো বুঝি নি। ভাবলাম ভুতের কথা বললে জানালা বন্ধ করে দেও নাকি তুমি ভয় পাও কিনা দেখতাম। "
রোদেলা নাক টেনে বলল,

" জানালা বন্ধ করেন । "
সাহেদ উঠে জানালা বন্ধ করতে গেলো। কিন্তু ওর পেট ফেটে হাসি আসতে চাইছে রোদেলার ভয় দেখে। কিন্তু হাসলে রাগবে নয়তো কাঁদবে তাই হাসি চেপে রেখেছে। সাহেদ এসে বলল,

" সরি রোদ আমি বুঝতে পারি নি তুমি এতো ভীতু না মানে ভয় পাবে। ঘুমিয়ে পড়ো ভুতটুথ কিছু নেই। "
রোদেলা শুয়ে পড়তেই যাচ্ছিল। কিন্তু ওইযে মানুষের হাসি চেপে রাখলে যা হয় আর কি সাহেদের মুখো ভঙ্গি কেমন লাগলো রোদের। বুঝতে পারলো সাহেদ মনে মনে হাসছে। রোদ ক্ষেপে চেঁচিয়ে বলল,

" খুব মজা লাগছে না আমাকে ভয় দেখিয়ে। জোরে জোরে হাসেন আমি সকাল হলে ই আম্মু কে ফোন করে বিচার দেবো। "
বলে রোদেলা ওপাশ ঘুরে শুয়ে পড়লো। রোদেলার বাচ্চামোতে সাহেদ আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না মানে ভাবা যায় সাহেদ এতো দিন যে রোদ কে দেখেছে আজকে তার উল্টো দেখলো। ও ভেবেছিল রোদেলা খুব সাহসী না হলে ও এতো ভীতু হবে না।আর রোদেলা ওপাশ ঘুরে সাহেদের হাসি শুনে ফুঁসছে।

**

ঠিক ১১ টায় ইরফান কাঁকন কে ফোন করলো। দু বোন পা টিপে টিপে পৌঁছে গেলো পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায়। পেখম আগে বের হলো দেখলো দুটো বাইক একটায় ইরফান আরেকটায় সাইফান। কাঁকন পেখমের পিছনে। সাইফান খুব বিরক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান ওকে কি বুঝিয়ে নিয়ে এসছে ইরফান ই জানে ভালো। পেখম এগিয়ে এসে বলল,

" আপনার বান্ধবী কই ? "
কাঁকন হাসছে মিটি মিটি। ইরফান ও হাসলো। কাঁকন ঘরে গিয়েই ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলেছে কি বলে পেখম কে বের করছে। ইরফান বলল,

" ওর হঠাৎ পেট ব্যাথা হলো তাই আসে নি। "
পেখম মনে মনে বলল ' এলি না আসলে এক হাত দেখে নিতাম। ' ইরফান কাঁকন কে বলল,

" তুমি ওর বাইকে ওঠো। "
সাইফান দাঁড়িয়ে ছিলো। ভাইয়ের কথায় ঠিক হয়ে বসলো। কাঁকন ভয় পেলো সেদিনের রাগ মেটাতে ফেলে টেলে দেবে না তো ? আস্তে আস্তে পেছনে উঠে বসলো। আর ইরফান বসতেই পেখম উঠে বসল। ইরফান বলল,

" ধরে বসেন জেলাস রানী। "
এই নামের মানে বুঝলো না। পেখম কাঁধে হাত রাখতে রাখতে বলল,

" কি বললেন ? "

" কিছু না। "
ওইদিকে সাইফান কিছু বলে নি বাইক স্টার্ট করতেই কাঁকন দুইহাতে দুই কাঁধ চেপে ধরলো। সাইফানের মনে হলো কোনো রাক্ষুসী থাবা বসালো।
ভেজা পিচঢালা পথে দুই ভাই আগে পিছু বাইক নিয়ে যাচ্ছে। পিছে দুই বোন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। রেইনকোট পড়া তাই কেউ ভিজছে না। কাঁকন খুব ইনজয় করছে। আর বলছে,

" বৃষ্টি এলে রাতে এতো সুন্দর লাগে ! "
সাইফান মনে মনে বলল ' জীবনে প্রথম বের হলো নাকি এই ভাইয়া কোথায় কোথায় ফাঁসিয়ে দেয়। দেখেই মনে হচ্ছে বকবকানি। '

পেখম এক হাত ইরফানের কাঁধে রেখেছে। আরেক হাতে বৃষ্টির পানি জমাচ্ছে আবার রাস্তার উপর ফেলছে। ইরফান বার বার বলছে,

