10/06/2026
কাঁটাতারের দুই পাশে...
আলী কদর পলাশ
রাতের অন্ধকারে দূর থেকে দেখলে কাঁটাতারের বেড়াটাকে মনে হয় দুই দেশের শেষ সীমা। যেন এপাশ বাংলাদেশ, ওপাশ ভারত। কিন্তু সীমান্তের বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
অনেক জায়গায় আন্তর্জাতিক সীমারেখা আর কাঁটাতারের বেড়া একই জায়গায় নয়। সীমারেখা থেকে কিছুটা ভেতরে ভারত বেড়া নির্মাণ করেছে। ফলে বেড়া আর সীমারেখার মাঝখানে রয়ে গেছে জমি, যা আইনগতভাবে এখনও ভারতেরই ভূখণ্ড। মানচিত্রের এই বাস্তবতা সীমান্তবাসীরা জানে, কিন্তু দেশের ভেতরের অধিকাংশ মানুষ জানে না।
সাম্প্রতিক পুশ-ইন বিতর্কে এই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এসেছে।
ধরা যাক, রাতের অন্ধকারে কয়েকটি পরিবারকে এনে কাঁটাতারের বেড়ার বাইরের অংশে রেখে যাওয়া হলো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে তারা বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি, হয়তো বাংলাদেশের ভেতরেই। কিন্তু বাস্তবে তারা তখনও ভারতের জমিতেই বসে আছে। সামনে বাংলাদেশ, পেছনে ভারত, অথচ তাদের জন্য কোনো দরজা খোলা নেই।
সেই মুহূর্তে মানুষের পরিচয় বদলে যায়। তারা আর শুধু কোনো দেশের নাগরিক নয়; তারা হয়ে ওঠে অপেক্ষমাণ মানুষ।
একজন মা হয়তো সারাদিনের ক্লান্তিতে মাটিতে বসে আছেন। পাশে তার দুই সন্তান। বড় শিশুটি বুঝতে পারছে না কেন তাকে বারবার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোটটি শুধু কাঁদছে। তার ক্ষুধা লেগেছে। সে জানে না নাগরিকত্ব কী, সীমান্ত কী, কূটনীতি কী। সে শুধু জানে, অনেকক্ষণ ধরে কেউ তাকে ভাত খেতে দেয়নি।
কাঁটাতারের এই ভৌগোলিক বাস্তবতা আসলে মানুষের দুর্ভোগকে আরও গভীর করে। কারণ তারা এমন এক জায়গায় অবস্থান করে, যেখানে মানচিত্রের হিসাব আছে, কিন্তু জীবনের নিশ্চয়তা নেই। তাদের মাথার ওপর আকাশ আছে, পায়ের নিচে মাটি আছে, কিন্তু সেই মাটির দায়িত্ব নিতে কেউ তৎক্ষণাৎ এগিয়ে আসে না।
রাষ্ট্রের কাছে বিষয়টি নিরাপত্তা, আইন এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন। কিন্তু সীমান্তে বসে থাকা মানুষের কাছে বিষয়টি অনেক সহজ। সে জানতে চায়, আজ রাতে তার পরিবার কোথায় ঘুমাবে। তার শিশুর জ্বর এলে কে ওষুধ দেবে। বৃষ্টি নামলে তারা কোথায় আশ্রয় নেবে।
সীমান্তের কাঁটাতার তাই শুধু দুটি দেশকে আলাদা করে না। কখনও কখনও এটি মানুষকে তার মৌলিক পরিচয় থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একদিকে একটি রাষ্ট্র বলছে, "তুমি আমার নও।" অন্যদিকে আরেকটি রাষ্ট্র বলছে, "তুমি যে আমার, তার প্রমাণ কোথায়?"
এই দুই বাক্যের মাঝখানে বসে থাকে মানুষ।
দূর থেকে দেখা যায় কাঁটাতার। কাছে গেলে দেখা যায় মানুষ। আর আরও কাছে গেলে দেখা যায়, সীমান্তের সবচেয়ে বড় সংকট আসলে জমি বা রেখার নয়; সবচেয়ে বড় সংকট হলো সেই মানুষগুলোর, যারা একদিন হঠাৎ বুঝতে পারে, দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তারা কোনো দেশের ভেতরে নেই।