28/10/2021
একশটি কবিরা গুনাহ
অনুবাদ ও গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্সে সেন্টার, সৌদি আরব
▬▬▬◄❖►▬▬▬
🌀 কবিরা গুনাহ কাকে বলে?
কবিরা গুনাহ বলা হয় ঐ সকল বড় বড় পাপকর্ম সমূহকে যেগুলোতে নিন্মোক্ত কোন একটি বিষয় পাওয়া যাবে:
◉ যে সকল গুনাহের ব্যাপারে ইসলামি শরিয়তে জাহান্নামের শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
◉ যে সকল গুনাহের ব্যাপারে দুনিয়াতে নির্ধারিত দণ্ড প্রয়োগের কথা রয়েছে।
◉ যে সকল গুনাহের ব্যাপারে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা রাগ করেন।
◉ যে সকল কাজে আল্লাহ তায়ালা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ফেরেশতা মণ্ডলী লানত দেন।
◉ যে কাজের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যে এমনটি করবে সে মুসলমানদের দলভুক্ত নয়।
◉ কিংবা যে কাজের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
◉ সে সব বিষয়কে মুনাফেকির আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
◉ যে কাজে ‘দ্বীন নাই’, ‘ঈমান নাই’ ইত্যাদি বলা হয়েছে।
◉ অথবা যে কাজকে আল্লাহ তায়ালা সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় করা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
🌀 কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার মর্যাদা:
১. মহান আল্লাহ বলেন:
إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا
"যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সেসব বড় গোনাহ গুলো থেকে বেঁচে থাকতে পার। তবে আমি তোমাদের (ছাট) গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেব এবং সম্মান জনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করাব।” (সূরা নিসা: ৩১)
২. রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
الصلوات الخمس . والجمعة إلى الجمعة . ورمضان إلى رمضان . مكفرات ما بينهن
إذا اجتنب الكبائر
“পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং এক রমাযান থেকে আরেক রমাযান এতদুভয়ের মাঝে সংঘটিত সমস্ত পাপ রাশির জন্য কাফফারা স্বরূপ যায় যদি কবিরা গুনাহ সমূহ থেকে বেঁচে থাকা যায়।” (মুসলিম)
🌀 একশটি কবিরা গুনাহ (বড় পাপ):
নিম্নে একশটি কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) তুলে ধরা হল:
1. আল্লাহর সাথে শিরক করা
2. নামায পরিত্যাগ কর
3. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া
4. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা
5. পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করা
6. যাদু-টোনা করা
7. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
8. জিহাদের ময়দান থেকে থেকে পলায়ন
9. সতী-সাধ্বী মু‘মিন নারীর প্রতি অপবাদ
10. রোযা না রাখা
11. যাকাত আদায় না করা
12. ক্ষমতা থাকা সত্যেও হজ্জ আদায় না করা
13. যাদুর বৈধতায় বিশ্বাস করা
14. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
15. অহংকার করা
16. চুগলখোরি করা (ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা আরেকজনের নিকট লাগোনো)
17. আত্মহত্যা করা
18. আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা
19. অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ ভক্ষণ করা
20. উপকার করে খোটা দান করা
21. মাদক বা নেশা দ্রব্য গ্রহণ করা।
22. মদ প্রস্তুত ও প্রচারে অংশ গ্রহণ করা।
23. জুয়া খেলা।
24. তকদির (ভাগ্য) অস্বীকার করা।
25. অদৃশ্যের খবর জানার দাবী করা।
26. গণকের কাছে ধর্না দেয়া বা গণকের কাছে অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া।
27. পেশাব থেকে পবিত্র না থাকা।
28. রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নামে মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করা।
29. মিথ্যা স্বপ্ন বর্ণনা করা।
30. মিথ্যা কথা বলা।
31. মিথ্যা কসম খাওয়া।
32. মিথ্যা কসমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করা।
33. জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।
34. সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া।
35. মানুষের গোপন কথা চুপিসারে শোনার চেষ্টা করা।
36. হিল্লা তথা চুক্তি ভিত্তিক বিয়ে করা।
37. যার জন্যে হিলা করা হয়।
38. মানুষের বংশ মর্যাদায় আঘাত হানা।