" পেখম ঠান্ডা লেগে যাবে আর হাত ভিজিও না এভাবে। "
পেখম শুনলে তো ? ইরফানের কথা তার কানেই যাচ্ছে না। ইরফান বাইকের স্পিড অনেকটা বাড়িয়ে দিলো। ফাঁকা রাস্তা তাই একটু বাড়ানো ই যায়। সাইফান কে পেছনে ঘুরে ইশারায় বলল ওর বাইকের স্পিড কম রাখতে। ইরফান এতো জোরে বাইক টানছে যে পেখম এবার ভয়ে পানিতে হাত ভেজানো বাদ দিয়ে ইরফানের বুকের কাছে শার্ট খামছে ধরলো। আর বলল,

" আস্তে চালান মরার শখ হয়েছে নাকি ? "
ইরফান একটু জোরে বলল,

" হ্যা পেখম, একসাথে মরন এলে ও আমার আপত্তি নেই। আমি রাজি আছে। "
পেখম আরো জোরে টেনে ধরলো ওর শার্ট। ইরফান তাকালো হাতের দিকে। ওর হাতের ওপর হাত রেখে এই খামছে ধরা ছাড়ালো সুন্দর ভাবে রাখলো বুকের একটু নিচে পেটের একটু উপরে। ঠিক একই ভাবে কাঁধে রাখা হাত ঘুরিয়ে সামনে এনে রাখলো। বলল,

" হাত ছুটলে স্পিড আরো বাড়বে। "
পেখম কিছু বললো না চুপচাপ মুখ তুলে বৃষ্টির ফোঁটা অনুভব করলো।

সাইফান ইরফান বারন করায় আস্তেই চালাচ্ছে। কাঁকনের বিরক্তি লাগলো,

" আপনি পারেন না চালাতে নাকি ভয় পাচ্ছেন। আরেকটু জোরে চালান। ওরা কতদূর চলে গেলো। "
মুখ কুঁচকে বলল,

" ভাইয়া আস্তেই যেতে বলেছে। "

" আপনি আরো স্পিডে যান। "

প্রায় চল্লিশ মিনিট বাইক চালিয়ে একটা বিলের পাশে এসে থামলো ইরফান পেখম। পেখম নেমে সাইড হয়ে দাঁড়ালো বাইক রেখে ইরফান ও এসে দাঁড়ালো। বৃষ্টি একটু কমেছে। কিছুক্ষণ নীরবতা চলল দুজনের একটু পর ইরফান ই বলল,

" বসবে ? "

" না দাড়াতেই ভালো লাগছে। কাঁকন কোথায়? "

" আসছে পিছে। "
দুজনের মধ্যে আরো কিছুক্ষণ নীরবতা চলল পেখম নীরবতা ভাঙলো বিলের দিকে দৃষ্টি রেখে সোজাসুজি প্রশ্ন করলো,

" আসলে ঠিক কী চাইছেন ? "
ইরফান কিছু ভাবছিলো প্রশ্ন শুনে ওর দিকে তাকালো। এক কথায় উত্তর দিলো ,

" তোমাকে "
পেখম এবার ইরফানের দিকে ঘুরলো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

" হঠাৎ কি মনে করে আমাকে চাইলেন ? আগে না হয় বয়স কম ছিলো ভুল.. "

" চুপ করো পেখম তখন পরিস্থিতি টাই অন্যরকম ছিল। "
পেখমের এই সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে অনেক কথা শোনাতে ইচ্ছে করছে। খুব কড়া কড়া সেই পাঁচ / সাড়ে পাঁচ বছর আগে সকালে ইরফানের কাছে যাওয়ার পর ইরফান যেমন শুনিয়ে ছিলো তেমন। কিন্তু এতোটা ও কঠিন হতে পারছে না পেখম। সেদিন এই মানুষটা ওকে যতটা কষ্ট দিয়েছে ও তার বিন্দু মাত্র ও দিতে পারছে না। পেখম নিজের কান্না কষ্ট গিলে বলল,

" পরিস্থিতি যাই থাকুক আমি তখন ও আপনার যোগ্য ছিলাম না এখন ও না। ভালো এটাই হবে আপনার সময় নষ্ট না করে যোগ্য কাউকে বিয়ে করে নিন। স্মৃতি আপুর মতো যোগ্য কেউ। আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিন। আমি চাই না আমার ওই অল্প বয়সের ভুল গুলো আমার বাবা মা জেনে কষ্ট পাক। "
বলতে বলতে সামনে তাকালো। ইরফান স্মৃতির কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। বলল,

" স্মৃতি এলো কোথা থেকে ? "

