07/09/2025
#ভালোবাসার_মরশুম ( দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ )
লেখনিতে- #মীম_ইসলাম
পর্ব- ১১
( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত )
" আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই কেমন আছেন ? "
পেখম কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লো। কাঁকন কাকে ফোন দিয়েছে বুঝতে বাকি নেই। এখন এ ও ওদের সাথে যোগ হবে ? ইরফান ওপাশ থেকে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
" কে বলছেন ? "
" সে কি চিনতে পারলেন না আমি আপনার শালি। "
পেখম চোখ পাকাচ্ছে। ইরফান বলল,
" সরি রং নাম্বারে কল করেছেন। "
কাঁকন সাথে সাথে চেঁচিয়ে বলল,
" আরে আমি ঠিক নাম্বারে কল করেছি। "
ইরফান চেঁচানো তে গেস করলো কাঁকনের স্বর। অপ্রুস্তুত ভাবে বলল,
" সিনড্রেলা তুমি ? "
কাঁকন জিভে কামড় দিলো বলল,
" চিনে ফেললে ? "
" ফাজলামি হচ্ছে পড়ালেখা নেই। আমি আন্টি কে ফোন করছি দাঁড়াও। "
কাঁকন ভ্রু কুঁচকে বলল,
" এই যে দুলাভাই বিচার দেয়ার ভুল করবেন না তাহলে আমি ও অনেক কিছু জানি বলে দেবো। "
ইরফান বিস্মিত হলো। আর পেখম কপালে হাত দিয়ে চেয়ার টেবিলে বসে আছে। ইরফান ব্যস্ত ভাবে বলল,
" কি জানো ? কোথায় আছো তুমি ? "
" আপনার বউয়ের ঘরে বসে আছি। জানেন সাপের মতো ফুঁসছে কিন্তু মারতে পারছে না সব বলে দেবো যে তাই। আর কি জানি ? বলতে গেলে কিন্তু লম্বা কাহিনী হয়ে যাবে। "
" পেখম কে দেও ফোনটা। "
" এ বাবা আমি তো বলি ই নি আমি পেখুপুর ঘরে তারমানে পেখু পু আপনার বউ ? "
বলে হাসছে কাঁকন। ইরফান বলল,
" পেকেছো অনেক। পেখম কে দেও তোমার সাথে পরে কথা বলছি। "
কাঁকন পেখমের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিতেই পেখম ফোন নিয়ে বারান্দায় গিয়ে ' হ্যালো ' বলল। ইরফান বলল,
" ইঁচড়ে পাকা টা জানলো কি করে ? "
" আড়ি পেতে ছিলো। "
" ব্ল্যাক মেইল করছে তোমাকে ? "
" আমি ব্ল্যাক মেইলের স্বীকার হচ্ছি না। "
" তাহলে ? "
" ও যা ভাবছে তা কিছুই ঠিক না তাই আমাকে ব্ল্যাক মেইল করতে পারছে না। "
কাঁকন উঁকি দিয়ে বলল,
" সব ঠিক জানি আমি। তুই ঝগড়া করেছিস না বন্ধুর সাথে ? "
" তুই ঘরে যা। "
" ফোন দে আমি কথা বলবো। "
পেখম দিয়ে দিলো কাঁকন বলল,
" ওর বিষয় ছাড়ো বন্ধু আমার মুখ বন্ধ রাখতে চাইলে ঘুষ দিতে হবে এখন। "
ইরফান বলল,
" জেনে যখন গেছো ঘুষ তো দিতেই হবে বলো শালি সাহেবা কি চাও ? "
" বাইকে করে বৃষ্টি ভেজা রাতের শহর ঘুরে দেখাও। "
ইরফান চোখ কপালে তুলে বলল,
" কি সাহস ! ধরা পড়লে কি হবে জানো ? "
" পড়বো না। কখন আসছো বলো আমি লুকিয়ে যাবো। "
পেখম ঘরে উঁকি দিলো সত্যি সত্যি কি ওকে নিয়ে যাবে নাকি ? ইরফান বলল,