39. মৃতের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা।
40. মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা।
41. কোন মুসলিমকে গালি দেয়া অথবা তার সাথে মারামারিতে লিপ্ত হওয়া।
42. খেলার ছলে কোন প্রাণীকে নিক্ষেপ যোগ্য অস্ত্রের লক্ষ্য বস্তু বানানো।
43. কোন অপরাধীকে আশ্রয় দান করা।
44. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু জবেহ করা।
45. ওজনে কম দেয়া।
46. ঝগড়া-বিবাদে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা।
47. ইসলামি আইনানুসারে বিচার বা শাসনকার্য পরিচালনা না করা।
48. জমিনের সীমানা পরিবর্তন করা বা পরের জমি জবর দখল করা।
49. গিবত তথা অসাক্ষাতে কারো দোষ চর্চা করা।
50. দাঁত চিকন করা।
51. সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে মুখমণ্ডলের চুল তুলে ফেলা বা চুল উঠিয়ে ভ্রু চিকন করা (ভ্রু প্লাগ করা)
52. মাথায় অতিরিক্ত/ চুল সংযোগ করা (পরচুলা ব্যবহার করা)
53. পুরুষের নারী বেশ ধারণ করা।
54. নারীর পুরুষ বেশ ধারণ করা।
55. বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো।
56. কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা।
57. পথিককে নিজের কাছে অতিরিক্ত পানি থাকার পরেও না দেয়া।
58. পুরুষের গোড়ালির নিচে ঝুলিয়ে পোশাক পরিধান করা।
59. মুসলিম শাসকের সাথে কৃত বয়াত বা আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করা।
60. ডাকাতি করা।
61. চুরি করা।
62. সুদ লেন-দেন করা, সুদ লেখা বা তাতে সাক্ষী থাকা।
63. ঘুষ লেন-দেন করা।
64. গনিমত (জিহাদের মাধ্যমে কাফেরদের নিকট থেকে প্রাপ্ত সম্পদ) বণ্টনের পূর্বে আত্মসাৎ করা।
65. স্ত্রীর পায়ু পথে যৌন ক্রিয়া করা।
66. জুলুম-অত্যাচার করা।
67. অস্ত্র দ্বারা ভয় দেখানো বা তা দ্বারা কাউকে ইঙ্গিত করা।
68. প্রতারণা বা ঠগবাজী করা।
69. রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ আমল করা।
70. স্বর্ণ বা রৌপ্যের তৈরি পাত্র ব্যবহার করা।
71. পুরুষের রেশমি পোশাক এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য পরিধান করা।
72. সাহাবিদেরকে গালি দেয়া।
73. নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে গমন করা।
74. মনিবের নিকট থেকে কৃতদাসের পলায়ন।
75. ভ্রান্ত মতবাদ জাহেলি রীতিনীতি অথবা বিদআতের প্রতি আহবান করা।
76. পবিত্র মক্কা ও মদিনায় কোন অপকর্ম বা দুষ্কৃতি করা।
77. কোন দুষ্কৃতিকারীকে প্রশ্রয় দেয়া।
78. আল্লাহর ব্যাপারে অনধিকার চর্চা করা।
79. বিনা প্রয়োজনে তালাক চাওয়া।
80. যে নারীর প্রতি তার স্বামী অসন্তুষ্ট।
81. স্বামীর অবাধ্য হওয়া।
82. স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর অবদান অস্বীকার করা।
83. স্বামী-স্ত্রীর মিলনের কথা জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
84. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করা।
85. বেশী বেশী অভিশাপ দেয়া।
86. বিশ্বাসঘাতকতা করা।
87. অঙ্গীকার পূরণ না করা।
88. আমানতের খিয়ানত করা।
89. শরীরে উল্কি অঙ্কন করা বা ট্যাটু করা।
90. ঋণ পরিশোধ না করা।
91. বদ মেজাজি ও এমন অহংকারী যে উপদেশ গ্রহণ করে না।
92. তাবিজ-কবজ, রিং, সুতা ইত্যাদি ঝুলানো।
93. পরীক্ষায় নকল করা।
94. ভেজাল পণ্য বিক্রয় করা।
95. ইচ্ছাকৃত ভাবে জেনে শুনে অন্যায় বিচার করা।
96. আল্লাহ বিধান ব্যতিরেকে বিচার-ফয়সালা করা।
97. পার্থিব উদ্দেশ্যে দীনী ইলম (দীনের জ্ঞান) অর্জন করা।
98. কোন ইলম (দীনের জ্ঞান) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জানা সত্যেও তা গোপন করা।
99. নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করা।
100. আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন এবং কু প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনায় কোন গুনাহ করে ফেললে আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমীন।
সগীরা গুনাহ, ভয়াবহতা এবং কতিপয় উদাহরণ
▬▬▬◄❖►▬▬▬
প্রশ্ন: সগীরা বা ছোট গুনাহ কাকে বলে? এর ভয়াবহতা কতটুকু? সচরাচর মানুষ যে সব সগীরা গুনাহ করে সেগুলো কি কি? কিছু উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলে উপকৃত হবো আশা করি।
উত্তর :
নিম্নে সগীরা বা ছোট গুনাহের পরিচয়, এর ভয়াবহতা এবং কতিপয় উদাহরণ তুলে ধরা হল:
🌀 সগীরা (ছোট) গুনাহ কাকে বলে?
