09/05/2026
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি এ কথা জানান, যেখানে আগামী রোববার (১০ মে) থেকে শুরু হতে যাওয়া চারদিনব্যাপী এই কর্মসূচিকে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও নিজেদের প্রতি জনগণের বিশ্বাস অর্জনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো দেশের প্রতিটি মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করা। ঘরে বাইরে, কর্মক্ষেত্র বা চলাফেরার পথে যদি কোনো নাগরিক নিরাপদ বোধ না করেন, তবে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকারের সব কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের কাজটি মূলত পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। এই দায়িত্ব পালনে পুলিশের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে এই বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, আস্থার সম্পর্কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, যদি পুলিশ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করতে পারে, তাদের সঙ্গে বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে তাদের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কখনোই কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফল হতে পারে না—এই বাস্তবতাটি সবসময় মাথায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান ঘটেছে, জনমনে ফিরেছে কিছুটা শান্তি ও স্বস্তি। মানুষ এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন—এমন একটি বাংলাদেশের, যেখানে কাউকে গুম বা অপহরণের শিকার হতে হয় না, যেখানে কোনো ধরনের ভয়ে বা আতঙ্কে মানুষ জীবন যাপন করেন না। মানুষ চায় তাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের কোনো ক্ষতি হবে না; কেউ যেন কোনোভাবে অন্যায়, অবিচার বা নির্যাতনের শিকার না হন। এই প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর—এই বিষয়টি স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমের মূল্যায়ন করে তিনি বলেন, দেশের যেকোনো প্রয়োজনে বা সংকটের সময়ে পুলিশ সর্বদা সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। সেই সময় তারা প্রমাণ করেছেন, যদি সঠিক নির্দেশনা ও অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়, তবে কঠিন থেকে কঠিনতর দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করার সক্ষমতা বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখার মাধ্যমে তারা জনগণের আস্থা অর্জনের প্রথম ধাপটি সফলভাবে পার করেছেন।
শুধু দেশের সীমানার ভিতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ পুলিশ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা অসামান্য অবদান রেখেছেন, যার ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে, বেড়েছে দেশের মর্যাদা। বিদেশি বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা ও সততার প্রশংসা করেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আর পুরোনো ধাঁচের পুলিশ ব্যবস্থা দিয়ে চললে হবে না। বিশ্বজুড়ে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধ বাড়ছে, তাই পুলিশের আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণের মান বৃদ্ধি ও সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই কাজগুলো সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করে যাচ্ছে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, অপরাধ দমন এবং জাতীয় অগ্রগতি—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির উন্নতি সম্ভব নয়। তাই পুলিশ বাহিনীর উন্নয়নে সরকার যে বিনিয়োগ করছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়, বরং পুরো জাতির নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য করা বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও পুলিশের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও জনবলের মান উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে।
গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য দেশে স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যে কতটা জরুরি—সেই কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মব বা গণহিংসা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং মাদকদ্রব্যের ব্যাপক বিস্তার একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যা রোধে পুলিশকে আরও বেশি কার্যকর, সক্রিয় ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু অপরাধ দমন নয়, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এসব সামাজিক সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং জনগণের আস্থা রক্ষা করার মূল ভিত্তি হলো পেশাদার, দায়িত্বশীল ও ন্যায়নিষ্ঠ পুলিশ বাহিনী। জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ কেবল বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসব নয়—এটি হলো প্রতিটি পুলিশ সদস্যের নিজেদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করার, নিজেদেরকে মূল্যায়ন করার এবং জনগণের প্রকৃত বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে ওঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি বিশেষ মুহূর্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সপ্তাহের কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী নিজেদের লক্ষ্য ও লক্ষ্যপথ আরও স্পষ্ট করবে এবং জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে আরও বেশি নিষ্ঠার পরিচয় দেবে।
এই ঘোষণার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে—যে সরকার জননিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরলে জনগণ নিজেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করবেন, যার ফলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে। বিশেষ করে মাদক ও কিশোর অপরাধ রোধে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা গড়ে উঠলে সমাজ ও পরিবারের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া পুলিশের আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষণের ফলে তাদের কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়বে, যা সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
#পুলিশ_সংস্কার #জননিরাপত্তা #জাতীয়_পুলিশ_সপ্তাহ_২০২৬