12/08/2026
#অনুগল্প_১: শেষ ট্রেনের তৃতীয় কামরা
রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
স্টেশনে তখন আর কেউ নেই বললেই চলে। শেষ ট্রেনটা আসতে এখনও তেরো মিনিট বাকি।
রাহাত বেঞ্চে বসে ছিল। হাতে একটা পুরোনো বাদামি খাম। খামটার ওপর শুধু লেখা—
“যেদিন তুমি সত্যিটা জানতে চাইবে, সেদিন খুলবে।”
চিঠিটা তাকে দিয়েছিল তার বাবা।
বাবা মারা যাওয়ার আজ ঠিক সাত বছর।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মৃত্যুর আগে বাবা তাকে কখনো কোনো চিঠি লিখতেন না। কথা বলার মানুষ ছিলেন তিনি। চিঠি নয়।
তবু মৃত্যুর তিন দিন পর, বাবার আলমারি গোছাতে গিয়ে রাহাত খামটা পেয়েছিল।
সেদিন খুলতে পারেনি।
তার মনে হয়েছিল, কিছু সত্যি না জানাই ভালো।
আজ কেন যেন মনে হলো, সময় হয়ে গেছে।
রাহাত খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটা কাগজ।
“রাহাত,
তুই ছোটবেলায় আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলি, মানুষ কেন মিথ্যা বলে?
আমি বলেছিলাম, মানুষ ভয় পেলে মিথ্যা বলে।
উত্তরটা পুরোপুরি সত্যি ছিল না।
মানুষ শুধু ভয় পেলে মিথ্যা বলে না। কখনো কখনো ভালোবাসা থেকেও মিথ্যা বলে।
তোর মায়ের ব্যাপারে আমি তোকে যে গল্পটা বলেছি, সেটা মিথ্যা।
তোর মা আমাদের ছেড়ে চলে যায়নি।
আমি তাকে যেতে দিয়েছিলাম।
কারণ সে থাকতে চেয়েছিল।
আর আমি চেয়েছিলাম, তুই যেন আমাকে ঘৃণা না করিস।”
রাহাতের হাত কাঁপতে শুরু করল।
তার মা সম্পর্কে সে সারাজীবন একটা গল্পই শুনেছে।
মা নাকি তাকে ছেড়ে অন্য একজনের সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন।
ছোটবেলায় সে মাকে ঘৃণা করত।
বড় হওয়ার পর ঘৃণাটা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
তারপর একসময় সে মাকে ভুলেই গিয়েছিল।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
“তোর মা এখনও বেঁচে আছে।
শেষ ট্রেনের তৃতীয় কামরায় বসে থাকবে।
তুই যদি সত্যিটা জানতে চাস, আজ রাতে তার সঙ্গে দেখা করিস।
আর যদি না চাস, চিঠিটা এখানেই ছিঁড়ে ফেলিস।”
রাহাত মাথা তুলে তাকাল।
স্টেশনের ডিজিটাল ঘড়িতে তখন ১১টা ৫৪।
শেষ ট্রেন আসতে ছয় মিনিট।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছিল।
মানুষ জীবনে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তি দিয়ে।
আর কিছু সিদ্ধান্ত নেয় এমন এক জায়গা থেকে, যেখানে যুক্তির কোনো অধিকার নেই।
রাহাত উঠে দাঁড়াল।
---
ট্রেনটা ঠিক ১২টা ১ মিনিটে ঢুকল।
তৃতীয় কামরা প্রায় ফাঁকা।
রাহাত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল।
একজন বৃদ্ধ জানালার পাশে বসে ছিলেন।
একজন তরুণী বই পড়ছিল।
আর একদম শেষ সিটে একজন বৃদ্ধা।
সাদা শাড়ি।
চোখে চশমা।
হাতে একটা ছোট কাপড়ের ব্যাগ।
রাহাতের পা থেমে গেল।
বৃদ্ধা তাকালেন।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর বৃদ্ধা খুব শান্ত গলায় বললেন,
“তুই রাহাত?”
এই একটা প্রশ্নের মধ্যে সাতাশ বছরের অপেক্ষা ছিল।
রাহাত বসে পড়ল।
“আপনি আমার মা?”
মহিলাটি হাসলেন।
“তুই আমাকে কী নামে ডাকবি, সেটা আমি জানি না। তাই উত্তরটা তোর কাছেই থাক।”
রাহাতের চোখ জ্বালা করতে লাগল।
সে কোনোদিন কাঁদতে শেখেনি।
তার বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন, পুরুষ মানুষ কাঁদে না।
কিন্তু সেদিন সে বুঝল, কিছু কান্না চোখ দিয়ে আসে না।
কিছু কান্না মানুষের পুরো শৈশবটাকে ভিজিয়ে দেয়।
রাহাত ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন কেন?”
মহিলাটি জানালার বাইরে তাকালেন।
“আমি যাইনি।”
“তাহলে?”
“তোর বাবা আমাকে যেতে বলেছিল।”
রাহাত চুপ।
“কেন?”
মহিলাটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
“কারণ তোর বাবা জানত, আমি অসুস্থ। খুব বেশি দিন বাঁচব না।”
রাহাতের বুকটা ধক করে উঠল।
“কী?”
“ডাক্তার বলেছিল, আমার হাতে হয়তো দুই বছর আছে। তোর বয়স তখন চার।”
“তাহলে আমাকে বলেননি কেন?”
“কারণ তোর বাবা বলেছিল, তুই যেন আমাকে হারানোর ভয় নিয়ে বড় না হোস।”
রাহাত ফিসফিস করে বলল,
“কিন্তু আমি তো আপনাকে ঘৃণা করে বড় হয়েছি।”
মহিলাটি এবার তার দিকে তাকালেন।
“জানি।”
“আপনি জানতেন?”
“তোর বাবা প্রতি বছর আমাকে তোর ছবি পাঠাত।”
রাহাতের চোখ থেকে এবার সত্যিই পানি পড়ল।
“আপনি কখনো আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি?”
মহিলাটি মাথা নাড়লেন।
“এসেছিলাম।”
“কখন?”
“তোর স্কুলের প্রথম দিন। তুই নীল ব্যাগ নিয়ে বাবার হাত ধরে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলি।”
রাহাত স্থির হয়ে গেল।
“আমি দূর থেকে দেখেছিলাম। তুই আমাকে দেখিসনি।”
“তারপর?”
“তারপর তোর জন্মদিনে। তারপর তুই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলি।”
মহিলাটি একটু হাসলেন।
“আর আজ।”
রাহাত জানালার বাইরে তাকাল।
অন্ধকার শহর পিছনে ছুটে যাচ্ছে।
তার মনে হলো, মানুষের জীবন আসলে কত অদ্ভুত।
আমরা যাদের সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি, কখনো কখনো তাদের গল্পের অর্ধেকও জানি না।
কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে যায় না।
আমরা শুধু তাদের চলে যাওয়ার একটা গল্প বানিয়ে নিই।
“আপনি এখন কোথায় থাকেন?”
মহিলাটি বললেন,
“এই শহরেই।”
“আমার সঙ্গে থাকবেন?”
মহিলাটি মৃদু হাসলেন।
“এখন আর থাকা সম্ভব নয়।”
রাহাত বুঝতে পারল না।
তারপর মহিলা ধীরে ধীরে বললেন,
“আমার হাতে আর সময় নেই।”
রাহাত তার হাতটা ধরে ফেলল।
হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা।
“কতদিন?”
মহিলাটি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
“একটা কথা মনে রাখিস।”
“কী?”
“কাউকে ঘৃণা করার আগে তার গল্পটা শুনে নিস।”
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে পরের স্টেশনে ঢুকছে।
রাহাত হঠাৎ খেয়াল করল, বৃদ্ধার হাতে একটা পুরোনো ঘড়ি।
ঘড়িটা তার বাবার।
“এটা আপনার কাছে কেন?”
মহিলাটি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর বাবা আমাকে দিয়েছিল।”
“কবে?”
“আজ থেকে সাত বছর আগে।”
রাহাতের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“বাবা মারা যাওয়ার আগে?”
“হ্যাঁ।”
“আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমাকে কিছু বলেননি কেন?”
মহিলাটি মৃদু হেসে বললেন,
“তোর বাবা আমাকে একটা কথা বলেছিল।”
“কী?”
“বলেছিল, ‘রাহাত যখন সত্যিটা জানার মতো বড় হবে, তখন চিঠিটা ওর হাতে দিস।’”
রাহাত ধীরে ধীরে বুঝতে পারল।
তার বাবা জানতেন।
মা জানতেন।
শুধু সে জানত না।
এত বছর ধরে সে যেটাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা মনে করেছে, সেটা আসলে ছিল দুজন মানুষের অসম্ভব রকমের ভালোবাসার একটা ভুল পদ্ধতি।
ট্রেন থামল।
মহিলাটি উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি নামব।”
রাহাত তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আবার দেখা হবে?”
মহিলাটি কিছু বললেন না।
শুধু মাথায় হাত রেখে বললেন,
“এবার থেকে নিজের জীবনে কাউকে ভালোবাসলে, তার জন্য সিদ্ধান্ত নিস না। তার সঙ্গে কথা বলিস।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
রাহাত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, সাদা শাড়ির মানুষটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
তার হাতে তখনও বাবার চিঠি।
চিঠির একেবারে নিচে, যা সে এতক্ষণ খেয়াল করেনি, আরও একটা লাইন লেখা ছিল—
“কিছু সত্যি মানুষকে ভেঙে দেয় না, বরং তাদের পুরোনো জীবনটা শেষ করে দেয়।”
সেদিন রাতেই রাহাত প্রথমবার বাবাকে ক্ষমা করেছিল।
আর তার মাকে?
তাকে ক্ষমা করার প্রয়োজনই ছিল না।
কারণ সে কোনোদিন অপরাধী ছিল না।
অপরাধটা ছিল শুধু একটাই—
দুজন মানুষ ভালোবাসাকে এত বেশি রক্ষা করতে চেয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত সত্যিটাকেই লুকিয়ে ফেলেছিল।