▪শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন: এ মাসআলায় (সগীরা বা ছোট গুনাহের পরিচয়ের ব্যাপারে ) ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত কথাটি সবচেয়ে সঠিক। এটি আবু উবাইদ ও ইমাম আহমদ প্রমুখ উল্লেখ করেছেন। আর তা হল:
أن الصغيرة ما دون الحدين: حد الدنيا وحد الآخرة
“সগীরা বা ছোট পাপ বলা হয় ঐ পাপকে, যা দুনিয়ার দণ্ড ও আখিরাতের দণ্ড (অবধারিত হয় এমন পাপ) থেকে নিম্ন পর্যায়ের।"
[অর্থাৎ ছোট গুনাহ বলতে বুঝায়, যে সকল অপরাধের ক্ষেত্রে দুনিয়ায় আইনগত দণ্ড বিধি নেই (যেমন, হাত কাটা, পাথর মেরে মৃত্যু দণ্ড দেয়া, বেত্রাঘাত করা ইত্যাদি) অনুরূপভাবে আখিরাতেও নির্ধারিত কোনো দণ্ড বা শাস্তির কথা বলা হয় নি। যেমন: কবরের আযাব, জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ ইত্যাদি]
▪আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমীন রহ. বলেন:
الكبائر هي ما رتب عليه عقوبة خاصة بمعنى أنها ليست مقتصرة على مجرد النهي أو التحريم، بل لا بد من عقوبة خاصة مثل أن يقال من فعل هذا فليس بمؤمن، أو فليس منا، أو ما أشبه ذلك، هذه هي الكبائر، والصغائر هي المحرمات التي ليس عليها عقوبة. انتهى
"কবীরা বা বড় গুনাহ বলা ঐ সকল গুনাহকে যেগুলোর ব্যাপারে বিশেষ কোনো শাস্তি আরোপের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ যেগুলো শুধু নিষেধ বা হারামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তাতে অবশ্যই বিশেষ শাস্তি রয়েছে। যেমন: যে এ কাজ করবে সে ইমানদার নয় অথবা সে আমাদের দলভুক্ত নয় ইত্যাদি। এগুলো হল কাবীরা গুনাহ। আর সগীরা বা ছোট গুনাহ হল ঐ সকল হারাম কাজ যেগুলোর জন্য শাস্তি নাই।"
সুতরাং আলেমদের বক্তব্যের আলোকে আমরা বলতে পারি, যে সকল গুনাহ কবীরা পর্যায়ের নয় সেগুলোই সগীরা গুনাহ। তাহলে সগীরা গুনাহ সম্পর্কে জানতে হলে আগে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জানতে হবে।
▪কোনো কোনো আলেম বলেন: "যে সব গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ হয় না সেগুলো কবীরা গুনাহ আর যে সব গুনাহ তওবা ছাড়া বিভিন্ন প্রকার নেক আমলের দ্বারা মাফ হয় সেগুলো সগীরা গুনাহ।"
🌀 সগীরা বা ছোট গুনাহের ভয়াবহতা:
➤ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ كَقَوْمٍ نَزَلُوا فِي بَطْنِ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، وَجَاءَ ذَا بِعُودٍ حَتَّى أَنْضَجُوا خُبْزَتَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ مَتَى يُؤْخَذْ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكْهُ».
‘সাবধান! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করার ব্যাপারে সর্তক হও। কেননা গুনাহকে তুচ্ছ মনে করার উদাহরণ হল:
একদল লোক কোন এক পাহাড়ের উপত্যকায় যাত্রা বিরতি করলো। এরপর সেখানে কেউ একটা কাঠি নিয়ে এলো, আরেকজন আরেকটা কাঠি নিয়ে এলো।তারপর তারা (এই ছোট ছোট কাঠিগুলো জমা করে সেগুলো দ্বারা) রুটি পাকালো।
ঠিক তদ্রূপ যে সব গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা হয় সেগুলোই এতে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।“ [মুসনাদ আহমাদ ৫/৩৩১। সহীহুল জামে‘, নাসিরুদ্দিন আলবানী, আল মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ, হাদিস নং: ২৬৮৬।]
➤ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ ، فَإِنَّهُنَّ يَجْتَمِعْنَ عَلَى الرَّجُلِ حَتَّى يُهْلِكْنَهُ
“তোমারা ছোট গুনাহ থেকেও দূরে থাকবে। কেননা, এগুলো জমা হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে।” (সহীহুল জামে লিল আলবানী, হা/২৬৮৭-সহীহ)
➤ বিজ্ঞ আলিমগণ বলেছেন: ছোট গুনাহকে যদি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে বারবার করে বা তুচ্ছ মনে করে করে তখন তা আর ছোট থাকে না বরং তা বড় গুনাহে পরিণত হয়।
যেমন: ইমাম নওবী রহ. সহীহ মুসলিম এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন:
