06/09/2026
একই আঙুর। একদিকে তা থেকে তৈরি হতে পারে মদ, অন্যদিকে তৈরি হতে পারে নেশামুক্ত আঙুরের ঘন সিরাপ বা মোলাসেস। উৎস একই, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে একটির হুকুম হারাম, অন্যটি হালাল। কখনো ভেবেছেন, কেন?
কারণ ইসলাম কোনো জিনিসের হুকুম শুধু এই দেখে দেয় না যে, সেটি কোথা থেকে এসেছে। বরং শেষ পর্যন্ত সেটি কী হয়েছে, তার বৈশিষ্ট্য কী এবং মানুষের ওপর তার প্রভাব কী, সেটাও বিবেচ্য।
আঙুর নিজেই আল্লাহর দেওয়া একটি হালাল নিয়ামত। আপনি সেটি ফল হিসেবে খেলেন, রস বানালেন, শুকিয়ে কিশমিশ করলেন কিংবা নেশামুক্তভাবে ঘন করে সিরাপ বানালেন, এগুলো মূলত বৈধ খাবারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সেই আঙুর থেকেই যখন এমন পানীয় তৈরি হয় যা নেশা সৃষ্টি করে, তখন আর শুধু “আঙুর থেকেই তো তৈরি” বললে হবে না। তার বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে, আর সেই কারণেই তার হুকুমও বদলে গেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর খেজুর গাছের ফল ও আঙুর থেকে তোমরা নেশাজাতীয় পানীয় এবং উত্তম রিযিক গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
সূরা আন নাহল, ১৬:৬৭
এই আয়াতটি মদ চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার আগের পর্যায়ের। পরে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন,
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারণের শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”
সূরা আল মায়িদাহ, ৫:৯০
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন,
“প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু খামর, আর প্রত্যেক খামর হারাম।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০০৩
আর যে জিনিস বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৮১
এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আছে। ইসলাম আঙুরকে হারাম করেনি, আঙুরের রসকেও হারাম করেনি। হারাম হয়েছে সেই রূপটি, যা নেশাজাতীয় হয়ে মানুষের বিবেক ও বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
অর্থাৎ কোনো কিছুর উৎস হালাল হলেই তার প্রতিটি পরিবর্তিত রূপও হালাল হবে, এমন নয়।
এই জায়গাটা শুধু খাবারের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের আরও অনেক বিষয়ে আমাদের ভাবতে শেখায়। টাকা নিজে হারাম নয়, কিন্তু সেই টাকা যদি প্রতারণা, সুদ বা অন্যায় উপায়ে আসে, তখন সমস্যাটা টাকায় নয়, উপার্জনের পথে। প্রযুক্তি নিজে হারাম নয়, কিন্তু একই ফোন দিয়ে কেউ উপকারী জ্ঞান শিখতে পারে, আবার কেউ এমন কিছু দেখতে পারে যা তার ঈমান ও চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাই একজন মুমিনের প্রশ্ন শুধু “এটা কী দিয়ে তৈরি?” বা “সবাই তো করছে” হওয়া উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “আল্লাহর শরিয়তে এর হুকুম কী?”
আমাদের পছন্দ, অভ্যাস কিংবা সমাজে কোনো কিছু খুব স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া তার হুকুম বদলে দেয় না। হালাল ও হারামের সীমা নির্ধারণ করেন আল্লাহ।
আঙুরের এই ছোট উদাহরণটাও তাই বড় একটি শিক্ষা দেয়। একই নিয়ামত এক পথে হালাল থাকতে পারে, আর অন্য পথে গিয়ে হারামের কারণ হতে পারে। পার্থক্যটা শুধু উৎসে নয়, শেষ পর্যন্ত সেটি কী হয়ে উঠেছে এবং কী প্রভাব সৃষ্টি করছে, সেখানেও।
তাই কোনো কিছু দেখেই শুধু বাহ্যিক মিলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, তার প্রকৃতি ও শরয়ি হুকুম জানা জরুরি।
আল্লাহ আমাদের তাঁর দেওয়া নিয়ামতগুলো হালাল ও পবিত্র পথে ব্যবহার করার তাওফিক দিন, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে হেফাজত করুন এবং সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো অন্তর দান করুন। আমিন।
📌 পোস্ট-টি সদকায়ে জারিয়া এবং ইসলাম প্রচারের স্বার্থে শেয়ার করে অশেষ সওয়াবের ভাগিদার হোন। এই পোস্ট আপনার আখেরাতের কঠিন মুসিবাতের সময় নাজাতের ওসিলা হয়ে যাক, আমিন🤲