07/09/2026
গল্প লেখা :
বাবার পকেটে টাকা ছিল না, কিন্তু আমার স্বপ্নটা বড় ছিল
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা।
পুরো বাড়ি ঘুমিয়ে গেছে।
শুধু আমার বাবা তখনও জেগে ছিলেন।
ছোট্ট একটা টেবিলের ওপর একটা পুরোনো হিসাবের খাতা। পাশে একটা ভাঙা চশমা। আর হাতে কয়েকটা কুঁচকে যাওয়া নোট।
বাবা টাকাগুলো বারবার গুনছিলেন।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে টাকাগুলো খাতার ভেতর রেখে দিলেন।
আমি দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিলাম।
আমার বয়স তখন মাত্র ষোলো।
আমার একটা স্বপ্ন ছিল—আমি শহরের ভালো একটা কলেজে পড়ব। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াব।
কিন্তু সেই স্বপ্নটার একটা দাম ছিল।
আর সেই দামটা আমার বাবার সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
পরদিন সকালে সাহস করে বাবাকে বললাম,
“বাবা, আমি ওই কলেজটাতে ভর্তি হতে চাই।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
“তুই পড়তে চাইলে পড়বি বাবা। টাকা নিয়ে চিন্তা করিস না।”
আমি তখন বুঝিনি…
এই কথাটার পেছনে কতটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল।
আমাদের সংসারে তখন অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
বাবা একটা ছোট চাকরি করতেন।
মাসের শেষে বেতন হাতে আসার আগেই প্রায় সব টাকা শেষ হয়ে যেত।
বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, আমার পড়াশোনা, ছোট বোনের স্কুলের খরচ—
সবকিছু সামলানোর পর বাবার নিজের জন্য কিছুই থাকত না।
অনেক রাতে দেখতাম বাবা চুপচাপ বসে আছেন।
মা বলতেন,
“তোমার নিজের জন্য একটা নতুন জামা কিনো।”
বাবা হেসে বলতেন,
“আমার জামা দিয়ে কী হবে? ছেলেটার বই লাগবে।”
আমি পাশের ঘর থেকে কথাগুলো শুনতাম।
কিন্তু কখনো কিছু বলতাম না।
কারণ তখনও আমি বুঝতাম না—
একজন বাবা নিজের প্রয়োজনগুলো কীভাবে সন্তানের স্বপ্নের নিচে চাপা দিয়ে রাখে।
কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন যতই কাছে আসছিল, আমার ভয় ততই বাড়ছিল।
একদিন বাবাকে বললাম,
“বাবা, যদি অনেক খরচ হয়… তাহলে আমি এখানেই পড়ব।”
বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই শুধু ভালো করে পড়। তোর স্বপ্ন ছোট করার দায়িত্ব তোর না।”
সেদিন বাবার কথাটা আমার বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল।
ভর্তির দিন বাবা আমাকে নিয়ে শহরে গেলেন।
আমার হাতে নতুন একটা ব্যাগ।
ব্যাগটা খুব দামি ছিল না।
কিন্তু সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার।
কলেজের অফিসে গিয়ে যখন ফি-এর কথা বলা হলো, বাবা পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন।
আমি দেখলাম…
মানিব্যাগে টাকা খুব কম।
বাবা চুপ করে গেলেন।
আমি বুঝে গেলাম।
আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
আমি বললাম,
“বাবা, থাক। আমি এখানে পড়ব না।”
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুই বাইরে দাঁড়া।”
আমি বাইরে চলে এলাম।
প্রায় বিশ মিনিট পর বাবা বেরিয়ে এলেন।
মুখে হাসি।
হাতে আমার ভর্তি ফরম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“টাকা দিলে কীভাবে?”