" কেনো স্মৃতি আপুর সাথেই তো চলে গিয়ে ছিলেন। বিয়ে করলেন না কেন ওনাকে ? "
ইরফান কোমরে হাত দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। বুঝলো মহারানীর রাগ কোথায় তাহলে। বৃষ্টির দাপট কমলে ও আবার শো শো করে বাড়ছে। কিছুদিন পরে শীত পড়বে। কিন্তু কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভূতি লাগছে বিলের পাড়ে। ইরফান নিজের পকেটে থেকে ফোন বের করলো গ্যালারি তে গেলো একটা ছবি বের করে পেখমের দিকে এগিয়ে দিলো। পেখম জিজ্ঞেস করলো ,

" কি ? "

" দেখো "
পেখম হাতে নিয়ে দেখলো স্মৃতির ছবি। সাথে অন্য কেউ আছে। জিজ্ঞেস করলো,

" সাথে কারা ? "

" স্মৃতির হাজব্যান্ড ডা.আসিফ মাহমুদ পেশায় নিউরোসার্জন আর ওদের চার বছরের মেয়ে তিয়াসা।
পেখম থেমে গেলো অবাক হলো কি শুনলো এটা ? তবে সেদিন যে রায়হান ভাইকে বলতে শুনেছিল স্মৃতি বিয়ে করেছে স্বামীর সাথে বিদেশ গেছে, ইরফান কে ওর সাথে দেখা গেছে। যদি ইরফান ওর স্বামী না হয় তবে ওদের সাথেই গিয়ে ছিলো কেন ? নাকি যায় নি কোথা ও ?

সাইফান ইরফান কে ফলো করেই আসছিলো মাঝে কয়েকটা গাড়ি চলে আসায় ইরফান কে হারিয়ে ফেলেছে কোন দিক গেছে বুঝলো না। ওই বা এখন কোন দিক যাবে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যে কাঁকন চেঁচিয়ে বলল,

" এই আপনে থামান আমি নেমে যাবো এতো স্লো কেউ চালায় ? "
এমনি সাইফানের মেজাজ খারাপ তার ওপর ওর সাথে চেঁচাচ্ছে। জোরে বাইক থামলো। কাঁকন সাইফান কে শক্ত করে ধরায় পড়লো না। তবে সাইফানের পিঠে এসে কাঁকনের মুখ বাড়ি খেলো। কাঁকন ' আহ ' বলে চেঁচালো। সাইফান পাত্তা না দিয়ে বলল,

" নেমে পড়েন। "
কাঁকন ঝাঁঝিয়ে বলল,

" এখানে নেমে কি করবো বন্ধু আর আপু কোথায় সেখানে নিয়ে থামান। আর আপনাকে বাইক চালানো শিখিয়েছে কে এভাবে কেউ থামায় ? "

" আপনিই তো নামতে চাইলেন। আর ওরা কোথায় জানি না হারিয়ে ফেলেছি। "

" হারিয়ে ফেলেছেন মানে ? আমরা কোথায়? "

" সেটা ও জানি না। "
এবার কাঁকনের ভয় হতে শুরু করলো। আশেপাশে তেমন কোনো বাড়িঘর ও তো নেই দুই একটা গাড়ি যাচ্ছে রাস্তায় লোকজন ও নেই। কাঁকন বলল,

" ফোন করেন। "
সাইফান ফোন করলো পর পর কয়েকবার ঢুকছে না। কাঁকন ও পেখম কে ফোন করলো ঢুকছে না। বৃষ্টির জন্য হয়তো সমস্যা হচ্ছে।
কাঁকন এবার ভয়ে কেঁদে ফেলল বিরবিরালো,

" এই জন্যই মা বলে ' কাঁকন একা একা কোথা ও যাস না ' আমি ই ফাজিল শুনি না। "
সাইফান বলল,

" এখানে কাঁদার কি হলো বুঝলাম না। "
কাঁকন তেজ নিয়ে বলল,

" আপনি কি মেয়ে যে বুঝবেন কেন কাঁদছি ? "
সাইফান বিরক্ত হয়ে বলল,

" ভাইয়া কোথায় ফাঁসালো। এই রকম মেয়ে নিয়ে এখন কি ঝামেলায় পড়লাম। "

" এই আপনি এই রকম বলতে কি মিন করছেন আমি কেমন মেয়ে? কি মনে হয় ? "

" থামুন নয়তো ওই যে দেখছেন কবরস্থান দূরে একা ছেড়ে দিয়ে আসবো। ভাবতে দিন কি করবো। একটা ও কথা না। "
কাঁকন তাকালো এতোক্ষন তো দেখে ই নি। ওর আত্মা যেনো এইবার বেরিয়ে যাবে মনে হলো। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাইকে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো।