" সিনড্রেলা নিতে পারি একটা শর্তে। "
" কি শর্ত "
" আমার হবু বউটাকে ও রাজি করাও আসতে সাথে। "
" তিনজন বাইকে অসুবিধা হবে না। "
" সেসব আমি দেখছি তুমি ওকে রাজি করাও আমি এগারোটায় তোমাদের বাড়ির পেছনের গেটে থাকবো। "
ইরফান ফোন কাটলো। কাঁকন ভাবছে ওর তেড়া বোন কে রাজি করাবে কি করে ? পেখম এসে জিজ্ঞেস করলো,
" কি বললো ? "
কাঁকন চুপ। পেখম বলল,
" নিবে না তোকে একা জানি আমি। কেউ দেখলে উল্টো পাল্টা বলবে। "
বলে নিজের বিছানা ঠিকঠাক করছে। কাঁকন হঠাৎ জোরে বলল,
" কে বলল নিবে না ? নিবে তো ইরফান ভাইয়ের বিদেশি বান্ধবীর বাড়ি নাকি আশেপাশে তাকে ও নিবে। তিনজন একসাথে যাবো। "
পেখম সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়ালো জিজ্ঞেস করলো,
" বন্ধু না বান্ধবী ? "
" বান্ধবী? "
পেখম বিরবিরালো,
" বৃষ্টিতে বান্ধবী নিয়ে ঘুরবে বাহ খুব ভালো। "
" তো আর কি তুই তো বেরসিক হয়ে গেছিস। তাই বান্ধবী কে আর আমাকে নিবে। ইশ আমি যদি একটা প্রেম করতাম না বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতাম এই বৃষ্টির রাতে কি ভালো... "
" একটা থাপ্পড় মারবো অসভ্য মেয়ে। যা ঘুমো কোথা ও যেতে হবে না। "
" আমি না গেলে বন্ধু আর ওই মেয়ে একা একা ঘুরবে আমি যাবো। "
পেখম ও ভাবলো আসলেই তো একা ওই বিদেশীর সাথে ঘুরবে ওরা যা অসভ্য হয় । একটু থেমে রেগে রেগে বলল,
" আমি ও যাবো তোর সাথে বৃষ্টিতে রাতের শহর দেখতে তোকে একা ছাড়বো না আমি। "
" কি ? এক বাইকে তিনজন কষ্ট করে না হয় বসতাম চারজন কিভাবে বসবো। "
" সে আমি জানি না আমি যাবো। যাহ তোর রেইন কোর্ট নিয়ে এখানে চলে আয়। "
কাঁকন মনে মনে হাসতে হাসতে বের হলো। ঘরে যেতে যেতে বিরবিরালো,
" এই জেলাসি ই তো আমার পেখুপুর আসল রুপ। আহা এতোদিন নিরামিষ লাগছিল এখন আমিষ আমিষ ভাব লাগছে। "
আর পেখম ওই দিকে রেইন কোর্ট বের করতে করতে বিরবিরালো,
" বান্ধবী কে নিয়ে রাতের শহর দেখবে না দেখাচ্ছি বেশি করে। "
**
রোদেলা কখনো এইরকম টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমায় নি। জন্ম থেকেই তো কিচিরমিচিরে আছে। আর আত্মীয় স্বজন গ্ৰামে কেউ নেই। এই টুপ টাপ শব্দ খুব ভালো লাগছে। সাহেদ ওপাশ ফিরে ফোনে কিছু করছে। রোদেলা উঠে বসে একটু জানালা ফাঁক করলো। পুকুরে কি সুন্দর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই দিকেই তাকিয়ে রইলো রোদেলা। হালকা ঠান্ডা বাতাস গাঁয়ে লাগতেই সাহেদ ঘুরে দেখে রোদেলা জানালা খুলে বসে আছে। সাহেদ ও ফোনটা রেখে উঠে বসলো। সাহেদের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসলো। রোদেলা এক মনে বাহিরে তাকিয়ে। আর সাহেদ একদম শব্দ না করে রোদেলার মাথার উপর দিয়ে একটু ঝুঁকে জানালায় মুখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
