14/02/2026
সালটা ১৯৯৬, প্রথম জানুয়ারি,,,
চারিদিকে এখনো ভোরের আলো ফোটেনি।
গাছের পাতাগুলো অন্ধকারে ছেয়ে আছে।
চারিদিকে নীরবতা কাটিয়ে, দূর থেকে ভেসে আসছে ।
কারো মরা কান্নার আওয়াজ,,,
—গিন্নিমা আপনি হুনছেন...? করিমের মাইয়াডারে কেডা জানি..?মাইরা বটতলায় ফেলায় রেখে গেছে...
মাথায় মনে হয় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে। মাথাটা পুরো থেতলে গেছে। দেইখা চেনার উপায় নাই।
করিমডার তিন কুলে আর কেউ নাই। একটা মাইয়া ছিল। তাও তো কারা জানি কাইরা নিল।
করিমডা খুব ভাঙ্গে পড়ছে।
কি যে শুরু হইল গেরামটাতে। আল্লাহ মালুম,,
আল্লাহর গজব পড়ুক। ওই জানোয়ারদের উপর।
হাজেরা সওদাগর,,
রুটি বেলতে বেলতে বললেন: আল্লাহ মেয়েটাকে জান্নাতবাসী করুক... গ্রাম টাকে জানোয়ারদের হাত থেকে রক্ষা করুন... জানিনা আর কতদিন এসব মেনে চলতে হবে....
রান্না ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে। প্রতিটা কথা শুনছে মহুয়া।
প্রতিটা কথার ধ্বনি কানে আসতে। বুকের ভেতরটা যেন মুছরে উঠছে তার।
— আম্মা...
—কি হয়েছে...?
—আমি মেয়েটাকে দেখতে যেতে চাই আম্মা...
—না... তোকে যেতে হবে না....
—আমি মুখ ঢেকে যাব... কেউ আমাকে দেখবে না আম্মা...
—আমাকে রাগাস না মহুয়া.... ঘরে গিয়ে ঘরের কাজগুলো গুছিয়ে ফ্যাল...
মহুয়ার কথা বলবে না মন খারাপ করে নিজের ঘরে চলে গেল।
ঘরে থাকা ক্যালেন্ডারে চোখ পড়তেই। মনে পড়লো আজকে বড় আপার জন্মদিন।
তাই ছোট ভাই শিহাবকে ডাকে।
শিহাব এই শিহাব ,,শিহাব। কইরে আপা ডাকি শুনে যা।
মহুয়ার সৎ মা জানালেন: শিহাব খেতে গেছে সবজি আনার জন্য... তারে ক্যান ডাকো মহুয়া...
—ও বাড়ি ফিরলে আমার কাছে পাঠাইও ছোট আম্মা.. ওর সাথে দরকার আছে....
জাহারা হলেন মহুয়ার সৎ মা। তার যখন দুই থেকে তিন বছর বয়স। হাজেরা সওদাগর। কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ায়। আমজাদ সওদাগর দ্বিতীয় বিয়ে করে।
বড় বোন যাহারা কে মেনে নিতে না পারলে। মহুয়া ও বকুল মেনে নিয়েছে নিজের মা হিসেবে। যাহারা তাদের নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে।
ছোট থেকে আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তুলেছে। মায়ের মত মমতা দিয়ে এসেছেন। ছোট বোন বকুলের ১৩ বছর বয়স। মহুয়া ষোল বছর বয়সে কিশোরী।
বড় বোনের বিয়ে হয়েছে আরো কয়েক বছর আগে।
ছোট ভাই শিহাব। ১৪ বছর বয়স,, যাহারা সন্তান শিহাব।
—আপা আমারে ডাকছো...?
—হ্যাঁ...
—কিছু কইবা..?
—হ্যাঁ ..
—কি করতে হইবে.. আমারে একবার খালি কও.. আমি এখনই কইরা দিমু...
— মল্লিকা কে গিয়ে বলবি আপা ডেকেছে..
—আচ্ছা আপা আমি এহনই যাইতাছি..
—আর শোন.. শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার অভ্যাস কর...
— জ্বী আপা...
— আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসতে বলিস।
— আমি যাই তাহলে আপা...
মহুয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কাঠের জানালাটা খুলে দিল।
বাইরের মিষ্টি রোদের ঝিলিক এসে পরলো তার ফর্সা মুখে।
ছোট্ট মাথায় হাজাররকম প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে।
কে বা কারা, এমন খুনখারাবিতে মেতে উঠেছে।
আর শুধু কিশোরী মেয়েদের কেন..? মেয়েদের সাথে তাদের কিসের শত্রুতা...?
তখনই পিছন থেকে বেশি এলো বকুলের কণ্ঠস্বর:— আপা তুমি কিছু শুনছো...?
—হ্যাঁরে বকুল... সকালে আমেনা খালার কাছে শুনছি...
—গ্রামটাতে যেগুলো কি শুরু হইলো আপা...
—হ্যাঁরে বকুল.. তুই সেখানে গিয়েছিলি নাকি..?
—হ্যাঁ.. পুলিশ এসেছে... তদন্ত করছে,,
—কি মনে হয়..? আসামি বের হবে ...?
—আমি জানিনা আপা... গত বছরও তো কত মেয়ের লাশ পাওয়া গেল। কই একটা আসামি তো বের হলো না। এবার আর নতুন কি...?
এবারও যে হবে না তা খুব ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে...
জানিনা আর কত কিশোরী এই ঘটনা স্বীকার হবে,,
আম্মা তোমারে খেতে ডাকছে। খেতে চলো,,,
—তুই যা আমি আসতেছি....
