Story Time

Story Time "কল্পনার জগতে হারিয়ে যাও! 🌟📚 গল্প, রূপকথা আর মজার কাহিনীতে ভরা প্রতিটি মুহূর্ত। আমাদের সাথে গল্পের জাদু উপভোগ করো!"

তাজমহল #পর্ব_১০প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরীমেহেদী পাতা তোলা শেষে উঠোনে অনেকগুলো চেয়ার বসানো হলো। সবার জন্য চা নাশতার ব্যবস্থা কর...
20/11/2025

তাজমহল
#পর্ব_১০
প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরী

মেহেদী পাতা তোলা শেষে উঠোনে অনেকগুলো চেয়ার বসানো হলো।

সবার জন্য চা নাশতার ব্যবস্থা করেছেন শাহিদা বেগম। শারমিলা আর শাবরিন ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে বিস্কুট, নিমকি, মুচমুচে মিষ্টি খাজা, সাগর কলা, আর চানাচুর বাড়িয়ে দিচ্ছে সবার দিকে।

শাইনা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল সব। চা খেতে গল্প গুজব করা চাচীদের একজন বলল,

"ও শানু তাজদার তোকে কি কি কিনে দিয়েছে আমাদের দেখাবিনা?"

শারমিলা, শাবরিন একসাথে শাইনার দিকে তাকালো তখুনি। শাইনা চুপ দেখে শাহিদা বেগম বললেন,"পরলে তখন দেখতে পাবে। কাল ওর গায়ে হলুদ ছোঁয়াবো। তোমরাও এসো।"

দাদীমা এসে ব্যস্ত গলায় বললেন,"খুরশিদের মাকে চা দে। ও লতিফের বউ এইদিকে আসো। তোমারে না বলছি শানুর বিয়ার আগ পর্যন্ত বাড়িতে থাকবা। কাজকাম আগায় দিবা।"

লতিফের বউ বলল,"চাচী আমাকে তো বড় জেঠি আগে ঠিক করে রাখছে।"

দাদীমা মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,"সবখানে টাকার জোর দেখাবে। আমাদের বাড়িতে কাজকাম কি কম? সব লোক নিজে দখল করে রাখছে।"

শাইনা ফিসফিসিয়ে বলল,"কথাগুলো ঘরের ভেতরে বলো। সবার সামনে বলছো কেন আশ্চর্য! সবাই গিয়ে ওই বাড়ির মানুষের কানে তুলে দেবে। কখন কোথায় কোন কথা বলতে হবে এখনো জানেনা। এদিকে সারাক্ষণ আমাকে জ্ঞান দেয়।"

দাদীমা তার দিকে ফিরলেন।

"শ্বশুরবাড়ির হয়ে কথা বলা শুরু করেছিস এখন থেকে?"

শাইনা হতাশ হলো। সে বলে একটা তারা বোঝে আরেকটা। আর কোনো কথা না বলে সে চলে গেল।

মেহমান আসা শুরু করছে। বাড়ির এককোণ ভর্তি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। শাহিদা বেগমকে বড় পাতিলে ভাত আর মাছ মাংস বসাতে হচ্ছে। আশরাফের বউ তেমন কাজকাম করতে পারছেনা। বাচ্চার মা। পানি ঘাটলে কখন না জানি ঠান্ডা লেগে যায়। শাহিদা বেগমের কাছে তার নাতির সুস্থতা আগে। যাদের কাজে রাখা হয়েছে তারা কাজচোর। শারমিলা আর শাবরিনকে খাটতে হচ্ছে। শাইনাও গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াতে পারছেনা। এত কাজ বেড়ে গিয়েছে হুট করে। কাটো, রাঁধো, খাও আবার ধোও। সে কাজ দেখে বসে থাকতেও পারছেনা।

সকাল আটটার দিকে মুন্নীর মা এসেছে শাইনাদের বাড়িতে। শিলপাটায় মেহেদী বাটা শুরু করেছে। তার হাত লাল টকটকে হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। মেহেদী পাতাগুলোতে ভীষণ রঙ ধরে।

ওই বাড়ির মেহেদী বেটে এসে এখন এই বাড়ির মেহেদী বাটছে মুন্নীর মা। যদিও বাটা মেহেদী বর কনে কেউ হাতে দেবেনা। মেহেদী অনুষ্ঠানে শুধু একফোঁটা মেহেদী কপালে ছোঁয়ানো হয় মায়ের হাতে। আবার পরে মুছে নেয় রঙ বসার আগে। বাটা মেহেদীগুলো অন্যরা হাতে লাগিয়ে নেয়।

দাদীমা কাঁচা হলুদ তুলে এনেছে তার ক্ষেত থেকে। মুন্নীর মাকে বলল,

"এগুলোও বেটে দিস তো।"

মুন্নীর মা বলল,"হলুদ তো বিকেলে দরকার হবে।"

"তুই আবার পাটায় বসবি নাকি? পাটা ভালো ধুয়ে হলুদগুলোও বেটে রাখ।"

"আচ্ছা রেখে দাও চাচী।"

শাইনা রান্নাঘরের এককোণায় বসে পান্তা ভাত খাচ্ছে। আর সবার কাজ দেখছে। গরুর মাংস কয়েকবার জ্বাল দেয়ার পর রসালো হয়ে এসেছে। সেগুলো দিয়ে মেখে পান্তা ভাত খেতে ভালো লাগছে তার। শাহিদা বেগম একটা শুকনো মরিচ তেলে ভেজে দিয়েছেন মুচমুচে করে। শাইনা ওটা লবণ দিয়ে ভাতে মেখে নিয়েছে। এত এত তেলে ভাজা নাশতা, আর মিষ্টান্ন দেখে হঠাৎ করে তার পান্তা খেতে ইচ্ছে করছিল। অন্য খাবার মুখেও উঠছেনা। একদম খেতে ইচ্ছে করছেনা।

মুন্নীর মা তাকে পান্তা ভাত খেতে দেখে বলল,"ওমা বউমানুষ পান্তা ভাত খায় কেন সকাল সকাল?"

শাহিদা বেগম তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বললো। যা ইচ্ছে করুক ওই মেয়ে। উদ্ভট উদ্ভট কাজ করে যাচ্ছে কাল থেকে।

শাইনা পানিতে ডুবে থাকা ভাতগুলো আঙুল দ্বারা টেনে নিয়ে মুখে তুললো।

তারপর বাসনে থাকা পান্তা ভাতের পানিগুলো সুরুত সুরুত করে শব্দ করে খেতে খেতে বাইরে বেরিয়ে এল।

শেষপাতে থাকা কিছু ভাত কাকদের উদ্দেশ্য ছিটিয়ে দিয়ে বাসনটা নিয়ে সোজা পুকুর ঘাটে নেমে এল সে। সাবানদানী সেখানে রাখা ছিল। সাবান দিয়ে বাসন আর হাত ধুয়ে নিল। ভেজা হাত দিয়ে ঠোঁট মুছে নিতেই দেখলো ওই বাড়ির পাকা সিঁড়ি ঘাটের উপরে রঙিন টিনের চাউনির নীচে আড্ডা ও বিশ্রামের জন্য যে আরামঘাট বাঁধা। তার গায়ে হেলান দিয়ে কেউ একজন বসে আছে। আরামঘাটে পিঠ এলিয়ে বসে, এক হাতে পেছনে ঠেস দিয়ে রেখেছে ঘাটের পাথুরে গায়ে।

শাইনা শুধু ঘাড়, মাথা আর ওইহাতটা দেখতে পাচ্ছে যেটা ঘাটের পাথুরে গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা। মাথায় গোবরের মতো কিছু একটা লেপে দেওয়া।

দাদীমা বড় সাইজের একটা বোল নিয়ে পুকুরের ঘাট বেয়ে নামছে। শাইনা তা দেখে ছুটে গেল। ঝাড়ি মেরে বলল,

"আছাড় খেলে তোমার কোমর আস্ত থাকবে?"