পেখম তখন থেকে চুপচাপ আছে কিছু ভাবছে। ইরফান বলল,

" আর কি কি অভিযোগ আছে ? "

" কিছু না। শুধু আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিন। "

" সম্ভব না একমাত্র মরলেই হয়তো তোমাকে ছাড়বো।
পেখম আবারো চুপ। ইরফান ওকে বাহুতে ধরে নিজের দিকে ঘোরালো। পেখম ঘুরলো তবে তাকালো না ইরফানের দিকে। ইরফান ওর দুই গালে হাত রেখে মুখ উঁচু করে ধরলো। পেখম না চাইতেই চোখাচোখি হলো। ইরফান কোনো ভনিতা ছাড়াই প্রশ্ন করলো,

" ভালোবাসো ? "
পেখম চুপ। কোনো কথা বলতে পারছে না। পেখমের মুখ উঁচু করায় বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ওর চোখে মুখে ঠোঁটে পড়ছে। এই মুহূর্তে ইরফানের এই বৃষ্টি ফোঁটাগুলো কে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। ওরা পেখমের চোখ মুখ ঠোঁট ছুঁতে পারছে। ইরফান আবার বলল,

" চুপ কেন বলো ? "
পেখম কি করবে ? সত্যিটা স্বীকার করতে চাইছে না। এর আগে স্বীকার করে অপমানিত হয়েছে আবার ওই সমুদ্রের মতো গভীর চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলাটা ও যে সম্ভব না। তাই চুপ থাকাটাই সহজ মনে হলো। বৃষ্টির সাথে বিজলী চমকাচ্ছে। পেখম কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিছুটা বিজলীর শব্দে কিছুটা ঠান্ডা হাওয়ায়। ওর চোখ জ্বলছে ঠোঁট গুলো ও কাঁপছে।

ই‌রফান কেমন ঘোরে চলে গেলো এই গোলাপি ঠোঁট জোড়াতেই দৃষ্টি আটকে গেলো। আর পেখম ইরফানের চোখে ডুবেছে। এই চোখ মনে হচ্ছে কতো মায়া ভালোবাসা জমে আছে সরাতেই ইচ্ছে করছে না। ইরফান ঘোরে থেকেই নিজের মুখ পেখমের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আনছে। গন্তব্য ওর গোলাপী ঠোঁটে। দুজনেই ভুলে গেছে কোথায় আছে। কোনো হুশ নেই। ব্যস আর ইঞ্চি খানেক দুরুত্ব সেটা ও কয়েক সেকেন্ডে মিলিয়ে যাবে। একে অপরের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে।

তখনি ইরফানের ফোন বেজে উঠলো। পেখম ছিটকে সরে পড়লো। ইরফান দু পা পিছিয়ে গেলো। ফোনের শব্দে হুশে এলো দুজন।
ইরফান ফোন বের করে দেখলো সাইফান, রিসিভ করলো। আর পেখম জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এতোক্ষন কি হতে যাচ্ছিল সেটাই ভাবছে।
ইরফান কথা শেষ করে পেখম কে বলল,

" বাইকে উঠো ফাস্ট ওরা হারিয়ে গেছে আরো দেরি হলে একা একা বিপদে পড়বে। "
পেখমের এইবার মাথা থেকে সব চলে গেলো বোনের জন্য চিন্তা শুরু হলো। দেরি না করে ঝটপট উঠে বসলো।

সাইফান কল কেটে বাইকের সামনে এলো। কাঁকন কে ভয় দেখানো তে আর জোরে কাঁদে নি বা চিল্লাচিল্লি করে নি তবে গুনগুন করে কাঁদছে। সাইফানের এটা একদম পছন্দ হলো না কাঁদবে কেন ? আজব বাংলাদেশেই তো আছে অন্য কোথাও যায় নি। সাথে ও থাকতে তো কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু সাইফান কি জানে কাঁকন ওকে ও ভয় পাচ্ছে ?
রেগে রেগে বলল,

" এইবার থামেন ঝাঁঝের রানী। আসছে ওরা। "

" সত্যি "

" মিথ্যা কেন বলবো আপনাকে ? "
কাঁকন এইবার চোখ মুছে ফেলল। খুশি হয়ে গেলো। দুই মিনিটের মধ্যে মুড চেঞ্জ করে বলল,