" ভূত আসছে রোদ ... "
" ও মাগো.. "
সাহেদের বলতে দেরি রোদেলার লাফ দিতে দেরি হয় নি। আসলে ও সাহেদের স্বর শুনেই ভয় পেয়ে গেছে। এমন সময় ফিসফিসানো স্বর।
রোদেলা ভয়ে ঘুরতে গিয়ে সাহেদের বুকে বাড়ি খেয়ে ওর গলা কাঁধের কাছে টি-শার্ট মুঠো করে ধরেছে। সাহেদ তো ওর ভয় পাওয়া দেখে হু হা করে হেসে ফেলেছে। রোদেলা কতোক্ষন সাহেদের হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো একটু পর ওর জামা ছেড়ে জানলার পাশে থেকে সরে বসে কান্না ভাব করে বলল,
" আপনি আমাকে এই ভাবে ভয় দেখালেন যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। ভয়ে মরে যেতাম। "
সাহেদ ওর এই অবস্থা দেখে থেমে গেলো। তাড়াতাড়ি ওর কাছে এসে বলল,
" আরে কাঁদছ কেনো ? আমি তো মজা করে .... "
" আপনাকে তো আমি ভালো ভেবেছিলাম আপনি আমার ভাই গুলোর থেকে ও ফাজিল। "
রোদেলার চোখের কোনে এক ফোঁটা পানির মতো দেখা যাচ্ছে। সাহেদ এবার ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
" আচ্ছা সরি আর ভয় দেখাবো না। আরে তুমি যে আমার কথা তে ভয় পাবে সেটাই তো বুঝি নি। ভাবলাম ভুতের কথা বললে জানালা বন্ধ করে দেও নাকি তুমি ভয় পাও কিনা দেখতাম। "
রোদেলা নাক টেনে বলল,
" জানালা বন্ধ করেন । "
সাহেদ উঠে জানালা বন্ধ করতে গেলো। কিন্তু ওর পেট ফেটে হাসি আসতে চাইছে রোদেলার ভয় দেখে। কিন্তু হাসলে রাগবে নয়তো কাঁদবে তাই হাসি চেপে রেখেছে। সাহেদ এসে বলল,
" সরি রোদ আমি বুঝতে পারি নি তুমি এতো ভীতু না মানে ভয় পাবে। ঘুমিয়ে পড়ো ভুতটুথ কিছু নেই। "
রোদেলা শুয়ে পড়তেই যাচ্ছিল। কিন্তু ওইযে মানুষের হাসি চেপে রাখলে যা হয় আর কি সাহেদের মুখো ভঙ্গি কেমন লাগলো রোদের। বুঝতে পারলো সাহেদ মনে মনে হাসছে। রোদ ক্ষেপে চেঁচিয়ে বলল,
" খুব মজা লাগছে না আমাকে ভয় দেখিয়ে। জোরে জোরে হাসেন আমি সকাল হলে ই আম্মু কে ফোন করে বিচার দেবো। "
বলে রোদেলা ওপাশ ঘুরে শুয়ে পড়লো। রোদেলার বাচ্চামোতে সাহেদ আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না মানে ভাবা যায় সাহেদ এতো দিন যে রোদ কে দেখেছে আজকে তার উল্টো দেখলো। ও ভেবেছিল রোদেলা খুব সাহসী না হলে ও এতো ভীতু হবে না।আর রোদেলা ওপাশ ঘুরে সাহেদের হাসি শুনে ফুঁসছে।
**
ঠিক ১১ টায় ইরফান কাঁকন কে ফোন করলো। দু বোন পা টিপে টিপে পৌঁছে গেলো পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায়। পেখম আগে বের হলো দেখলো দুটো বাইক একটায় ইরফান আরেকটায় সাইফান। কাঁকন পেখমের পিছনে। সাইফান খুব বিরক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান ওকে কি বুঝিয়ে নিয়ে এসছে ইরফান ই জানে ভালো। পেখম এগিয়ে এসে বলল,
