25/08/2026
যে দেশে পুরুষের ভুঁড়িই সৌন্দর্যের মাপকাঠি, মোটা হলেই মেলে নায়কের সম্মান!
বিশ্বের অনেক সমাজে ছিপছিপে শরীরকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওমো ভ্যালির বোডি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি একেবারেই ভিন্ন। সেখানে পুরুষের বড় ভুঁড়ি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং তা সম্পদ, মর্যাদা, শক্তি ও সামাজিক সম্মানের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। এমনকি সবচেয়ে বড় ভুঁড়ির অধিকারী পুরুষকে দেওয়া হয় ‘ফ্যাট ম্যান অব দ্য ইয়ার’ বা বছরের সবচেয়ে মোটা পুরুষের সম্মান।
এই অদ্ভুত অথচ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ‘কা’ইল’ উৎসব। এটি বোডি জনগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ আয়োজন। উৎসবের আগে কয়েক মাস ধরে অবিবাহিত তরুণ পুরুষদের ওজন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে। বিভিন্ন পরিবার থেকে একজন করে তরুণকে প্রতিযোগিতার জন্য বেছে নেওয়া হয়।
ভুঁড়ি বাড়াতেই ছয় মাসের ‘সাধনা’ : -
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তরুণদের প্রায় তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে হয়। এ সময় তারা শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কুঁড়েঘরের বাইরে বের হওয়াও নিষিদ্ধ থাকে। যৌ/নসংযমও এই প্রস্তুতির অংশ। উদ্দেশ্য একটাই—যত দ্রুত সম্ভব শরীরে ওজন বাড়ানো।
ওজন বাড়ানোর প্রধান খাবার হিসেবে তাদের দেওয়া হয় গরুর দুধ ও রক্তের মিশ্রণ। বোডি জনগোষ্ঠীর কাছে গবাদিপশু অত্যন্ত মূল্যবান ও পবিত্র। তাই র'ক্ত সংগ্রহের সময় সাধারণত পশুটিকে হ/ত্যা করা হয় না; শিরায় ছোট ছিদ্র করে র'ক্ত নেওয়া হয় এবং পরে ক্ষতস্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ফরাসি আলোকচিত্রী এরিক লাফর্গের নথিভুক্ত বর্ণনায় দেখা যায়, প্রতিযোগীদের দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রচুর পরিমাণে দুধ ও রক্তের মিশ্রণ পান করতে হয়। অতিরিক্ত তরল দ্রুত পান করা অনেকের জন্য অত্যন্ত ক'ষ্ট'ক'র হয়ে ওঠে; কেউ কেউ তা সহ্য করতে না পেরে বমিও করেন।
যত বড় ভুঁড়ি, তত বেশি সম্মান
মাসের পর মাস এই বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও বিশ্রামের পর আসে কাঙ্ক্ষিত উৎসবের দিন। প্রতিযোগীরা শরীরে কাদা ও ছাই মেখে বিশেষ সাজে জনসমক্ষে হাজির হন। এরপর তাদের বড় হয়ে ওঠা শরীর ও পেট প্রদর্শন করে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে হয়।
অনুষ্ঠানের সময় তারা একটি পবিত্র গাছকে ঘিরে হাঁটেন এবং প্রবীণরা তাদের শারীরিক গঠন পর্যবেক্ষণ করেন। অতিরিক্ত ওজনের কারণে অনেক প্রতিযোগীর হাঁটাচলাই ক'ঠি'ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় নারীরা তাদের ঘাম মুছিয়ে দেন এবং প্রয়োজনীয় পানীয় দিয়ে সহযোগিতা করেন।
শেষ পর্যন্ত যে প্রতিযোগীর পেট বা শরীরের আকার সবচেয়ে বড় বলে বিবেচিত হয়, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এই বিজয়ের সঙ্গে সাধারণত বড় কোনো আর্থিক পুরস্কার জড়িত থাকে না। কিন্তু সামাজিক সম্মানটাই এখানে সবচেয়ে বড় অর্জন। বিজয়ী পুরুষ দীর্ঘদিনের জন্য গোত্রের নায়ক হিসেবে পরিচিতি পান এবং বিয়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেন।
আজব মনে হলেও এর পেছনে আছে সামাজিক বিশ্বাস
বাইরের পৃথিবীর কাছে এই প্রতিযোগিতা যতই বিস্ময়কর মনে হোক, বোডি সমাজে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব জীবনধারা ও মূল্যবোধ। গবাদিপশু তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে বড় শরীরকে সেখানে সমৃদ্ধি ও সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবে দেখার ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে।
আর এখানেই আধুনিক বিশ্বের সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে বোডি সংস্কৃতির বিস্ময়কর পার্থক্য। যেখানে বিশ্বের বহু জায়গায় মানুষ ভুঁড়ি কমাতে জিম, ডায়েট ও নানা পদ্ধতির আশ্রয় নেন, সেখানে বোডি সমাজের তরুণরা ঠিক উল্টো পথে হাঁটেন—ভুঁড়ি যত বড়, সম্মানও যেন তত বেশি!
উৎসব শেষ, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা
কা’ইল উৎসব শেষ হওয়ার পর প্রতিযোগীরা আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যান। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার এই জনগোষ্ঠী মূলত পশুপালন ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। উৎসবের জন্য বাড়ানো অতিরিক্ত ওজনও অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কমে যায়।
তবে এই ঐতিহ্য আধুনিকতার চাপে পরিবর্তনের মুখে পড়ছে। ভূমি ব্যবহার, পুনর্বাসন, নগরায়ণ ও তরুণদের অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো নানা কারণে বোডি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, যে ভুঁড়ি একসময় শুধু শরীরের অতিরিক্ত মেদ হিসেবে দেখা যেতে পারে, বোডি সমাজে সেটিই হয়ে ওঠে সম্মান, সৌন্দর্য ও সামাজিক সাফল্যের প্রতীক। পৃথিবীর সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যে এক নয়—ইথিওপিয়ার এই ছোট জনগোষ্ঠীর ‘কা’ইল’ উৎসব তারই এক বিস্ময়কর উদাহরণ।
তথ্যসূত্র: আরটিভি
#ইথিওপিয়া