رُوِيَ عَنْ عُمَر وَابْن عَبَّاس وَغَيْرهمَا رَضِيَ اللَّه عَنْهُمْ : لا كَبِيرَة مَعَ اِسْتِغْفَارٍ ، وَلا صَغِيرَة مَعَ إِصْرَار
مَعْنَاهُ : أَنَّ الْكَبِيرَة تُمْحَى بِالاسْتِغْفَارِ , وَالصَّغِيرَة تَصِير كَبِيرَة بِالإِصْرَارِ اهـ
উমর রা. এবং ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তারা বলেছেন: ইস্তিগফার তথা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা হলে কোনো কবীরা (বড়) গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না আর কোনো গুনাহ বারবার করা হলে তা আর সগীরা (ছোট) থাকে না।"
এ কথার অর্থ হল: বড় গুনাহ ইস্তিগফার (আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা) এর মাধ্যমে মুছে যায় আর ছোট গুনাহ বারবার করার মাধ্যমে বড় গুনাহে পরিণত হয়।"
➤ ছোট গুনাহগুলোকে তুচ্ছ মনে না করা আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّـهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ
“আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম।” (সূরা হজ্জ: ৩০)
➤ কবি বলেন: (আরবি কবিতা)
خل الذنوب صغيــــــرها
وكبيـرها فهو التـــــقى
واصنع كمـــــــاش فوق أرض
الشــــوك يحذر ما يرى
لا تحــــقرن صغيـــــرة
إن الجبـــال من الحــصى
সরল অর্থ:
ছোট -বড় সকল পাপকর্ম পরিত্যাগ কর।
এরই নাম ‘আল্লাহ ভীতি’।
আর পথ চল ঠিক সেভাবে যেভাবে একজন মানুষ
কণ্টকময় রাস্তা দিয়ে সর্তকতার সাথে পথ চলে।
ছোট বলে কোন পাপকেই তুচ্ছ মনে করো না।
কেননা, বড় বড় পাহাড়গুলো (এত বিশাল আকার ধারণ করেছে)
ছোট-ছোট নুড়ি পাথর দ্বারাই।
🌀 সগীরা বা ছোট গুনাহের কতিপয় উদাহরণ:
সগীরা বা ছোটগুনাহের সীমা-সংখ্যা নাই। তবুও নিম্নে বহুল প্রচলিত কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল:
🔰নামাযরত অবস্থায় এদিক ওদিকে দৃষ্টিপাত করা।
🔰নামায অবস্থায় কাপড়, দাড়ি, বা শরীরের কোন অঙ্গ নিয়ে খেলা করা।
🔰জুমার ২য় আযানের সময় বেচাকেনা করা।
🔰কোন ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাবের উপর তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অন্যজন প্রস্তাব করা।
🔰বেচাকেনার ক্ষেত্রে কেউ দরদাম করছে এমতাবস্থায় তার শেষ হওয়ার আগে আরেকজন এসে দরদাম শুরু করা।
🔰কোন পর নারীর দিকে দৃষ্টিপাত করা।
🔰 স্ত্রীকে এক বৈঠকে একাধিক তালাক দেয়া।
🔰 ঋতু চলাকালীন সময়ে তালাক দেয়া।
🔰 অতিরিক্ত ঝগড়া-ঝাটি করা।
🔰 গীবত শুনে চুপ থাকা।
🔰 পাপাচারী লোকদের সাথে ( সংশোধন ও দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া) উঠবস করা।
🔰 খোলা স্থানে কিবলার দিকে মুখ করে বা কেবলাকে পেছনে করে পেশাব-পায়খানা করা।
🔰 বিনা প্রয়োজনে উপকার হীন কথাবার্তা বলা ইত্যাদি।
পাপ ছোট না বড় সে দিকে না তাকিয়ে আমাদের উচিৎ সব ধরণের পাপাচার থেকে বিরত থাকার সর্বাত্বক চেষ্টা করা। তারপরও শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কু প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো পাপাচার করে ফেললে তৎক্ষণাৎ অনুতপ্ত হৃদয়ে সেই ক্ষমাশীল দয়াময় প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক। তাহলে তিনি ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায়।
পরিশেষে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই জনৈক মনিষীর চমৎকার একটি বাণী:
لا تَنْظُرْ إِلَى صِغَرِ الْخَطِيئَةِ ، وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى عَظَمَةِ مَنْ تَعْصِي
"পাপের ক্ষুদ্রতার দিকে না তাকিয়ে যার অবাধ্যতা করছ তার বিশালত্বের দিকে তাকাও।"
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ছোট-বড় সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচার তাওফিক দান করুন এবং জেনে-নাজেনে যে সকল গুনাহ করে ফেলি সেগুলো ক্ষমা করুন। আমীন।
▬▬▬◄❖►▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল, সৌদি আরব
fb id: AbdullaahilHadi