" আপনার বান্ধবী কই ? "
কাঁকন হাসছে মিটি মিটি। ইরফান ও হাসলো। কাঁকন ঘরে গিয়েই ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলেছে কি বলে পেখম কে বের করছে। ইরফান বলল,
" ওর হঠাৎ পেট ব্যাথা হলো তাই আসে নি। "
পেখম মনে মনে বলল ' এলি না আসলে এক হাত দেখে নিতাম। ' ইরফান কাঁকন কে বলল,
" তুমি ওর বাইকে ওঠো। "
সাইফান দাঁড়িয়ে ছিলো। ভাইয়ের কথায় ঠিক হয়ে বসলো। কাঁকন ভয় পেলো সেদিনের রাগ মেটাতে ফেলে টেলে দেবে না তো ? আস্তে আস্তে পেছনে উঠে বসলো। আর ইরফান বসতেই পেখম উঠে বসল। ইরফান বলল,
" ধরে বসেন জেলাস রানী। "
এই নামের মানে বুঝলো না। পেখম কাঁধে হাত রাখতে রাখতে বলল,
" কি বললেন ? "
" কিছু না। "
ওইদিকে সাইফান কিছু বলে নি বাইক স্টার্ট করতেই কাঁকন দুইহাতে দুই কাঁধ চেপে ধরলো। সাইফানের মনে হলো কোনো রাক্ষুসী থাবা বসালো।
ভেজা পিচঢালা পথে দুই ভাই আগে পিছু বাইক নিয়ে যাচ্ছে। পিছে দুই বোন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। রেইনকোট পড়া তাই কেউ ভিজছে না। কাঁকন খুব ইনজয় করছে। আর বলছে,
" বৃষ্টি এলে রাতে এতো সুন্দর লাগে ! "
সাইফান মনে মনে বলল ' জীবনে প্রথম বের হলো নাকি এই ভাইয়া কোথায় কোথায় ফাঁসিয়ে দেয়। দেখেই মনে হচ্ছে বকবকানি। '
পেখম এক হাত ইরফানের কাঁধে রেখেছে। আরেক হাতে বৃষ্টির পানি জমাচ্ছে আবার রাস্তার উপর ফেলছে। ইরফান বার বার বলছে,
" পেখম ঠান্ডা লেগে যাবে আর হাত ভিজিও না এভাবে। "
পেখম শুনলে তো ? ইরফানের কথা তার কানেই যাচ্ছে না। ইরফান বাইকের স্পিড অনেকটা বাড়িয়ে দিলো। ফাঁকা রাস্তা তাই একটু বাড়ানো ই যায়। সাইফান কে পেছনে ঘুরে ইশারায় বলল ওর বাইকের স্পিড কম রাখতে। ইরফান এতো জোরে বাইক টানছে যে পেখম এবার ভয়ে পানিতে হাত ভেজানো বাদ দিয়ে ইরফানের বুকের কাছে শার্ট খামছে ধরলো। আর বলল,
" আস্তে চালান মরার শখ হয়েছে নাকি ? "
ইরফান একটু জোরে বলল,
" হ্যা পেখম, একসাথে মরন এলে ও আমার আপত্তি নেই। আমি রাজি আছে। "
পেখম আরো জোরে টেনে ধরলো ওর শার্ট। ইরফান তাকালো হাতের দিকে। ওর হাতের ওপর হাত রেখে এই খামছে ধরা ছাড়ালো সুন্দর ভাবে রাখলো বুকের একটু নিচে পেটের একটু উপরে। ঠিক একই ভাবে কাঁধে রাখা হাত ঘুরিয়ে সামনে এনে রাখলো। বলল,
" হাত ছুটলে স্পিড আরো বাড়বে। "
পেখম কিছু বললো না চুপচাপ মুখ তুলে বৃষ্টির ফোঁটা অনুভব করলো।
সাইফান ইরফান বারন করায় আস্তেই চালাচ্ছে। কাঁকনের বিরক্তি লাগলো,
" আপনি পারেন না চালাতে নাকি ভয় পাচ্ছেন। আরেকটু জোরে চালান। ওরা কতদূর চলে গেলো। "
মুখ কুঁচকে বলল,
" ভাইয়া আস্তেই যেতে বলেছে। "
" আপনি আরো স্পিডে যান। "