বাবা শুধু বললেন,
“ব্যবস্থা হয়ে গেছে।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
কয়েক মাস পর একদিন হঠাৎ বাবার আলমারি খুলতে গিয়ে একটা কাগজ পেলাম।
কাগজটা হাতে নিয়ে দেখি—
একটা পুরোনো ঘড়ি বিক্রির রসিদ।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
কারণ ওই ঘড়িটা আমি ছোটবেলা থেকেই বাবার হাতে দেখেছি।
আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“মা, বাবার ঘড়িটা কোথায়?”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“তোর কলেজের ভর্তির টাকা কম পড়েছিল। তোর বাবা ঘড়িটা বিক্রি করে দিয়েছিল।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
মনে হলো বুকের ভেতর কেউ যেন পাথর রেখে দিয়েছে।
আমি বাবার কাছে গেলাম।
বাবা তখন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন।
আমি চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে বললাম,
“বাবা, তুমি আমাকে বলোনি কেন?”
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
তারপর হেসে বললেন,
“এতটুকু ব্যাপার নিয়ে কাঁদছিস কেন?”
আমি বললাম,
“ওটা তো তোমার প্রিয় ঘড়ি ছিল।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“ঘড়ি আবার কেন প্রিয় হবে?”
তারপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ওটা তো শুধু একটা ঘড়ি ছিল। তুই আমার ছেলে। তোর স্বপ্নটা তার চেয়ে অনেক বেশি দামি।”
সেদিন প্রথমবার আমি বুঝেছিলাম—
বাবারা ভালোবাসি কথাটা খুব কম বলেন।
তারা ভালোবাসাটা পকেট থেকে বের করে দেন।
কখনো বই কিনে…
কখনো ফি দিয়ে…
কখনো নিজের শখ ছেড়ে…
কখনো নিজের প্রয়োজনটা লুকিয়ে।
বছর কয়েক পর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।
সেদিন বাবার হাতে একটা নতুন ঘড়ি তুলে দিয়েছিলাম।
বাবা ঘড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“এত টাকা খরচ করলি কেন?”
আমি হেসে বললাম,
“বাবা, এটা শুধু একটা ঘড়ি না।”
“এটা আমার সেই স্বপ্নের প্রথম কিস্তি।”
বাবা কিছু বললেন না।
শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি অনুভব করলাম—
বাবার বুকটা কাঁপছে।
হয়তো আনন্দে…
হয়তো পুরোনো কষ্টের কথা মনে পড়ে।
আজ আমি অনেক দূর এসেছি।
নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি।
আমার ঘরে অনেক দামি জিনিস আছে।
কিন্তু বাবার সেই পুরোনো ঘড়ির মতো কোনো জিনিস আমার কাছে এত মূল্যবান নয়।
কারণ সেই ঘড়িটা শুধু সময় দেখাত না।
ওটা আমাকে শিখিয়েছিল—একজন বাবা নিজের সময়, নিজের স্বপ্ন, নিজের আরাম… সবকিছু সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য দিয়ে দিতে পারেন।
আজও মাঝে মাঝে বাবার পুরোনো মানিব্যাগটা দেখি।
একসময় সেখানে টাকা ছিল না।
কিন্তু সেই খালি মানিব্যাগের ভেতরেই ছিল আমার পুরো ভবিষ্যৎ।
তাই যদি আপনার বাবা আজও আপনার জন্য কষ্ট করেন…
তাহলে তাকে শুধু একদিন “ভালোবাসি” বলবেন না।
তার পাশে বসুন।
তার হাতটা ধরুন।
আর বলুন—
“বাবা, তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পেরেছি।”
কারণ পৃথিবীতে অনেক মানুষ আপনার সফলতা দেখতে চাইবে।
কিন্তু আপনার সফলতার জন্য নিজের জীবনটা নিঃশব্দে উৎসর্গ করবে—
সেই মানুষটার নাম বাবা।
বাবার পকেটে হয়তো টাকা কম ছিল…
কিন্তু আমার স্বপ্নের জন্য তার ভালোবাসা ছিল সীমাহীন।
#বাবারভালোবাসা