" এতোক্ষন ভয়ে দেখলাম ই না কি সুন্দর জায়গা টা। দেখেন ওপাশে ফুলের গাছগুলো কি সুন্দর লাগছে। "
সাইফান অবাক হলো মনে মনে বলল ' আজব মেয়ে মানুষ। একটু আগেই কেঁদে ভাসাচ্ছিল আবার হাসছে এখন। '

প্রায় পনেরো মিনিট পরে ইরফান এলো। কাঁকন তো আগে দৌড়ে গিয়ে সাইফানের নামে বিচার দিলো। ইরফান ওকে শান্ত করতে মেকি ধমকালো সাইফান কে। তারপর আবার বাইকে করে রওনা দিলো ফিরতে। সাইফান বাইক চালাচ্ছে। আর কাঁকন একটু পর পর এটা সেটা বলছে। মাঝে মাঝে সাইফান চুপ করতে বলছে।

ইরফান চলছে তার অভিমানিনি কে নিয়ে। পেখম নিজেই এবার ইরফান কে জড়িয়ে বসেছে। আর মাথা হেলিয়ে ‌দিয়েছে ইরফানের পিঠে। পেখম তার মূল্যবান প্রশ্নের উত্তর যে পেয়েছে। হ্যা পুরো পায় নি যতোটুকু পেয়েছে এতেই তার মন অনেকটা শান্ত।

ঠিক ১টা ২০মিনিটে কিচিরমিচির এর পেছনে এসে বাইক থামল। কাঁকন ঝটপট নেমে ভেতরে সরে দাঁড়ালো। সাইফান বাইক ঘোরাচ্ছে। পেখম নামলো ধীরে সুস্থে। ঘুম ঘুম ভাব হয়ে গিয়ে ছিলো ওর। বাইকে থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকবে ইরফান বলল,

" শোনো "
পেখম ঘুরে তাকালো ইরফান চাপা আওয়াজে বলল,

" অসম্পূর্ণ কাজ টা সুযোগ বুঝে ঠিক সম্পূর্ণ করে নেবো এক দম সুদ সমেত তখন এমন ছিটকে সরে যেতে দেবো না। "
পেখম প্রথমে বুঝলো না। যখন বুঝলো চোখ বড় করে তাকালো। কাঁকন ওর হাত টান দিলো তখনি বলল,

" আয় "
পেখম সরে এলো। মনে মনে আওড়ালো ' অসভ্য ' চুপচাপ ভেতরে ঢুকতেই ইরফান সাইফান বাইক টানলো। ওরা দুই বোনে পা টিপে টিপে ঘরে চলে গেলো। ওরা যাওয়ার ২/৩ মিনিট পর বড় বারান্দা থেকে রায়হান নিজের ঘরে গেলো। ইরফান বের হওয়ার আগেই ওকে মেসেজ করেছিল। ও পারমিশন দেয়ার পর দুই বোন কে নিয়ে বেরিয়েছে। ওরা না ফেরা পর্যন্ত জেগেই কাটালো।

চলবে,
কপি করা নিষেধ।

 #শ্রাবণের_ছুঁয়ে_যাওয়া_দিনগুলি  #মীম_ইসলাম_সুকন্যা পর্ব- ১১" কথা ও কথা তুই এখনো টেবিলে বসা উঠ মা ছেলে পক্ষ চলে আসবে। এ...
06/09/2025

#শ্রাবণের_ছুঁয়ে_যাওয়া_দিনগুলি
#মীম_ইসলাম_সুকন্যা
পর্ব- ১১

" কথা ও কথা তুই এখনো টেবিলে বসা উঠ মা ছেলে পক্ষ চলে আসবে। এদিকে তোর মেয়ে জেদ ধরেছে তুই তৈরি না করে দিলে সে তৈরি হবে না আজকের দিনে একটু বইখাতা গুলো রাখ। "

শায়লার বলায় রূপকথা নিজের ডায়েরিটা বন্ধ করে চোখের চশমা টা খুলে রাখল। শায়লার কাছে এগিয়ে বলল,

" তুলতুলকে বলো মুখ হাত ধুয়ে স্থির হয়ে নিজের ঘরে বসতে আমি একটু পর যাচ্ছি তাকে তৈরি করতে। "

শায়লা মাথা নাড়িয়ে চলে যাওয়ার সময় কী মনে করে আবার দাঁড়ালেন। রূপকথা ভ্রু কুঁচকে বলল,

" কিছু বলতে চাও ? "

" বলছিলাম কী তুই আজকে একটু সুন্দর করে সেজে তৈরি হয় না। "

" আমার মেয়েকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে খালা আমায় না। বয়স তো কম হলো না আমার আটচল্লিশ এখন আর এতো সেজেগুজে কী কাজ ? "

