28/07/2026
বাবাকে বাঁচাতে পারেনি তিনটি ওড়না, মেয়েকে বাঁচিয়ে চিরবিদায় নিলেন বাবা
হাওরে ঘুরতে গিয়ে এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ-মিঠামইন সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন হাওরে গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন ঢাকায় কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট মো. বাছির উদ্দিন মিলন। স্ত্রী, তিন মেয়ে এবং স্বজনদের নিয়ে আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে।
গোসলের সময় হঠাৎ প্রবল স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে তাঁর মেয়ে সেমন্তী। এক মুহূর্ত দেরি করেননি বাবা। বারবার ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে নিরাপদ জায়গায় তুলে দেন। কিন্তু নিজের আর ফিরে আসা হয়নি। তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যান তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছিল মেয়ের স্মৃতিচারণা।
“সাঁতার কাটার সময় আমায় ধাক্কা দিয়ে ঠিকই ওপরে তুলে দিল বাবা। কিন্তু চোখের সামনে বাবা পানিতে তলিয়ে গেল। আমরা তিনটি ওড়না বেঁধে বাবার দিকে ছুড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু স্রোতের কারণে বাবা ধরতে পারেননি। যদি জানতাম বাবা হারিয়ে যাবে, তাহলে কখনো পানিতে নামতাম না।”
আজ সেই বাবার কবরের পাশে গিয়ে দুই বছরের ছোট্ট মেয়ে সাইয়ারা বলে, “এখানে আমার বাবা শুয়ে আছে।” তারপর আবার শিশুসুলভ সরলতায় খেলতে চলে যায়। অথচ সে এখনো বুঝতেই পারেনি, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
নিহতের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবু বাক্কার জানান, হাওরে যাওয়ার আগে ছেলে তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন, “বাবা, হাওরে বেড়াতে যাব, আপনিও কি যাবেন?” সেটিই ছিল বাবা-ছেলের শেষ কথা। শোকাহত এই বাবা বলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ।”
বাছির উদ্দিনের স্ত্রী এখনও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না। বড় দুই মেয়ে প্রায় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই পরিবারের সামনে দাঁড়িয়েছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। তিন মেয়ের লেখাপড়া, সংসারের খরচ এবং ব্যাংকের ঋণের বোঝা। পরিবার ও স্বজনরা সমাজের বিত্তবান মানুষ, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা করা হবে।
একজন বাবা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন, সন্তানের জীবন বাঁচানোর কাছে নিজের জীবনও তুচ্ছ হয়ে যায়।
এই পরিবারের জন্য আপনার একটুখানি সহানুভূতি, দোয়া এবং সম্ভব হলে সহযোগিতাই হতে পারে তাদের নতুন করে বাঁচার শক্তি।