পেছন পেছন শাহিদা বেগম বেরিয়ে এলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন,"তোর দাদী ইচ্ছে করে করতেছে এইসব। আমাকে কাজ করে দিতে গিয়ে কাজ বাড়াবে আরও। কথা শোনেনা আমার।'

শাইনা বোলটা নিয়ে নিল। সেখানে বাসনকোসন, চামচ, আর চায়ের কাপ। বেসিনে ধোয়ার চাইতে পুকুরে ধোয়ামোছার কাজ করতে বেশি ভালোবাসে দাদীমা। পুরোনো অভ্যাস রয়ে গেছে।

দাদীমা কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালেন। বললেন,

"তোমার কাজ বেশি তাই একটু...

শাইনা শাহিদা বেগমকে বলল," আমি ধুয়ে দিচ্ছি।"

শাহিদা বেগম হঠাৎ ওই বাড়ির ঘাটের দিকে তাকালো। মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলো,

"আম্মা দেখেন তো, ওটা জামাই না?"

দাদীমা চোখ সরু করে তাকালেন। বললেন,"সেটাই তো মনে হচ্ছে।"

শাহিদা বেগম ছটফটিয়ে উঠে শাইনাকে বলল,"তুই উঠে যা। আমাকে দে। আমি ধুয়ে নিই।"

শাইনা কপাল কুঁচকে ফেলতেই শাহিদা বেগম আস্তে করে বললেন,"জামাই বসে আছে দেখলাম।"

তাতে কি? জামাই বাঘ না ভাল্লুক? তাকে কাজ করতে দেখলে কাঁদতে বসবে? যতসব উদ্ভট কথাবার্তা তাদের।

শাইনা মাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল তখুনি দাদীমা ডেকে উঠলেন,

"লন্ডনওয়ালা নাকি?"

তাজদার সিদ্দিকী ধীরেধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। দাদীমা হেসে ফেলে বললেন,

"নাতজামাই দেখি মাথায় মেহেদী দিয়ে বসে আছে।"

তাজদার দাদীমাকে কি জবাব দিল কে জানে? শাইনা বাসনকোসন টাংটুং শব্দ করে ধুয়ে দ্রুত চলে এল ঘরে। ইচ্ছে করে কিছু শুনলো না।

দাদীমা তার পেছন পেছন ঘরে এসে বলল,

"মুন্নীর মা কপালে ছোঁয়ার জন্য একফোঁটা রেখে দিয়ে বাকিসব মেহেদী ওর মাথায় লাগিয়ে দাও। বউ জামাই দুজনের মাথা খুব গরম হয়ে আছে। মেহেদী দিয়ে ঠান্ডা হোক।"

শাইনা বলল,"আমার মাথা যথেষ্ট ঠান্ডা আছে। তুমি দাও।"

"দেখতেই পাচ্ছি কত ঠান্ডা আছে।"

শাইনা বলল,"আমি মাথায় মেহেদী দেব না। দেখে মনে হয় মেহেদী না গোবর দিয়ে রাখা।"

দাদীমা তাকে চেপে ধরে পিঁড়িতে বসিয়ে মাথার তালুর উপর ঠাস করে একমুঠো মেহেদী লাগিয়ে দিল। যদিও শাইনার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মাথায় এত শান্তি লাগলো মাথায় তা বলার বাইরে। সে আর কোনো তর্ক করলো না। চুপ করে বসে রইলো। মেহেদী লাগানোর সময় কপালে গালে লেগে গিয়েছে। শাহিদা বেগম বললেন,

"তাড়াতাড়ি ধুয়ে নে।"

শাইনা পুকুরপাড়ে ছুটলো। ঘাটে নেমে এসে কপাল আর গাল থেকে মেহেদী ধুয়ে ফেলতেই আবারও পুকুরপাড় জুড়ে হাঁটতে থাকা গোবরওয়ালার দেখা। তাজদার টিস্যু দিয়ে কান মুছতে মুছতে হঠাৎ এদিকে তাকালো। সম্ভবত মেহেদীর রস গড়িয়ে কান বেয়ে পড়ছে বলে সে ঘনঘন কান মুছছে রঙ না বসার জন্য। বাড়ির বারান্দা, ছাদ যেখানে যেখানে রোদের দেখা মিলে সব ভরে আছে মেহমানে। তাই বাড়ির পেছনে চলে এসেছে সে। দাদীমা এসে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,

"মিয়া বিবির মাথা গরম। কইতে লাগে শরম। গরম মাথার মিয়াবিবির দিল খুবই নরম।"

তাজদার সিদ্দিকী হয়তো হাসছিল শ্লোকটা শুনে। শাইনা তাকায়নি তাই দেখতে পায়নি।

_____________________

গায়ে হলুদটা একদম গ্রাম্য স্টাইলে করবে এরূপ পরিকল্পনা করেছে তারা। কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া থাকবে না। উঠোনে করার কথা ছিল। কিন্তু ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজন এসে কাজ শুরু করে দেওয়ায় আর সম্ভব হয়নি। তাজদার বলেছে ওদের কাজ ওদের করতে দিতে। তারা চাইলে ছাদে আয়োজন করতে পারে।

কিন্তু শাইনা বেঁকে বসলো। সে বলে দিল ওই বাড়ির ছাদে গায়ে হলুদ করবেনা সে। তার এখনো আকদের রাতটার কথা মনে আছে।

তার কথা শুনে শেষমেশ তাদের ছাদে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাদের ছাদে আরও কাজ বাকি ছিল। সেসব ছাড়াও সিমেন্টের বস্তা জমিয়ে রাখা, শুকনো কাঠখড়, পাতার বস্তা, কাপড় শুকনোর রশি। সব পরিষ্কার করে বন্দোবস্ত করে নিয়েছে তৌসিফ, তাশফিন আর শাওন। লাইটিংও সেট করেছে তারা।

ফটোশুট হবে তাই নিচে অনেক বড় একটা পাটি বিছিয়ে তার উপর সাদা ধবধবে একটা কাপড় বিছিয়ে দেয়া হ'য়েছে। তারউপর গাঁদাফুলের পাঁপড়ি।

শাইনার পেছনে একটু উপরে করে একটা চিকন রশি টানা হয়েছে লম্বা করে। তার সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হ'য়েছে সুঁতোয় গাঁথা গাঁদাফুল। সেগুলি বাতাসে দুলছে। তাজা গাঁদাফুল হওয়ায় ঘ্রাণটাও কড়া। একটা গোলগাল হ্যান্ডহেল্ড প্রপসে লেখা,"তাজ-শাইনার গায়ে হলুদ।"

কাঁচা হলুদ রঙের একটা সাদামাটা সুতি শাড়ি পরানো হয়েছে শাইনাকে। শাড়িটায় গ্রাম্য গ্রাম্য ভাব আছে।

শাইনা নিজের মতো করে হালকা করে সেজেছে।
হলুদ লাগালে ভারী সাজ নষ্ট হয়ে জঘন্য দেখাবে।

তাকে ছাদে নিয়ে আসার পর তাসনুভা এসে তার হাতে আর মাথায় গাঁদাফুলের মালা, গাজরা পরিয়ে দিল। তারপর হালকা করে মেকআপ করিয়ে দিয়ে বলল,"তৌসিফ ভাই ক্যামেরা নাও। আগে শুট। তারপর বাকি রিচুয়াল।"

সে নিজেও হলুদ শাড়ি পরেছে। তিতলি, তাসনীম সবাই পরেছে। এমনকি বাড়ির ছোটবড় সব মেয়েরাই হলুদ শাড়ি পরেছে। ছেলেরা বিশেষ কিছু পরেনি। তাদের ড্রেসকোড শুধু মেহেদী অনুষ্ঠানের জন্য।

গোটা বাড়ির ছেলেমেয়েরা এসে জটলা পাকিয়েছে ছাদে। চারপাশে হৈচৈ, কোলাহল, বাচ্চাদের ছোটাছুটি। তন্মধ্যে তৌসিফ শাওন আর তাজদার সিদ্দিকীর পরিচিত প্রফেশনাল ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলছে। সবাই হাতে অল্প অল্প করে হলুদ নিয়ে শাইনার গালে, কপালে ছোয়াঁলো। তাদের সবার হলুদ মাখা হাত শাইনার চারপাশে ঘিরে রেখে অনেক ছবি তোলা হলো। গান বাজছে...

