25/10/2025
রাত তখন ১০টা ২৪ মিনিট। ঢাকার এক কোণে নিঃশব্দ শহরের বাতাসে ভেসে আসছিল পাকা রাস্তায় গড়িয়ে যাওয়া গাড়ির শব্দ। অফিস ফেরা, ক্লান্ত মানুষদের আনাগোনা শেষের পথে। আমি বাস বদলে এক অটোরিক্সায় উঠলাম—চালকসহ মোট সাতজন। অটোরিক্সার পেছনের সিটে বসে আছে তিন তরুণী। দুজন শাড়ি পরা। ওদের বয়স ১৯/২০ বছর। অপর যাত্রী বোরকা-নিকাব পরিহিত। ড্রাইভারের পাশের দুই সিটে দুই পুরুষ যাত্রী। সিট খালি না থাকায় আমি ড্রাইভারের ঠিক পেছনের চতুর্থ সিটে গিয়ে বসলাম বসলাম।
অটোরিক্সা ধীরে গড়িয়ে চলল। হালকা বাতাস, কিছুটা ঠান্ডা। হঠাৎ শাড়ি পরিহিত দুই তরুণীর কথাবার্তা শুরু হলো—তাদের গলায় রাগ, বিস্ময় আর ভয় মিলেমিশে একাকার।
“ফাজিলটা কোন জায়গা থাইকা আমাগো ফলো কইরা আইলো?”—প্রথম মেয়েটি বলল, কণ্ঠে তীব্র বিরক্তি।
অন্যজন হালকা গলায় উত্তর দিল, “সালারে তো আমি খেয়ালই করি নাই! আরেকবার দেখলে একটা মাইর খাওয়াইয়া দিমু।”
অটোরিক্সার বাকি যাত্রীরা নীরব। কেউ তাকাল না, কেউ হাসল না, কিন্তু সবার কান তাদের কথায় ঝুঁকে গেল।
প্রথম মেয়েটি আবার বলল, “কত্তবড় বেহায়া! ন্যূনতম শিক্ষা যদি থাকতো তাইলে তো এমন করত না। পারিবারিক শিক্ষা কিছুই পায় নাই বেয়াদবটা।”
অপরজন তৎক্ষণাৎ যোগ করল, “তুই চিন্তা করছোস! আমগোরে কইত্থাইকা ফলো কইরা আইছে, এই জায়গায় আইয়া তো ঠিক বুঝে গেছি। আরে, এগুলার ক্যারেক্টার বলতে কিছু নাই। পুরাই ক্যারেক্টারলেস।”
তাদের কথাগুলো তীব্র, অজান্তেই একধরনের আতঙ্ক মিশে আছে তাতে। কেউ একজন—সম্ভবত এক অপরিচিত পুরুষ—তাদের পেছন পেছন এসেছে। শহরের এই রাত, যেখানে আলোর নীচে অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, সেখানে একজন মেয়ের জন্য এমন পরিস্থিতি ভয়ানক।
রিক্সার ভেতরে অন্যরা চুপচাপ। কেবল বোরকা-নিকাব পরা মেয়েটি আলতো করে তাকালেন, যেন বোঝাতে চান—সব ঠিক হয়ে যাবে। চালকও মুখে কোনো কথা আনলেন না, কেবল সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে গতি সামলাচ্ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মোবাইলের আলো ঝলসে উঠল। সেই শাড়ি পরা মেয়েদের একজন মোবাইল হাতে নিয়ে কিছু স্ক্রল করছে। হিন্দি রিমিক্স গান বাজতে শুরু করল, ভলিউমও কমানো হয়নি। মোবাইলের আলো অটোরিক্সার অন্ধকার কোণটিকে উজ্জ্বল করে তুলল। গানের ছন্দে তারা হেসে উঠল।
“এই ভিডিওটা দেখ, ওরে চিনস?”—মেয়েটি বলল।
“হ্যাঁ, হাহা! নিজেরে অনেক কিছু ভাবে। টিকটকে দিনরাত ভিডিও দেয়,” বলল অপরজন।
“ওরে দেখি, কলেজে গিয়া কেমন ভাবে। আমি একদিন কমেন্টে লিখে দিমু—‘নিজেরে কি ভাবস?’”
তাদের হাসি এখন পুরো অটোরিক্সায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে আগের রাগ, লজ্জা, ভয়—সব যেন মিলেমিশে এক ধরনের বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। আমি নীরবে তাকালাম। ভাবলাম, কিছুক্ষণ আগেই তারা যে ছেলেটিকে “ক্যারেক্টারলেস” বলছিল, এখন তারাই একধরনের নির্লজ্জ হাসির মধ্যে ডুবে আছে—মোবাইলের আলোয় মুখদুটো উজ্জ্বল, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
এবার বোরকা পরা মেয়েটি হঠাৎ নরম স্বরে বললেন, “শোনো আপুরা— তোমরা গানটা একটু বন্ধ করো। রাত বেশি হইছে।”
মেয়েরা থমকাল, তারপর একজন বলল, “ সরি আপু, একটু মজা নিচ্ছিলাম।”
পর্দানশীল তরুণী মৃদু হাসলেন, “মজা নাও বোন, কিন্তু শালীনতার বাইরে যেও না। আল্লাহ আমাদের সবার ওপর দৃষ্টি রাখেন।”
অটোরিক্সায় যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। চালক মুখ ফিরিয়ে না দেখেই বলল, “ঠিক কইছেন আপা। এখনকার মাইয়াগুলা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনে। রাস্তায় বের হলে আল্লাহর নাম নিয়া বের হইতে হয়।”
মেয়েদের একজন কিছুটা বিরক্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “ভাই, আপনি কি কইতাছেন পোশাকের দোষ? দোষ তো ঐ ছেলেগুলার, যারা মেয়েদে ফলো করে। আমরা কি দোষ করতাছি?”