—তাড়াতাড়ি এসো আপা...
বলেই বকুল খাওয়ার ঘরের এল,
বকুলকে একা আসতে দেখে হাজারা সওদাগার বলে উঠলেন: বকুল তুই একা আসলি যে.. মহুয়া কই..?
—আপা আসতেছে আম্মা...
—আচ্ছা তুই মাদুর পেতে বোস আমি ভাত দেই...
মহুয়ায় এসে মাদুর বিছিয়ে বসতে বসতে বলল: —আম্ম তোমার একটা কথা কই...?
—বল ...
—বড় আপা কবে আসবে আম্মা.. কতদিন হয়ে গেল বড় আপা এই বাড়িতে আসে না...
হাজরা সওদাগর প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন : আসার জন্য খবর পাঠাবো। তুই এখন খেয়ে নে,
কিছুক্ষণ আগেই বকুল খাওয়া দাওয়া করে। আঙ্গিনার রোদে একটা পাঠাচ্ছি আর নিয়ে বসেছে। বাড়ির গেটে কারো কড়া পরছে।
তাই বকুল উঠে গেল সদর দরজা খোলার জন্য।
দরজা খুলতে এই চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেলো।
চিৎকার দিয়ে বলল: আম্মা, বড় আপা,,,
ওর চিৎকার শুনে, হাজরা সওদাগর তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলেন।
পিছু পিছু মহুয়া ও ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো।
সামনে থাকা মানুষটির দিকে চোখ করতেই। হাত থেকে ভাতের প্লেটটা পড়ে গেল মহুয়ার।
মোহিনী ছুটে এসে। মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলো।
—আম্মা তোমার মেয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারেনি আম্মা...
উনি আমাকে কোনদিন ভালোবাসিনি আম্মা,,,
উনি আমাকে ছেড়ে দিয়েছে...
আমার পেটে বাচ্চাটাকে বাবা ডাকতেছে বঞ্চিত করেছে আম্মা,,,
তোমার মেয়ে সংসার করতে পারেনি আম্মা,,,
মোহিনীর পুরো শরীরে মাটির লাগানো। চুলগুলো এলোমেল। মনে হচ্ছে চুল ধরে কেউ মাটিতে। ছেচরা দিয়েছে।
শরীরে অসংখ্য মাইরের দাক।
ডান হাতটা গরম তেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এতে হাজেরা সওদাগরের, কোন প্রতিক্রিয়ে দেখা গেল না। খুব স্বাভাবিক ও শান্ত কন্ঠে বলল: ঘরে গিয়ে গোসল করে কাপড় পরিবর্তন করে নে মোহিনী...
বকুল মোহিনের হাত ধরে বলল; চলো আপা আমি তোমারে উপরে নিয়ে যাই...
—না বকুল... ওকে একা যেতে দে...
মেয়ে মানুষের ভেঙ্গে পড়তে নেই,,
আঘাত পেয়ে পাথরের মত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে হয় না। নিজেকে লোহার মতো তৈরি কর।
তে ভেঙ্গে নাই। আগুনে পুড়িয়ে যেন। নতুন কিছু তৈরি হয়।
আমার মেয়েদের কে যেন। আঘাত পেয়ে কখনো ভেঙ্গে যেতে না দেখি। যেখান থেকে আঘাতের শেষ। এখান থেকেই নিজেকে আর নতুন করে তৈরি করার চেষ্টা করবে।
মহুয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।—আম্মা আসলে কি দিয়ে তৈরি..?
কোনদিন কারো কাছে কষ্ট প্রকাশ করতে দেখলাম না...
বড় কঠোর মনের মানুষ আম্মা...
তা না হলে আপার এমন অবস্থা দেখে। কিভাবে স্বাভাবিক থাকতে পারে।
চারিদিকে বিকেলের আভাস নেমে এসেছে। শীতকালীন দিন। তাই চারিদিকে আবছা কুয়াশাও মিশে আছে।
মোহিনী ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে যাচ্ছে।
—আপা তুমি কাঁদছো কেন...? আম্মা কি বলল শুননি..? ভেঙ্গে পড়না আপা...? তোমার সন্তানকে নিয়ে ভাবো.. কেদোনা আপা...
—আমি সহ্য করতে পারছি না রে মহুয়া... ওই বাড়িতে থাকার আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারলাম নারে মহুয়া... শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলাম। কষ্টগুলো মনের ভেতর চেপে রাখতে পারছি না।
—তুই শুনবি আমি পাঁচটা বছর কিভাবে কাটিয়েছি...?
,—হ্যাঁ আপা আমি শুনতে চাই..
—যখন আমি নতুন বিয়ে হয়ে ওই বাড়িতে গেলাম। একটা বছর খুব ভালো কেটেছে, হয়েছিল আমার মত সুখী হয়ত পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
একটা বছর যেতেই শুরু হলো আমার উপর নির্যাতন।
কারণটা কি ছিল জানস মহুয়া, আমার বাচ্চা হচ্ছিল না বলে...
এই নিয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে। আমার শরীর রক্তাক্ত করতো।
আমি কাউকে বলিনি...
বিয়ের তিন বছরের মাথায়,, আল্লাহতালার রহমতে। আমার গর্ভে সন্তান আসে।
মহুয়া...
লেখিকা_আনিকা_আফরিন
#পর্ব ০১...
প্রথম পর্ব, কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন। নেক্সট পর্ব চাইলে। কমেন্ট করুন.. এবং ফলো করুন উপন্যাস প্রেমির আড্ডা