প্রায় চল্লিশ মিনিট বাইক চালিয়ে একটা বিলের পাশে এসে থামলো ইরফান পেখম। পেখম নেমে সাইড হয়ে দাঁড়ালো বাইক রেখে ইরফান ও এসে দাঁড়ালো। বৃষ্টি একটু কমেছে। কিছুক্ষণ নীরবতা চলল দুজনের একটু পর ইরফান ই বলল,
" বসবে ? "
" না দাড়াতেই ভালো লাগছে। কাঁকন কোথায়? "
" আসছে পিছে। "
দুজনের মধ্যে আরো কিছুক্ষণ নীরবতা চলল পেখম নীরবতা ভাঙলো বিলের দিকে দৃষ্টি রেখে সোজাসুজি প্রশ্ন করলো,
" আসলে ঠিক কী চাইছেন ? "
ইরফান কিছু ভাবছিলো প্রশ্ন শুনে ওর দিকে তাকালো। এক কথায় উত্তর দিলো ,
" তোমাকে "
পেখম এবার ইরফানের দিকে ঘুরলো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
" হঠাৎ কি মনে করে আমাকে চাইলেন ? আগে না হয় বয়স কম ছিলো ভুল.. "
" চুপ করো পেখম তখন পরিস্থিতি টাই অন্যরকম ছিল। "
পেখমের এই সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে অনেক কথা শোনাতে ইচ্ছে করছে। খুব কড়া কড়া সেই পাঁচ / সাড়ে পাঁচ বছর আগে সকালে ইরফানের কাছে যাওয়ার পর ইরফান যেমন শুনিয়ে ছিলো তেমন। কিন্তু এতোটা ও কঠিন হতে পারছে না পেখম। সেদিন এই মানুষটা ওকে যতটা কষ্ট দিয়েছে ও তার বিন্দু মাত্র ও দিতে পারছে না। পেখম নিজের কান্না কষ্ট গিলে বলল,
" পরিস্থিতি যাই থাকুক আমি তখন ও আপনার যোগ্য ছিলাম না এখন ও না। ভালো এটাই হবে আপনার সময় নষ্ট না করে যোগ্য কাউকে বিয়ে করে নিন। স্মৃতি আপুর মতো যোগ্য কেউ। আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিন। আমি চাই না আমার ওই অল্প বয়সের ভুল গুলো আমার বাবা মা জেনে কষ্ট পাক। "
বলতে বলতে সামনে তাকালো। ইরফান স্মৃতির কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। বলল,
" স্মৃতি এলো কোথা থেকে ? "
" কেনো স্মৃতি আপুর সাথেই তো চলে গিয়ে ছিলেন। বিয়ে করলেন না কেন ওনাকে ? "
ইরফান কোমরে হাত দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। বুঝলো মহারানীর রাগ কোথায় তাহলে। বৃষ্টির দাপট কমলে ও আবার শো শো করে বাড়ছে। কিছুদিন পরে শীত পড়বে। কিন্তু কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভূতি লাগছে বিলের পাড়ে। ইরফান নিজের পকেটে থেকে ফোন বের করলো গ্যালারি তে গেলো একটা ছবি বের করে পেখমের দিকে এগিয়ে দিলো। পেখম জিজ্ঞেস করলো ,
" কি ? "
" দেখো "
পেখম হাতে নিয়ে দেখলো স্মৃতির ছবি। সাথে অন্য কেউ আছে। জিজ্ঞেস করলো,
" সাথে কারা ? "
" স্মৃতির হাজব্যান্ড ডা.আসিফ মাহমুদ পেশায় নিউরোসার্জন আর ওদের চার বছরের মেয়ে তিয়াসা।
পেখম থেমে গেলো অবাক হলো কি শুনলো এটা ? তবে সেদিন যে রায়হান ভাইকে বলতে শুনেছিল স্মৃতি বিয়ে করেছে স্বামীর সাথে বিদেশ গেছে, ইরফান কে ওর সাথে দেখা গেছে। যদি ইরফান ওর স্বামী না হয় তবে ওদের সাথেই গিয়ে ছিলো কেন ? নাকি যায় নি কোথা ও ?