চালক একটু থেমে বলল, “বোন, দোষ তোমার না। কিন্তু সমাজটা তো এমন জায়গায় পৌঁছায় নাই, যেখানে পুরুষের চোখে পর্দা থাকে। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য নিজেকেই একটু সতর্ক থাকতে হয়। পর্দা মানে বদ্ধ থাকা না, রক্ষা পাওয়া।”
এই কথাগুলোতে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো। মেয়েরা চুপ, আমি তাকালাম রাতের দিকে—রাস্তার আলোয় ছায়া আর ছায়ার ভেতরে ক্লান্ত শহর ঘুমিয়ে পড়ছে।
অটোরিক্সা একটি মোড় ঘুরতেই হঠাৎ নীরা (তরুণী দ্বিতীয়জন) বলল, “রিয়া, তুই ভাবছস না? আমরা যদি এমন জায়গায় একা ফিরি, এইসব ফলো করা পাগলগুলা তো আরও সাহস পায়। পরদিন আবার আসবে।”
রিয়া নিচু গলায় বলল, “হ্যাঁ রে। আমি ভাবতেছি কাল থেকে একটু অন্যভাবে ফিরব। হয়তো ওড়না টা ভালো করে নিছি না। কেউ কিছু ভাবুক না, অন্তত নিজের মানটা বাঁচাই।”
পর্দানশীল মেয়েটি এবার কথা বলতে শুরু করলো- “দেখো, তোমরা তরুণী, সুন্দর, আল্লাহর দান। কিন্তু সৌন্দর্যেরও হেফাজত আছে। চোখ নামানো যেমন ফরজ, তেমনি পর্দা রাখা সম্মানের।”
রিয়া মাথা নিচু করল, “আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া চাই, যেন এই শহরটা মেয়েদের জন্য একটু নিরাপদ হয়।”
চালক এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বোনেরা, সমাজটা আজ যে জায়গায় গেছে, সেখানে মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। কিন্তু তোমরাই বদল আনতে পারো। তোমাদের চলাফেরা, পোশাক, কথাবার্তা—সবই হতে পারে অন্য মেয়েদের অনুপ্রেরণা।”
রিক্সা তখন শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। বাতাসে ধুলার গন্ধ, দূরে কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে দেরি করে পড়া এশার আজান।
বোরকা পরা তরুণী আস্তে বললেন, “পর্দা মানে শিকল না মা, এটা ঢাল। ঢাল না থাকলে যুদ্ধের ময়দানে সৈনিকও বাঁচে না।”
মেয়েরা চুপ করে গেল। রিয়ার চোখে সামান্য অনুতাপের ছায়া, নীরার মুখে চিন্তার রেখা। তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসল—একটি বোঝাপড়া, একটি মৃদু প্রতিশ্রুতি।
অটোরিক্সা থামল এক মোড়ে। আমি নামার প্রস্তুতি নিলাম। নামার আগে শেষবার শুনলাম রিয়া নীরাকে বলছে, “তুই কাল থেকে ওড়নাটা ঠিকমতো নিস। আমরা কেউ আমাদের মর্যাদা হারাব না।”
নীরা উত্তর দিল, “আর কেউ যদি পেছন থিকা ফলো করে, সরাসরি পুলিশে জানাব। ভয় না পেয়ে মুখ খোলাই হবে আমাদের শক্তি।”
আমি নেমে দাঁড়ালাম রাস্তায়। অটোরিক্সাটা সামনে এগিয়ে গেল, রাতের বাতাসে তার টুংটাং শব্দ মিলিয়ে গেল। চারপাশে নীরবতা, তবু মনে হলো সেই দুই তরুণীর কথাগুলো এখনো বাতাসে ভাসছে।
আমি ভাবলাম—এই মেয়েরা ভয় পায়, তবু প্রতিবাদ করে; তারা দ্বিধায় থাকে, তবু নিজেদের মর্যাদা নিয়ে সচেতন। তারা আজকের সমাজের প্রতিচ্ছবি—যেখানে লম্পট চোখের ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়কে হার মানাতে শালীনতার শক্তিও আছে।
রাত ক্রমে গভীর হচ্ছিল। আকাশে একটিমাত্র তারা জ্বলছে, অটোরিক্সার শব্দ মিলিয়ে গেছে দূরে। আমি ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম—
এই শহর একদিন বদলাবে, যখন প্রত্যেক নারী বুঝবে—নিজেকে আড়াল করা মানে লুকানো নয়, বরং নিজের সম্মানকে রক্ষা করা।
আর প্রত্যেক পুরুষ বুঝবে—নারীকে ফলো করা নয়, তাকে সম্মান দেওয়া-ই আসল পুরুষত্ব।
আকাশে তখন নিস্তব্ধ চাঁদ। রাস্তার পাশের একটি ঘর থেকে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ বাতাসে ভেসে আসছিল। মনের ভেতর তখন একটি শব্দ বেজে উঠছিল—“যে চোখ পর্দা মানে না, সে-ই আসলে সবচেয়ে অন্ধ।”
বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত— অটোরিক্সার রাত