"গায়ে হলুদ পায়ে আলতা,
হাতে মেন্দি দিয়া।

বিয়ের সাজন সাজাও কন্যারে
সুন্দোরো করিয়া..... সখি লো।"

শাইনা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। কে যেন তাজদারের নাম নিল সাথে সাথে শাইনা শাওনকে বলল,"হয়েছে আমাকে যেতে দাও এবার। আমার গাল চুলকাচ্ছে হলুদ লেগে।"

শাওন বলল,"চুপ করে বসে থাক। তাজ ভাই আসবে।"

তাজদার তাদের বাড়ির ছাদ থেকে দাঁড়িয়ে সমস্তটা দেখছিল। শাইনাদের দোতলা বাড়ির ছাদের সমস্তটা দেখা যায় তাদের ছাদ থেকে।

বড়রাও এসে একে একে শাইনাকে হলুদ ছোঁয়ালো। রওশনআরা এসে দেখে গেলেন। শাইনাকে দেখে মনে হচ্ছে নব্বই দশকের কোনো বধূ যে গাঁদাফুল দিয়ে সেজে বসে আছে মন খারাপ করে। রওশনআরা তার গালে একটু হলুদ ছোঁয়াল। গান বাজছে,

"গতরে হলুদো লাগাইয়া,
কন্যারে সাজাও বধূরো সাজে মিলিয়া।
আতরো গোলাপো লাগাইয়া,
কন্যারে সাজাও বধূরো সাজে মিলিয়া"

শেষমেশ বরের আগমন হতেই ছাদজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হৈ-হুল্লোড় করে উঠলো। তাজদার সিদ্দিকীর গায়ে বটল গ্রীন কালার পাঞ্জাবি।

সে পা রাখামাত্রই গানের সুর পাল্টে গিয়ে হঠাৎ গোটা ছাদ কেঁপে উঠলো। উদ্ভট গানের সুর কানে এল শাইনার।

"বাপের বড় পোলা ভাইজান বিয়া করতাছে।
আজকে ভাইয়ের গায়ে হলুদ।
কালকে বিয়া যে।
ডিজে গান বাজতেছে।
সখী, কনে নাচতেছে।"

এত বিশ্রী সুর! শাইনার এত রাগ লাগলো। তাজদারও কপাল কুঁচকে ফেলেছে। এইসব কেমন গান? তৌসিফ আর শাওনরা সবাই আরও দাঁত খেলিয়ে হাসছে। গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে।

"এই গান বন্ধ...

সবাই চমকে গেল। বর কনে একসাথে চেঁচিয়ে উঠেছে। তাজদার সিদ্দিকী শাইনার দিকে তাকালো। শাইনাও তার দিকে তাকালো। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। তাজদার সিদ্দিকী সুর পাল্টে বলল,"গানটা খারাপ না। ভলিউম বাড়িয়ে দে।"

ভলিউম বাড়িয়ে দেয়া হলো। শাইনা তাজ্জব বনে গেল। এই লোকটার নাম তাজদার না হয়ে গাদ্দার হওয়া উচিত ছিল।

চলমান.......
কপি©

20/11/2025

রুবি আয়নায় নিজের মুখটা ভালো করে দেখল। চাপা রঙ, নাকটা একটু চওড়া, চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নোংরা কাপড়-চোপড়, বিছানাটা অগোছালো। ঘরে ঝুল জমেছে। সে তাড়াহুড়া করে ইন্টারভিউ এর জন্য রেডি হচ্ছিল তার মাঝখানেও তার মনে হল রাজিবকে একটা টেক্সট করা দরকার।

-শোন না, আজকে আবার একটা ইন্টারভিউ আছে। ভালো করে দোয়া করো, প্লিজ। কাল রাত থেকে তো স্টাডি করছি কনটিনিউ… প্লিজ বলো, ‘তুমি পারবে’। না বললে আমার কনফিডেন্সই আসে না।

সেন্ড চাপতেই হোয়াটসঅ্যাপের ডাবল টিক নীল হয়ে গেল। কিন্তু রিপ্লাই নেই। রুবি ভীষণ কষ্ট পেল।

তারপর খাবার টেবিলে বসে,প্রথমে খালাকে ফোন দিল।

-খালামণি শোনো না, আজকে বড় একটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ আছে।

- বাহ! আল্লাহ ভরসা রে মা। আবার যেন আগেরগুলার মতো না হয়।

-ইনশাআল্লাহ খালামণি, এইবার মনে হচ্ছে হবে।

-হবে হবে, তুই তো মেয়ে খুব ভালো, মেধাবী । তবে জানিস, এখনকার কম্পানিগুলো একটু… মানে, স্মার্ট টাইপ মেয়ে পছন্দ করে, বুঝলি? তুই তো একটু… যাই হোক, দোয়া রইলো।

লাইন কাটতেই রুবির বুকের ভেতরটা হালকা কুঁচকে গেল। সে পরপর চাচা ফুফু মামি কে জানালো ইন্টারভিউর কথা। সবাই ‘দোয়া আছে’, ‘হবে ইনশাআল্লাহ’ বলল, কিন্তু প্রত্যেকটা শব্দের ভেতর থেকে একটা করে সন্দেহ বের হয়ে আসছিল যেন,
“ওর দিয়ে কিচ্ছু হবে না।"

ইন্টারভিউ থেকে বের হয়ে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল রুবি। পা দুটো কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। ইন্টারভিউতে প্রথমে ঠিকই চলছিল, কিন্তু এক পর্যায়ে এইচআর হাসতে হাসতে বললো,

-আপনি এত নার্ভাস কেন, কনফিডেন্স ছাড়া ইন্টারভিউ নেয়া যায় নাকি? আগে কতগুলো কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিয়েছেন?

-জ্বী স্যার ৭/৮ টা হবে রুবি আমতা আমতা করে বললো।

এইচ আর যেন খুব হতাশ হলেন।
- ঠিক আছে আপনার সাথে পরে আমরা যোগাযোগ করবো। ইন্টারভিউ এই পর্যন্তই ছিল।

বাড়ি ফিরেই ফেসবুকে রুবি স্ট্যাটাস দিলো ,

"আজকে আবার ইন্টারভিউ দিলাম। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।"

এক সপ্তাহ চলে গেলেও ওই কোম্পানি থেকে আর কোন মেসেজ বা ইমেইল আসেনি। তারমানে সে আবার রিজেক্টেড।

কান্না জড়িত কন্ঠে রাজিবকে ফোন দিয়ে বললো,
-হ্যালো রাজিব জানো এবারও চাকরিটা হয়নি।

-এবার হয়নি পরের বার হবে সমস্যা কি? কান্নাকাটি করো না। কান্নাকাটি করলেই চাকরি হবে না। আমি নিজেও ৬/৭ টা ইন্টারভিউ এর পর তারপরে এই ভালো চাকরি টা পেয়েছি।

-আমি কি ইচ্ছে করে কান্না করি নাকি! আর যখন তোমার কাছ থেকে সাপোর্ট চাই তুমিও দূরে দূরে থাকো।

-শোন রুবি বিষয়টা এমন নয় যে আমি তোমাকে ভালবাসি না। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বহুদিনের সম্পর্ক আমাদের কিন্তু তার মানে এই না যে পার্সোনাল স্পেস থাকবে না। বিশ্বাস করো আমি অফিসে প্রচন্ড রকম ব্যস্ত থাকি। তার মধ্যে তুমি যখন সমানে মেসেজ করতে থাকো এই হয়েছে, সেই হয়েছে ,এই খালা এটা বলেছে , সেই ফুপু সেটা বলেছে, কাজের মহিলা এই করেছে, মা আজ এই বিষয়ে বকা দিয়েছে আমার কেমন সাফোকেটেড লাগে।

-হ্যাঁ লাগবেই তো এখন আমি পুরোনো হয়ে গেছি।

এক মিনিট, বলে রাজিব তার ফেসবুকটা খুললো। সেখানে ফেভারিট লিস্টে রুবি আছে। সে রুবির স্ট্যাটাস টা দেখলো।
"আবার আমি রিজেক্টেড হলাম , কিছুই ভালো লাগে না,ম*রে যেতে ইচ্ছে করে"

কমেন্টগুলো এমন ছিল,
“কোনো সমস্যা নাই।”
“আল্লাহ ভালো কিছু রেখেছে।”
“আগামীতে ইনশাআল্লাহ হবে।”

কিন্তু রাজিব খুব ভালো করেই জানে, এই একই মানুষগুলো রুবির উপর আড়ালে হাসছে। তার ভীষণ রাগ হলো।

-হ্যালো রাজিব ,হ্যালো কোথায় গেলে?