" তবুও। তুই একটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার এতো সাধারণ ভাবে চলিশ তাই বলছিলাম। "

" সবসময় এক কথা ভালো লাগে না খালা, আমি কোথা থেকে উঠে এসেছি সেটা আমি ভূলে যেতে চাই না আর আমি এভাবেই অভ্যস্ত অতিরিক্ত চাকচিক্য কখনোই ভালো লাগে না। "

রূপকথা রেগে যাচ্ছে তাই শায়লা আর কথা বাড়ালেন না। শায়লা যেতেই রূপকথা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে হাঁটা ধরল। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির চারপাশে নজর বুলিয়ে দিল। এই মিলিটারি বাড়ি অনেক বদলেছে। অনেকাংশের ফাঁকা জায়গায় রবি বাড়ি করেছে সেখানে পরিবার নিয়ে স্থায়ী হয়েছে। আলিম হোসেনের দালানটা পুরোনো হয়েছে যদিও রবি, কথা কিছু দিন পরপর ই মেরামত করে বকুলির জন্য ভেঙে নতুন করে করে দিতে পারে না। আমিরের ও পাকা দালান হয়েছে। পুকুরটা আছে আগের মতোই পুকুরগাটে ফাটল ধরেছে কয়েক জায়গায়। দাওয়ার মাঝে পুরোনো রান্নাঘরটা নেই যার যার রান্নাঘর এখন আলাদা।

সবকিছুর বদল ঘটেছে । ঘটবে নাই বা কেন ? পেরিয়েছে যে, পঁচিশ টা শ্রাবণ। বাড়ির ছেলে মেয়ে গুলোর বিয়ে হয়েছে তাদের ছেলে মেয়েরাও এখন বিয়ের উপযুক্ত। আলিম হোসেন দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে গেছেন, বকুলি শয্যাশায়ী, বয়সের ভাড়ে নুয়ে গেছে হাবিব- রেশমি। সবই পাল্টেছে কেবল একই রকম রয়ে গেছে রূপকথা।

ব্যবহার আচার বৈশিষ্ট্য সব এক রয়ে গেলেও নিজের জীবনের স্বপ্ন পূরণে সে এগিয়েছে। পড়ালেখা শেষ করে চাকরি বাকরি করেছে। কতো গুলো বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় চাকরী করে ঘুরে বেড়িয়েছে, এই বাড়ি ছেড়ে দূরে থেকেছে। কিন্তু মানুষের ভাগ্য যেখানে থাকে তাকে সেখানে আসতেই হয় ঘুরে ফিরে। গত দুই বছর হলো এই গ্ৰামের স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে তার প্রমোশন ও বদলি হয়ে এসছে।

রূপকথা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির শেষমাথায় এলো। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন আসাটা তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে হয় সকালে না হয় বিকালে। এখান থেকে এই হোসেন বংশের কবরস্থান টা দেখা যায় ভালো ভাবে। রূপকথা নির্দিষ্ট একটা কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রতিদিন কিছু ভাবে তারপর আবার ফিরে যায়। আজো তার ব্যতিক্রম হয় নি। পাকা করা উঁচু কবরটার দিকে তাকিয়ে আছে। তখনি কোথা থেকে রবির ছেলে রায়ান এসে পাশে দাঁড়াল। রবির ছেলে হলেও মুরুব্বিরা বলে তারিফের মতো হয়েছে একেবারে । রবি আর তারিফের চেহারার ষাট শতাংশ মিল ছিল তবে রায়ান পুরোই চাচার মতো হয়েছে। রূপকথাও মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে রায়ানের মুখের দিকে।

রায়ান রূপকথার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল। শ্বাস ফেলে বলল,

" সবার থেকে গল্প শুনি তুমি আমার চাচ্চুকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে , বড় মা এজন্য এখনো তোমায় দেখতে পারে না তবে তার কবরখানা দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসো কেন ? আর তাকিয়ে থেকে কী ভাবো ? "

রূপকথা কিঞ্চিত চমকে তাকালো সময় নিয়ে বলল,

" আমার ওপর নজরদারি করিস নাকী ? "

" ওই একটু একটু। "

" ভালো। তোর চাচ্চুর ওপর আমার অনেক রাগ জমে আছে তো এখানে দাঁড়িয়ে মনে মনে গাল মন্দ করে শান্তি পাই। "

রায়ান হেসে ফেলল। রূপকথা কবর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রায়ন বলল,

" কী দেখছো ? "