সাইফান ইরফান কে ফলো করেই আসছিলো মাঝে কয়েকটা গাড়ি চলে আসায় ইরফান কে হারিয়ে ফেলেছে কোন দিক গেছে বুঝলো না। ওই বা এখন কোন দিক যাবে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যে কাঁকন চেঁচিয়ে বলল,
" এই আপনে থামান আমি নেমে যাবো এতো স্লো কেউ চালায় ? "
এমনি সাইফানের মেজাজ খারাপ তার ওপর ওর সাথে চেঁচাচ্ছে। জোরে বাইক থামলো। কাঁকন সাইফান কে শক্ত করে ধরায় পড়লো না। তবে সাইফানের পিঠে এসে কাঁকনের মুখ বাড়ি খেলো। কাঁকন ' আহ ' বলে চেঁচালো। সাইফান পাত্তা না দিয়ে বলল,
" নেমে পড়েন। "
কাঁকন ঝাঁঝিয়ে বলল,
" এখানে নেমে কি করবো বন্ধু আর আপু কোথায় সেখানে নিয়ে থামান। আর আপনাকে বাইক চালানো শিখিয়েছে কে এভাবে কেউ থামায় ? "
" আপনিই তো নামতে চাইলেন। আর ওরা কোথায় জানি না হারিয়ে ফেলেছি। "
" হারিয়ে ফেলেছেন মানে ? আমরা কোথায়? "
" সেটা ও জানি না। "
এবার কাঁকনের ভয় হতে শুরু করলো। আশেপাশে তেমন কোনো বাড়িঘর ও তো নেই দুই একটা গাড়ি যাচ্ছে রাস্তায় লোকজন ও নেই। কাঁকন বলল,
" ফোন করেন। "
সাইফান ফোন করলো পর পর কয়েকবার ঢুকছে না। কাঁকন ও পেখম কে ফোন করলো ঢুকছে না। বৃষ্টির জন্য হয়তো সমস্যা হচ্ছে।
কাঁকন এবার ভয়ে কেঁদে ফেলল বিরবিরালো,
" এই জন্যই মা বলে ' কাঁকন একা একা কোথা ও যাস না ' আমি ই ফাজিল শুনি না। "
সাইফান বলল,
" এখানে কাঁদার কি হলো বুঝলাম না। "
কাঁকন তেজ নিয়ে বলল,
" আপনি কি মেয়ে যে বুঝবেন কেন কাঁদছি ? "
সাইফান বিরক্ত হয়ে বলল,
" ভাইয়া কোথায় ফাঁসালো। এই রকম মেয়ে নিয়ে এখন কি ঝামেলায় পড়লাম। "
" এই আপনি এই রকম বলতে কি মিন করছেন আমি কেমন মেয়ে? কি মনে হয় ? "
" থামুন নয়তো ওই যে দেখছেন কবরস্থান দূরে একা ছেড়ে দিয়ে আসবো। ভাবতে দিন কি করবো। একটা ও কথা না। "
কাঁকন তাকালো এতোক্ষন তো দেখে ই নি। ওর আত্মা যেনো এইবার বেরিয়ে যাবে মনে হলো। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাইকে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো।
পেখম তখন থেকে চুপচাপ আছে কিছু ভাবছে। ইরফান বলল,
" আর কি কি অভিযোগ আছে ? "
" কিছু না। শুধু আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিন। "
" সম্ভব না একমাত্র মরলেই হয়তো তোমাকে ছাড়বো।
পেখম আবারো চুপ। ইরফান ওকে বাহুতে ধরে নিজের দিকে ঘোরালো। পেখম ঘুরলো তবে তাকালো না ইরফানের দিকে। ইরফান ওর দুই গালে হাত রেখে মুখ উঁচু করে ধরলো। পেখম না চাইতেই চোখাচোখি হলো। ইরফান কোনো ভনিতা ছাড়াই প্রশ্ন করলো,