-তুমি আবার এসব উল্টোপাল্টা স্ট্যাটাস দিয়েছো!

-কি আশ্চর্য! সবাইকে জানাতে হবে না ?

প্রচন্ড রাগে রাজিব লাইন কেটে দিল। শুধু একটা টেক্সট পাঠালো,
"আমি আজ সারাদিন ব্যস্ত থাকব, রাতেও একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই। দয়া করে ফোন বা মেসেজ করবে না।"

রাতে ডিনার টেবিলে ভাত খেতে খেতে রুবি হঠাৎ বলল,
-এই চাকরিটাও হলো না, খেতে খেতেই সে কেঁদে ফেলল।

-হবে মা, হবে দোয়া আছে।কিন্তু মায়ের গলার স্বরটা কেমন যেন নির্জীব। মা একবার মাথায় হাত রাখলেন না। আগে অনেক সান্ত্বনা দিতেন।

বাবা তখন কাঁচের গ্লাসে পানি ঢালছিলেন। কিছু না বলেই উঠে চলে গেলেন নিজের রুমে।

একটু পরে, রুবি যখন ফেসবুকে আবার একটা দুঃখী স্ট্যাটাস লিখছে, পাশের রুম থেকে চাপা গলায় কথোপকথন ভেসে আসছিল।

-মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিই। ওই রাজিব না কি একটা ছেলে আছে ,ওর সাথে তো ভালোই ঘনিষ্ঠতা। এই মেয়েকে দিয়ে চাকরি-বাকরি কিছুই হবে না। মা বললেন।

- বিয়ে দিয়ে দিলেই কি ওর স্বভাব চরিত্র চেঞ্জ হয়ে যাবে, কি করে তুমি ভাবো? বাবার উত্তর। সব কথাতেই কান্নাকাটি, আবেগ, সবাইকে বলে বেড়ানো, এখনো ম্যাচিউর হতে শিখলো না মেয়েটা। ওর দ্বারা কিছুই হবে না, শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে আরো বিপদে পড়ে যাবে।

মায়ের দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

আবার সবাইকে বলে, সবার দোয়া নিয়ে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আরেকটা ইন্টারভিউ দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ শৈশবের বান্ধবী তানিয়ার সাথে দেখা হয়ে গেল। তানিয়া তাদের গ্রুপে খুবই পপুলার, দেখতে সাদামাটা কিন্তু কি সুন্দরভাবে নিজেকে রিপ্রেজেন্ট করে। খানিকটা ঈর্ষা বোধ হয় ওর প্রতি রুবির। তানিয়া প্রায় জোর করে রুবিকে ওর বাসায় নিয়ে যায়।

তানিয়ার বাসায় ঢুকতেই রুবি চোখ কপালে তুলল। ছোট্ট ফ্ল্যাট, অথচ কী সুন্দর গোছানো! শো-কেসে সাজানো কিছু বই, একটা ছোট ইনডোর গাছ। দেয়ালে ওয়েল পেন্টিং ঝুলছে।

-তুই তো একদম ফেইরিটেল লাইফ নিয়ে থাকিস রে তানিয়া!

-ফেইরিটেল? হেসে ওঠে তানিয়া। চল আগে কফি হোক, কফির সাথে চলবে আড্ডা। তোর তাড়া নেই তো? বলতে বলতে তানিয়া কফি বানাতে চলে যায়।রুবি চারপাশটা খুব ভালোভাবে দেখতে থাকে, কি সুন্দর, যেন স্বর্গ!

কফির মগ হাতে তানিয়া এসে দাঁড়ায়।

-তুই কত ভালো আছিস রে তানিয়া, সবাই তোকে কত পছন্দ করে, তুই কত সুন্দর মার্জিত। কেউ তোকে নিয়ে হাসাহাসি করে না অথচ আমাকে দেখ, কণ্ঠ কাঁপিয়ে সব কথা ঢেলে দিল রুবি। ইন্টারভিউ, রিজেকশন, আত্মীয়স্বজনের কথা, রাজিবের দূরে সরে যাওয়া, বাবা-মায়ের হতাশা… সব।

-শোন রুবি তোর প্রত্যেকটা ফেসবুক স্ট্যাটাস আমি দেখি কিন্তু কোন রিয়েক্ট করি না। অন্য কেউ হলে বলতাম না কিন্তু তোকে বলবো। আমার আর জয়ের তিন মাস ধরে সেপারেশন চলছে হয়তো ডিভোর্স হয়ে যেত কিন্তু এখন সম্ভবত ও আবার ফেরত আসতে চায় এবং আসবে সেটা আমি জানি। এসব কথা যদি আমি ফেসবুকে অথবা খালা মামা চাচা ফুফুদের কে বলে বেড়াই তারা কি বিষয়টা সহজ ভাবে নেবে? হয়তো আমাকে সান্তনা দেবে কিন্তু আড়ালে ঠিকই দোষ খুঁজে বের করবে, হাসাহাসি করবে আমি হবো তাদের গসিপের পাত্রী। তুই হয়তো জানিস না, মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী। সে চায় অন্য আরেকটা মানুষ কখনোই তার চেয়ে যেন ভালো না থাকে। তুই যখন দুঃখের স্ট্যাটাস দিস, ফোনে তোর ফেইলিউর এর কথা সবাইকে বলে বেড়াস তখন সেই মানুষটা নিজেকে সুপিরিয়র মনে করে। তোকে উপরে উপরে সান্ত্বনা দিলেও ভেতরে সে ভীষণ আনন্দবোধ করে।

রুবি চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

তানিয়া কফির মগ থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল,
-আর একটা কথা, বিউটি ইজ নট দ্য ইস্যু, রুবি। তুই নিজেকে কেমন ক্যারি করিস, সেটাই ইস্যু।
তুই খুব সুন্দর না, ঠিক আছে। কিন্তু তুই কি আত্মবিশ্বাসী? তুই কি নিজের চেহারার পাশাপাশি নিজের প্রতিভা, নিজের কাজ, নিজের আচরণ, এগুলো নিয়ে ভাবিস?

-আমি জানি কিন্তু কারো সাপোর্ট না পেলে.....

রুবির কথা শেষ করতে দেয় না তানিয়া বলে ওঠে,
-এটাই তোর ভুল। তুই নিজের ভ্যালিডেশন আউটসোর্স করে ফেলছিস। সবকিছু সবাইকে বলে বেরোলে ওরা তোর লাইফের দর্শক হয়ে যায়। তুই জিতলে ওরা শুধু ভালো বলবে, তুই হারলে ওরা হাসাহাসি করে, মজা নিবে ,গসিপ করবে এটাই নরমাল।

রুবির চোখে পানি চলে এলো।
-আমি তাহলে কী করব?

-কিছু পয়েন্ট বলি, মাথায় রাখবি। রুবি খুব মন দিয়ে তানিয়ার কথাগুলো শুনলো।

সে বাড়ি ফিরে এলো। ভালোভাবে গোসল করে নিজের জন্য এক কাপ চা বানালো ,এইবার আর মাকে ডাকল না। পরদিন নিজের ঘরটা খুব সুন্দর করে পরিপাটি করলো। সাজানো গোছানোর পর তার ঘরটাকেও তানিয়ার ঘরের মতোই লাগছে। রুবির মনে কেমন একটা শান্তি শান্তি ভাব চলে এসেছে। মা আড়চোখে দেখে বাবাকেও দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছে, রুবি সেটা খেয়াল করল তবে কিছু বলল না।

টিউশনির টাকা থেকে বেশ কিছু টাকা নিয়ে সে নিজের জন্য শপিং করলো। কোন ট্রেন্ড ফলো না করে তাকে দেখতে ভালো লাগে এই ধরনের কিছু পোশাক তানিয়ার সাহায্য নিয়ে কেনাকাটা করলো।

সকালে রাজিব কে একটা মেসেজ পাঠিয়ে থেমে গেল
-অফিসে ভালো দিন কাটুক। সন্ধ্যায় কথা হবে।

রাজিব প্রথমে অবাক। দুপুর পর্যন্ত কোনো মেসেজ নেই। সে নিজেই একটা মেসেজ দিল,
-ইন্টারভিউ কেমন হল?