" দেখছি তোর হাসিটা। তোর চাচ্চুকে যে কয়দিন দেখে ছিলাম হাসতে দেখি নি তো তাই তোর হাসি দেখছি। "

" তুমি ও না ফুপি। সত্যি করে বলোতো এই বুড়ি বয়সে আমার চাচ্চুকে মিসটিস করো নাকী? "
রূপকথা আবার তাকাল উঁচু কবরটায় । সময় নিয়ে বলল,

" বুড়ি বয়সে মিস করতে যাবো কেন ? যৌবনকাল থেকেই করি। "

রায়ান বিস্ময় নিয়ে তাকাল। রূপকথা তার চাউনি দেখে বলল,

" এইজন্যই তো গালমন্দ করতে আসি নিজে তো চলে গেছে আমায় মাঝ দরিয়ায় ডুবিয়ে রেখে গেছে বাকিটা জীবন ভেসে ভেসেই বেড়ালাম। যাকে ভূলে যাওয়ার চেষ্টায় এতো গুলো বছর দূরে ছিলাম তার কাছেই ভাগ্য টেনে আনলো। "

রায়ান কিছু সময় চুপ থেকে বলল,

" জানো মাঝে মাঝে বাবা বলে তুমিও মনে হয় তারিফ চাচ্চুকে ভালোবেসে ফেলে ছিলে তাই হয়তো আর বিয়ে করো নি। "

" তোর বাবা ভূল বলে আমি তোর চাচ্চুকে ভালোটালো বাসি নি কখনো। "

" তবে ? "

" তোর চাচ্চু চলে যাওয়ার আগে আমায় জাদু করে রেখে গেছে তার চোখ দিয়ে এইজন্য আর বিয়েটিয়ে হয় নি। "

রায়ান বলল,

" তুমি ঠিক করে বলবে ? "

" কয়টা বাজে দেখেছিস তুলতুলে কে দেখতে আসবে তো চল। "

রায়ানের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। রূপকথা যাওয়ার আগে আরো একবার তাকাল কবরটায়, কবরের গায়ে জ্বলজ্বল করা নামটায় চোখ বুলিয়ে দিল ' তারিফ হোসেন ' । রায়ান রূপকথার সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই রূপকথা বলল,

" শোন রায়ান কখনো কাউকে ভালোবাসলে জোর করে হলেও নিজের করে নিবি। পরিবার আত্মীয়স্বজন কিছু সময় মুখ ফিরিয়ে রাখবে কিন্তু অবশেষে ঠিকই মানবে। এক জীবন আফসোস নিয়ে বাঁচার চেয়ে কিছু সময় সবার থেকে দূরে থাকা ভালো। "

রূপকথা আর দাঁড়ালো না । রায়ান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবল।

___________________________

ধরনীতে রাত্রী নেমেছে অনেক সময় আগে। রাতের খাওয়া শেষ করে পুকুর ঘাটে বসে ছিল রূপকথা। মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাবছে। পাত্র পছন্দ হয়েছে পাত্রের পরিবার ভালো তবে তুলতুলের মুখ দেখে মনে হয়েছে ও খুব একটা খুশি না মুখ ফুটে মেয়ে কিছু বলছেও না। নিজের পেটে না ধরলেও স্বভাব যে তার মতোই হয়েছে রূপকথা ভালো করেই জানে হবে নাই বা কেন সেই দেড় বছর বয়স থেকে তার কাছে আছে। তুলতুলে কে যদি বলা না হতো রূপকথা তার আসল মা না তবে তুলতুল কখনো জানতেও পারতো না তবে রূপকথা লুকায় নি তার কাছে কিছু।

রেশমি কোনো রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে রূপকথার পাশে বসলেন। বয়সের ভাড়ে শরীরে ব্যাথা তৈরি হয়েছে ঠিকঠাক চলাচল করা অসুবিধা এখন। রূপকথা বলল,

" পায়ের জন্য যে তেলটা এনে দিয়ে ছিলাম সেটা শেষ ? "

" আছে তো সকালেও দিসি। "

" এই সময় এখানে এলে কেন ? "

" তুই একা বইসা এতো কি ভাবস কথা ? "
রূপকথা আলতো হেসে বলল,

" কিছু না। "

" কইবি না তাই তো ? আচ্ছা কইস না। তুলতুলের বিয়ায় ওর নানা নানী রে জানাবি না ? "

" জানালেই কী ফুপু তাদের তো এই বাড়িতে আসা নিষেধ আর তুলতুল ও চায় না তারা আসুক। "

