14/08/2026
জাতিসংঘের এক বাক্য, ভারতের ‘জঙ্গি কার্ড’: লক্ষ্য কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব?
[একটি বাক্যের আড়ালে বড় খেলা]
জাতিসংঘের ত্রিশ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা হয়েছে মাত্র একটি বাক্য।
সেখানে কোনো জঙ্গি আস্তানার ঠিকানা নেই।� কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম নেই।� নেই অস্ত্র, অর্থায়ন কিংবা সক্রিয় নেটওয়ার্কের প্রমাণ।
শুধু বলা হয়েছে—বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা AQIS সেল গঠনের চেষ্টা করতে পারে—এমন “কিছু উদ্বেগ” রয়েছে।
কিন্তু এই অনির্দিষ্ট উদ্বেগই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমে হয়ে গেল—বাংলাদেশে আল-কায়েদার উত্থান।
প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই বাংলাদেশের জন্য জঙ্গিবাদের সতর্কতা?
নাকি জাতিসংঘের একটি অস্পষ্ট বাক্যকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে আরও বড় একটি ভূ-রাজনৈতিক অভিযান?
যার চূড়ান্ত লক্ষ্য—বাংলাদেশকে দুর্বল, অনিরাপদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে সন্দেহভাজন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
[রিপোর্টে কী আছে, আর কী নেই]
জাতিসংঘের ৩৮তম পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ১০১ নম্বর অনুচ্ছেদে AQIS সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, সংগঠনটি বড় কাঠামোর পরিবর্তে ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেলের মাধ্যমে আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এরপর দিল্লির লালকেল্লায় ২০২৫ সালের হামলার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশকে নিয়ে মাত্র একটি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি জাতিসংঘের নিজস্ব ফরেনসিক তদন্ত নয়।
প্রতিবেদনটি মূলত বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্য ও মূল্যায়নের সমন্বয়। অথচ বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্যটি কোন রাষ্ট্র দিয়েছে, কী প্রমাণ দিয়েছে এবং সেই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না—রিপোর্টে তার কিছুই বলা হয়নি।
আর এখানেই সন্দেহের শুরু।
কারণ দিল্লির হামলার তদন্ত করেছে ভারত। সেই হামলার অভিযোগ এবং বাংলাদেশে সেল গঠনের আশঙ্কা রাখা হয়েছে একই অনুচ্ছেদে।
ভারতই এই তথ্য দিয়েছে—এমন প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। কিন্তু ভারত এই মূল্যায়নের সম্ভাব্য উৎস কি না—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
[আশঙ্কা থেকে কীভাবে তৈরি হলো ‘সত্য’]
জাতিসংঘ বলেছে—“কিছু উদ্বেগ রয়েছে।”
ভারতীয় গণমাধ্যম বলেছে—জাতিসংঘ বাংলাদেশে আল-কায়েদার বিস্তার নিশ্চিত করেছে।
দুই বক্তব্য এক নয়।
“হতে পারে” থেকে “হচ্ছে”—এই ছোট পরিবর্তনই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল।
প্রথমে একটি অনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে প্রবেশ করে।
এরপর জাতিসংঘের নাম ব্যবহার করে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়া হয়।
তারপর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যম একই বক্তব্য বারবার প্রচার করে।
শেষে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও উৎস পরীক্ষা না করে সেই ন্যারেটিভ নিজেদের জনগণের সামনে তুলে ধরে।
ফলে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত হয়—বাংলাদেশে ভয়াবহ জঙ্গি নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে।
আর আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশ কি আবার উগ্রবাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হচ্ছে?