রুবি কয়েক সেকেন্ড দেখেও সাথে সাথে রিপ্লাই দিল না। সে এখন নিজের ল্যাপটপে সিভি এডিট করছে, অনলাইনে একটা নতুন কোর্সে নাম রেজিস্টার করছে। আধা ঘণ্টা পরে রিপ্লাই করল
-আজকে ইন্টারভিউ ছিল না। নিজের স্কিল নিয়েই কাজ করছি।

-ওহ! ভালো। আজকে অনেক ব্যস্ত ছিলে নাকি?

-হ্যাঁ, একটু ব্যস্ত ছিলাম।
সেই ‘ ব্যস্ত’ শব্দটা রাজীবের মাথায় ধাক্কা দিল।

আজকে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সময় রুবি শুধু বাবা-মাকে বললো। তারপর সুন্দর একটা পোশাক পরে
হালকা ফাউন্ডেশন, সাদামাটা কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপবাম দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে আয়নায় তাকিয়ে দেখলো , "বাহ মেয়েটা তো বেশ সুন্দর" যেন নিজেই নিজেকে বলল।

-আপনার রেজাল্ট তো খুব ভালো। তাহলে এতদিন কেন কোনো চাকরি করেন নি? ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রথম প্রশ্নই ছিল এটা।

আত্মবিশ্বাস নিয়ে রুবি উত্তর দিল,
-স্যার এর আগেও আমি বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়েছি কিন্তু কোন না কোন কারণে হয়নি আর এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশের চাকরি পাওয়া খুব একটা সহজ ব্যাপার না। আমি লবিং পছন্দ করি না, তাছাড়াও শুধুমাত্র একটা চাকরির জন্য যে কোন কুপ্রস্তাবে রাজি হবো না। তাছাড়াও কোনো না কারণে হয়তো আমাকে তাদের পছন্দ হয়নি কিংবা আমার ওই অফিসটা পছন্দ হয়নি অনেক কিছুই হতে পারে স্যার।

কিছুক্ষণ বোর্ডের লোকজন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বললো,

-আপনাকে আমাদের যোগ্য মনে হয়েছে। ইমেইলের মাধ্যমে আজকালের মধ্যেই আশা করছি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ হবে । খুব ভালো থাকবেন আর মানসিকভাবে প্রিপারেশন রাখবেন আগামী মাস থেকে জয়েন করার।

-ধন্যবাদ স্যার আমি এখন আসি। হালকা হেসে বেরিয়ে আসে রুবি।

সন্ধ্যায় রাজিব কল দিয়ে পরদিন দেখা করার কথা বলে।
-কিন্তু কালকে তো আমি একটু ব্যস্ত থাকবো রাজিব।

-ব্যস্ত! কি নিয়ে?

-কাল সন্ধ্যায় আমাদের পারিবারিক একটা অনুষ্ঠান আছে সেখানে যেতে হবে।

-তাহলে বিকেলে দেখা করি।

-এত তাড়াহুড়ো করতে পারবো না, পরশু দেখা করতে পারি তোমার সমস্যা আছে?

-না আমি পরশুই তোমার জন্য আমাদের সেই প্রিয় ক্যাফেটেরিয়াতে অপেক্ষা করবো। রাজিবের মুখে এক চিলতে হাসি। সে যেন তার প্রেয়সির মধ্যে একজন ম্যাচিউর, আত্মবিশ্বাসী মানুষের ছায়া দেখতে পাচ্ছে।

পরদিন পারিবারিক গেট-টুগেদারে সবাই মিলে গসিপ করলেও, রুবি সেসবের মাঝে নেই।

এক খালা এসে বললেন,
-কিরে রুবি, এখন কি করছিস? আর কোন ইন্টারভিউ দিয়েছিস?

রুবি জানে তার চাকরিটা কনফার্ম তারপরও ওই ব্যাপারে কিছু না বলে মুচকি হেসে বললো,
- হলে অবশ্যই আপনাদের সবাইকে জানাবো।
তার এই কথা বলার স্টাইল সাথে মানানসই সাজগোজ, আত্মবিশ্বাস যেন মুহূর্তে চারদিকটা থমথম করে দেয়।

দুই তিন দিন পর রুবি ইমেইল পায় সেই কোম্পানি থেকে যে সে সিলেক্টেড। প্রথমে সে তার বাবা মাকে জানায়, বিকেলে যায় তানিয়ার বাড়িতে।

তানিয়া ভীষণ খুশি। তার সাথে জয়ও ছিল অর্থাৎ তানিয়ার হাসবেন্ড। ওদের সব ভুল বোঝাবুঝি মিটমাট হয়ে গেছে।

-রাজিব কে জানিয়েছিস? তানিয়ার প্রশ্ন।

-এখনো না, তুইতো না করেছি সবাইকে সব না জানাতে।

তানিয়া হেসে উঠে,
- আরে বোকা, কাকে প্রায়োরিটি দিতে হবে আর কাকে দিতে হবে না সেটা বুঝতে হবে তো। এই নিউজটা জানার অধিকার ও রাখে আর ও কখনোই তোকে ইগনোর করেনি শুধু একটু স্পেস চেয়েছিল। ও তোকে অসম্ভব ভালোবাসে, তুই শুধু আঠার মত লেগে থাকিস না। দুটো মানুষ একসাথে ভালো থাকতে হলে স্পেস দিতে হয়। রুবি অনুধাবন করে তার ভুলগুলো।

বাড়ি ফিরে রাজিবকে ফোন দিয়ে রুবি চাকরির ব্যাপারটা বললো। রাজিব কিছু বললো না, ফোন কেটে দিল। ঘন্টাখানেক পরে মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে এসে উপস্থিত।

চাকরিতে জয়েন করার মাস খানেক পর নিজেকে যখন রুবি মানিয়ে নিয়েছে তখন নিজের ডেস্ক গোছাতে গোছাতে একটা সেলফি তুলল, খুব বেশি গ্ল্যামারাস না, সাদামাটা, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী চোখ।

ছবির সঙ্গে একটা স্ট্যাটাস জুড়ে দিল,
"সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ" ব্যাস এটুকুই।

কমেন্ট সেকশনে অনেকেই লিখলো
“ওয়াও তুমি অনেক চেঞ্জ্ড লাগছ!”
“কনফিডেন্সের আলো চোখে দেখা যাচ্ছে।”

খালা ফুফুরা রাগ করে যা লিখলো টা অনেকটা এরকম,
“আমাকে তো বলিসনি কিছু, কবে থেকে কাজ করছিস? এটুকু জানার অধিকার নেই আমার?"

রুবি হালকা হেসে ভাবল,
-ভালোই তো… এখন তারা কনফিউজড। আমার ভেতরের কান্না তাদের হাসির খোরাক , কিন্তু আমার হাসিমুখ তাদের গুলিয়ে দিচ্ছে।

#আত্মবিশ্বাস
কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী
©কপি

তাজমহল #পর্ব_৯প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরীশাইনা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাজদার তাকে ভিড়ের মধ্যে থেকে টেনে নিয়ে গেল জুয়েলারির দোকানে।...
17/11/2025

তাজমহল
#পর্ব_৯
প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরী

শাইনা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাজদার তাকে ভিড়ের মধ্যে থেকে টেনে নিয়ে গেল জুয়েলারির দোকানে।

শাইনা শুধু পুরুষালি হাতের মধ্যে জিম্মি হওয়া তার হাতদুটোর দিকে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ।

তাজদার সিদ্দিকীর ঘৃণা হচ্ছে না তার হাত ধরতে?