" ভালোবাসো ? "
পেখম চুপ। কোনো কথা বলতে পারছে না। পেখমের মুখ উঁচু করায় বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ওর চোখে মুখে ঠোঁটে পড়ছে। এই মুহূর্তে ইরফানের এই বৃষ্টি ফোঁটাগুলো কে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। ওরা পেখমের চোখ মুখ ঠোঁট ছুঁতে পারছে। ইরফান আবার বলল,
" চুপ কেন বলো ? "
পেখম কি করবে ? সত্যিটা স্বীকার করতে চাইছে না। এর আগে স্বীকার করে অপমানিত হয়েছে আবার ওই সমুদ্রের মতো গভীর চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলাটা ও যে সম্ভব না। তাই চুপ থাকাটাই সহজ মনে হলো। বৃষ্টির সাথে বিজলী চমকাচ্ছে। পেখম কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিছুটা বিজলীর শব্দে কিছুটা ঠান্ডা হাওয়ায়। ওর চোখ জ্বলছে ঠোঁট গুলো ও কাঁপছে।
ইরফান কেমন ঘোরে চলে গেলো এই গোলাপি ঠোঁট জোড়াতেই দৃষ্টি আটকে গেলো। আর পেখম ইরফানের চোখে ডুবেছে। এই চোখ মনে হচ্ছে কতো মায়া ভালোবাসা জমে আছে সরাতেই ইচ্ছে করছে না। ইরফান ঘোরে থেকেই নিজের মুখ পেখমের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আনছে। গন্তব্য ওর গোলাপী ঠোঁটে। দুজনেই ভুলে গেছে কোথায় আছে। কোনো হুশ নেই। ব্যস আর ইঞ্চি খানেক দুরুত্ব সেটা ও কয়েক সেকেন্ডে মিলিয়ে যাবে। একে অপরের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে।
তখনি ইরফানের ফোন বেজে উঠলো। পেখম ছিটকে সরে পড়লো। ইরফান দু পা পিছিয়ে গেলো। ফোনের শব্দে হুশে এলো দুজন।
ইরফান ফোন বের করে দেখলো সাইফান, রিসিভ করলো। আর পেখম জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এতোক্ষন কি হতে যাচ্ছিল সেটাই ভাবছে।
ইরফান কথা শেষ করে পেখম কে বলল,
" বাইকে উঠো ফাস্ট ওরা হারিয়ে গেছে আরো দেরি হলে একা একা বিপদে পড়বে। "
পেখমের এইবার মাথা থেকে সব চলে গেলো বোনের জন্য চিন্তা শুরু হলো। দেরি না করে ঝটপট উঠে বসলো।
সাইফান কল কেটে বাইকের সামনে এলো। কাঁকন কে ভয় দেখানো তে আর জোরে কাঁদে নি বা চিল্লাচিল্লি করে নি তবে গুনগুন করে কাঁদছে। সাইফানের এটা একদম পছন্দ হলো না কাঁদবে কেন ? আজব বাংলাদেশেই তো আছে অন্য কোথাও যায় নি। সাথে ও থাকতে তো কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু সাইফান কি জানে কাঁকন ওকে ও ভয় পাচ্ছে ?