[বাস্তব তথ্য কী বলছে]
২০২৬ সালের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
এই সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নথিভুক্ত সন্ত্রাসী হামলা আগের বছরের তুলনায় শতভাগ কমেছে। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত স্কোরও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখন পর্যন্ত দেশে AQIS-এর সক্রিয় সাংগঠনিক কাঠামোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি।
এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে কোনো উগ্রবাদী ঝুঁকি নেই।
অনলাইন উগ্রবাদ, বিচ্ছিন্ন অনুসারী কিংবা বিদেশি মতাদর্শে অনুপ্রাণিত ব্যক্তির ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে। রাষ্ট্রকে সেগুলো কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং প্রমাণিত সক্রিয় নেটওয়ার্ক—এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার জন্য এই দুইয়ের পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
[ভারতের গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ]
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু একটি মিত্র সরকার হারানো নয়।
দিল্লি হারিয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর দীর্ঘদিনের বিশেষ প্রভাব।
বর্তমান বাংলাদেশ যদি নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে—তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্য দুর্বল হবে।
এ কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে ভারতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল দেখা যাচ্ছে।
এর সম্ভাব্য লক্ষ্য কয়েকটি।
প্রথমত, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল করা।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান বা চীনের যেকোনো যোগাযোগকে জঙ্গিবাদ কিংবা ভারতবিরোধী নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে যুক্ত করা।
তৃতীয়ত, সীমান্তে ভারতীয় সামরিকীকরণ ও নজরদারি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তৈরি করা।
চতুর্থত, পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে বাংলাদেশকে এমন রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা—যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী নয়—ভারতের নিরাপত্তা-নির্ভর একটি অধস্তন রাষ্ট্রে পরিণত রাখাই হতে পারে এই ন্যারেটিভের গভীর উদ্দেশ্য।
[অজিত দোভালের নীতি ও ভারতের দ্বিমুখী আচরণ]
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের বহুল আলোচিত “প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণ” নীতির মূল কথা হলো—প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ব্যবহার করে তাকে চাপে রাখা।
পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে দোভাল একসময় বলেছিলেন—একটি মুম্বাই হামলার বিনিময়ে পাকিস্তান বেলুচিস্তান হারাতে পারে।
এই বক্তব্য প্রমাণ করে না যে ভারত প্রতিটি আঞ্চলিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
কিন্তু এটি অবশ্যই দেখায়—অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকটকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ধারণা ভারতের নিরাপত্তা চিন্তায় উপস্থিত।
তালেবান প্রশ্নেও একই বাস্তববাদ দেখা যায়।
একসময় ভারত তালেবানকে চরম উগ্রবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবান সরকারের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর ভারত এখন সেই সরকারের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
অর্থাৎ ভারতের কাছে নীতি স্থায়ী নয়—স্বার্থই স্থায়ী।
আজ যে গোষ্ঠী ভারতের শত্রু, আগামীকাল পাকিস্তান বা চীনের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে সেই গোষ্ঠীর সরকারের সঙ্গেই দিল্লি সম্পর্ক গড়তে পারে।
তাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগও শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়—এটি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
[বাংলাদেশের ভেতরের বিপজ্জনক ফাঁদ]
এই ন্যারেটিভের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে আবার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সাবেক সরকারের সময় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের আড়ালে বিরোধী মত দমন, গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এখন জাতিসংঘের এই অস্পষ্ট সতর্কতার অজুহাতে যদি আবার প্রমাণহীন গ্রেপ্তার, সাজানো অভিযান কিংবা রাজনৈতিক দমন শুরু হয়—তাহলে ভারতীয় ন্যারেটিভই জয়ী হবে।
অন্যদিকে, ভারত জড়িত সন্দেহে যদি বাংলাদেশ বাস্তব উগ্রবাদী ঝুঁকিও সম্পূর্ণ অস্বীকার করে—সেটিও হবে ভয়াবহ ভুল।
বাংলাদেশকে এই দুই ফাঁদই এড়িয়ে চলতে হবে।
জঙ্গিবাদ দমন করতে হবে প্রমাণ, আইনের শাসন এবং পেশাদার গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে—রাজনৈতিক নাটকের মাধ্যমে নয়।
[সার্বভৌম বাংলাদেশের করণীয়]
বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উপনিবেশ নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে ঢাকা—নয়াদিল্লি নয়।
প্রথমে জাতিসংঘের কাছে জানতে হবে—বাংলাদেশ-সংক্রান্ত আশঙ্কার উৎস কী এবং এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়।
দিল্লির হামলার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো যোগাযোগ থাকলে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তথ্য দিতে হবে।
বাংলাদেশের নিজস্ব গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে স্বাধীন তদন্ত চালিয়ে তার একটি প্রকাশযোগ্য মূল্যায়ন জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের পরিকল্পিত বিভ্রান্তি মোকাবিলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় তথ্য-যাচাই ও কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কারণ সার্বভৌমত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়।
সার্বভৌমত্ব মানে—নিজের রাষ্ট্র সম্পর্কে সত্য নির্ধারণের ক্ষমতাও নিজের হাতে রাখা।
[CONCLUSION]
বাংলাদেশে AQIS-এর সংগঠিত উপস্থিতি এখনো প্রমাণিত নয়।
কিন্তু জাতিসংঘের একটি প্রমাণহীন আশঙ্কাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে ঘিরে বড় নিরাপত্তা ন্যারেটিভ তৈরি হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট।
ভারত এই তথ্যের মূল উৎস কি না—তার প্রমাণ এখনো নেই।
তবে এই প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা কার—সেই উত্তর বুঝতে খুব বেশি গোয়েন্দা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না।
বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ থেকে যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি জঙ্গিবাদের ভয় দেখিয়ে পরিচালিত বিদেশি প্রভাব থেকেও রক্ষা করতে হবে।
কারণ এই রাষ্ট্র কারও উপগ্রহ নয়।
এই রাষ্ট্র সতেরো কোটি বাংলাদেশির।
আর বাংলাদেশের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে।
কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক নির্দেশে নয়।