দোকানে প্রবেশ করার পর কৌশলে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল শাইনা।

জুয়েলারি কেনার সময় তাজদার সিদ্দিকী শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। শাইনা মিনিমাল কিন্তু প্রিমিয়াম ডিজাইনগুলি চুজ করেছে। দামটাও চড়া। বাপ ভাইয়ের টাকায় কিনতে হলে সে এত দামী জুয়েলারি কখনোই কিনতো না।

কিন্তু আজ সে দাম কত হবে সেটা ভাবেনি। এখন সে যদি দামের কথা চিন্তা করে সবচেয়ে সুন্দর জুয়েলারিটা না নেয় তাহলে পরে দেখা যাবে রটে যাবে বউয়ের পছন্দ ভালো না।

তাসনুভা সবার আগে বলবে তারা ক্লাসি নয় বলে সে ফালতু জুয়েলারি চুজ করেছে।

মানুষ সবসময় নিজের জন্য ভালো জিনিসটা কিনতে চায়। কিন্তু টাকার কথা চিন্তা করে কিনতে পারেনা। তেমন শাইনা সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা চেনে। বাপ ভাইয়ের উপর জুলুম হবে ভেবে কখনো সে কারো উপর নিজের পছন্দ চাপিয়ে দেয়নি। তাকে যা কিনে দেয়া হয়েছে সে তা পরেছে। যা খেতে দিয়েছে সে তা খেয়েছে। যা বলা হয়েছে তা করেছে।

অবশ্য তার পরিবার তার সাথে জুলুম করেছে। তাদের মনের মতো চলতে গিয়ে, ভালো মেয়েটা হতে গিয়ে সে নিজের ক্ষতিটাই বেশি করে বসেছে।

সেইসব মনে পড়তেই আবারও তার মন খারাপ হচ্ছে। সে ঠিক করেছে তাজদার সিদ্দিকীর সামনে সে জীবনেও নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবেনা।

শাড়ি, লেহেঙ্গার জন্য জুয়েলারি কেনা শেষে সে গায়ে হলদুের অনুষ্ঠানে পরার জন্যও জুয়েলারি কিনে নিল সে। তাজদার সিদ্দিকী পেছনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখে যাচ্ছে সব। শাইনা মাঝেমধ্যে নিজেকে সামলে নিচ্ছিল। কারণ তার মনে হচ্ছে সে বেশি কথা বলে ফেলছে।

জুয়েলারি কেনা শেষ হতেই তাজদার বিল মিটিয়ে পকেট ফোন ভরে নিতে নিতে শাইনার দিকে তাকালো। শাইনা শপিং ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। শাড়ির ব্যাগগুলো ওই দোকানেই রাখা। আবার সেখানে যেতে হবে।

তাজদার কিছু ব্যাগ নিতে চাইলে শাইনা ব্যাগগুলো নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। কিছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল তাজদার।

মেকআপ কেনার কথা শাইনা ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু তাজদার তাকে মনে করিয়ে দিল।

সে কসমেটিকস শপের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সোজা। ইনিয়েবিনিয়ে শাইনাকে বোঝালো এটা কসমেটিকস শপ।

শাইনা তাড়াহুড়ো করছিল বাড়ি ফেরার জন্য। তাজদারকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে, সে মেয়ে হয়ে মেকআপের কথা ভুলে গেছে দেখে খানিকটা লজ্জিতও হলো। এজন্যই কয়েকজনকে সাথে করে নিয়ে আসতে হয়। একা আর পারছেনা সে।

কসমেটিকসের দোকানে ঢুকে সে একটা চেয়ারে বসলো আগে। ঠান্ডা পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিল। খুব ক্লান্ত লাগছে।

তাজদার সিদ্দিকী সেখানে কর্মরত মানুষদের সাথে কি কথাবার্তা বলছে কে জানে? শাইনা ইচ্ছে করে খেয়াল করেনি। কানে এসেছে কথাগুলো। মনোযোগ দিয়ে শোনেনি সে।

পরে অবশ্য তার কাছে বিষয়টা স্পষ্ট হলো। সেখানে কর্মরত সেলস পার্সন তাকে একটা কম্বো দিয়ে দিল। তাজদারকে দেখিয়ে বলল,

"আপনি যেমনটা বলেছেন তেমনটা এখানে আছে। সব অথেনটিক মেকআপ প্রডাক্টস এন্ড স্কিন কেয়ার প্রডাক্টস একসাথে।"

শাইনার পরিশ্রম কমে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই দুটো কম্বোর দাম শুনে তার মাথায় হাত।

এসব কিনে নিলে বাড়ি পৌঁছে তার ইজ্জত সম্মান আর থাকবে না। ওই বাড়ির মানুষ বলবে কোনোদিন দেখেনি তাই আজ যা পেল সব একসাথে নিয়ে ফেলেছে। একটা ভয় ঝেঁকে ধরলো তাকে। সে অন্য সবকিছু সহ্য করতে পারলেও মানুষের কটু কথা একদম নিতে পারেনা। সে যা নয় তা বললে তার সারাদিন অশান্তি লাগে।

সে বলল,"আমি সবগুলো ব্র্যান্ড থেকে বেছেবেছে নিতে চাই। L'Oréal Paris এর সব প্রডাক্টস আমার লাগবেনা।"

দোকানে বিউটি অ্যাডভাইজার ছিলেন। তিনি বললেন,"স্যার প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের প্রডাক্টস চেয়েছেন ম্যাম। আমরা L'Oréal Paris এর প্রডাক্টস সাজেস্ট করছি। আর কসমেটিকসের ক্ষেত্রে ম্যাক। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্র্যান্ড। L'Oréal Paris রূপচর্চার নির্ভরযোগ্য নাম। স্টাইল আইকনদের প্রথম পছন্দ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।"

শাইনা আর কিছু বলবে তার আগেই তাজদার বলল,"আপনারা প্যাকেজিং শুরু করুন। একটু তাড়াতাড়ি।"

"জি স্যার। আমাদের কিছুক্ষণ সময় দিয়ে সাহায্য করুন।"

শাইনার মন কেমন কু গাইছে। টাকার অংকগুলো এত দ্রুত কষছে যে তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব। এটা তো সত্যি যে সে ধনী পরিবারে বড় হয়নি।

ভাইদের পয়সা হওয়ার পরও আহামরি বিলাসিতা সে করেনি।

সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে পরের পয়সা নিয়ে বাহাদুরি করতে তার অনেক ভয়।

মেকআপ আর স্কিন কেয়ার প্রডাক্টসের প্যাকেজিং কমপ্লিট। কার্টনে প্যাক করে দিয়েছে। কার্টনটা এত বড় হয়েছে যে সবার চোখে লাগবেই।

শাইনার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। শান্তি লাগছেনা। পরে সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই বলে তাজদার সিদ্দিকী নিজেই তো সব কিনছে। সে তো জোর করে কিনেনি।

বিল মিটিয়ে তাজদার সবগুলো কার্টন নিয়ে বেরিয়ে এল। শাড়ির দোকানে সবগুলো ব্যাগ রেখে বেরিয়ে গেল। শাইনা শাড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে রইলো।

সবগুলো ব্যাগ কার্টন দেখে সে মনে মনে হিসেব কষছে কত টাকার জিনিস কিনেছে সে। কত লাখ কষেছে এখানে? শাড়ি আর লেহেঙ্গাই তো লাখ ছুঁয়েছে।

কিছুক্ষণ পর একটা লোক এল। তিনিও সাথে করে ব্যাগ, কার্টন সব নিয়ে বেরিয়ে গেল তাজদারের আগে আগে। তাজদার শাইনার দিকে তাকালো একপলক। তারপর দোকানদারদের সাথে হাত মিলিয়ে বলল,"তবে আসি।"

"আবার আসবেন। বিয়েতে আমরা থাকছি।"

"অবশ্যই।"

বলেই তাজদার বেরিয়ে এল বাকি ব্যাগগুলো নিয়ে। শাইনাও তার পিছু পিছু বের হলো। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখলো ছোট ভাইয়া ফোন দিচ্ছে। সে ফোন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে তাজদারের পেছন পেছন গেল। শাওন তাকে সবটা খুলে বললো। বাড়িতে অনেক ঝুটঝামেলা হয়ে গেছে। আনিস তাসনুভাকে বেয়াদব বলায় শাইনার শ্বশুর খেপে গিয়েছে আনিসের উপর।

আনিস বলেছে আকদ ভেঙে দিতে।
এখন আবার আকদ ভাঙার কথা শুনে উল্টো ওরা খেপে উঠেছে।

যদিও পরিস্থিতি এখন ঠান্ডা হয়েছে। কারণ বড় আম্মা এসে আনিসের সাথে কথাবার্তা বলেছে। তাজদার আসার আগে পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে চাইছেন তিনি। ভাইয়ের কথা চুপচাপ শুনলো শাইনা। ভাইয়া আরও কিছু বলতো। শাইনার ইচ্ছে নেই দেখে কিছু বলেনি।