রেগে রেগে বলল,
" এইবার থামেন ঝাঁঝের রানী। আসছে ওরা। "
" সত্যি "
" মিথ্যা কেন বলবো আপনাকে ? "
কাঁকন এইবার চোখ মুছে ফেলল। খুশি হয়ে গেলো। দুই মিনিটের মধ্যে মুড চেঞ্জ করে বলল,
" এতোক্ষন ভয়ে দেখলাম ই না কি সুন্দর জায়গা টা। দেখেন ওপাশে ফুলের গাছগুলো কি সুন্দর লাগছে। "
সাইফান অবাক হলো মনে মনে বলল ' আজব মেয়ে মানুষ। একটু আগেই কেঁদে ভাসাচ্ছিল আবার হাসছে এখন। '
প্রায় পনেরো মিনিট পরে ইরফান এলো। কাঁকন তো আগে দৌড়ে গিয়ে সাইফানের নামে বিচার দিলো। ইরফান ওকে শান্ত করতে মেকি ধমকালো সাইফান কে। তারপর আবার বাইকে করে রওনা দিলো ফিরতে। সাইফান বাইক চালাচ্ছে। আর কাঁকন একটু পর পর এটা সেটা বলছে। মাঝে মাঝে সাইফান চুপ করতে বলছে।
ইরফান চলছে তার অভিমানিনি কে নিয়ে। পেখম নিজেই এবার ইরফান কে জড়িয়ে বসেছে। আর মাথা হেলিয়ে দিয়েছে ইরফানের পিঠে। পেখম তার মূল্যবান প্রশ্নের উত্তর যে পেয়েছে। হ্যা পুরো পায় নি যতোটুকু পেয়েছে এতেই তার মন অনেকটা শান্ত।
ঠিক ১টা ২০মিনিটে কিচিরমিচির এর পেছনে এসে বাইক থামল। কাঁকন ঝটপট নেমে ভেতরে সরে দাঁড়ালো। সাইফান বাইক ঘোরাচ্ছে। পেখম নামলো ধীরে সুস্থে। ঘুম ঘুম ভাব হয়ে গিয়ে ছিলো ওর। বাইকে থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকবে ইরফান বলল,
" শোনো "
পেখম ঘুরে তাকালো ইরফান চাপা আওয়াজে বলল,
" অসম্পূর্ণ কাজ টা সুযোগ বুঝে ঠিক সম্পূর্ণ করে নেবো এক দম সুদ সমেত তখন এমন ছিটকে সরে যেতে দেবো না। "
পেখম প্রথমে বুঝলো না। যখন বুঝলো চোখ বড় করে তাকালো। কাঁকন ওর হাত টান দিলো তখনি বলল,
" আয় "
পেখম সরে এলো। মনে মনে আওড়ালো ' অসভ্য ' চুপচাপ ভেতরে ঢুকতেই ইরফান সাইফান বাইক টানলো। ওরা দুই বোনে পা টিপে টিপে ঘরে চলে গেলো। ওরা যাওয়ার ২/৩ মিনিট পর বড় বারান্দা থেকে রায়হান নিজের ঘরে গেলো। ইরফান বের হওয়ার আগেই ওকে মেসেজ করেছিল। ও পারমিশন দেয়ার পর দুই বোন কে নিয়ে বেরিয়েছে। ওরা না ফেরা পর্যন্ত জেগেই কাটালো।
চলবে,
কপি করা নিষেধ।