রেশমি হতাশ শ্বাস ফেললেন সময় নিয়ে বললেন,

" বড় ভাইয়ের কী অবস্থা জানোস কিছু ? পঁচিশ টা বছর হইছে দেখি না সেই যে তারিফরে মাটি দেয়ার পর আব্বা বাইর কইরা দিল আর দেখি নাই তারে। "

" কী আর অবস্থা লাইজুর মৃত্যুর সাত মাস পরেই তো স্ট্রোক করে ছিল জানোই প্যারালাইজড জীবন যাপন আর কতই বা ভালো হবে। "

" ওগো সংসার চলে কী দিয়া লামু সাহায্য করে ? ওরেও দেখি না কত বছর। "

" বাড়ি ভাড়া পায় সেই দিয়ে বড় চাচী চালিয়ে নেয়। লামিয়ার সাথে কথা হয়েছে আসবে খুব শীঘ্রই একমাত্র বোনজির বিয়ে না এসে পারবে। "

রূপকথার বলার পর রেশমির মুখটা উজ্জল হল। খুশি হয়ে বেশ কিছু সময় পরে বলল,

" আমাগো বাড়ির সব গুলা মাইয়ার ভালো বিয়া হইছে শুধু লাইজুর ছাড়া বেচারীরে তো জামাই শাশুড়ী মাইরা ছাড়ল। ওর কথা মনে পড়লে বুকটা ফাটে। মরার তিন দিন আগেও ফোন কইরা কইসে আমগো বাড়ি আইতে মন চায় ..."

রূপকথা কিছু বলল না রেশমিকে। ইদানিং বাড়ির মানুষ গুলো তার কাছে পাথর মনে হয় । মনে হয় যেন তারা সব দুঃখ কষ্ট গুলো সয়ে নিতে নিতে একেকজন পাথরে পরিণত হয়েছে । এর চেয়ে ভালো কাদুক কেঁদে মনটা নরম করুক।

লাইজুর করুণ মৃত্যুর কথা মনে পড়লে রূপকথার মতো শক্ত মেয়েও টলে যায় । লাইজুর বিয়ের চার বছর পর তুলতুল জন্মে ছিল মেয়ে সন্তান হওয়ার কারনে লাইজুর ওপর তাদের অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল তারেকের অবস্থা তখন পড়ে গেছে অনেকটাই, মেয়ের শশুরবাড়ির লোকদের খুশি করতে পারত না। লাইজুর শাশুড়ি ছেলের আবার বিয়ে দিতে লাইজুকে মেরে ফেলে গলায় ফাঁস লাগিয়ে। তখন তার মেয়ের বয়স মাত্র দেড় বছর। রূপকথা তখন ঢাকায় ছিল চাকরীর কারণে , খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে ছিল। সবাই লাইজুকে নিয়ে ছোটাছুটি করতে ব্যস্ত ছোট্ট মেয়েটা তখন হামাগুড়ি দিয়ে মা মা করে কাঁদছে এর ওর আঁচল ধরে টানছে। রূপকথার তাকে দেখে নিজের বাবা মায়ের মৃত্যু দিনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল যখন বাবা মায়ের দেহটাকেও খুঁজে পাচ্ছিল না চিৎকার করে করে কাঁদছিল। শুধু বয়সের পার্থক্য। রূপকথা সহ্য করতে না পেরে ছোট্ট তুলতুলে কে নিজের বুকে টেনে নিয়ে ছিল। সেই থেকে তুলতুল তার মেয়ে। রবি, লামিয়া নিজেদের কাছে নিতে চাইলে দেয় নি। রূপকথার সাথে কেউ জোর খাটিয়ে তুলতুলে কে নিতে পারে নি।

বেশ অনেকটা সময় চুপ থেকে রেশমি বললেন,

" তুলতুলরে বিয়া দেওনের পর কী করবি কথা ? "

" বুঝলাম না ফুপু। "

" নিজে তো বিয়াশাদি করলি না তুলতুলরে বিয়া দিয়া তো তোর দায়িত্ব শেষ একলা হইয়া পড়বি। কেন যে তুই বিয়াশাদি করলি না আজো তার রহস্য বুঝতে পারলাম না দুই এক সময় মনে হয় রবি যা কয় তাই সত্যি আসলেই কী সত্যি কথা ? "

রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বলল,

" আমিও ঠিক জানি না ফুপু উত্তর খুঁজে পাই নি। অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে চলো। "

রেশমি আর কথা বাড়ল না রূপকথা তাকে ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে নিজে ঘরে গেল।

চলবে,
কপি করা নিষেধ।

[ তারিফের রূপকথা কে লেখা চিঠি পড়তে চান পাঠক ? ]

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Meem Islam Sukonna - মীম ইসলাম সুকন্যা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share