কথা বলা শেষ হয়েছে। বাইরে বেরিয়ে এল তারা। বাইরে এসে দম নিল শাইনা। বাড়ি গিয়ে কবে সে বিছানায় শুয়ে পড়বে। শরীর আর কূলোচ্ছেনা।

ওই লোকটা ড্রাইভার ছিল। সব ব্যাগগুলো গাড়িতে তোলা শেষে শাইনার দিকে তাকিয়ে বলল,"গাড়িতে উঠে বসুন। স্যার বোধহয় কাছে কোথাও গিয়েছেন।"

শাইনা গাড়িতে উঠে বসলো। সিটে বসে মাথা এলিয়ে চোখ বুঁজলো। হঠাৎ কেউ একজন নিজের উপস্থিতি জানানোর জন্য গলা ঝাড়লো। শাইনা চট করে চোখ মেললো। তার সামনে আইসক্রিম বাড়িয়ে দিল তাজদার। পোলার কার্নিভাল আইসক্রিম। মুচমুচে কোনের ভিতরে ভ্যানিলা আইসক্রীমের সাথে চকোলেট টপিং আর বাদাম। শাইনা অপ্রস্তুত হয়ে আইসক্রিমটা নিল।

তাজদার ডাকলো,

"ড্রাইভার সাহেব।"

ড্রাইভার হেসে তাকালো তার দিকে। বাড়িয়ে দেয়া আইসক্রিমটা নিল হাত থেকে। শাইনা আইসক্রিম খাওয়া শুরু করেছিল একটু আরাম করে। ঠিক তখুনি ঘটলো বিপত্তি। সে তার পাশের সিটে দুটো শপিং রেখে দিয়েছিল। সেগুলো সরিয়ে তাজদার সিদ্দিকী তার পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো। পাশ ঘেঁষে না যদিও। কিন্তু পাশাপাশি বসাটাও এখন শাইনার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। তার ইচ্ছে করলো আইসক্রিমটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে। তার আইসক্রিম খাওয়ার বারোটা বাজিয়ে দিল।

শাইনা একটু সরে বসে আইসক্রিমটা খেল জানালার বাইরে তাকিয়ে। তাজদার সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে রেখেছে। শাইনা আইসক্রিম খাওয়া শেষ করে আঁড়চোখে একবার তাকালো নড়াচড়া টের না পেয়ে। কপাল কুঁচকে গেল তার। সাথে সাথে তাজদার সেভাবে মাথা এলিয়ে রাখা অবস্থায় তাকালো চোখ মেলে। শাইনা ভড়কে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।

কতশত ভাবনা উদয় হলো মনে। একসময় সে আর আপারা এই লোকটার পায়ের আওয়াজ শুনলে পর্যন্ত লুকিয়ে পড়তো ভয়ে। ছেলেটা যেদিকে হাঁটতো তারা সেদিকেও পাও মাড়াতো না। পুকুরঘাটে বসে আছে দেখলে তারা একটা বালতি পানি আনার জন্যও নামতো না। কলপাড়ে যেত না।

সারাক্ষণ তারা আতঙ্কে থাকতো ছেলেটা কখন কি বলে বসে, কখন না জানি অপমান করে বসে। ছোটবেলায় তো আর এত বুঝ ছিল না। টিভি দেখতে সে আল্লাহকে ডাকতো যাতে ওই ছেলেটা না আসে সিনেমা শেষ হওয়ার আগে। তাজদার সিদ্দিকীও তখন ধুরন্ধর চালাক ছিল। এমনভাবে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তো যে তারা আগেভাগে বুঝতেও পারতো না। তাদের দেখামাত্রই চেহারাটা এত ভয়ংকর হয়ে উঠতো তা মনে পড়লে শাইনার দমবন্ধ হয়ে আসে।

তাদের দেখলে ঠাস করে টিভি বন্ধ করে দিত তাজদার সিদ্দিকী। তারপর ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালে শাইনার মনে হতো এই গোটা পৃথিবীতে এমন জঘন্য, ভয়ংকর মানুষ আর নেই। মাথা নিচু করে সে বেরিয়ে যেত তখন। বেরোতে একটু দেরী হলে মাথা ঠেলে বের করে দিয়ে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিত। অবশ্য তার মা থাকলে এমন করতো না। তখন শুধু ঘাড় বাঁকাতো। আর চোখ রাঙিয়ে ইশারা করতো বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। এত বিশ্রীভাবে অপমান! এরচেয়ে তো মৃত্যুও ভালো।

আল্লাহ ওইরকম একটা লোকের সাথে কেন তার ভাগ্য জুড়ে দিল? সে এই প্রশ্নের উত্তর পেল না হাজার খুঁজেও। কোনো উত্তর নেই তার কাছে।

___________

বাড়ির উঠোনে গাড়ি এসে থামলো। শাইনা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সোজা তাদের ঘরে চলে এল। গাড়ি থেকে ব্যাগ, কার্টন নামিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে তৌসিফ, তাশফিন। এত বড় বড় ব্যাগ, কার্টন সবাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। কিন্তু চারপাশ এত নীরব দেখে শাইনা বুঝে গেল অনেক ঝড় গেছে তার আসার আগে।

রওশনআরার কানে এল মেঝ ননদের কথা।

"আমার ভাইপোকে তো মনে হয় ঝাঁজরা করে দিয়েছে ওই মেয়ে। কত লাখ খেয়েছে কে জানে?"

রওশনআরা কিছু না বলে সরে পড়লেন। তাজদার আসায় বাড়ির সবাই আরও চুপ হয়ে গেছে। রওশনআরা তাসনুভাকে ঘরে বসে থাকতে বলেছেন। বাড়ি ফেরার সাথে সাথে কেউ যেন কোনো বাড়তি কথা না তোলে।

তাসনুভাকে তিনি ইচ্ছেমতো বকেছেন। আকদ ভাঙার কথা পর্যন্ত উঠে গেছে তার কারণে। তাজদারের কানে এসব গেলে কি হবে?

বউয়ের জিনিসপত্র সব রওশনআরা নিজের ঘরে এনে রেখেছেন। সবাই শাড়ি লেহেঙ্গা জুয়েলারি দেখা শুরু করেছে।

তাজদার নিজের ঘরে চলে গিয়েছে। যাওয়ার সময় তাসনুভাকে দেখলো। তাসনুভা ভাইকে দেখামাত্রই মাথা নামিয়ে নিল। রওশনআরা তাজদারের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। তাসনুভার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন তিনি। তাকে এখনি ঘর থেকে বের হতে হলো?

তাজদার ঘরে যেতে যেতে বলল,"জিনিসগুলো গুছিয়ে ওই বাড়িতে দিয়ে এসো।"

তাসনুভা মায়ের দিকে তাকালো। মায়ের ইশারা বুঝে বলল,"আচ্ছা।"

_______

বউয়ের জিনিসপত্র বাড়ির সবাই মিলে দেখছে। বড় ফুপু বলল,"এত দামী শাড়ি দিয়েছে সেখানে আবার লেহেঙ্গার কি দরকার ছিল? ওয়ালিমায় সেকেন্ড শাড়িটা পরলেই তো হয়ে যেত। ওর দুই বোনকে তো শ্বশুরবাড়ি থেকে দশ হাজার টাকার শাড়ি দিতেও বাঁধছে। মেঝটাকে তো বাপে এককাপড়ে বিয়ে দিয়েছিল।"

একেকজন একেক কথা বলতে লাগলো। সবাই মিলে আনুমানিক ভাবে হিসেব মিলিয়ে দেখলো তিন লাখ টাকার উপরে বাজার হয়ে গিয়েছে। তার কম বেশি হতে পারে। শাড়িটা আর লেহেঙ্গা লাখ পার করেছে।

যারা সরাসরি বলছেনা তারাও গাইগুই করে বলছে বাজার অনেক বেশি হয়েছে। এত দামী জিনিস খুব জরুরি ছিল না।

বিশেষ করে তাসনীম যে সবসময় মুখ গোমড়া করে রাখে সেও হেসে ফেলে উপহাস করে বলল,

"বাড়ির সব মেয়েদের মধ্যে তো শাইনা জিতে বসে আছে। আমরা বিয়ের বাজারে নাকও গলাতে পারিনি।"

মেঝ ফুপু বলল,"মেকআপ তো মনে সব তুলে আনছে। ও নুভা দেখ তো। এগুলোতে কত টাকা আসবে?"

তাসনুভা ঘরের এককোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। সব এক্সক্লুসিভ জিনিস নিয়েছে। দামও তেমন। সে নড়লো না। বলল,

"স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টসগুলো একটা তিন হাজার টাকার উপরে। এবার সবগুলো কত আসে হিসেব করো।"

রওশনআরা বলল,"সব তোমার পছন্দমতো হয়েছে কিনা বলো।"

তাসনুভা এবার সাহস পেয়ে শাড়ি, লেহেঙ্গা, আর গায়ে হলুদের শাড়িটা, দোপাট্টা সবগুলো দেখল। জুয়েলারি মিলিয়ে দেখলো। সব দেখা শেষে বলল,

"মোটামুটি।"

রওশনআরা বলল,"এতেই যথেষ্ট। এতকিছু দেয়ার দরকার ছিল না। তবুও তাজদার যখন নিজে দাঁড়িয়ে কিনেছে তখন তো আর কিছু বলার নেই। এখন এসব নিয়ে কথা না বলায় ভালো। তিতলি সব গুছিয়ে নাও। একটা জিনিসও যাতে নড়চড় না হয়। ওদের বাড়িতে পাঠানোর আগে তোমার মেঝ ভাইয়াকে একবার দেখিয়ে নেবে।"

তিতলি বলল,"আচ্ছা। শাড়ি লেহেঙ্গাগুলো এত জোশ হয়েছে। শাইনার পছন্দ সুন্দর।"

তাসনুভা তাকে সংশোধন করে দিয়ে বলল,"শাইনা নয় ভাইয়ার পছন্দ।"

তিতলি বলল,"তুমি সবসময় ভেজাইল্যা কথা বলো।"

________________

তিতলি, তাসনুভা আর তৌসিফ নিয়ে এসেছে বিয়ের সব জিনিসপত্র। তাজদারকে দেখিয়েছে আনার সময়। সব ঠিকঠাক আছে দেখে তাজদার অনুমতি দিল। তাসনুভা এসেছে দেখে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো কিছু একটা। শাহিদা বেগম বললেন, কি এক ঝামেলা পাকিয়ে দিল মেয়েটা। এত ডেয়ারিং মেয়ে।

তাসনুভা দাঁড়ায়নি। ব্যাগগুলো রেখে সোজা বেরিয়ে গিয়েছে। ভাইয়া বলেছে তাই আসতে হয়েছে। নইলে এই বাড়িতে পা রাখারও ইচ্ছে নেই তার।

তিতলি আর তৌসিফ চা খেতে খেতে
শাইনাকে সবটা বুঝিয়ে দিয়ে চলে এল। শাইনার ঘরে এসে ভীড় জমালো তার চাচী, চাচাতো বোন, আপা, ভাবি সবাই। বড় আপা সব খুলে খুলে দেখালো সবাইকে।

শাইনা ঘরের এককোণায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। শাহিদা বেগম অবাক চোখে শাইনার দিকে তাকালেন। বললেন,

"তুই এসব কি করলি? এত দামী দামী জিনিস কিনে নিলি? ওরা তো এখন যা তা বলবে। হাভাতে ঘরের মেয়ে বলবে।"

শাইনা মায়ের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বলল,

"তুমি কি বলতে চাইছো? আমি সস্তা?"

"দেখো মেয়ে কি বলে। এত দামী বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা কিনলি। ওরা আবার তোকে চার ভরি স্বর্ণও দিচ্ছে।"

"একবারই তো দিচ্ছে। সারাজীবনের জন্য চাকরাণি নিয়ে যাচ্ছে। একবার সব ঢেলে দিলে মন্দ কি? সারাজীবন আমাকে খোঁটার তলে রাখতে পারবে। ওদেরই লাভ।"

সবাই তার দিকে চেয়ে রইলো। দাদীমা বলল,

"আরেহ ওদের স্বর্ণ আগে থেকে ছিল। ওখান থেকে দেবে রায়হানের মা। কোটি টাকা আছে ওদের। দশ লাখ খরচ করে বিয়ে করলে ওদের সম্পত্তির এককোণও নড়বে না। মেয়েটার সামনে ফালতু কথা বইলো না।"

শাহিদা বেগম চুপ করে গেলেন।

শাড়ি, গয়না সব দেখে খুশি হলে সবাই। শাইনা সব যথাস্থানে রেখে দিচ্ছিল একে একে। ঘর খালি। শুধু দাদীমা আছেন। তিনি ব্যাগ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন,

"বাবাগো ব্যাটা দেখছি ওইসবও কিনেছে।"

শাইনা জানতে চাইল,"কীসব?"

দাদীমা হাসলেন,"ওইসব আর কি। ব্যাটা ভালোই জানে বউয়ের আর কি কি লাগতে পারে।"

শাইনা কপাল কুঁচকে বলল,"কীসের কথা বলছো?"

দাদীমা ব্যাগের ভেতর থাকা অন্তর্বাস আর অন্যান্য জিনিসগুলো দেখাতেই শাইনা জোরে একটা চিৎকার দিল।

দাদীমা কোনোমতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আফসার সাহেব মাকে হাসতে দেখে বললেন,

"তুমিও ওর পেছনে লেগেছ।"

দাদীমা হাসতে হাসতে বললেন,"তোর মেয়ে আস্ত একটা বজ্জাত।"

শাইনা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল,"তুমি আমার সাথে কোনো কথাই বলবেনা বুড়ি।"

_________________

মেহেদী পাতা তোলার জন্য বাড়ির সব চাচীদেরকে ডেকে আনা হয়েছে। বর কনের মেহেদী একসাথে তোলা হচ্ছে। শাইনার ভাবি সাবিনার হাতে একটা কুলা। সেখানে একটা মোমবাতি জ্বলছে। কিছু ঘাস, একমুঠো চাল, কয়েকটা খুচরো পয়সা, কিন্তু পান সুপারি আর কত কী। সাবিনা কুলা নিয়ে সবার আগে দাঁড়িয়ে রইলো। তৌসিফ আর শাওন ক্যামেরা নিয়ে হাজির। শাহিদা বেগম আর রওশনআরাকে ঘিরে সবাই হাসিঠাট্টা করছে। শাইনা জানালা দিয়ে সব দেখছে। বড় আপার বিয়ের সময়ও এভাবে মেহেদী পাতা তোলা হয়েছিল। খুব আনন্দ করেছিল সে।

মেহেদী গাছটা শাইনাদের বাড়ির সামনেই। বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায়। সবাই একসাথে মেহেদী পাতা তুলতে যাচ্ছে। বাচ্চা কাচ্চারা সাথে সাথে হাঁটছে।

শাইনা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। দাদীমা বললেন, "ঘরে বসে থাকতে মন চাইছেনা না?"

কথাটা ঠিক। নিজের বিয়ে তাই নইলে সে একদৌড়ে চলে যেত সেখানে।

হঠাৎ পাশ ফিরতেই সে দেখলো ওই বাড়ির বারান্দায় তাজদার দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফোন।

শাইনার হাতে তার নতুন ফোনটা। হঠাৎ টুং করে একটা মেসেজ ঢুকলো হোয়াটসঅ্যাপে। গ্রুপে এসেছে মেসেজটা। শাইনা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতেই দেখলো, মেহেদী পরা মেয়েলি হাত। হাতের তালুতে বরের নামের প্রথম অক্ষর।

শাইনা মেসেজটা দেখে কপাল কুঞ্চিত করে তাজদারের দিকে তাকালো। তাজদার ফোনে চোখ ডুবিয়ে রেখে হেঁটে হেঁটে বারান্দা ছাড়লো। শাইনা বিড়বিড় করে বলল, জীবনেও লিখব না।

চলমান......
কপি©

Address

Dhaka

Telephone

+8801705024254

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Story Time posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share